ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
আজ নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ কুমিল্লা থেকে ‘বিদ্রোহী’র খোঁজে কলকাতায়
Published : Tuesday, 28 December, 2021 at 12:00 AM
আজ নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ কুমিল্লা থেকে ‘বিদ্রোহী’র খোঁজে কলকাতায়শাহ্জাহান চৌধুরী ||

৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে কবির ‘মহর্রম’ কবিতা আবৃত্তি করে তৃতীয় স্থান লাভ করি। সেই আমার নজরুল ইসলামের সাথে পরিচয়। তারপর ‘মানুষ’ কবিতায় কবিকে পাই আরেক রূপে। কবির কবিতা সংগ্রহ শুরু করি। ‘লিচু চোর’ আমার কিশোর মনে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দেয়; মনে হয় দূরন্ত কৈশোরে যা করেছি তাইতো...। ‘ভোর হলো দোর খোলো’ মায়ের মুখে শুনতে শুনতে ঘুম ভাঙ্গতো। ‘চল্ চল্ চল্’ গেয়ে স্কুলের মার্চপাস্ট নিয়মিত ছিল। কবির ‘শিল্পী’ নাটকে অভিনয় করে পুরস্কারও পেলাম। ইতোমধ্যে কবির জন্মবার্ষিকী, মৃত্যুবার্ষিকী অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করতে শুরু করি এবং কুমিল¬া নজরুল পরিষদের সাথে জড়িত হই। ছাত্র হিসাবে নাচের ক্লাসে ভর্তি হই।
১৯৮৩ সালের ২৯ আগস্ট কুমিল¬ায় নজরুল স্মৃতি বিজড়িত স্থানসমূহ ফলক দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। সে সমস্ত জায়গার ছবি তুলে রাখি। তখন থেকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, ম্যাগাজিনে আমার তোলা ছবিগুলো ব্যবহার হতে থাকে। ১৯৯২ সালে নজরুল ইন্সটিটিউট এর সহকারী পরিচালক চিঠি লিখেন নজরুল স্মৃতি বিজড়িত স্থান ও কুমিল¬ায় নজরুল নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার ছবি পাঠানোর জন্য। ৯/৪/৯২ তারিখে মোট ৪৫টি ছবি ইন্সটিটিউটকে দেই। এদিকে ৯২ সালে প্রথমবারের মত জাতীয় পর্যায়ে নজরুল জন্মজয়ন্তী পালন উপলক্ষে আমার তোলা ছবিসহ কুমিল¬া কালচারাল কমপে¬ক্স হতে ‘চির উন্নত মম শির’ শিরোনামে, উদ্যাপন পরিষদের স্মারক গ্রন্থ ‘চেতনায় নজরুল’ প্রকাশিত হয়। নজরুল ইন্সটিটিউট এর স্মারক গ্রন্থ ‘প্রলয় কেতন’, আবুল আজাদের প্রবন্ধ ও ১৯৯৪ সালে ‘নজরুলের গানের রাগ গ্রন্থে’ আমার তোলা ছবি প্রকাশিত হয়। আমার প্রকাশিত শান্তিরঞ্জন ভৌমিকের লেখা গ্রন্থ ‘কবিকথন’। তিতাশ চৌধুরী, ড. আলী হোসেন চৌধুরী এবং ইন্সটিটিউটের বড় এ্যালবামে প্রমীলাদের বাড়ির একটি ছবিসহ অনেক ছবি ছাপা হয়। ২০০০ সালে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় হতে প্রকাশিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজরুল জন্মশত বার্ষিকী উদ্যাপন কমিটি কর্তৃক প্রকাশিত স্মরণিকায় ৩০-৩১ পৃষ্ঠায় ‘কুমিল¬ায় নজরুল’ শিরোনামে আমার একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়।
নজরুলের ‘ভিক্ষা দাও হে পুরবাসী...’ এবং ‘মানুষ’ কবিতার নাট্যরূপ দিয়ে দু’টি নাট্যাংশ পরিবেশন করি। ২০১১ সালে বহুদিনের সুপ্ত বাসনা পরিপূর্ণ হয়। কবির জন্মভূমি, চুরুলিয়া, তার স্কুল রাণীগঞ্জ, শিয়ারসোল রাজ উচ্চ বিদ্যালয় এবং কলকাতায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সূতিকাগার, নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত স্থানসমূহ ঘুরে এসে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করি। ২০১২ সালে নজরুল এর ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে, কলকাতা রবীন্দ্র সদনে ‘জীবনানন্দ সভাগৃহে’ কুমিল¬ায় নজরুল স্মৃতি বিষয়ে বক্তব্য রেখেছি।
২০১১ সকালে  জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাড়ি এবং তার স্মৃতি বিজড়িত জায়গাগুলো দেখার জন্য বর্ধমান, আসানসোল হয়ে চুরুলিয়ায় যাই। চুরুলিয়ায় কবির জন্মস্থান দেখে কবির বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটা ধরলাম আসানসোলের দিকে। রাস্তায় একজন কে দেখি মোটর সাইকেল স্টার্ট দিচ্ছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম: দাদা আসানসোল থেকে রাণীগঞ্জ যেতে কতক্ষণ লাগবে। তিনি বললেন: আপনি কোথা থেকে এসেছেন। বললাম, বাংলাদেশ। তিনি বললেন কেন? আমি বললাম, নজরুলের খোঁজে। ভদ্রলোক হেসে দিলেন এবং অবাক করে দিয়ে বললেন: চলুন আমিও রাণীগঞ্জ যাচ্ছি, আপনার অসুবিধা না হলে আমার সাথে যেতে পারেন। এমনি গেলে দু’আড়াই ঘন্টা লাগতে পারে। আমি যাব খনি এলাকা দিয়ে সর্টকাট পথে। ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট লাগবে। আমি তো আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। উঠে বসলাম তার বাইকে। পথে যেতে যেতে তিনি আমাকে দেখালেন অজয় নদী, নদীর ওপারে বীরভূম পাহাড়, তমাল হরতকির বন, ইস্পাত শিল্প কারখানা। পঞ্চ পান্ডবশ্বরের মন্দির, কত কী। কথায় কথায় জানলাম, তিনি একজন এগ্রো রিপ্রেজেন্টেটিভ। ৩টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম রাণীগঞ্জ। তিনি আমাকে নামিয়ে দিলেন ‘শিশু বাগানে’। কাছেই শিয়ারসোল রাজ হাই স্কুল। তাকে ধন্যবাদ জানালাম। বললাম, চলুন এক সাথে খাই। তিনি রাজি হলেন না। এদিকে আমার পেটে ছুঁচোর কেত্তন। সেই সকাল ৮টায় বর্ধমানে নাস্তা করেছি, আবিষ্কারের নেশায় আর কিছু খাওয়া হয়নি। ছাপরা মতো একটি হোটেলে ঢুকে পড়লাম। বুঝলাম নিম্নবিত্তদের হোটেল । ২৪ টাকায় পেটপুরে খেয়ে ঝোলাঝুলি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।  পৌছে গেলাম শিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে, সেখানে কবির স্মৃতি বিজড়িত জায়গাগুলো দেখি। তারপর রাত ৮টার স্পেশাল বাসে করে রাত ১১ টায় পৌছে গেলাম কলকাতায়। তার পরদিন চলে আসলাম ৩/৪ সি তালতলা লেকের বাড়ি, মাঝিদা’র বাড়িতে। যেখানে বসে কবি নজরুল রচনা করেন তার যুগান্তকারী কবিতা ‘বিদ্রোহী’। আগে এখানে কোন চিহ্ন ছিলনা। মুখেমুখেই মানুষ জানত এখানে কবি কোন এক ঘরে বসে লিখেছিলেন ‘বিদ্রোহী’। ১৯৯৯ সালে ‘ভারতের নজরুল শতবর্ষ উদ্যাপন কমিটি কলকাতায় কবির স্মৃতি বিজড়িত স্থানসমূহে স্মৃতি ফলক লাগায়। মাঝি বাড়ি প্রাঙ্গণে ঢুকেই মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির’, ছলকে ছলকে শরীরের রক্ত মাথায় চলে আসছে। ২০০৫-এ বাইপাস করা ‘হৃদয়’ মানবে কেন? মাথাটা চক্কর দিল, রোগে নয় আনন্দে। সামলে উঠে চিন্তা করলাম, ১৯২১ সালে বিদ্রোহী লেখা হয়েছে। যে বছর আমরা স্বাধীনতা লাভ করি অর্থাৎ ১৯৭১ সাল ছিল ‘বিদ্রোহী’ লেখা ও প্রকাশের সুবর্ণজয়ন্তী। আর আমি এখানে দাঁড়িয়ে ২০১১ সালে অর্থাৎ বিদ্রোহী লেখা ও প্রকাশের ৯০ বছরে। আর দশ বছর পরই বিদ্রোহী’র হবে শতবর্ষ আর বাংলাদেশের হবে অর্ধশত বর্ষ অর্থাৎ সুবর্ণজয়ন্তী। কবির ‘বিদ্রোহী’ কি বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিল? ব্যাপারটি কাকতালীয় হলেও ‘বিদ্রোহী’ এবং বাংলাদেশ এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়িত। মাঝি বাড়ির ক্যাম্পাসটি হেঁটে-হেঁটে, ঘুরে-ঘুরে দেখলাম আর মনে মনে চিন্তা করলাম কাজী নজরুল ইসলাম ‘নজরুল’ হওয়ার পেছনে কুমিল্লার ভূমিকা অগ্রগণ্য আর তাঁর সিংহভাগ প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য দৌলতপুরের পুস্তক ব্যবসায়ী আলী আকবর খাঁ। তিনি যদি নজরুলকে কুমিল্লায় নিয়ে না আসতেন তাহলে নজরুলকে আমরা পেতাম না। কবির আনন্দময়ীর আগমনে ও বিদ্রোহী লেখার উদ্দীপনা পেয়েছেন কুমিল্লা থেকেই। কবির কুমিল্লা আগমন ১৯২১ এপ্রিলে। ২০২১ এপ্রিলে হয়েছে ১০০ বছর। আবার বিদ্রোহী লেখার ১০০ বছর হবে আগামী ২০২১ এর ডিসেম্বরে। তিনি বিদ্রোহী যে বাড়িতে বসে রচনা করেছিলেন সে বাড়ি সে ঘরটিও কুমিল্লার নবাব ফয়জুন্নেছা পরিবারের। নজরুল মনেহয় কুমিল্লা থেকেই স্বরাজ আন্দোলনে ধিক্ষা নিয়েছিলেন ২১ বাইশ বছরের প্রাণোচ্ছল এক যুবক প্রথম বিবাহ ঘটিত ব্যাপারে আঘাত পেয়ে মনে মনে ক্ষেপে যাঁন। আবার সেন বাড়ির স্নেহ মমতা ভালবাসা তাঁকে কুমিল্লার প্রতি আকৃষ্ট করে।
কুমিল্লায় তিনি স্বরাজ আন্দোলনে ধিক্ষা  নেন বসন্ত কুমার মজুমদার, আশ্রাফ উদ্দিন চৌধুরী, অতিন্দ্র মোহন রায়, হেম প্রভা মজুমদার প্রমুখের কাছ থেকে। কবির বিদ্রোহী কবিতা রচিত হয়েছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে। তার আগে তিনি ১৯২১ সালের নভেম্বর মাসে দ্বিতীয় বারের মত কুমিল্লায় আসেন। এবং সরাসরি উঠেন কান্দিরপাড় ইন্দ্র কুমার সেন অর্থাৎ প্রমিলা ওরফে দুলিদের বাড়ি। এবার এখানে এলে অনেকের সাথে কবির সম্পর্ক গড়ে উঠে। এ সময় শোনা যায় ১৯২১ সালের ১৭ই নভেম্বর প্রিন্স অব ওয়েল্স ভারত আগমনের পর ২১ নভেম্বর কংগ্রেস কর্তৃক দেশব্যাপী হরতাল আহবান করেন। সেদিন নজরুল কুমিল্লার তরুণ তরুণীদের নিয়ে গলায় হারমুনিয়াম ঝুলিয়ে গান করে শহর প্রদক্ষীণকালীন কোতয়ালী থানার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বৃটিশ পুলিশ শহরের আইন শৃঙ্খলা অবনতি হবে ভেবে তাঁকে থানায় নিয়ে কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখেন। কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দেন।
এছাড়া কবির বয়সের সমসামিয়ক সময়ে পৃথিবীর প্রথম মহাযুদ্ধের পর পৃথিবীর পরাধীন দেশ ও নিপিড়ীত মানুষের মধ্যে স্বাধীনতা লাভের যে আকাঙ্খা তা কবির ভেতর রেখাপাত করেছিল। কেউ কেউ যুক্তি করে  ‘বিদ্রোহী সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন এর  সওগাত পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয়েছিল এর পেছনে অবশ্য একটা ধারনা ছিল যে যেহেতু নজরুল এর প্রথম লেখা ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’ ছাপা হয়েছিল সওগাত পত্রিকায়, আসলে বিদ্রোহী প্রথম ছাপা হয়েছিল বিজলী নামক সাপ্তাহিক পত্রিকায়।
মাঝি বাড়ি থেকে বেড়িয়ে হাতের বায়ে গলির শেষ মাথায় ‘তালতলা থানা’ সেখানে ঘুরে এসে বেড়িয়ে পরলাম বিদ্রোহীর কলকাতায়। শহর ঘুরে কবি যেখানে যেখানে অবস্থান করেছিলেন পত্রিকা বের করেছিলেন সে সব জায়গায় ঘুরে তথ্যচিত্র ধারণ করি। সে আরেক ইতিহাস।

শাহ্জাহান চৌধুরী
লেখক ও নাট্যসংগঠক
মোবাইলঃ ০১৭১১-১৪১০২৭