
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
পর্ব-০৬
আমার শহর ‘কুমিল্লা’র রাস্তাঘাটের কথা একটু বলা দরকার। প্রধান প্রধান রাস্তাগুলো হলো-শাসনগাছা থেকে পূর্বদিকে এগিয়ে বাদশা মিঞা বাজারের দক্ষিণে একটি রাস্তা চলে গেছে ধর্মপুর মোড়ে। এ রাস্তাটি পূর্বদিকে অশোকতলা দিয়ে রানীরবাজার হয়ে কান্দিরপাড়ে পূবালী চত্বরে গিয়ে মিলেছে।
অপর রাস্তাটি বাদশা মিঞার বাজার থেকে সোজা পূর্বদিকে এগিয়ে পুলিশ লাইন মোড়ে এসে একটি রাস্তা দক্ষিণদিক ঘেঁষে ঝাউতলা-বাদুরতলা হয়ে কান্দিরপাড় পূবালী চত্বরে গিয়ে মিলেছে। অন্যদিকে পুলিশ লাইনের মোড় থেকে একটু উত্তরদিক ঘেঁষে রাস্তাটি পূর্বমুখি হয়ে সিটি কর্পোরেশন- জেলা পরিষদ- কেন্দ্রিয় কারাগারের মাঝামাঝি হয়ে জেলা প্রশাসনের কার্যালয় ও রেজিস্টার ও সাবরেজিস্টার অফিসের মাঝামাঝি দিয়ে পূর্বদিক অগ্রসর হয়ে দক্ষিণ দিক ঘেঁষে গির্জার ও পিডাবলিউ ভবনের মাঝ দিয়ে সামান্য অগ্রসর হয়ে ঈদগাহের কোণা ছোঁয়ে পূর্বমুখি হয়ে একপাশে শিল্পকলা একাডেমি ও প্রধান ডাকঘর, অপর পাশে সার্কিট হাউজ অতিক্রম করে কুমিল্লা হাই স্কুলের সামনে দিয়ে একটু দক্ষিণমুখি হয়ে রাজগঞ্জ বাজার ঘেঁষে অপর পাশে দোকানপাট অতিক্রম করে চৌমোহনীর পূর্বদিকে ছাতিপট্টি-কাপাড়িয়াপট্টি অতিক্রম করে চকবাজার দিয়ে পূর্বদিকে এগিয়ে একটু দক্ষিণমুখি হয়ে বাখরাবাদ গ্যাস অফিসের সামনের দিক দিয়ে চৌয়ারা পার হয়েছে বিশ্বরোডে গিয়ে মিলেছে। এদিকে পূর্বালী চত্বর থেকে পূর্বমুখি রাস্তাটি মনোহরপুর-রাজগঞ্জ অতিক্রম করে রাজগঞ্জ চৌমোহানায় বড় রাস্তার সাথে মিলেছে। অপরদিকে পূবালী চত্বর থেকে দক্ষিণ দিকের রাস্তাটিকে বলা হয় লাকসাম রোড, এটি ঈশ্বর পাঠশালা- শিক্ষাবোর্ড অফিস অতিক্রম করে টমসমব্রীজ দিয়ে দক্ষিণ দিকে পদুয়ার বাজারে গিয়ে বিশ্বরোডে মিলেছে। টমসমব্রীজ থেকে পূর্বমুখি রাস্তাটি উপজেলা, কেটিসিসি, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ঘেঁষে বাখরাবাদ গ্যাস অফিসের উত্তর পাশ দিয়ে পূর্ব দিকের বড় রাস্তায় গিয়ে মিলেছে। অপর দিকে টমসমব্রীজ থেকে পশ্চিমের রাস্তাটি কোটবাড়ী দিকে চলে গেছে। মাঝে বিশ্বরোড অতিক্রম করতে হয়। এদিক দিয়ে অথবা পদুয়াবাজার দিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া যায়। মোটামুটি এগুলোই শহর কুমিল্লার প্রধান রাস্তা। এ রাস্তাগুলোর দু’পাশ দিয়ে নানা দিকে সরু রাস্তা দিয়ে মূল রাস্তার সাথে সংযুক্ত হয়েছে। একটি সিটি কর্পোরেশনের অভ্যন্তরে রাস্তা যতটুকু প্রশস্ত থাকা দরকার, শহর কুমিল্লায় তা নেই। এছাড়া রাস্তার দু’পাশে উঁচু ড্রেইন পাকা করায় রাস্তা আরো সংকুচিত হয়ে গেছে। দিন দিন লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পুরো শহরটি বাজারের মতো ভীড় লেগে থাকে সকাল ১০টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। তার মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত বেটারিচালিত অটো ও রিক্সা, তাদের যেমন নিবন্ধন নেই, তাদের জন্য কোনো আইনও নেই। তারা এতটা স্বাধীন, পথচারীদেরকে কোনো তোয়াক্কা করে না, দুর্ব্যবহারও করে। অটোগুলো চলে কান্দিরপাড় থেকে ধর্মপুর-শাসনগাছা, পূবালী চত্বর থেকে পুলিশ লাইন হয়ে শাসনগাছা, চকবাজার থেকে রাজগঞ্জ হয়ে কান্দিরপাড়, পূবালীচত্বর থেকে লাকসাম রোড দিয়ে পদুয়ার বাজার। অর্থাৎ সর্বত্র তাদের দাপট। অথচ সরকারিভাবে তারা নিষিদ্ধ। তাদের নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করার জন্য যাদের উপর দায়িত্ব বর্তায়, তারা ব্যক্তিস্বার্থের সুবিধার জন্য আন্তরিক নয়। একসময় কুমিল্লা ছিল রিক্সার শহর, এত সস্তা ভাড়ায় রিক্সা দিয়ে যাতায়াত কোনো শহরে ছিল না। তা এখন স্বপ্নবিলাস। আর এখন রিক্সাওয়ালা বলতে উত্তরবঙ্গের জনগোষ্ঠি।
বড় রাস্তার দু’পাশে গড়ে উঠেছে বিশাল বিশাল শপিংমল। এই শপিংমলের সামনে পর্যাপ্ত কোনো ফাঁকা জায়গা রাখা হয়নি। ফলে সবসময় শপিংমলের সামনে যানজট বা ভীড় লেগে থাকে, মজার ব্যাপার হলো একজন দারোয়ান মেকি পোশাক পড়ে কৃত্রিম পুলিশি মেজাজে লাঠি দিয়ে রিক্সা বা অন্যান্য যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করে।
এ ব্যাপারে পুলিশের দায়িত্ব কি, সিটি কর্পোরেশনের নাগরিক সেবার জন্য করণীয় কি- তা বুঝা যায় না। যারা মনে করে কতগুলো দালান বা অট্টালিকা নির্মাণই উন্নয়নের চাবিকাঠি, তাদের বক্তব্যের অন্তরালে লুকিয়ে আছে নিবিড় স্বার্থ। অথচ শহরবাসী হয়েও কেউ তাদেরকে উপেক্ষা করতে পারে না। জবাবদিহিতার জন্য স্বচ্ছতার প্রয়োজন, পেশি শক্তি যদি প্রবল হয়ে উঠে, গণতন্ত্র ভূলুষ্ঠিত হয়, তাহলে দায়বদ্ধতার বিষয়টি অনুপস্থিত হয়ে যায়। আমার শহর ‘কুমিল্লা’ এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। প্রতিটি বড় বড় বা পুরানো শহরের জন্য থাকে মেগা পরিকল্পনা। কুমিল্লা শহরের লোকদের আবাসনের জন্য নতুন হাউজিং এলাকা চিহ্নিত করার ভাবনা নেই, পর্যটনের জন্য পুরানো গোমতীকে নান্দনিক করার উদ্যোগ নেই, কেবল মাঝে মাঝে মিথ্যা আশ্বাস, রাস্তাঘাট প্রশস্ত করার বিকল্প ব্যবস্থা নেই। যেমন শাসনগাছায় উড়াল সেতু করা হয়েছে, তা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। তা যদি পুলিশ লাইন থেকে শুরু হয়ে আলেখারচর পর্যন্ত বর্ধিত করা যেত, তাহলে যানজট ও দ্বিগুন মানুষ সুবিধা পেত। অন্যদিকে জাঙ্গালিয়া থেকে দক্ষিণমুখী পদুয়ার বাজারের উপর একটি উড়াল সেতু প্রায় বিজয়পুর পর্যন্ত নেয়া গেলে রাস্তাটির সুবিধা পাওয়া যেত। এমনভাবে চকবাজারের কথাও ভাবা যায়। শহরের মধ্যে বাসষ্ট্রা- রাখার যৌক্তিকতা নেই। এখন করোনা মহামারির জন্য বন্ধ, অন্যসময় দেখা গেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্পাহানী স্কুল-কলেজ, সেনাসদরের বিশ্ববিদ্যালয়ের ও অন্যান্য আরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাসগুলো শহরের অতীব ব্যস্ত এলাকায় কান্দিরপাড়ে এসে ঘুরে যেত। কী যে দুর্বিষহ অবস্থা সৃষ্টি হতো, তা অবর্ণনীয়।
যে রাস্তাগুলো এখন আছে, তা কতটুকু ব্যবহারযোগ্য তাও প্রশ্নবিদ্ধ।
অন্যান্য শহরে রাস্তাগুলোর নামকরণ যেমন আছে, নামকরণের ফলকও স্থাপন করা আছে। শহর কুমিল্লায় কিছু কিছু রাস্তার নামকরণ থাকলেও তার কোনো ফলক নেই। যেমন নজরুল এভিনিউ, এ,কে ফজলুল হক রোড, লাকসামরোড হয়ত বা নামকরণই হয়নি। অতীন রায়-ধীরেন্দ্রনাথ সড়ক চিহ্নিত থাকলেও মাঝে মাঝে দুর্বৃত্তের আঁচড়ে উৎপাটিত হয়ে যায়। উল্লেখ্য রানীরবাজার থেকে দক্ষিণমুখি রাস্তাটি রামমালা পর্যন্ত গিয়েছে, এ রাস্তাটির নাম ‘রামমালা রোড।’ দানবীর মহেশচন্দ্র ভট্টচার্য এ রাস্তাটির জমি কিনে নিজের মার নামে উৎসর্গ করে গেছেন। আর রামমালা বলতে এখন পশুপ্রজননকেন্দ্র, সার্ভে ইন্সটিটিউট, আনসার ক্যাম্প ও দপ্তর ইত্যাদি একুশ একর জমির উপর দাঁড়িয়ে আছে। অথচ এটি মহেশবাবুর নিজস্ব জায়গা। একসময় রামমালা ছাত্রাবাস, রামমালা লাইব্রেরি, কৃষি খামার ছিল।
প্রতিটি শহরে নানাধরনের চত্বর থাকে। যেমন ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় ধীরেন্দ্রনাথ চত্বর, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান মিউজিয়াম, চাঁদপুরেও আছে। অথচ আমার শহর ‘কুমিল্লা’য় কোনো মুক্তিযুদ্ধের স্মারক নেই, বঙ্গবন্ধুর নামে কোনো চত্বর নেই, স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারক সমৃদ্ধ মিউজিয়াম নেই। কেবলমাত্র কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ও কতগুলো ছবি সংযোজন করে মুক্তিযুদ্ধের মিউজিয়াম করা হয়েছে। সর্বসাধারণের জন্য এরূপ ব্যবস্থা নেই। পুলিশ লাইনে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, শহিদ পুলিশ সুপারের নামে নান্দনিক তোরণ এবং পুলিশ সুপারের বাসভবনের সামনের রাস্তাটি ‘শহিদ মুন্সি কবির উদ্দিন রোড, চিহ্নিত আছে। এ ব্যবস্থাপনা জেলা পুলিশই উদ্যোগ নিয়ে করেছেন। এই তুলনায় শহিদ জেলাপ্রশাসক শামসুল হক খানকে তেমনভাবে দৃশ্যমান করে তোলা হয়নি। এমন কি সত্তর দশকে জেলা প্রশাসক জনাব আশিকুর রহমান যে কুমিল্লা ফাউন্ডেশন গঠন করে গেছেন যে উদ্দেশ্যে তার কোনো দৃশ্যত কর্মকা- আছে বলে জানা যায় না। এমন কি শুনতে পাই- শহিদ জেলা প্রশাসকের নামেও একটি ফাউন্ডেশন গঠিত হয়েছে। তার কর্মকা-ও দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে সারা শহর ব্যাপী বর্তমান মেয়র তাঁর ছবি ও নামের প্লেইট লাগিয়ে ভিন্নধরনের বার্তা প্রচার করে চলেছেন। এমনটি প্রত্যাশিত নয়। অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে, স্বাস্থ্যসেবার জন্য কিনিক আছে, বিনোদনের জন্য নানা আয়োজন আছে- কুমিল্লায় তা এখনও গড়ে উঠেনি। এমন কি জেলাপরিষদের তত্ত্বাবধানে যে চিড়িয়াখানাটি রয়েছে, তা অনেকটাই প্রহসনখানায় পরিণত হয়েছে। এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। এককালের জেলা প্রশাসক জনাব আবদুস সালাম উদ্যোগ নিয়ে চিড়িয়াখানাটি স্থাপন করে কুমিল্লাবাসীর আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
লক্ষ্য করা গেছে নগরের সকল পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা টাকা খরচে যতটা আন্তরিক, কিন্তু অভিজ্ঞ পরিকল্পনা ও যথাযথ বিধিবদ্ধ নান্দনিকতায় উদাসীন। কুমিল্লার অর্জন ও ঐতিহ্য একসময় আকাশচুম্বী ছিল, তা অবশ্যই ফুরিয়ে যায়নি, অর্জনকে যদি ধরে না রাখা যায়, তাহলে ধারাবাহিকতায় ঘাটতি পড়ে, আর ঐতিহ্যকে যদি মুছে ফেলা হয়, তবে অস্তিত্বে আঘাত লাগে। এজন্যই চাই প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা। সন্তান যেমন পিতাকে অস্বীকার করতে পারে না, তেমনি ঐতিহ্যকেও অস্বীকার করা যায় না। তা কালের ইতিহাস, তা কালের সাক্ষী। মানুষ পূর্বপুরুষের পরিচয়ে এতটাই সমৃদ্ধ, এখানে বাইরের কেউ এসে সে গৌরবকে কুর্ণিশ করে। এটা আমাদের অর্জন, পূর্বপুরুষের প্রতি স্বীকৃতি ও শ্রদ্ধা। কথাটি অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলছি। আমার বাবা শিক্ষক, আমিও শিক্ষক। আমার নিকট প্রতিবেশী সহপাঠী মজিবুর রহমান কৃষকের ছেলে, সে বি,কম পাশ করে সাবরেস্ট্রিার। এজন্য অর্থবিত্তে আমার চেয়ে অনেক ধনী। কিন্তু তার মুখের কথা- বলেছে-‘ভাই, তোমাকে দেখলে মানুষ সালাম দেয়, আমাকে চোর বলে, ঘুষখোর বলে।’ মোট কথা ইতিহাস অস্বীকার করা যায় না, ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করা যায় না এবং অর্জনকে মুছে ফেলা যায় না।
পুরাতনকে ভেঙে নতুন কিছু করার মধ্যে গৌরব নেই। বরং পুরাতনের পাশে নতুনসৃষ্টি অবশ্যই কালের চিন্তা-চেতনা ও শৈলীর ধারাবাহিকতা হিসেবে উজ্জ্বলতা লাভে সমৃদ্ধি অর্জন করে।
আমার শহর ‘কুমিল্লা’ কিন্তু অনৈতিক কর্মকা-ে বিতর্কিত নয়, অর্জনের আভিজাত্যে সমৃদ্ধ, ঐতিহ্য নির্মাণে দক্ষ কারিগর। শহর কুমিল্লার প্রতিটি নাগরিক হলো এ ধারার উত্তর-প্রজন্ম। সুতরাং বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমি কীরকম শহর ‘কুমিল্লা’ চাই, এ নিয়ে কিছু কথা।
ক্রমশ
লেখক: সাহিত্যিক, গবেষক ও সাবেক অধ্যাপক
মোবাইল:০১৭১১-৩৪১৭৩৫