
শাহজাহান চৌধুরী ||
ছোট
বেলায় মা যখন দুষ্টামি করলে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে পিট্টি দিত তখন মাকে শুনিয়ে
শুনিয়ে গাইতাম “একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি, হাসি হাসি পরবো ফাঁসী দেখবে
জগৎবাসী”, মা তখন মিটি মিটি হাসতে হাসতে দৌড়ানি দিত। মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে
মায়ের কন্ঠে গানটি শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। তখনতো জানতাম না গানটি
গেয়েছেন কে, শুধু মায়ের মুখে শোনা ইংরেজ তাড়াতে খুদিরাম ফাঁসীর মঞ্চে যেতে
যেতে এ গানটি গেয়েছিলেন “সুভাষ বসু” চলচ্চিত্রে। বড় হয়ে জেনেছি গেয়েছেন লতা
মঙ্গেশকর। ভালোবেসে ফেললাম অদেখা এই শিল্পীকে। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে
বীরমুক্তিযোদ্ধাদের মুখে থাকতো এ গান। দেশ মাতৃকাকে উদ্দেশ্য করে
মুক্তিযোদ্ধারা এ গান যুদ্ধক্ষেত্রে গেয়েছে কতশতবার!
লতা মঙ্গেশকর
এর জন্ম ১৯২৯ সালে, পিতা দিননাথ মঙ্গেশকর এর ছিল ৫ ছেলে মেয়ে। পিতা ছিলেন
নাট্যকর্মী। লতা শুরু করেছিলেন নাট্যাঙ্গনে অভিনয়ের মাধ্যমে কিন্তু অভিনয়
তার তেমন ভালো হতোনা, তাই তিনি চলে এলেন সংগীত জগতে এবং মাত্র তের বছর বয়সে
গান শুরু করেন। তারপর ইতিহাস। এলাম দেখলাম, জয় করলাম। মাত্র ২৫ টাকা
উপার্জনের মাধ্যমে শুরু হলো তার সঙ্গীতে পথচলা। ১৯৪৮ সালে ‘মুজবুর’ ছবির
মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে প্লে-ব্যাক সিঙ্গার হিসাবে তার আগমন তারপর আর পেছনে
ফিরে তাকাতে হয়নি। চলচ্চিত্র, সংগীত জগতে তিনি পরিচিত হয়ে গেলেন সঙ্গীত
সম্রাজ্ঞী। তবে তার এ প্রাপ্তি তার সাধনা, তারচেয়ে বেশী ‘ঈশ^র প্রদত্ত’,
লতার কন্ঠে ঈশ^রের বাস, যা লাখো লোকে বিরল। লতাজি রেয়াজের মাধ্যমে ৯২ বছর
তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন। তার কন্ঠ নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এক
জার্নাল উঠে এসেছে।
৩৬টি ভাষায় তিনি গান গাইতে পারতেন। তার গাওয়া
রবীন্দ্রসংগীত, তুমি রবে নিরবে হৃদয়ে মর্ম, তোমার হলো শুরু, আমার হলো সারা,
হৃদয় আমার নাচেরে, আজিকে মুযূরের মতো নাচেরেসহ কবিগুরুর অন্যান্য গান
বাঙালী শ্রোতাসহ অন্য যে কোন শ্রোতাকে তার কণ্ঠের ঝরনায় আবিষ্ট করে রাখে।
তার গাওয়া বাংলা গান, আমি যে কে তোমার তুমিতা জানোনা। অথবা কি লিখি তোমায়
তোমা ছাড়া কোন কিছু ভালো লাগেনা আমার, অথবা ভালোবাসার আগুন জেলে কেন চলে
যাও, অথবা প্রেম একবার এসেছিল নিরবে আমারও দুয়ার প্রান্তে অথবা, অথবা অথবা
লিখে শেষ হবেনা। এ গানগুলো শ্বাশত উঠতি যুবক যুবতি হতে ৫০ উর্দ্ধোদের এ
গান নস্টলজিয়া ভোগায়, ভোগাবে পৃথিবী যতদিন থাকবে। ও মোর ময়না গো, কার কারণে
তুমি একলা, কার বিহনে বিহনে দিবা নিশি যে উত্তলা-সেত ফিরবেনা, ফিরবেনা আর।
মন, শরীর হৃদয় এমনভাবে মোহাবিষ্ট করে যা ভাষায় প্রকাশ করা দুষ্কর।
লতা
মঙ্গেশকরের-সাতভাই চম্পা জাগোরে জাগরে, ঘুমঘুম থাকেনা ঘুমের ঘোরে, একটি
পারুল বোন ডাকে তোমারে, আমাদের নিয়ে যায় ঠাকুরমার ঝুলির সেই দেশে। আজমন
চেয়েছে আমি হারিয়ে যাব, হারিয়ে যাবো আজ তোমার সাথে, শঙ্খবেলা ছবির উত্তম
কুমার, মাধুবী মুখার্জী জুটির গান, আহ্! কিশোরী বয়সে লতা মঙ্গেশকর প্রেমে
পড়েছিলেন কিন্তু পারিবারিক কারণে তাঁদের মিলন হয়নি তাই এ জীবনে তিনি আর
বিয়ে করেননি। তাঁর স্বপ্নের পুরুষটিও অবিবাহিত রয়ে যান।
হামকো হামছে
চোরা লো- হো গেয়া তো পেয়ার সাজনা, জানে কেয়া বাত হ্যায়, নিদ নেহি আতি নিদ
নেহি আতি। তার চটুল গান ‘দিদি তেরা দেবর দিবানা, হায়রাম.... তার গানের
প্রথম লাইন নিয়ে লিখতে গেলে বিস্তর বিস্তৃত হয়ে যাবে। তবে ২০১৯ সালে ভারতীয়
আর্মিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘তেরে মিট্টিকে সওগাত’ গানটি দেশ প্রেমের উজ্জ্বল
দৃষ্টান্ত।

৯২ বছর সংগীত জীবনে তিনি অনেক সম্মাননা পেয়েছেন তার মধ্যে
১৯৮৯ সালে “দাদা সাহেব ফলকে”ও ২০০১ সালে ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয়
সম্মননা “ভারতরত্ন” উল্লেখযোগ্য-
উপমহাদেশের সংগীতের মহারাজ আমাদের
কুমিল্লার সন্তান শচীন দেববর্মনের সাথে ছিল তার নিবিড় সম্পর্ক, তিনি
বর্ম্মন পরিবারের একজন ভালো বন্ধু ছিলেন। শচীনপুত্র রাহুল দেব বর্ম্মনের
প্রথম ও শেষ গানটির শিল্পী ছিলেন লতা মঙ্গেশকর। শচীন দেব বর্ম্মনের সংগীত
পরিচালনায় তিনি বহু ছবিতে প্লেব্যাক সিঙ্গার ছিলেন। তারমধ্যে Ñ প্রেম
পূজারী, হাউস নং-৪৪, মুনিম জি, মিস ইন্ডিয়া, অর্জ্জুন পণ্ডিত, বুজদিল,
নওজোয়ান, রাধাকৃষ্ণ শাহনশাহ। আরাধনা ছবিতে শচীনপুত্র রাহুল দেববর্ম্মন এর
সাথে লতা মঙ্গেশকারের দ্বৈতসংগীত “মাধবীফুটেছে” ঐ গানটি উল্লেখ যোগ্য।
বাংলাদেশের সাথে ছিল লতা মঙ্গেশকরের আত্মার আত্মীয়তা। ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের
সময় তিনি চিত্রনায়ক সুনীল গঙ্গপাধ্যায়, মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র শিল্পী,
সংগীত শিল্পী নিয়ে গঠিত দলের সাথে বিভিন্ন কনসার্ট এ অংশগ্রহণ করে সাহায্য
তুলেছেন। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সুনীল
গঙ্গপাধ্যায় ও দলবলসহ ভারতীয় সেনাবাহিনীর হেলিকাপ্টার যোগে বাংলাদেশে আসেন
এবং বিভিন্ন ক্যান্টেনমেন্টে ভারতীয় সৈনিকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন এবং
সংগীত পরিবেশন করে তাঁদের উজ্জীবিত করেন। সে সময় তাদের সাথে সঙ্গদেন
বাংলাদেশের বিশিষ্ট সংস্কৃতিজন সৈয়দ হাসান ইমাম। তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসেও
এসেছিলেন। এছাড়া লতা মঙ্গেশকার ১৯৭২ সালে বাংলাদেশী ছায়াছবি “রক্তাক্ত
বাংলা” ছবিতে প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসাবে Ñ ও দাদা ভাই মুর্তী বানাও, একটা
ছোট মন বানাতে পারো কি? Ñগানটি গেয়েছিলেন।
লতা মঙ্গেশকর ৩৬টি ভাষায়
গান গাইতে পারতেন। ১৯৭৪ সালে ৩০ হাজার গান রেকর্ড হলে গিনিস বুকে তাঁর নাম
ওঠে। লতা মঙ্গেশকর তাঁর গানের রয়েলিটি হিসাবে প্রতি মাসে ৪০ লক্ষ রুপি
পেতেন যা বছরে ৭ কোটি রুপিরও অধিক।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি এই সুর
সম্রাজ্ঞীর মৃত্যুতে ভারতীয় উপ মহাদেশের সংগীতাঙ্গন এবং শ্রোতারা স্তব্দ
হয়ে যান। ভারত সরকার সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান
করেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান জ্ঞাপন করেন। তিনি থাকতেন
দক্ষিণ মুম্বাইয়ের পশ এলাকায়, তার নিজ বাড়ি “প্রভূকুঞ্জে” সেখান থেকে তার
মৃতদেহ শিবাজী পার্কে নিয়ে যাওয়া হয়। দিল্লী থেকে ছুটে আসেন ভারতের
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তখন সেখানে তাঁর জনপ্রিয় গানগুলি বাজানো
হচ্ছিল। পশ্চিমবঙ্গ মমতা সরকার ১৫ দিনব্যাপী সারা রাজ্যে তার গান গুলো
বাজানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সুর সম্রাজ্ঞীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন।
লতা মুঙ্গেশকারের মৃত্যুতে কুমিল্লার সংস্কৃতি অঙ্গন গভীর শোকাহত। আমরা তাঁর আত্মার চির শান্তি কামনা করি।
লেখক নাট্যগুরু বিশিষ্ট নাট্য সংগঠক
মোবাইল: ০১৭১১-১৪১০২৭