
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলিজনিত জটিলতায় স্থানীয় ও বহিরাগত নামে নতুন করে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা অনাকাঙ্তি। আমরা জানি, সরকারি চাকরি সাধারণত বদলিনির্ভর। উপজেলাভিত্তিক নিয়োগ হওয়ায় সেদিক থেকে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যতিক্রম। তবে অবস্থার আলোকে বদলির সুযোগ থাকলেও শিক্ষকরা এক ধরনের বৈষম্যের শিক্ষকার। রোববার সমকালে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়েছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক এক যুগ একটি উপজেলায় চাকরি করার পর স্বামীর কর্মস্থলে বদলি হওয়ায় প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু হলে তিনি জানতে পারেন, জ্যেষ্ঠতা নিরূপণে তার বদলির আগের কর্মকাল ধরা হবে না। কোন যুক্তিতে তার পেশাগত জীবনের এতগুলো বছর শূন্য হয়ে যাবে? এ নিয়ে প্রাথমিকের শিক্ষকদের মধ্যেই যে বিভেদ দেখা যাচ্ছে, তাও অপ্রত্যাশিত। কার্যত এ বিভাজন খোদ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরই তৈরি করেছে। সমকালের সংশ্নিষ্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্র্রতি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য জ্যেষ্ঠতার তালিকা করতে শিক্ষকদের অনলাইন ফরমে প্রশ্ন রয়েছে- আপনি বহিরাগত শিক্ষক কিনা? কবে এ উপজেলা বা থানায় যোগ দিয়েছেন? বলাবাহুল্য, এমন প্রশ্নের কোনো ভিত্তিই নেই।
সর্বশেষ ২০১৯ সালের নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন নীতিমালায় কোথাও বলা নেই যে, বদলি হলে আগের অভিজ্ঞতা গণনা করা হবে না। তাহলে কোন যুক্তিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তৈরি করা গ্রেডেশন সফটওয়্যারে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে বর্তমান উপজেলায় যোগদানের তারিখ থেকে হিসাব করা হচ্ছে? এটা কোনোভাবেই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। তাছাড়া একই চাকরির মধ্যে 'বহিরাগত' কিংবা 'স্থানীয়' শব্দ ব্যবহার করে শিক্ষকদের আলাদা করা যেমন উচিত নয়, তেমনি কোনো শিক্ষকের নামের আগে বহিরাগত থাকাও শোভন নয়। তার ওপর শিক্ষকরা যে নিয়োগবিধি অনুযায়ী কর্মে যোগদান করেছেন, সেখানে এ ধরনের বিষয় না থাকায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর তা নতুন করে যোগ করতে পারে না। আমরা জানি, কোনো উপজেলায় সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ শিক্ষক অন্যত্র থেকে বদলি হয়ে আসতে পারবেন বলে সরকার ইতোপূর্বে সার্কুলার জারি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই হার কোথাও কোথাও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশও ছাড়িয়ে গেছে। আমরা মনে করি, বদলির হার বেশি হওয়া নিয়ে কথা হতে পারে। কিংবা যেখানে বদলি বেশি হয়ে গেছে, সেখানে তা কমানোর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর অন্য কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে। তাই বলে আগে যে বদলি সম্পন্ন হয়েছে, তাদের বদলির আগের চাকরিকাল না ধরার 'শাস্তি' দেওয়া হচ্ছে কেন?
তাছাড়া, বদলিকৃত শিক্ষকও নিশ্চয়ই অধিদপ্তরের অনুমতিক্রমেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। তাহলা অনুমোদিত বিষয় নিয়ে কেন জ্যেষ্ঠতার এই অদ্ভুত নিয়ম করা হচ্ছে? এটা সত্য, সুযোগ-সুবিধার জন্য সদর উপজেলা, সিটি করপোরেশন প্রভৃতি শহরাঞ্চলে বদলি হয়ে আসার প্রবণতা বেশি। তবে স্বামী-স্ত্রীর কর্মস্থল আলাদা হলে পারিবারিক প্রয়োজনে বদলির বিষয়টি অস্বীকার করা যাবে না। তাই আমরা মনে করি, জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে বদলিপূর্ব কাল বাদ দেওয়া সমীচীন হবে না। এমনিতেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নানাভাবে বঞ্চিত। তাদের প্রাপ্ত গ্রেডও সে অর্থে সন্তোষজরক নয়। তার চেয়ে বড় বিষয়, এখানে পদোন্নতির সুযোগ সংকীর্ণ ও সীমিত।
এ অবস্থায় নতুন করে বদলির বিষয়টি অযাচিতভাবে সামনে এনে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কিছু শিক্ষককে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে, যা মেনে নেওয়ার মতো নয়। স্বস্তির বিষয় হলো, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সমকালকে নিশ্চিত করেছেন, সফটওয়্যার থেকে এরই মধ্যে বহিরাগত শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। তবে তার মতে, বিষয়টিতে যথেষ্ট ঝামেলা আছে, যা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনা নিয়ে সুরাহা করতে হবে। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর মন্ত্রণালয়কে সেভাবে পরামর্শ দেবে। সব চাকরিতেই যেখানে ব্যক্তির কর্মে নিযুক্তির দিন থেকেই জ্যেষ্ঠতা নির্ধারিত হয়, সেখানে প্রাথমিক শিক্ষকরা বদলিজনিত কারণে বৈষম্যের শিক্ষকার হবেন কেন?