
শাহজাহানের “সুহৃদ স্বজন স্মৃতি”
কৈশোর-যৌবনের সোনাঝরা দিনগুলোতে নিয়ে যায়

প্রদীপ সিংহ রায় (মুকুট) ।।
ভেবেছিলাম আমাদের প্রিয় ছোটভাই বন্ধু-সহকর্মী কুমিল্লার বিশিষ্ট নাট্য-ব্যক্তিত্ব শাহজাহন চৌধুরীর সর্বশেষ গ্রন্থ “সুহৃদ স্বজন স্মৃতি” সম্পর্কে পর্যালোচনা বা রি-ভিউ লিখবো বইটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা উৎসবের পর। কিন্তু দেখলাম গত বছরের (২০২১) ৪ঠা জুলাই প্রকাশিত হলেও যেকোন কারণে বইটির প্রকাশনা উৎসব করা যায়নি। কিংবা লেখক নিজেই তার প্রয়োজন বা তাগিদ অনুভব করেননি সম্ভবতঃ গত আড়াই বছর ধরে ডাইনী করোনার আগ্রাসনের বিব্রতকর-অস্বস্তিকর দিনগুলোর কারণে। অবশ্য লেখক নিজে আমাদের পশ্চিম তালপুকুর পাড়ের বাড়িতে (শান্তি কুটির) এসে বইটির একটি সৌজন্য কপি উপহার দেন গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর।
বেশ কিছুদিন অনুজপ্রতিম শাহজাহানের বইটি পড়বার সুযোগ পাইনি বা হয়নি। বাড়িতে একটা ১৭ মাস বয়সী দষ্যি ছেলেকে ক্ষাণিক দেখভাল ও জীবনের প্রান্তবেলায় এসে হৃদয়ের অনেকটা জুড়ে পিচ্চিটার অবস্থান নেবার কারণে। বই-পত্র দেখলেই এই এত্তোটুকুনি শিশু যেখানে সেখানে ছুঁড়ে ফেলে দেয় । তার কাছ থেকে একটু নিস্তার পাবার জন্যেই প্রতিষেধকমূলক বা প্রতিরক্ষামূলক একটা ব্যবস্থা হিসেবে বিছানার আশপাশে যতগুলো বই ছিলো সেগুলো লুকিয়ে রাখতে হয়। শাহজাহানের বইটিও তার মধ্যে ছিল। বলছিলাম আমার তৃতীয় ভাই বিশিষ্ট তালবাদ্যবাদক অভিজিত সিংহ রায় মিঠুর নাতি আমাদের অতি আদরের শ্রেয়াণের দস্যিপনার কথা। সে মিঠুর প্রকৌশলী ছেলে অভিষেক সিংহ রায় প্রিয়মের সন্তান।
বইটির রি-ভিউ লিখতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক এত্তগুলো কথা বলে ফেললাম। পাঠক আমার এই দুর্বলতাটুকু মার্জনা করবেন। কিছুদিন আগে বিশিষ্ট বইপোকা ও শিক্ষার আলোকবর্তিকা বিতরণকারী জিয়াউদ্দিন ঠাকুর ভাইকে বলেছিলাম শাহজাহানের বইটার ওপর রি-ভিউ বা পর্যালোচনা দরকার, হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকেই তা অনুভব করছি। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমার অভিপ্রায়কে সাধুবাদ জানিয়েছেন। জেনেছি, জিয়াউদ্দিন ভাই শাহজাহান সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করে থাকেন এবং তাকে বড় ভালোও বাসেন।
বইটি পড়তে বসে আমি স্তম্ভিত, বাকরুদ্ধ ও অভিভূত হয়ে পড়ি। সাধারণতঃ রাত গভীর হলেই আমি কোন হালকা বা গুরুগম্ভীর বই পড়ে থাকি। দ্রুতযান ট্র্রেনের গতিতে বইটি স্বচ্ছন্দে পড়ে চলি। কেননা শাহজাহান অত্যন্ত গোছানো সহজ সরল ভাষায় আন্তরিকতার সঙ্গে কুমিল্লার ক’জন বিশিষ্ট ব্যক্তির স্মৃতিচারণ করেছে। ছোট ছোট কিন্তু বিষয় বৈচিত্রে ভরপুর কিছু আবেগপ্রবণ লেখা এখানে সন্নিবেশ করেছে। যাদের সঙ্গে তার গভীর ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল জীবদ্দশায়। বেশ কিছু লেখা এর আগে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। বইটিতে সেগুলোর পুনর্মুদ্রণ বা রি-প্রিন্ট করা হয়েছে।
আমি যেন কৈশোর-যৌবনের সেই সোনাঝরা উজ্জ্বল জীবনে ঘুরে এলাম বইটি পড়তে গিয়ে। যদিও ক’জন প্রয়াত ব্যক্তির স্মৃতিচারণ করেই বইটি লিখিত। প্রায় সাতাশ বছর পর ঢাকায় কর্মক্ষেত্র থেকে জন্মস্থান কুমিল্লায় ফিরে ফেলেআসা স্বর্ণযুগের অনেক স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও বৈষাদৃশ্যগুলো যেন বদলাতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেখকের সম্পর্কে আপাতঃ ধারণাও। এই স্বীকারোক্তি দিচ্ছি বইটি পড়বার পরপরই। হোয়াট আ ট্রান্সফরমেশান অব আওয়ার বিলাভড্ শাহজাহান। সত্যি করে বলতে, শাহজাহান যে মন-মানসিকতায় এতো উন্নতি করেছে, গভীর থেকে গভীরে গিয়েছে এবং মার্জিত, পরিশীলিত এবং যথার্থতা সম্পর্কে ব্যুৎপত্তিগত উৎকর্ষ সাধন করেছে এই কয় বছরে, তা ভাবতেও পারিনি।
বলছিলাম শাহজাহান সম্পর্কে অভিভূত এবং আশ্চর্যান্বিত হওয়া সম্পর্কে। সোজা-সাপ্টাভাবেই বলি--১৯৮১ সাল থেকে ১৯৯০ সন পর্যন্ত কুমিল্লা থেকে তৃণমূল পর্যায়ে সাংবাদিকতা পেশা নির্বাহ করাকালীন সময়ে শাহজাহানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্ব গাঢ় হয়। দ্য ডেইলী নিউ নেশান পত্রিকার কুমিল্লার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবার সময়ে। দিনে দিনে তা আরো প্রগাঢ় হয়। সেসময় শাহজাহান কখনো-সখনো সাড়াজাগানো খবর এবং ছবিসহ খবর দিয়ে যেত আমাদের পৈত্রিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শতাব্দী প্রাচীন (১৮৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত) বাদুরতলার সিংহ প্রেসে এসে।
সেসময় সিংহ প্রেস প্রকারান্তরে বিকল্প প্রেস ক্লাব হয়ে গিয়েছিল। ঢাকার পত্রিকার ও টিভি চ্যানেলের গণমাধ্যমকর্মী ও স্থানীয় সাংবাদিকদের পদচারণায় তা মুখরিত থাকতো। শাহজাহানকে দেখেছি চিরচঞ্চল এবং অস্থির চিত্তের এক যুবা সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে। পুরোপুরি সাংবাদিক তখনো হয়নি সে। এমন কোন পেশা বা কর্মক্ষেত্র নেই তা খেলাধূলা থেকে নাট্যচর্চা সংঙ্গীতানুষ্ঠান হিচ-হাইকিং পাহাড়ে চড়া এবং যেখানে- সেখানে ঘুরে বেড়ানো ও সমাজসেবা পর্যন্ত, সে অবলীলায় অংশগ্রহণ করতো এবং ব্যপ্ত ছিলো সানুগ্রহে।
এমনকি ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে যখন জঙ্গী আক্রমণ চলছে তখন সে সস্ত্রীক সঙ্গে সস্ত্রীক ড. আলী হোসেন চৌধুরীসহ ঘুরে এসেছে। হঠাৎ শুনি সে জাপান-সাউথ কোরীয়া ভ্রমণ করছে। ফেসবুকে ছবি আপলোড করেছে আমাদের জাপান-প্রবাসী প্রিয়ভাজন কবি-সাহিত্যিক-গবেষক প্রবীর বিকাশ সরকারসহ টোকিও থেকে। এর আগেই সস্ত্রীক ঘুরে এসেছে সিলেটের পর্যটন কেন্দ্র সাঁতারকুল থেকে। সঙ্গে ছিল সস্ত্রীক অভিজিত সিংহ রায় মিঠু। কক্সবাজার, সাজেক ভ্যালী, বান্দরবন এবং দেশের অন্যান্য প্রসিদ্ধ জায়গায় শাহজাহানকে পাওয়া যেত, যখন সে কুমিল্লায় অনুপস্থিত।
মানে খ্যাতিমান রম্য লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর “দেশে বিদেশে” ভ্রমণকাহিনিতে কাবুল ভ্রমণকালে আব্দুুর রহমান নামে আমরা এক “হরফুন মৌলা”-র সন্ধান পাই। হরফুন মৌলা হচ্ছে-সকল কাজের কাজি। যেমনটি আমাদের আপনজন শাহজাহান। উচ্ছল, উজ্জ্বল, প্রাণস্পন্দন ও উচ্ছাসে ভরপুর টকবগে এক আশাবাদী তরুণ, যে জীবনকে নিয়েছে খুব সহজ সরল স্বাভাবিকভাবে। এমন একটি বহুধা-বিস্তৃত কর্মকান্ডে যুক্ত কোন ব্যক্তি এমন মনোগ্রাহী সহজ সরল বোধগম্য ভাষায় ও আন্তরিকভাবে তার অত্যন্ত কাছের বরেণ্য ব্যক্তিত¦ থেকে সমাজের তথাকথিত নিম্ন স্তরের আত্মজন সম্পর্কে মন খুলে লিখতে পারেন--বইটা গভীর মনোযোগ দিয়ে না পড়লে বোঝা যাবে না।
সেই দিনাজপুর শহরের বাল্যকাল, মা-বাবা-ভাইবোনদের স্মৃতিচারণ থেকে ব্রাত্য নাট্যজন কে.এম. নিজাম, ফুজির শাহজাহান, পত্রিকা এজেন্ট মন্টু, উদীয়মান শিল্পী আব্দুল আলীম, হৃদয়ের কাছের বন্ধু মনিরুল আলম মনির এবং লুৎফুল আমীন মুরাদসহ বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল ও অদম্য সাহসী শহর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা কালিয়াজুরীর শাহজাহান সম্পর্কে হৃদয়ের মাধুরী মিশিয়ে অতিমাত্রার ভালোবাসার আবেগে যে চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন, তা যে কোন পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। তাছাড়া রয়েছে কুমিল্লার দ্য গ্রেট ভার্ণাল থিয়েটার এর ঐতিহ্যবাহী নাট্যাঙ্গন, বরেণ্য সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুল ওহাব, চারণ সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা চৌধুরী ও নওশাদ কবীর, গণসক্সগীত শিল্পী সুখেন্দু চক্রবর্তী, নাসির আহমেদ, শেফাল রায়, মিলন আহমেদ, মিন্টু সিনহা, নাট্যজন কাজি মেহেরজান, মকসুদ আলী মজুমদার, কল্যাণী সেনগুপ্ত, রাজনীতিক আকবর হোসেন, খলিলুর রহমান ফরিদ, কবি আবু জাফর সিদ্দিকী, কবি তিতাস চৌধুরী, ফুটবলার বাদল রায়, সমাজসেবক ডা. জোবায়দা হান্নান, শিক্ষক স্বপ্না রায় এমনি গুণী-জ্ঞানীজন তার স্মৃতিচারণমূলক লেখায় উদ্ধৃত হয়েছেন। সুচারুরূপে এবং অতিসুন্দর সাবলীল বর্ণনায়।
বোধকরি ৩০১ পৃষ্ঠার বইটির কলেবর আর বাড়ানো যাচ্ছে না বলে প্রাথমিকভাবে শাহজাহান তার বাসস্থান বজ্রপুর ও এর পাশর্র্^বতী এলাকার ক’জন ঘনিষ্টজন যেমন মুসলিমলীগ নেতা আবাদ সাহেব, সেতারবাদক শামসুল আমিন তোতা মিয়া, বিলিয়ার্ড ও স্নুকার খেলোয়াড় সৈয়দ মনসুর হায়দার, কবি-গীতিকার-নাট্যকার রতন সাহা এবং তার ছোট ভাই সংযোগের সাংস্কৃতিক সংগঠক ও নাট্যকার-নির্দেশক তপন সাহা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব দুলাল চৌধুরী এ পর্বে উপেক্ষিত হয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ছে, ভার্ণাল থিয়েটার আমলের অভিনেতা কল্যাণী সেন (রক্ষিত) ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাজী সাহানাও সম্ভবতঃ লেখকের নজর এড়িয়েছে। উল্লেখিত ব্যক্তিত¦দের সঙ্গেও শাহজাহানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বইটির পরবর্তী সংস্করণে এঁদের সম্পর্কে পাঠককুল জানতে পারবেন, আশা করছি।
বইটির ভূমিকায় আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু-সহকর্মী সাংবাদিক ড. আলী হোসেন চৌধুরী যথাযথ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। কিছু বানান ভুল ও মুদ্রণপ্রমাদ ব্যতিরেকে বইটির সম্পাদনাও ভালো। প্রচ্ছদ হৃদয়গ্রাহী। আমি বইটির বহুল প্রচার ও পাঠকপ্রিয়তা প্রত্যাশা করছি।
রি-ভিউ লেখকঃ প্রদীপ সিংহ রায়, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, কুমিল্লা প্রেস ক্লাব।
“শান্তি কুটির”, ৭৩৪ পশ্চিম তালপুকুরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০, ফোন: ০৮১-৭৩০৭৩ (টি এ্যান্ড টি) ০১৭৩১৫১২৭২২ (মুঠোফোন)। ফেব্রুয়ারি-০৩, ২০২২ খ্রী:
পবিত্র শব্দ এবং একজন ক্রিড়াবিদ
আরিফুল হাসান ।।
জামালপুরের উত্তরে যে মহুয়া গ্রাম, সে গ্রামের একজন কৃষকের নাম মঈন শেখ। তার জাগাজিরাত মাশাল্লাহ ভালো। তবু মনে সুখ নেই। একটি সন্তানের আশায় সে তার যৌবন মাটি করছে। পাড়ার লোকেরা বলে, -মঈন, বউ পাল্টাও। সে পাল্টায় না। ময়নাকে আদর যত্নও কম করে না। তবু রাতের অন্ধকারে তার বিষাদের মতো দীর্ঘশ্বাসে অন্ধকার আরও বেশি ঘণিভূত হয়ে আসলে কেমন যেনো অটান অনুভব করে স্ত্রীর প্রতি। অন্ধকারের অপরপ্রান্ত থেকে ময়না স্বামীর বুকে হাত রাখে। তার ভেতরটাও হুহু করে কেঁদে উঠে। রাত বাড়ে, একসময় ক্লান্তস্মৃতিগুলো ঘুমিয়ে যায়। স্বপ্নে কি কেউ আসে? কেউ হয়তো আসে না। আবার ঘুম ভাঙে। পুবাকাশ আলো করে নতুন সূর্য উঠে। একটি দিনের সূচনা হয়। মানুষের কর্মব্যস্ততায় প্রাণ পায় পংক্তির মতো প্রহর। শুরু হয় মঈন শেখের কর্মব্যস্ততাও। কাঁধে লাঙল ফেলে হালের বলদ দুটিকে হাঁকাতে হাঁকাতে মাঠে যায়। বাঁকা লাঙলের কামাইয়ে তার সংসার ঝলমলে চলে। বছরে এক দু কানি জমি কিনতে পারে সে। সবাই বলে, -মঈনের কী ভাগ্য দেখো! মাটি ঠেলে কত সম্পদ করছে লোকটা! মঈন এসবে খুশি নয়। তার সন্তান চাই, সন্তান। কার্তিকের মাঠে হাল চালাতে চালাতে আল্লার কাছে কেঁদে উঠে। - রহম করো আল্লাহ, আমার দিকে মুখ তুলে চাও। কিন্তু তার ভাগ্য বড় প্রলম্বিত। এতো সহজে মওলা তার কথা শোনে না। পাশে দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে আজিমুদ্দিন বুদ্ধি দেয়, -একবার ফেওরার হুজুরের কাছে যাও গো। বড় পরীক্ষীত কামেল। মঈন শোনেও শোনে না। কত হুজুরের কাছেই তো গিয়েছে। কত ওষুধ পত্তর, কতো ঝাড়-ফুঁক কবিরাজ; কই, কিছুই তো কাজ হচ্ছে না। তবু আজিমুদ্দিন পিড়াপিড়ি করে, - একবার যাওই না হুজুরের কাছে। বারো বছরের বন্ধা নারীও সন্তান পাইছে। তুমি তো মিয়া নতুন বিয়া করছো ধরা যায়। নতুন বিয়ের কথা শোনে মঈন শেখের একচিলতে হাসি আসে। -হ, নতুনই তো। পাঁচ বছর আবার কম সময়ও না। আজিমুদ্দিন বুঝায়, -ধৈর্য ধরো মিয়া, ধৈর্য ধরো। একবার যাও হুজুরের কাছে।
পরদিন জুম্মাবার হুজুরের এখানে গিয়ে জুম্মা নামাজ পড়ে মঈন। নামাজান্তে হুজুরের কাছে আরজি জানায়, মনের কথা কয়। সব শুনে হুজুর মঈন শেখকে স্ত্রী সহ আসতে বলে পরের শুক্রবার। এক সপ্তাহ অনেক সময়। সাতটা দিন যেনো কাটে না। রাতে ভাত বেড়ে ময়না ডাকে। খেতে আসে মঈন। খাবারে মন বসে না। পাতের ভাত নেড়ে চেড়ে হাত ধুয়ে উঠে যায়। ময়না সেদিন ভাত খেতেই বসে না। বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যায়। গুড়গুড়িতে কষে একটা টান পড়ায় কলকের আগুন উসকে উঠলে সে আলোতে মঈনের চোখ যায় ময়নার দিকে। কেমন গুঁটিসুটি মেরে ঘুমাচ্ছে। বড় মায়া হচ্ছে তার জন্য। ঘুম থেকে ডেকে তুলে। বাইরে একটা ধবধবে জ্যোৎস্না উদারভাবে বিছিয়ে আছে। দরজার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে আলোর রেখা ঘরের মেঝে এসে লুটুপুটি করছে। মঈন ময়নার কানের কাছে মুখ এনে বলে - জোছনা দেহি চলো। জড়িয়ে জড়িয়ে ময়না স্বামীর সাথে দরজা খুলে । উত্তর দিকের জারুল গাছটা জোনাকি পোকাতে ভরে গেছে। একটা শনশন হাওয়া হিজলের পাতায় খেলা করছে আনমনে। বাঁশবনের ছায়া এসে পড়েছে এদিকটায়। বড় রহস্যময় মনে হয় এই রাত। বুকের কাছে মিশে যেতে যেতে ময়না বলে, -আইজ কী বার? - বুইধ বার। মঈন শেখ বলে। কড়ে আঙুলে দিন গুনে ময়না। -রাইত পুহাইলে বিষুধ, তারপর দিন গিয়া রাইত শুক্কুর। মনে হয় শুক্কুর বার রাতেই চলে যায় ময়না। কিন্তু না, হুজুর বলেছে শুক্রবার দিন দশটার সময় আসতে হবে।
বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে অঘটনটা শুরু হয়। ময়নার বমির কোনো বাঁধ মানে না। -ডায়রিয়া না কলেরা? আল্লায় না করুক। বাড়ির লোকজনও আতংকিত হয়। কি হইলো ঘটনা? রাতভর ময়নার এই থেকে থেকে বমি করা চলে। -হায় আল্লাহ, অখন আমি কই যামু? মঈন শেখের কাতর গলা কাঁদে। ময়না চোখের ভাষায় স্বামীকে অভয় দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তারও সহ্যসীমা অতিক্রম হয়। ভোর রাতের দিকে সে একেবারেই নেতিয়ে পড়ে। ফলে, বেলা উঠার সাথে সাথে মঈন একটা কেরায়া নৌকা ভাড়া নিয়ে গঞ্জের পথে রৌয়ানা হয়। সাত মাইল উত্তরের বিহরের বাজার, সেই বাজার পিছনে ফেলে আলিয়ার বিল আরও এক মাইল। তার পর না গঞ্জ। আলিয়ার বিলে তাদের নৌকা দুলে। শাদা শাদা শাপলাগুলো ঢেউ ভেঙে নৌকার কাঠে এসে বাড়ি খায়। মাঝির বৈঠা ছলাৎ ছলাৎ জল কাটে। পালে হাওয়া লেগে তরতর করে এগুতে থাকে নৌকা। তখন বেলা বাড়ে। দুপুরের পর আছর হয়। মাগরিবের কাছাকাছি সময় তারা গঞ্জের হাসপাতালে পৌঁছে। তখন একটা লালিমা আকাশ নুয়ে এসে ময়নার কপালে চুমু খায়। এটি মঈনের চোখের ভুলও হতে পারে। কিন্তু সে এরকমই দেখে। নৌকা থেকে বৌয়ের দু বাহু ধরে ধীরে ধীরে নামায়। হাসপাতালের ঘাটে কত রকম নৌকা বাঁধা। কতো দূর দূরান্ত থেকে এসেছে রুগি-দুখি মানুষগুলো। নৌকা থেকে নেমে মঈন হাসপাতালে সিট পায়। কিন্তু ডাক্তার পায় না তাৎক্ষণিক। কাল দুপুরের পরে ডাক্তার আসবে। আপাতত নার্সরা বমি বন্ধের ওষুধ দিয়ে চলে যায়। অচেনা বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে ময়না স্বামীর হাত দুটি চেপে ধরে। -আমার যুদি কিছু অয়ে যায়? -র্ধু, যাও, চিন্তা কইরো না। কিচ্ছু অইবো না আল্লার রহমতে। মঈন স্ত্রীকে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করে। রাত বাড়ে। হুঁকা পাবে কই। ঘাটে নৌকায় হয়তো তার কেরায়া মাঝিদের কাছে থাকতে পারে। মঈন স্ত্রীকে সান্তনা দিয়ে নিচে নামে। ঘাটে মাঝিরা ঘুমিয়ে আছে অনেকেই। তার মাঝি দুজনও আধঘুমে। সে তাদের জাগায়। হুঁকু চেয়ে তামুক জ্বেলে টানে। শরীরটা একটু চাঙ্গা হয়ে আসলে আবার ফিরে আসে স্ত্রীর কাছে। এসে দেখে ময়না ঘুমুচ্ছে। কপালে হাত বুলায়। নিজেও একপাশে একটু কাত হয়।
সকাল হলে মাঝিদের জন্য তার নিজের জন্য নাসতা কিনে মঈন। ময়নার নাস্তা হাসপাতাল থেকে দেয়া হবে। সে বাইরের খাবার খেতে পারবে না। মঈন শেখ মাঝিদের সাথেই নৌকায় বসে বসে সকালের নাস্তা সারে। মলিন মুখে উঠে গিয়ে স্ত্রীকে নাস্তা করায়। ময়না স্বামীকে বাইরে যেতে দিতে চায় না। আমার কেমন যেনো ভয় করে। মঈন অভয় দেয়, -ভয় কিয়ের? আল্লা আছে না? ময়না মনে মনে আল্লা- খোদার নাম স্মরণ করে। ছোটবেলায় দাদি যেই দোয়া ইউনুস শিখিয়েছিলো তা ঢোকে ঢোকে জপ করে। কণ্ঠ তার শুকিয়ে উঠে। কিন্তু পেটের ভেতর থেকে কি যেনো ঠিক গুলিয়ে উঠছে। সে আবার ওয়াক ওয়াক করে বমি করে। তাড়াতাড়ি সীটের নিচ থেকে বলটা এগিয়ে দেয় মঈন। -আহারে, ডাক্তার জানি কখন আসব? তার শংকা আর ধরে না। বেলা বাড়ে না। ঠিক এগারোটায় এসে পড়ে থাকে। অথচ ডাক্তার আসবে দুপুরের পর। কখন দুপুর হবে? কখন জ্বলজ্বলে সূর্যটা মাথার উপর তাপ দিতে থাকবে? তারপর পশ্চিমদিকে হেলে পড়লে তো গিয়ে ডাক্তার আসবে? ডাক্তার আসে। সবকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানায়, আপনারা সন্তান পেতে যাচ্ছেন। এ ঘোষণা অভাবিত লাগে মঈন শেখের কাছে। ময়নাও যেনো নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে চায় না। পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে চেয়ে লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠে। ফেরার সময় আলিয়ার বিলে তাদের নৌকা দুলে। দু হাত ভরে শাপলা ফুল তোলে মঈন শেখ ময়নাকে দেয়।
২৬ জানুয়ারি ২০২২/ কুমিল্লা, বাংলাদেশ। ০১৭৬৩৭১৩৫৪৮