জম্বুদ্বীপে দু’মিনিট

মানিকরতন শর্মা ।।
ভালো
করে বুঝে ওঠেনি সে। তার আগেই বাবা মারা যায় জনমজয়ের। সে থেকে পাখির নীড়ের
মত সংসারটাকে আগলে রেখেছে মা। মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরুনো মা ছোটদের স্কুলে
একটা চাকরি নেয়। টিউশনি আর চাকরি এই নিয়ে চালিয়ে নেয় সংসার। দারিদ্রের
খণ্ডিত আঘাতে রক্তক্ষরণ হলেও ভেঙে পড়েনি সুলক্ষণা। তার তিরিশ পেরুনোর আগেই
স্বামীর পরপাড়ে চলে যাওয়া। শোককে বুকের গহীনে চাপা দিয়েছে সে। ছোট ছোট
তিনটি সন্তান। জনমজয়, মাদৃশা আর অধিরথ।
বিদ্যার বর্ণবীজই একমাত্র পুঁজি
সুলক্ষণার। যে বীজ একবার মনো জমিতে রোপন করা যায় সে-বীজ একদিন অশ^ত্থে
পরিণত হয়। তাই রাতদিন এই তিনটি সন্তানকে ছেড়া মাদুরে বসিয়ে পড়াতে বসে সে।
দুপুর
বেলা চুলোতে কী চড়বে; কিংবা রাতে কী হবে সেই চিন্তা সন্তানের মনে আঁচ পড়তে
দেয় নি সে। যৌবনের ভাঁজ ঘোমটার আঁচলে যত্ন করে রেখেছে। তবু কু-মনের দৃষ্টি
যে পড়েনি তা নয়। যৌবনকে স্বামীর শ্মশানে ভস্ম করে দিয়েছে সুলক্ষণা। কখনো
কখনো প্রবল প্রতিকুলে নিয়তিকে দোষারোপ করতে গিয়েও ফিরে আসে আবার। মনে মনে
ভাবে শুধু কপালকে দোষ দিয়ে কী লাভ। মরলোকে এইভাবে একদিন না একদিন খসে যাবে
সব।
চিন্তাগুলো কষ্টের দাবানলে মনের ভিতর ছড়িয়ে পড়তে দেয় নি। সন্তানের
ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে স্বপ্ন নির্মাণে একটু একটু করে এগুতে থাকে সে। ওরা বছর
বছর ক্লাস ডিঙিয়ে যেতে থাকে। এতে মায়ের ভার লাগব হতে থাকে।
জনমজয়ের চাকরি হয়। দু’বছরের মাথায় বোন মাদৃশেরও বিয়ে দিয়ে দেয় সে। এবার সংসারের অনেকটা দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় জনমজয়।
উঠুনের
দক্ষিণ পাশে একটা হিজল গাছ। বিয়ে করে এসেই দেখেছে এই হিজল গাছটিকে। তখন
ওটা ছোট ছিল। এখন কত্ত বড় হয়েছে! স্বামীর লাগানো এই গাছটির নিচে বিকেলের
বাতাসে মন ভারাক্রান্ত হয়ে বসে সুলক্ষণা। দক্ষিণা ঝির ঝির বাতাস। আনমনায়
স্বামীর মুখটি ভেসে ওঠে। চোখের কোণায় জল আসে। বাম হাতে আঁচলটি টেনে নেয়।
অশ্রু গড়িয়ে পড়তে দেয়নি। এমন সময় মার পাশে এসে জনমজয় বলেÑ
Ñ কি হয়েছে মা!
Ñ না কই কিচ্ছু না
মায়ের চোখ মোছা দেখেও কথাটা বলেনি জনমজয়। হয়তো বাবার কথা মনে পড়ছে!
Ñ দেখ্ খামাকা চিন্তা কইরনা। মাস্টার্সটা কমপ্লিট হলে অধিকে কিছু একটাতে ঢুকাতে চেষ্টা করব।
Ñ না রে বাবা, চিন্তা কী ছাড়া যায় বল! জীবনের বাঁকে বাঁকে চিন্তার ধরণও পাল্টায়। জনমজয়কে পাশে বসিয়েÑ
Ñদেখ্
ঐ যে দিগন্ত রেখা কিংবা নীলাকাশ ওরাই তো মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়। মানুষ
তো প্রকৃতির অভিন্ন সত্তা। তোরা বড় হয়েছিস। আধুনিক জীবন, যান্ত্রিক চলা
ফেরা। তোরা তো এখন আর আকাশ দেখার সময়টাও পাছ না। অধিকে দেখ্ ; সারাক্ষণ
মোবাইল নিয়েই আছে। চারপাশে কী ঘটছে দেখার সময় নেই তার।
Ñ ও একটু এই রকমই মা। দেখছ না ছোট্ট সময় থেকেই ও একটু চুপচাপ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে
পড়তে গিয়ে দেখেছে; সকলেই কেমন যেন নিজ নিজ প্রতিষ্ঠার রাস্তায় ছুটছে।
অধিরথও তার ব্যতিক্রম নয়। যেভাবেই হোক প্রতিষ্ঠা চাই, চাই।
মাঘে
জনমজয়কে বিয়ে করানো হল। নতুন সংসার ওর। সংসারের কাঠামোতে পরিবর্তন হল।
প্রজন্ম ব্যবধানে চিন্তা ও বোধের পার্থক্য থাকবেই। সময়ের এইযে ফাঁক তা সে
ভালো করেই বুঝে সুলক্ষণা। বৌকে নিয়ে কর্মস্থলেই থাকে জনমজয়। বাড়িতে একরকম
একাই থাকে সুলক্ষণা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিছাটা পেলে বাড়িতে আসে অধিরথ।
দু’চারদিন থেকে আবার হোস্টেলে চলে যায়। মায়ের সাথেও কম কথা বলে সে। যখন
যেটুকু বলে সেখানেও বিত্তভাবনার কথাই বেশী।
এদিকে শরীরও ভালো যাচ্ছে না
সুলক্ষণার। পড়া শেষ করে দু’বছর ঘুরেছে অধি। চাকরি হয় নি। একদিন নতুন চাকরি
পায় অধিরথ। কিন্তু তার এককথা প্রচুর টাকা না হলে বিয়ের পিড়িতে বসবে না সে।
তারপরও সংসারের যে দায়িত্ব তা সম্পন্ন করতে চায় সুলক্ষণা। ছোটকে সংসারী
করেই সেইদায়িত্ব পূর্ণ করতে চায় সে। কিন্তু ছেলের তো এককথা। অনঢ়। এখন নয়।
চারপাশ
মানুষের এই যে এস্টাবলিশমেন্ট হওয়ার দৌড় এটা তাকে পেয়ে বসে। বছর ঘুরতে
থাকে। বত্রিশ পেরিয়ে যায় তার। বড় ভাই নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তারপরও দু’এক
বার বলেছে সেও। এখন আর বলে না। হাই পেশার। ডায়বেটিক উঠা-নামায় ব্যস্ত।
বয়সের ভারে খাচার হাড়ও নরম হতে থাকে। এ সকল কারণে প্রায়ই মৃত্যু চিন্তা
ঘিরে বসে তার।
অনেক বলার পর গত মাঘে বিয়ে করে অধিরথ। বৌকে নিয়ে
গ্রামের বাড়িতে থাকে সুলক্ষণা। নতুন বৌয়ের চাল-চলনে খুশী সে। অনেক কিছুতেই
নিজের সাথে মিল খুঁজে পায়। রাত হলে বৌমাকে নিয়ে প্রায়ই শাস্ত্রগ্রন্থ নিয়ে
বসে। মনযোগ দিয়ে সেইসব ধর্ম কথা শুনে অধির বৌ পারমিতা। বর্তমান সময়ের
সমাজব্যবস্থা এবং বাস্তবতা এই নিয়েও বৌ-শাশুড়ির কথা হয়। দ্বিধাহীনভাবে তার
দৃষ্টিভঙ্গির কথাও খুলে বলে পারমিতা। কিন্তু স্বামীর সাথে দর্শনের দিকটি
মিলে না তার ।
স্বামী বেচারের কথা হচ্ছে প্রতিষ্ঠা মানে টাকা-টাকা-আরও
টাকা। টাকার পেছনে ঘোড় দৌড় এই একটা বিষয়েই দ্বিমত পারমিতার। ক্ষুদ্রায়িত
সুখের মাঝেও অপার ভালোবাসা থাকে। টাকাই একমাত্র নয়। বিষয়টাকে নিয়ে স্বামীর
কথার সাথে এগিয়ে যায় না সে। দু’বছর হলো। অধিরথের কারণেই সন্তান নিতে পারছে
না সে। লেইট করে সন্তান নিলে তার নেগেটিভ দিকগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন
ডাক্তার। পরামর্শ আমলে নেয় অধি। ফলে দুমাস হল কনসেপ্ট হল পারমিতা।
চতুর্থ
মাস। এক রাতে পারমিতাকে নিয়ে বসে সুলক্ষণা। সন্তান গর্ভে কিভাবে বেড়ে ওঠে
এবং তার সাথে পরমবস্তুর সম্পর্ক কি? এই বিষয়ক একটা গ্রন্থ নিয়ে বসে সে।
একদিন এই গ্রন্থটি তার শাশুড়িমা দিয়েছিল। বলল, কণ্ঠে সুর তুলে পড়তে। তাই
শুরু করে সুলক্ষণাÑ
মায়ের উদরে জীব শৃঙ্গার পরশে।
ঋতুর সংযোগ জন্ম পিতার ঔরসে ॥
পঞ্চ রাত্রি হয় বুদ্বুদ্ প্রমাণ।
পক্ষান্তরে হয় জীব বদরী সমান ॥
মাসেক অন্তরে হয় অঙ্গুষ্ঠ প্রমাণ।
হস্তপদ নাহি মাংস পিন্ডের সমান ॥
দ্বিতীয় মাসেতে হয় মস্তক উৎপত্তি।
তৃতীয় মাসেতে হয় হস্তপদাকৃতি ॥
চতুর্থ মাসেতে দেখ হয় কেশরোম।
পঞ্চম মাসেতে দেহ বাড়ে ক্রম ক্রম॥
শাশুড়ির
মুখে গর্ভবাসের কথা শোনতে শোনতে একটা হাইম তুলে পারমিতা। চোখের পাতা ভেঙে
ঘুম জড়িয়ে যায় তার। প্রথম সন্তান। শরীরের সাথে মনেও এক অচেনা শিহরণ দোলা
দেয়। ঘুম ঘরে একটা ছোট্ট বাচ্চার ছবি টাঙিয়ে রাখে সে। শুয়ে শুয়ে খাট থেকে
দেখে যায় ছবিটাকে। কখনো তার সাথে আনমনে কথা বলে সে। ছবিটা ছেলের। কিন্তু
মনে মনে মেয়ের ছবিও এ্যাঁকে নেয় পারমিতা। এই সবের দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই
অধিরথের। সারাক্ষণ বিত্তবৈভব চিন্তায় ব্যস্ত। স্বপ্নের সিঁড়িগুলো এক এক করে
গ্রাস করতে থাকে তাকে। স্ত্রীর মাঝে মাতৃত্বের লক্ষণগুলো খুব যে মনোযোগ
দিয়ে দেখে তা মনে হয় না।
গাইনি ডাক্তার দেখানো হলো। টিকা কিংবা চেকআপ
এসব একাই দেখে সুলক্ষণা। নিজের মেয়ের মত করে দেখভাল করে সে। মমতা ও
দায়িত্ববোধ এতোটুকু ঘাটতি নেই তার। শাশুড়ি না, যেন নিজ মা। মনে মনে কৃতার্থ
হয় পারমিতা। তাই তো জমানো দুঃখকষ্টের কথাও অবলিলায় খুলে বলে সুলক্ষণার
কাছে।
বাইরে অঝোর ধারার বৃষ্টি। চারদিক আধো অন্ধকার। সন্ধ্যার প্রদীপ আর
আগরবাতি জ্বালিয়ে নেয় সুলক্ষণা। হাতে নিয়ে সেই ছোট্ট বাচ্চার ছবিটার কাছে
গিয়ে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ দাঁড়াতেই নিজের প্রথম গর্ভ ধারণের কথা মনে পড়ে তার।
আজ পারমিতার অনুরোধেই গর্ভকথা গ্রন্থ নিয়ে বসে সুলক্ষণাÑ
ষষ্ঠ মাসে জীব নড়ে মায়ের উদরে।
চতুর্দিকে ঘোর অগ্নি দাহ কলেবরে॥
ষষ্ঠ মাসে ভোগের যত গর্ভের যন্ত্রণা।
বলিব বিশেষ কি চৈতন্য থাকে না ॥
সপ্তম মাসেতে জীব নানা ক্লেশে রয়।
তাহা দেখি পরমাত্না গুরু দয়া ময় ॥
মায়ের ভোজন রসে দিনে দিনে বাড়ে।
অষ্ট মাসে দিব্য জ্ঞানে জ্ঞানে আপনারে ॥
জীব বলে প্রভু আমি সে দেশে যাব না।
কতবার জম্বুদ্বীপে পেয়েছি যন্ত্রণা ॥
জম্বুদ্বীপ গমনেতে আমার ইচ্ছা নাই
এথা থাকি তব শ্রীরূপ দেখিবারে চাই ॥
শাশুড়ির মুখে সুরেলা কণ্ঠে গর্ভকথা শোনে এক স্বপ্ন ঘোরে চলে যায় পারমিতা। গর্ভাসয়ে শিশুর কথা এক আবেশ তৈরি করে তার।
এলো
পূর্ণিমার জোয়ার। ধীরে ধীরে ব্যথা বাড়ে পারমিতার। বিকালে হাসপাতালে ভর্তি
করানো হলো তাকে। নার্স সবিতার দক্ষতায় নরমাল ডেলিভারি হয় তার।
কিন্তু
কী আশ্চার্য ! নবজাত শিশুপুত্রটি একদম চুপ। কাঁদে না। অথচ দুচোখ ফেল ফেল
করে দেখতে লাগল চারদিক। সবাই হতবাক। দূরে দাঁড়িয়ে বাবা অধিরথ ক্লাইনকে
বলছেÑ যেভাবে হোক টাকাটা আমার চাই। কিভাবে মেনেজ করবেন সেটা আপনার হ্যাডেক।
সোমবারের মধ্যে বিশলক্ষ টাকা আমার চাই চাই।
এ দিকে হঠাৎ হাসপাতালে
শোরগোল। অসংখ্য মানুষের ভিড়। একের পর এক জখমি মানুষ ভর্তি হচ্ছে হাসপাতালে।
দু’গ্রামের মধ্যে প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ঘটনাস্থলেই তিন জন মারা যায়।
পুলিশ আসে। মামলা হয়।
এবার মায়ামুক্ত শিশুটি এ সব দেখে দেখে মুচকি
হাসে। তারপর দু’মিনিট শেষ হতে না হতে মায়াগ্রাসে শিশুটি এবার চিৎকার দিয়ে
ওঠে। এর কিছুক্ষণ পর পুরো শরীরটা নীলবর্ণ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে কান্না থেমে
যায় তার।
ডাক্তার আসে। চোখ-মুখ, হাত-পা ধরে শিশুটিকে দেখে। তারপর মাথাটা নাড়িয়ে বলেÑ না, বাঁচানো গেল না।
গর্ভকথার আবেশে তখনো মা পারমিতা বেঘোরে অচেতন। এই অচেতন ঘোরের ভেতর কে যেন বলছেÑ
‘জীব বলে প্রভু আমি সে দেশে যাব না। কতবার জম্বুদ্বীপে পেয়েছি যন্ত্রণা ॥’
কামিনী বাবু এবং কদম আলীর একটি রাত

অমিত ভট্ট ।।
রাত
তৃতীয় প্রহর শেষ হয়ে চতুর্থ প্রহর চলছে। দুজন মধ্যবয়সী পুরুষ বাগানের পাথর
বাঁধানো পুকুর ঘাটে বসে আছেন। তাদের মধ্যে বয়স্ক জনের শরীর থেকে ভুরভুর করে
কামিনী ফুলের মোহনীয় মাতাল করা গন্ধ বেরোচ্ছে। অপর জনের শরীর থেকে কদম
ফুলের হালকা মিষ্টি গন্ধ বের হচ্ছে। আকাশের ছাতাকৃতির বিশাল উঠোনে
পূর্ণিমার যৌবনবতী ভরাট চাঁদ শ্বেত পাথরের থালা বিছিয়ে তা থেকে অকাতরে
রূপালী জোছনা বিলিয়ে যাচ্ছে। তারাগুলোও সেই অসীম হতে ছোট ছোট পিদিমের মতো
ধুকে ধুকে জ্বলে কিছুটা হলেও আলো ছড়িয়ে দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
স্রোতের টানে নদীর বুকে ভেসে চলা পাল তোলা বাহারি নৌকার মতন হেলে দুলে
ঘোলাটে মেঘ গুলো বয়ে চলেছে। কখনও বিচ্ছিন্ন দু-একটি। কখনও বা সদলবলে ছুটে
চলেছে। কত না সহস্র সহস্র বৎসর ধরে যেন চাঁদ-তারাকে আড়াল করার জন্য মেঘেরা
এভাবে ছুটে চলেছে। অবিরাম ছুটে চলেছে।
কামিনী বাবু মহাকালের সেই
সূচনালগ্ন থেকে বয়ে চলা ঘোর লাগা অন্তরীক্ষের প্রবাহ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন।
হঠাৎ কদম আলী জিজ্ঞেস করলেন, “কামিনী বাবু কি দেখেন?” কামিনী বাবু চোখ
আকাশ থেকে নামিয়ে কদম আলীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “কি আর দেখবো! আপনি যা দেখেন
আমিও তাই দেখি।” কদম আলী মুচকি হেসে বললেন, “আমিতো অল্প সময় দেখি। আপনার
মত সবসময় আকাশ দেখি না। উপরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আপনার ঘাড় ব্যথা করে
না?”পুকুরের অপর পাশের জমাট অন্ধকারের দিকে তাকাতে তাকাতে ভরাট কন্ঠে
কামিনী বাবু উত্তর দেন, “প্রথম প্রথম হতো। এখন হয় না।” কদম আলী কামিনী
বাবুর দিকে আরও একটু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেন, “আপনার আকাশ দেখতে ভালো লাগে
বুঝি?” এমন সময় পুকুরের অন্ধকার কোনা থেকে দুটো শিয়াল, “হুক্কাহুয়া।
হুক্কাহুয়া” বলে কোরাশে চেঁচাতে থাকে।
কামিনী বাবু কোনও কথা না বলে কান
পেতে নিবিষ্টবনে শেয়াল দুটোর উচ্চারিত বিচ্ছিন্ন ধ্বনিগুলো শুনেন। একটু
পরেই গভীর রাতের নিসিম স্তব্ধতাকে দুমড়েমুচরে শিয়াল দুটো ছুটে চলে যায়।
শিয়াল দুটো ছুটতে ছুটতে ঠিক কতদূর চলে যায় কামিনী বাবু কান পেতে তা বোঝার
চেষ্টা করেন। ছুটন্ত শিয়াল দুটোর পায়ের ধারালো নখের সাথে বাগানের বুকে
কার্পেটের মতো বিছানো নধর ঘাস কিংবা গুল্মলতার সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট খসখসে
শব্দ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন। আগে যে কোনও শব্দ শুনেই কামিনী বাবু
শব্দের উৎসের ঘটে চলা ঘটনা হুবহু বুঝতে পারতেন। এখন বয়সের সাথে কিছুটা
ক্ষমতা কমেছে। খসখসে শব্দ শুনে কামিনী বাবু বুঝতে পারছেন শেয়াল দুটো কচি
কচি ডিগ মেলা ঘাসের বিছানা ছেড়ে এখন বাগানের উত্তর দিকের চন্দ্রমল্লিকার
ঝোপের উপর দিয়ে দৌঁড়াচ্ছে।
“বাবু কিছু বললেন না যে!” কদম আলীর কথায়
কামিনী বাবু নিজের মনোযোগ পলায়মান শিয়াল থেকে সরিয়ে আনলেন। “ও, আকাশ দেখতে
খারাপ লাগে না তো।” নিতান্ত অনিচ্ছায় কদম আলীর করা প্রশ্নের উত্তরে কামিনী
বাবু বললেন। “ তার মানে ভালো লাগে বুঝি?” কামীনি বাবুর দিকে তাকিয়ে কদম আলী
জানতে চায়। খালি পা দুটো আনমনে বাঁধানো ঘাটের পাথরে ঘষতে ঘষতে কামিনী বাবু
বললেন,“ হুঁ।” “কেমন ভালো লাগে? নেশা নেশা লাগে নাকি?” কদম আলি সাথে সাথে
জানতে চায়। কামিনী বাবু কিছুটা বিরক্ত হয়ে ভ্রু-জোড়া কুচকে বলেন, “হ্যাঁ,
নেশা লাগে। কিন্তু...” কামিনী বাবু নিজের কথা শেষ করতে পারলেন না। হঠাৎ করে
চার বছর পেরিয়ে পাঁচে পরা পুকুরের বিরাট বোয়াল মাছটি পুকুরের নিস্তরঙ্গ
জলরাশিতে ঘাই মেরে উঠে। কামিনী বাবু পানিতে ছড়িয়ে পরা শব্দ তরঙ্গ নিজের
শ্রবনেন্দ্রীয়ের সাহায্যে বিশ্লেষণ করা শুরু করে দেন। উনি নিজের মানসলোকে
দেখতে পান বোয়াল মাছটি বিশাল মুখের ভেতর অন্য একটি মাছ ঢুকিয়ে পুকুরের
প্রথম স্তর থেকে গভীরের দিকে এইমাত্র ডুব দিলো।
কদম আলী সাথে সাথে বসা
থেকে দাঁড়িয়ে গেলো। “দেখলেন বাবু, দানবটা কি করলো! পুরোটা জায়গা আঁশটে গন্ধ
ছড়িয়ে দিলো। আমার কি যে ঘেন্না করছে তা আপনাকে বলে বুঝাতে পারবো না। বলছি
কি এমন প্রয়োজন এতদিন ধরে বোয়ালটাকে পালার? ব্যাটা পুকুরের সব মাছ খেয়ে দিন
দিন বিশাল আকার ধারন করছে। কি বিচ্ছিরি গন্ধরে বাবা। অসহ্য।” এক নিঃশ্বাসে
কথা গুলো বলার সাথে সাথে কদম আলী লাফিয়ে লাফিয়ে হাত, পা ও শরীর ঝাড়তে
লাগলো। যেন সে ঝেড়ে ঝেড়ে মাছের গন্ধ নিজের গাঁ থেকে সরিয়ে ফেলবে। কদম আলীর
এমন কান্ডে কামিনী বাবুর হাসি চলে আসলো। কামিনী বাবু মুচকি হেসে বললেন,
“চলো কদম আলী, একটু হাঁটি। রাত তো প্রায় শেষ হতে চললো। নিজেদের ঘরে ফিরতে
হবে।” কদম আলীও লাফাতে লাফাতে বললো, “চলেন বাবু একটুকু হাঁটি। দানবটার গন্ধ
থেকেতো তাহলে রেহাই পাবো।”
কামিনী বাবু ও কদম আলী হাঁটছেন। পাশাপাশি
নয়, আগে পিছে। কামিনী বাবু আগে এবং কদম আলী পিছনে। বিশাল বাগানের মাঝে
লম্বা ঘাসের ফাঁক দিয়ে এক চিলতে হাঁটা রাস্তা উঁকি দিচ্ছে। রাস্তার পাশে
সারি বেঁধে আম কাঁঠল গাছ দাঁড়িয়ে আছে। ফলের ভারে গাছগুলো কিছুটা নুইয়ে আছে।
মনকারা পাকা ফলের মোহনীয় গন্ধে চারপাশ সয়লাব হয়ে আছে। বাদুরেরা দলে দলে
ডানা ঝাপটে পাঁকা ফলের উপরে ঝাপিয়ে পড়ছে। বাগানে স্থায়ীভাবে বাস করা পেঁচা
দুটো ডানা ঝাপটে ছুচোর পিছনে ছুটছে। দুদিন আগে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানি
এখানে ওখানে কিছুটা জমাট বেঁধে আছে। দুটো ব্যাঙ ছপছপ করে পানির উপর দিয়ে
হেঁটে গেলো। একটা নিশাচর পাখি উড়তে উড়তে কর্কশ শব্দে ক্যা করে চিৎকার দিলো।
ঝিঁ ঝিঁ পোকাগুলো এক সুরে ঝিঁ ঝিঁ করে ডেকে যাচ্ছে। হঠাৎ সরসর করে চাবুকের
মতো ছুটতে ছুটতে মদ্দা কাল কেউটেটা এগিয়ে আসলো। কামিনী বাবু স্থির হয়ে
গেলেন। উনার সারা গাঁয়ের পশম দাঁড়িয়ে গেলো। কেউটেটা ওদের পাশ কাটিয়ে চলে
গেলো। কামিনী বাবু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
কামিনী বাবু ও কদম আলী
হাঁটতে হাঁটতে মাথায় ঝুঁটি বাঁধা পুরান তাল গাছটার কাছে চলে আসলেন।
তালগাছের গোড়ার নিচে মাদি জল ঢোড়াটা কতগুলো বাচ্চা ফুটিয়েছে। এদিকে আসলেই
বাচ্চাগুলোর কিলবিল করে পানিতে ডুবোডুবি দেখা যায়। মদ্দা মোটা ঢোড়াটা
সারাদিন ঘাসের উপরে চিৎ হয়ে পড়ে রোদ পোহায়। কামিনী বাবু আরও একটু এগিয়ে
গেলেন। নতুন তালগাছের উপরে কতগুলো বাবুই পাখি বসত গেড়েছে। কামিনী বাবু
গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে খুব ক্ষীণ শব্দের পাখিদের কিচকিচ শুনলেন। উনি মনে মনে
দেখতে পাচ্ছেন, ঠেঁটের কারুকাজে বোনা প্রতিটা পাখির বাসায় মা পাখিদের ডানার
নিচে বসে বাচ্চা পাখিরা গোল গোল বিস্মিত চোখ মেলে রূপকথার গল্প শুনছে।
কদম
আলী কামিনী বাবুর পাশে এসে চিন্তিত কন্ঠে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো, “বাবু, আপনি
কিছু জানেন নাকি?” কামিনী বাবু আনমনে বললেন, “কোন ব্যাপারে?” কদম আলী বললো,
“এই বাগানের ব্যাপারে। এই বাগান নিয়ে কেইস চলছে।” কামিনী বাবু বললেন, “তা
তো জানি। অনেক দিন ধরেই চলছে।” কদম আলী বললো, “হ্যাঁ, এখন সরকার এই বাগান
দখল করে নিবে। যারা আসল মালিক তারা অন্য দেশে চলে গেছে। সরকার এখানে
ইন্ডাস্ট্রি বানাবে।” চিন্তার ঝড় কদম আলীর গলা থেকে কামিনী বাবুর
ভ্রুঁ-জুগলে এসে লাগে। কামিনী বাবু ভ্রুঁ কুচকে ফেলেন। তিনি জানতে চান,
“ইন্ডাস্ট্রি বানালে কি বাগান কেটে ফেলবে?” মুখ কালো করে কদম আলী বলে,
“হ্যাঁ কেটে সাফ করে ফেলবে। বাগান কেটে ফেললে আমাদের কি হবে বাবু?” কদম
আলীর শেষ প্রশ্নটা কামিনী বাবুর ভিতরে বারবার প্রতিধ্বনিত হয়। উনার কানে
কদম আলীর শেষ কথাগুলো হাঁহাকারের মতো শোনায়। কামিনী বাবুর নিজের অজান্তেই
একটা দীর্ঘশ্বাস ফুসফুসের গভীর থেকে বেরিয়ে আসে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি
বলেন, “আর কি হবে! অন্যদের যা হবে আমাদেরও তা হবে।”
রাত তার মায়াবী
রহস্যের চাদরে সব কিছু ঢেকে রেখেছে। এই রাতের আলো আঁধারের মাঝেই কত প্রাণ
তিল তিল করে বাড়ছে। কত কত নবীন প্রাণের সৃষ্টি হচ্ছে। কত পুরাতন প্রাণ ঝড়ে
পড়ছে। একটা অদৃশ্য ছন্দের সুঁতোয় বেঁধে আছে সব কিছু। এই জগৎ, এই চরাচর, এই
অন্তরীক্ষ। রাতের এই ছন্দময় জগৎ দেখতে কামিনী বাবুর খুব ভালো লাগে। মায়াভরা
এই জগৎটা তাকে খুব কাছে টানে। অদৃশ্য বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরে আপন করে নেয়।
যেন কত যুগ যুগান্তরের সম্পর্ক নিশুতি রাতের সাথে। আর কি জীবনে দেখতে পাবে
এমন জোছনাময়ী রাত? আর কি পারবে নিজের চেতনা কোনও গভীর রাতে এভাবে ছড়িয়ে
দিতে? কাল কি হবে, তা কে বলতে পারে? হয়তো আজই জীবনের শেষ রাত। এক মনে এসব
ভাবতে ভাবতে কামিনী বাবু সিমেন্টের বাঁধাই করা উঁচু জায়গাটির দিকে এগিয়ে
আসে। পিছনে পিছনে কদম আলীও এগিয়ে আসে। নিজের জায়গাটিতে উঠার আগে কদম আলী
কামিনী বাবুর দিকে তাকিয় একটি হাসি দেয়। কামিনী বাবু অবাক হয়ে দেখেন কদম
আলীর হাসিতে কোনও উচ্ছ্বাস নেই। আছে অনিশ্চয়তা। আছে বিচ্ছেদের সুর। পূর্ব
দিকে ততক্ষণে গুটি গুটি পায়ে সূর্যের লোহিত কিরন উঁকি দিচ্ছে।
একটু পরেই
দিনের প্রথম আনকোড়া আলোতে চারপাশ আলোকিত হয়ে যায়। দারোয়ান করিম মিয়া একটি
নিম গাছের ডাল দিয়ে দাতন করতে করতে বাগানের খুপরি ঘরটি থেকে বের হয়। সে
বাঁধাই করা কামিনী এবং কদম গাছটির নিচে এসে দাঁড়ায়। সকালের বিশুদ্ধ কোমল
বাতাসের সাথে উত্তাল করা কামিনী এবং কদম ফুলের মাতাল গন্ধ সে নাক মুখ দিয়ে
টেনে নেয়। করিম মিয়ার ভিতরটা সঞ্জিবনী শক্তিতে ভরপুর হয়ে যায়। সে চোখ মেলে
গাছ দুটো দেখে। ফুলে ফুলে ছেয়ে থেকে গাছ দুটো যেন হেসে কুটিকুটি হচ্ছে।
কিন্তু, কদম গাছটির দিকে করিম মিয়া কেমন সন্দেহের চোখে তাকায়। আজকেও কদম
গাছটা যেন গতকালকের চেয়ে দক্ষিণ দিকে একটুখানি বেঁকে গেছে। কিছুক্ষণ পর
চোখের ভুল মনে করে করিম মিয়া তার কাজে চলে যায়।