ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
প্রসঙ্গ লবিস্ট এবং বাংলাদেশের প্রত্যাশা
Published : Thursday, 10 February, 2022 at 12:00 AM
প্রসঙ্গ লবিস্ট এবং বাংলাদেশের প্রত্যাশাডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল    ||
রাজনীতিতে হট টপিক ইদানীং ‘লবিস্ট’। শব্দটার সাথে আমাদের পরিচয়টাও নতুন। বিএনপির হাত ধরেই আমাদের রাজনীতিতে এই শব্দটার আমদানি আর সাম্প্রতিক ব্যাপক প্রসার। যদিও কেচো খুঁড়তে গিয়ে এখন জানা যাচ্ছে যে আমাদের রাজনীতিতে লবিস্টদের নাক গলানোটা নতুন কিছু না। এর শুরুটা সেই ২০১৯-এ। বিএনপির পক্ষ থেকে তখনই লবিস্ট নিয়োগ দেয়া হয়েছিল মার্কিন সিনেট আর সরকারের কাছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা চালানোর জন্য।
লবিস্টের কথা যে আমরা আগে একেবারেই শুনিনি তাও কিন্তু না। ফাঁসির দড়ি থেকে বাচার চেষ্টায় এর আগে লবিস্ট নিয়োগ দিয়েছিল দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলী। তারও আগে বিএনপি যখন ক্ষমতায়, তখন তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ দিয়ে দেশীয় শিল্পে শিশু শ্রমিক নিয়োগের কারণে মার্কিন রগরানি থেকে বাঁচার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল। তবে দেশের একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল দেশের বিরুদ্ধে লবিস্ট নিয়োগ করে এভাবে দেশে স্বার্থ বিরোধী তৎপরতা চালিয়েছে এমন উদাহরণ সম্ভবত ‘আমাদের দেশে’ আর দ্বিতীয়টি নেই।
‘আমাদের দেশের’ উপর জোর দেয়ার কারণ বাংলাদেশে গত পঞ্চাশ বছরে বিভিন্ন সময়ে রাজনীতি আর সংবিধানের যেভাবে দফায় দফায় শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছে তার উদাহরণ তাবৎ পৃথিবীতেই বিরল। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশে বিরাজনীতিকরণের যে অন্ধকার যুগের সূচনা হয়েছিল, তা বারবার আমাদের রাজনীতির বিকাশকে থমকে দিয়েছে নানা ভাবে, নানান সময়ে। কখনো হ্যাঁ-না ভোট তো কখনো উর্দিপরাদের শাসন আর কখনোবা উর্দিকে আড়াল করে সামনে থেকে তত্ত্বাবধায়কের খবরদারি, কত কি-ইতো আমাদের দেখা পঁচাত্তরের পর থেকে।
আশা ছিল ২০০৯ থেকে গণতন্ত্রের যে নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা তাতে এক সময় আঁধার কাটবে, রাজনীতির বাগানে খেলবে আলো। কার্যত তা তো হয়ই নি, বরং আমাদের ঝুলিতে জমা হয়েছে আরো নিত্য-নতুন অভিজ্ঞতা। গত একটি যুগেই তো আমরা দেখলাম গণতন্ত্রের নামে গিনেজ রেকর্ড ভাঙা অবরোধ আর আগুন সন্ত্রাস। দেখার বাকি ছিল দালাল লাগিয়ে দেশের বিরুদ্ধে দালালি, এবার তাও দেখা হয়ে গেল।
বিএনপির পক্ষ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন সিনেট কমিটি বা সরকারকে কবে কোন চিঠি দেয়া হয়েছে আর মার্কিন লবিস্ট ফার্মগুলোকে কত টাকা দেয়া হয়েছে এসব অপকর্ম সুসম্পাদনের জন্য ইত্যকার বিষয়গুলো মিডিয়ার কল্যাণে এখন বহুল আলোচিত ও সর্বজন বিদিত। কাজেই সেই বিস্তারিত বর্ণনায় না হয় না-ই গেলাম। বিএনপির এহেন কর্মকাণ্ডের পোস্টমর্টেমে ব্যস্ত দেশের মানুষ। মানুষ বুঝে উঠতে পারছে না হঠাৎ কেন সরাসরি দেশের বিরুদ্ধ তাদের এই সাঁড়াশি আক্রমণ। মির্জা সাহেজের মিষ্টি কথায় এ যাত্রায় চিড়া মোটেও ভিজছে না।

আমার কাছে এই বিষয়টা অবশ্য অতটা জটিল কিছু বলে মনে হয় নি। আমার সরল বুদ্ধিতে আর সহজ যুক্তিতে আমি যতটুকু বুঝি, বিএনপির নেতৃত্ব আসলে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের সরকার পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত দলটির মধ্যে গুবলেট পাকিয়ে ফেলেছে। আওয়ামী লীগকে ক্ষমাতচ্যুত করা এবং তারপর সুযোগ পেলে ক্ষমতায় আসাই যে এখন যথাক্রমে বিএনপির প্রথম এবং দ্বিতীয় প্রধান লক্ষ্য, তা নিয়ে নিশ্চই কারো সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
তবে আওয়ামী লীগকে টার্গেট করতে যেয়ে তারা কখন যে বাংলাদেশকেই টার্গেট করে বসছে, বিষয়টা তারাও বোধহয় ঠিক-ঠাক মত ঠাউর করে উঠতে পারেনি। অবশ্য অমনটা তাদের কাছে প্রত্যাশিতও নয়। বিএনপির জন্মই হয়েছিল একটা বিশেষ ম্যান্ডেট নিয়ে। একটা রাজনৈতিক দল যেভাবে একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে জন্ম নেয় এবং বিকশিত হয়, তার কোন কিছুই বিএনপির সাথে যায় না। ক্যান্টনমেন্ট থেকে উর্দিপরা মেজর টার্নড মেজর জেনারেলের হাত ধরে জন্ম নেয়া এই দলটির জন্মের ম্যান্ডেটই ছিল বাংলাদেশের পাকিস্তানিকরণ আর দেশের সংবিধানকে ছিঁড়ে ফেলে বাংলাদেশকে প্রাক-বাংলাদেশ যুগে ঠেলে দেয়া।
সংবিধানের চার মূলনীতি থেকে জয় বাংলা সবই আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল এই বিএনপির হাত ধরেই। দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গিয়ে জারি করা হয়েছিল ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশের মতন কালো আইন আর ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে শুধু পুনঃপ্রবর্তনই করা হয়নি, বরং একে সুপ্রতিষ্ঠিত করার মিশন বাস্তবায়ন করতে যেয়ে রাজাকারের গাড়িতে জুড়ে দেয়া হয়েছিল জাতীয় পতাকা। জেনারেল-উত্তর জমানার বিএনপিও কখনই এই রাজনৈতিক ম্যান্ডেট থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। তাই তাদের খোলসটা বদলালেও, ভেতরটা যেমন ছিল তেমনটাই রয়ে গেছে আর একের পর এক বিএনপি সরকারের হাতে পরে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের রাজনীতি বার বার শুধু ধর্ষিতই হয়েছে।
তবে এবারের প্রেক্ষাপটটা বোধ করি ভিন্ন। এবারে ‘লবিস্ট কাণ্ড’ যখন পত্রিকার শিরোনামে দেশে তখন ক্ষমতায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার আর এক যুগের পরিচর্যায় দেশের রাজনীতির ময়দানও এখন কিছুটা হলেও আগাছামুক্ত। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকরীদের আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় এনে দেশকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে অনেকখানি মুক্ত করার কৃতিত্ব আওয়ামী লীগ সরকারেরই। আর দেশের রাজনীতিকে অপরাজনীতি মুক্ত করে রাজনীতিতে রাজনীতিকে পুনর্বাসনের একটা অসম্ভব সুযোগ এখন বাংলাদেশের সামনে।
লবিস্ট নিয়োগে যে বিপুল অবৈধ অর্থ ব্যয় করা তার উৎস অনুসন্ধান আর পাশাপাশি এমন উলঙ্গ দেশদ্রোহিতার বিচারের মাধ্যমে সেই কাজটা করার সুযোগটা এখন আওয়ামী লীগের সামনে উপস্থিত। যে দলটির প্রতিষ্ঠাতা এই দেশটিকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার উত্তরসূরিরা এবারে এই কাজটি করে ২০২২-এর বাংলাদেশটাকে আদর্শিক ও রাজনৈতিকভাবে ১৯৭১ উত্তর বাংলাদেশের কাছে নিয়ে যাবেন এটাই আজকের বাংলাদেশের প্রত্যাশা।

লেখক: ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।