
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
আবদুল
করিম সাহিত্যবিশারদ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মধ্যযুগের জন্য একজন
নির্ভরশীল স্তম্ভ। প্রাচীন পুঁথি আবিষ্কার, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, সম্পাদনা ও
গবেষণায় অসাধারণ নিষ্ঠা, দক্ষতা ও প্রজ্ঞার যে পরিচয় দিয়েছেন এবং দু’হাজার
পুঁথি সংগ্রহ করে, তন্মধ্যে প্রায় একহাজার পুঁথি বাঙালি মুসলমানের রচনা-এসব
বিবেচনায় অর্থাৎ এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি এতো পুঁথি সংগ্রহ করে
আমাদের সারস্বত সমাজে কিংবদন্তি হয়ে স্মরণীয় হয়ে আছেন। পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন
সেন যথার্থই বলেছেন-
‘তিনি ব্যক্তি নহেন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান।’
মূল্যায়নে উক্ত হয়-
‘তাঁর এই সংগ্রহ ব্যতীত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনা কোনো সাহিত্যের
ইতিহাসবেত্তার পক্ষেই সম্ভব হতো না।’১ এক্ষেত্রে ড. দীনেশচন্দ্র সেন,
রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, ড. আহমদ শরীফ প্রমুখের গবেষণাকর্ম পর্যালোচনা
করলে তা স্পষ্টই বুঝা যায়।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সম্পর্কে যথার্থ মূল্যায়ন করেছেন আজহারউদ্দীন খান। তিনি লিখেছেন-
‘আবদুল
করিম সাহিত্যবিশারদই (১৮৬৯-১৯৫৩) প্রথম যিনি অতীত সাহিত্য-সম্পদ উদ্ধার
করে বাঙালি মুসলমানকে এক শক্ত ভূমির ওপর দাঁড় করিয়ে দিলেন। তিনি মধ্যযুগের
মুসলিম রচিত পুঁথি যা ইত:পূর্বে কী হিন্দু কী মুসলিম সংগ্রাহক উদ্ধারের
কোনো উৎসাহ দেখাননি। তিনি সেই সব লুপ্তপ্রায় পুঁথি উদ্ধার করে দেখিয়ে দিলেন
যে হিন্দুর মতোই এ দেশীয় মুসলমানরা পনেরো ষোলো শতক থেকে বিশুদ্ধ বাংলায়
সাহিত্য করে আসছে এবং মধ্যযুগে সাহিত্য রচনায় তারাই অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে।
বাংলা ভাষা শুধু তাদের মাতৃভাষাই নয় জাতীয় ভাষাও। এর ফলে মুসলমানদের মধ্যে
নতুন সৃষ্টির উন্মাদনা প্রবলভাবে জাগরিত হলো।’২
আবদুল করিম
সাহিত্যবিশারদের জন্ম তারিখ ও সাল নিয়ে বির্তক রয়েছে। পরবর্তীতে ৩০
সেপ্টেম্বর ১৮৬৯ সালটিই নির্ধারিত হয়। তিনি ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩ সালে মৃত্যু
বরণ করেন। উল্লেখ্য, তিনি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার সুচক্রদণ্ডী গ্রামেই
জন্মগ্রহণ ও মৃত্যুবরণ করেছেন। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ এফ,এ ক্লাস
পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। পরীক্ষার কিছুকাল আগে কঠিন সন্নিপাত রোগে আক্রান্ত
হন, শ্রবণ শক্তির ক্ষতি হয়। এখানেই তাঁর লেখাপড়ার ইতি ঘটে।
কর্মজীবন বহুমাত্রিক। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু, চট্টগ্রাম প্রথম
সাব-জজ আদালতে শিক্ষানবিস পদে যোগদান, কবি নবীনচন্দ্র সেনের সহযোগিতায়
চট্টগ্রাম কমিশনার অফিসে কেরানি পদে যোগদান, চাকরি চলে যাওয়ার পর পুনরায়
শিক্ষকতা এবং সর্বশেষ চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্কুল ইন্সপেক্টর অফিসে দ্বিতীয়
কেরানির পদে চাকরি লাভ এবং এ পদ থেকে অবসর গ্রহণ। তবে আদর্শ শিক্ষক হিসেবে
তিনি সমধিক পরিচিতি লাভ করেছিলেন এবং এ পেশায় নিযুক্ত হওয়ার ফলেই পুঁথি
সংগ্রহের কাজটি সুচারুরূপে করতে পেরেছিলেন। তিনি ১৯৪৫-এ চট্টগ্রামে
সংবর্ধনা সভায় বলেছেন-
‘ঘটনাস্রোতের আবর্তনে আমার জীবনে একটা পরিবর্তন
আসিয়া পড়ে। আমি আনোয়ারায় গিয়া পড়ি। সেখানেই আমার জীবনের ঐধষপুড়হ ফধুং
অভিবাহিত হয়। সুযোগ পাইয়া চতুর্দিক হইতে প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ করিতে বুঝিতে
পারি যে, হিন্দুর মতো মুসলমানেরও একটা বিরাট সুগঠিত ও উন্নত প্রাচীন
সাহিত্য আছে।’
এই আনোয়ারা বিদ্যালয়ে তিনি সাত বছর (১৮৯৯-১৯০৫) প্রধান
শিক্ষকরূপে কাজ করেন। এই সাত বছর চাকরি ছিল তাঁর জীবনের স্বর্ণযুগ। এই
স্কুল থেকেই তিনি বহু পুঁথি সংগ্রহ করেছিলেন। প্রথম পুঁথিটি তিনি এক চাষীর
ঘরে পেলেন, এ প্রাপ্তির আনন্দ ছিল অপার। অনুভূতিটি ড. মুহম্মদ এনামুল হকের
বর্ণনায় নিম্নরূপ-
‘একদিন হঠাৎ এক চাষীর বাড়িতে একখানা পুঁথি পাওয়া গেল।
ইউরেকা! ইউরেকা!! পেয়েছি, পেয়েছি। সে কি যে-সে আনন্দ। হাজার টাকার তোড়া বা
গুপ্তধন পেয়েও কেউ তেমন আনন্দ উপভোগ করেছেন কিনা জানিনে। ...
নানা
স্তোক বাক্যে চাষীটিকে ভুলিয়ে তিনি হস্তগত করলেন-সাত রাজার ধন এক মানিক।
আহার নেই, নিদ্রা নেই, পুঁথিটির পাঠোদ্ধারের চেষ্টা অবিরাম গতিতেই চললো। এক
সপ্তাহের অদম্য চেষ্টায় জানা গেল, পুঁথিটি কবি আলাওলের ‘পদ্মাবর্তী’।৩
পুঁথি
সংগ্রহে তাঁর ছাত্ররা প্রভূত সহযোগিতা করেছে। তার প্রধান কারণ ছিল যে,
ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে
সারদাচরণ চৌধুরী, শশীনন্দী, সুরেন্দ্র খাস্তগীর, সতীশচন্দ্র সেন,
যোগেশচন্দ্র সেন, নিশিকান্ত ঘোষ প্রমুখ অন্যতম যাঁরা উত্তরকালে স্ব স্ব
ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, অনেককে তিনি প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে দিয়েছেন।৪
ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অনার্স কোর্সের সিলেবাসে
ড. আহমদ শরীফ সম্পাদিত দৌলত উজির বাহরাম খানের ‘লাইলি-মজনু’ ও ড. মুহম্মদ
শহীদুল্লাহ সম্পাদিত আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ পাঠ্য ছিল। ড. আহমদ শরীফের
সম্পাদিত ‘লাইলি-মজনু’ বই-এর ভূমিকা ছিল বিস্তৃত ও ছাত্রদের জন্য খুবই
প্রাসঙ্গিক, যা পরীক্ষায় উত্তরপত্র প্রস্তুতকরণে সহায়ক। তার তুলনায়
‘পদ্মাবতী’র ভূমিকা তদ্রƒপ ছিল না। তখন রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানের উপর
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ও ড. মুহম্মদ এনামুল হকের ‘আরাকান-রাজসভায়
বাঙ্গালা সাহিত্য’ [খ্রিস্টীয় ১৬০০-১৭০০ অব্দ] বই ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো
সহায়ক আলোচ্য গ্রন্থ ছিল না। এই বই-এর ভূমিকায় ড. দীনেশচন্দ্র সেন লিখলেন-
‘এই
পুস্তকখানি প্রণয়ন করিয়াছেন সাহিত্যরথী মৌলভী আবদুল করিম
সাহিত্যবিশারদ-তিনি দ্রোণাচার্য সদৃশ এবং তাঁহার সহকর্মী মুহম্মদ এনামুল হক
এম,এ (স্বর্ণপদক), পিএইচডি-ইনি অর্জুনতুল্য। এই প্রবীণ ও নবীন কৃতিদ্বয়ের
গবেষণা দ্বারা বঙ্গ-সাহিত্যের অনেক অজ্ঞাত তত্ত্ব যে আবিষ্কৃত হইবে, তাহা
আমরা অনেক দিন পূর্বেই বুঝিতে পারিয়াছিলাম; সে সময় হইতে আমরা তাঁহাদের নূতন
আবিষ্কারের সহিত পরিচয় হইবার জন্য সোৎসুক মনে প্রতীক্ষা করিতেছিলাম।
তাঁহাদের সমবেত চেষ্টায় এই মূল্যবান পুস্তকটি প্রকাশিত হওয়ায়, আমাদের সে
ঔৎসুক্য আংশিকভাবে নিবৃত্ত হইয়াছে। বঙ্গ সাহিত্যের ইতিহাসের এই নবীন অবদান
খানি প্রত্যেক বঙ্গবাসীর অবশ্যই পঠিতব্য। [ভূমিকা: নভেম্বর ১৯৩৪]
ছাত্রাবস্থায়
অর্বাচীনের মত মনে মনে প্রশ্ন করতাম যে, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (চট্টল
ধর্মমণ্ডলী ১৯০৯ সালে সাহিত্যকৃতির স্বীকৃতিস্বরূপ ‘সাহিত্যবিশারদ’ উপাধি
প্রদান করেন), যিনি এফ, এ ক্লাশ পর্যন্ত পড়েছেন, এদিকে ড. মুহম্মদ এনামুল
হক কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে পাশ করে
স্বর্ণপদক লাভ করেছেন ও পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন-এ দু’জনের মধ্যে
পাণ্ডিত্যে কে বড়? তখন কোনো সদুত্তর খুঁজে পাইনি। পরবর্তীতে শিক্ষকতা করতে
গিয়ে যতটুকু পড়াশোনা করেছি, তখন অসহায়ের মতো নিজের অজ্ঞতায় কূর্ম হয়েছি।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সঙ্গে তুলনা করা বাতুলতা। শুধু এতটুকু বলতে
পারি ড. মুহম্মদ এনামুল হক এবং ড. আহমদ শরীফ আজ সারস্বত সমাজে যে স্থানটুকু
দখল বা অধিকার করে আছেন বা থাকবেন, তাঁরা উভয়েই আবদুল করিম
সাহিত্যবিশারদের সম্পদে ও আশীর্বাদে প্রতিষ্ঠিত। আবদুল করিম
সাহিত্যবিশারদের ভাইপো, যাঁকে পুত্রাধিক স্নেহ করতেন এবং প্রতিষ্ঠিত হওয়ার
ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন, সেই ড. আহমদ শরীফের আদর্শিক দর্শন
অনেকটাই সংশয়বাদীতে ভরপুর। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের ইতিহাস
গবেষণায় ও চর্চায় এবং মুসলিম সাহিত্যিকদের অবদান বিবেচনায় যে প্রামাণ্য
দলিল উপস্থাপন করে নতুনযুগের সূচনা করেছেন এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পাঠে
যে পূর্ণাঙ্গতা দান করেছেন, তার সবটুকুই ভিত্তিমূলে দাঁড়িয়ে আছেন আবদুল
করিম সাহিত্যবিশারদের আবিষ্কৃত পুঁথি-সাম্রাজ্য।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের পুঁথি আবিষ্কারের পর স্পষ্টত যে বিষয়টি প্রকাশ পেলো, তাহলো-
‘বাংলা
সাহিত্যে হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সাহিত্য রচনা হলেও যা ইতিহাস লেখা হয়েছে
তা প্রধানত একতরফা-বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত্য একা হিন্দুরও নয়, একা
মুসলমানদেরও নয়; পরন্তু হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই। এই উভয়ের সেবিত সাহিত্য
নিয়াই বঙ্গ-সাহিত্য। এ পর্যন্ত যে সকল ইতিহাস রচিত হইয়াছে তাহা এ কালেরই
ইতিহাস মাত্র, অপরাঙ্গের অর্থাৎ মুসলমান সাহিত্যের ইতিহাস অদ্যাপি লিখিত হয়
নাই।’
ড. সুকুমার সেন ‘ইসলামী বাংলা সাহিত্য’ নামে একটি পৃথক ইতিহাস
গ্রন্থরচনা করেছেন (১৩৫৮)। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ এই বই-এর নামকরণে
আপত্তি জানান, এমনকি গ্রন্থকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রকৃত তথ্যের প্রতিবাদও
করেছিলেন। তিনি শনিবারের চিঠি, শ্রাবণ ১৩৫৯, পৃ:৪১০ সংখ্যায় লিখেন-
‘প্রথমত:
ইসলাম একটি ধর্মের নাম। যারা ইসলাম ধর্ম মানিয়া চলে, তারা মুসলমান। অতএব
‘মুসলিম বাংলা সাহিত্য’ হইলেই নামটা সার্থক হইত। ‘ইসলামী বাংলা সাহিত্যের
অর্থ দাঁড়ায় ‘ইসলাম-ধর্ম বিষয়ক সাহিত্য।’
দ্বিতীয়ত: মুসলমান রচিত সাহিত্যও বাংলা সাহিত্য এবং তাহা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অবশ্য আলোচ্য বিষয় এবং অপরিহার্য অঙ্গ।’
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় অবদান হিসেবে দুটি প্রধান কারণের কথা উল্লেখ করেছেন।-
১.
‘হিন্দু কবিগণ সাহিত্যচর্চার ব্যপবেশে কেবল তাঁহাদের দেব-দেবীর
মাহাত্ম্যই প্রচার করিয়া গিয়াছেন কিন্তু মুসলমান কবিগণ বাঙ্গালা সাহিত্যের
প্রাচীন আদর্শকে বদলাইয়া দিয়া উহার স্রোতকে যে-মুখে প্রবাহিত করিয়াছিলেন,
তা হইল-সাহিত্যে মানবীয় প্রেমের মাহাত্ম্যশালী স্বীকার। মানবজীবনের
সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাশালী প্রেমরূপ গুণটিকে কেন্দ্র করিয়া কাব্য রচনা করিবার
কল্পনা কেবল মুসলমান কবিগণ বাঙ্গালা ভাষাকে সর্ব প্রথম দান করিয়া গিয়াছেন।’
২.
‘হিন্দু কবিগণ যেমন সংস্কৃত সাহিত্য মন্থন করিয়া তাহার সকল উৎকৃষ্ট
উপাদান বঙ্গভাষার ভিতর দিয়া বঙ্গসাহিত্যে আনয়ন করিয়া উহাকে তাঁহাদের জাতীয়
সাহিত্যে পরিণত করিয়াছেন, মুসলমান কবিগণও তেমনি নানা দেশের সুরভি কুসুমের
মালা রচনা করিয়া ভাষা জননীর কণ্ঠে পরাইয়া দিয়া গিয়াছেন। আরবী বা ফারসী
সাহিত্যের এমন কোন উৎকৃষ্ট গ্রন্থ নাই, যাহা তাঁহারা অনুবাদ করেন নাই বা
যাহাদের ভাবগ্রহণে গ্রন্থ রচনা করেন নাই।’৫
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ এজন্যই দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পেরেছেন-
‘সাহিত্যে জাতিধর্মের গণ্ডী আমি কখনও স্বীকার করি নাই, এখনও করি না কিন্তু ইহার বৈচিত্র্য স্বীকার করি।’৬
স্পষ্টই
বুঝা যায় তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের জন্যই সাহিত্য রচিত হওয়া উঠিত,
সেজন্য সাহিত্যের বিষয়বস্তু মানুষই হবে- যে সাহিত্য মনুষ্য সম্পর্কে
বিবর্জিত তা তাঁর কাছে মূল্যহীন ছিল। তাঁর দৃঢ় প্রত্যয় হলো-
‘সাহিত্যের প্রধান উপকরণ মানুষ; মানুষের অন্তরে যিনি প্রবেশ করিতে পারেন তিনিই সাহিত্যিক, তিনিই স্রষ্টা।’৭
১৯৫২ সালে অগাস্টমাসে কুমিল্লায় পূর্ব-পাক সাংস্কৃতিক সম্মেলন হয়েছিল।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ২২ অগাস্ট সভাপতিরূপে যে অভিভাষণ প্রদান করেন,
সেখান থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিতে চাই। এই অভিভাষণ ছিল তাঁর মৃত্যুর একবছর আগে।
তখন তিনি অশীতিপর বৃদ্ধ, তাঁর কাছে উপস্থিত সকলেই তরুণ, তাই সম্বোধন
করলেন-‘তরুণ বন্ধুগণ’।
কিন্তু শুরুটা করলেন এভাবে-
‘আমার মত অশীতিপর
বৃদ্ধের চক্ষে প্রৌঢ়গণও তরুণ। তাই সকলকে নির্বিশেষে তরুণ বলিয়া সম্বোধন
করিলাম। আমি বয়সে প্রবীণতম কিন্তু প্রজ্ঞায় প্রবীণ নহি।’-এটা তাঁর
বিনয়-ভাষণ।
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘যৌবনের গান’ প্রবন্ধে বার্ধক্য ও
যৌবনের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন-এটা বয়সের কোনো বিষয় নয়, তা মনের ও
আত্মবিশ্বাসের বিষয়।
আবদুল করিম বিশারদ কতটা অভিজ্ঞ তা নিজেই জানান দিলেন।-
‘আমার
জীবনে অন্তত ষাট বছরের অভিজ্ঞতা সঞ্চিত আছে। এই দেশে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য
বিপ্লব-বিবর্তন না ঘটিলেও সংঘাত-ক্ষুব্ধ ইয়োরোপের বিগত ষাট-সত্তর বছরের
বিচিত্র ও বিস্ময়কর বিবর্তনের সাথে আমার প্রায় প্রত্যক্ষ পরিচয় আছে।’
চমৎকারভাবে সংস্কৃতির ব্যাখ্যা দিলেন তিনি-
‘মানুষের
এই স্বার্থপরতা, অহংবোধ, নূতনের পিপাসা, চিত্ত-চাঞ্চল্য ও গতিশীলতাই
সংস্কৃতির উৎস অর্থাৎ ইহাদের সম্মিলিত অভিব্যক্তিই সংস্কৃতি।’
আবার একথাও বলেছেন-
‘সংস্কৃতির
জন্ম-প্রেরণা যেখান হইতেই আসুক না কেন, সংস্কৃতির উন্মেষ, বিকাশ ও প্রসার
পরিবেশ-নিরপেক্ষ নহে। এই পরিবেশের প্রধান উপাদান ঐতিহ্য।’
নিজের আত্মগত মননচর্চায় নির্ভার অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন অত্যন্ত নির্মোহভাবে। বলেছেন-
‘মুসলমান
হিসাবে আরব-পারস্যের সঙ্গে চিরকাল আমরা একটি আন্তরিক যোগ অনুভব করিয়াছি।
আবার এই দেশী আবহাওয়া ও অন্নে গঠিত দেহে নাড়ীর সম্পর্ক ছিল একান্তভাবে এই
দেশের সঙ্গেই। ফলত আমাদের সাধনা চিরকাল দুই ধারায় প্রবাহিত হইয়াছে। একটি এই
দেশের সহজে অনুভূত প্রাণবস্তু জাতীয় ধারা, অপরটি মনন চিন্তনের ধর্মীয় বা
আদর্শবাদমূলক ধারা। একদিকে ধর্মবোধে স্বাতন্ত্র্য সাধনা, অপরদিকে
জাতীয়তাবোধে সমন্বয়-সাধনা।’
আবার পাকিস্তানি মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে
বাংলা ভাষার প্রতি একশ্রেণি সাম্প্রদায়িক চেতনাপুষ্ট তথাকথিত আস্ফলনকারী
দেখে তিনি অনেকটাই ব্যথিত হয়েছিলেন। তাই অভিভাষণের এক পর্যায় বললেন-
‘আসন
গ্রহণের পূর্বে আমাদের সংস্কৃতির সঙ্কট সম্বন্ধে দুটো কথা না বলিলে মনের
খটকা থাকিয়া যায়। আজ প্রশ্ন উঠিয়াছে “বাংলা আমাদের সংস্কৃতির ভাষা হইতে
পারে না। আমাদের ধর্ম, ঈমান এই ভাষায় অটুট থাকিতে পারে না।” এই প্রশ্নের
কোন জবাব দেওয়া আমার কাছে লজ্জার ব্যাপার।’
তিনি মধ্যযুগের কবি সৈয়দ
সুলতান রচিত ‘ওফাতে রসূল’, চট্টগ্রামের কবি বদিউদ্দীন রচিত ‘ছিকতে ঈমান’,
সন্দীপ-নিবাসী কবি আবদুল হাকিম রচিত ‘নূর নামা’ ও নসরুল্লা খাঁন রচিত
‘মুসার সওয়াল’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন-‘ধর্মকথা বাঙ্গালায় বুঝিলে
কেহ স্বেচ্ছায় পাপে মন দিবে না।’ স্পষ্ট উচ্চারণ-
‘আজ বোধ হয় তাঁহারা দেশকে পাপে ডুবাইতে চাহেন, যাঁহারা প্রশ্ন তুলিয়াছেন বাঙ্গালা ভাষা আমাদের সংস্কৃতির বাহন হইতে পারে না।’
তাই সভাপতির ভাষণে আহ্বান জানান-
‘আমাদের সংস্কৃতির ধ্বংসের যে হীন আয়োজন নেপথ্যে চলিতেছে, তাহা ব্যর্থ করিতে পারেন কেবল আপনারাই।
---
আমার
এই বিশ্বাস আছে যে, আমার দেশের মৃত্যু নাই, আমার দেশের আত্মা যে জনগণ,
তারও মৃত্যু নাই, তেমনই অমর আমার এই বাঙ্গালা ভাষা। তরুণ বন্ধুগণ,
‘উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্নিবোধত।’
এই আহ্বান আমরা অনেক আগেই স্বামী বিবেকানন্দের কাছ থেকে পেয়েছি।
ঊনবিংশ
ও বিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে অনেক মনীষীর জন্ম হয়েছে। বিশেষত বাংলা ভাষা ও
সাহিত্যের ক্ষেত্রে যেমন কবি-সাহিত্যিকদের অবদান অফুরন্ত, তেমনই সারস্বত
সমাজে পণ্ডিত ও জ্ঞানীদের জ্ঞানসাধনায় অনেকেই আজ স্মরণীয়, বরণীয় এবং নমস্য।
এই পণ্ডিত-জ্ঞানীদের জ্ঞানসাধনার ভান্ডার আমাদের ঋদ্ধ করে বিকশিত করেছে।
কিন্তু সামগ্রিকভাবে তাঁদের সাধনার ফসলগুলোর সঙ্গে কতজনেরই বা প্রত্যক্ষ
যোগসাজশ রয়েছে? যখনই মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর কথা উল্লেখ করি, তখন
তিনি চর্যাপদের আবিষ্কর্তা হিসেবেই সমধিক আলোচিত হয়ে থাকেন, তেমনই ড.
মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ব্যাপক গবেষণার অট্টালিকা স্পর্শ না করে ‘বাংলা ভাষার
আঞ্চলিক অভিধান’ টিকেই প্রয়োজন মনে করি সমধিক, পড়ার টেবিলে সাজিয়ে রাখি ড.
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের অমর আকর গ্রন্থ ঙউইখ ও ভাষাপ্রকাশ বাঙ্গালা
ব্যাকরণ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসের পথে হাঁটতে গিয়ে ড. সুকুমার
সেনের ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ গ্রন্থসমূহের দ্বারস্থ হই, ধ্বনিবিজ্ঞানের
কঠিন পথের একমাত্র সঙ্গী হলো মুহম্মদ আবদুল হাই-এর ‘ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা
ধ্বনিতত্ত্ব’, ড. দীনেশচন্দ্র সেনকে আবিষ্কার করি চন্দ্রনাথ দে কর্তৃক
সংগৃহীত ময়মনসিংহ ও পূর্ববঙ্গ গীতিকার সম্পাদনায়, মুনীর চৌধুরীকে নাটকেই
মানায় বেশি, আবুল ফজলের বিচরণ মননশীল প্রবন্ধে, ড. আহমদ শরীফ আটকিয়ে গেছেন
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের ইতিহাসের পাতায়, ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও ড.
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এখন আমাদের কাছে গীতিকার ভিন্ন অন্য পরিচয়ে আর নেই,
ড. মুহম্মদ এনামুল হক তো সাহিত্যবিশারদের সঙ্গেই অনেকদিন হেঁটেছিলেন,
সাম্প্রতিককালে ড. আনিসুজ্জামানের প্রয়াণের পর তাঁকে মূল্যায়ন করা হয়েছে
তাঁর বিপুলা পৃথিবী, কালনিরবধি, আমার একাত্তর ইত্যাদি আত্মজৈবনিক রচনায়।
অথচ এইগুলো তাঁদের প্রকৃত পাণ্ডিত্যের পরিচয়বাহী নয়। এক্ষেত্রে আবদুল করিম
সাহিত্যবিশারদকে কোথায় স্থান দিতে হবে? যেখানে বলা হয়-‘আবদুল করিম
সাহিত্যবিশারদের মৌলিক কোনো গ্রন্থ নেই। তাঁর অধিকাংশ গ্রন্থই পুঁথি-
সম্পাদনা এবং এ পুঁথি আবিষ্কারসূত্রে তিনি যেসব ভাবনাচিন্তা করেছেন।
সেগুলিকে অজস্র প্রবন্ধে রূপ দিয়েছেন।’ যদিও হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেন-
‘গ্রন্থের
সম্পাদনা কার্যে যেরূপ কৌশল, যেরূপ সহৃদয়তা ও যেরূপ সূক্ষ্মদর্শিতা
প্রদর্শন করিয়াছেন তাহা সমস্ত বাঙ্গালায় কেন, সমস্ত ভারতেও বোধ হয় সচরাচর
মিলে না। এক একবার মনে হয়, যেন কোন জর্মান এডিটর গ্রন্থ সম্পাদনা
করিয়াছেন।’
তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়-বাংলা সাহিত্যে আবদুল করিম
সাহিত্যবিশারদের স্থান কোথায়? মহাভারতে দ্রোণাচার্য ছিলেন অস্ত্রবিদ্যা
শিখানোর শিক্ষক, আচার্য। তিনি যোদ্ধা ছিলেন। তদ্রƒপ আবদুল করিম
সাহিত্যবিশারদ হলেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস-প্রণয়নকারীদের শিক্ষক। তাঁর
আবিষ্কৃত ও সংগ্রহের ভাণ্ডারই বিশেষত বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের ইতিহাসের
অন্যতম গাণ্ডিব। তাঁর সংগৃহীত উপাত্ত ছাড়া পূর্ণাঙ্গরূপ লাভ করেনি, তা
দৃঢ়ভাবেই বলা যায়। তিনি হলেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতাদের
দ্রোণাচার্য, এ মূল্যায়ন ড. দীনেশচন্দ্র সেনের। একজন জহুরি প্রকৃত জহুরিকে
চিনতে কখনও ভুল করেন না। এটাই আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের যথার্থ পরিচয়।
তথ্য-সংকেত:-
১. চরিতাভিধান- বাংলা একাডেমি। ঢাকা-পৃ:৩১।
২. পূর্বাভাষ-দীপ্ত আলোর বন্যা-গ্রন্থের ভূমিকা-আজহারউদ্দীন খান।
বাংলা একাডেমি, ঢাকা-পৃ:সাত। ১৯৯৯।
৩. আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ: স্মারকগ্রন্থ, পৃ:৭০।
৪. মাঘনিশীথের কোকিল-আজহারউদ্দীন খান।
৫. প্রাচীন বঙ্গ-সাহিত্য ও মুসলমান- আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। পৃ:৪-৫।
৬. ১৯৩৯ সালে ৬ও৭ মে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনের মূল সভাপতির ভাষণ।
৭. ১৯৫০ সালে ২১-২২ শে জানুয়ারি চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনে তাঁর বক্তব্য।