ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
বঙ্গবন্ধুর শিক্ষকপ্রীতি ও কিছু কথা
Published : Tuesday, 2 November, 2021 at 12:00 AM
বঙ্গবন্ধুর শিক্ষকপ্রীতি ও কিছু কথাশাহজাহান আলম সাজু ||
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। একটি জাতির উন্নয়ন-অগ্রগতি সে দেশের টেকসই শিক্ষার ওপর নির্ভর করে। টানা ২০০ বছর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও ২৩ বছর পাকিস্তানি শোষণ-নিপীড়ন, নির্যাতন, বঞ্চনা ও শিক্ষা সংকোচন নীতির ফলে এ দেশের শিক্ষা অনেক পিছিয়ে ছিল। ফলে শিক্ষা ও শিক্ষকদের মর্যাদার ক্ষেত্রে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। একাত্তরে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বীর বাঙালি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাংলাদেশ স্বাধীন করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার অগ্রগতি ছাড়া পিছিয়ে পড়া বাঙালি জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। সে লক্ষ্যে তিনি একসঙ্গে ৩৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং এক লাখ ৬২ হাজার শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ করেছিলেন।
ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৪৪ সালে শিক্ষকদের জন্য মাসিক পাঁচ টাকা ভাতা চালু হয়। কালের বিবর্তনে আমাদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধাও বেড়েছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের গত ১২ বছরে শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষকদের মর্যাদার ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তবে এখনও শিক্ষা খাতে নানাবিধ সমস্যা এবং শিক্ষকদের মর্যাদার ক্ষেত্রেও অনেক ঘাটতি রয়েছে। মর্যাদার সঙ্গে শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধার বিষয়টিও জড়িত। একজন শিক্ষক যদি জীবিকা নির্বাহে প্রয়োজনীয় আর্থিক সুবিধা না পান, তাহলে তাকে বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় যুক্ত থাকতে হয়।
আবার শুধু আর্থিক সচ্ছলতার ওপরেই একজন শিক্ষকের মর্যাদা নির্ভর করে না। শিক্ষকতা পেশা যেহেতু জ্ঞানচর্চা বা জ্ঞান বিতরণের, তাই তাদের রাষ্ট্র বিনির্মাণ কিংবা পরিচালনার ক্ষেত্রে কতটুকু ভূমিকা রাখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, সেটাও বিবেচ্য। এক সময় বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। স্বাধীনতাউত্তর শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান, অধ্যক্ষ হুমায়ুন খালিদ, সামসুল হকসহ অনেকেই জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বর্তমানে জাতীয় সংসদে শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব একেবারেই নগণ্য।
জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ঘোষিত জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৮ শতাংশ এবং সর্বশেষ ডাকারে অনুষ্ঠিত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষামন্ত্রীদের সভায় আপাতত জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশ সরকারও এ সিদ্ধান্তে স্বাক্ষরকারী দেশ। কিন্তু আমাদের সরকার শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশের বেশি বরাদ্দ এখনও দিতে পারেনি। অথচ ১৯৭০-এর নির্বাচনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু 'সুষ্ঠু সমাজ গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চাইতে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর হইতে পারে না। জাতীয় উৎপাদনের শতকরা কমপক্ষে ৪ ভাগ সম্পদ শিক্ষা খাতে ব্যয় হওয়া প্রয়োজন' বলে উল্লেখ করেন।
সম্প্রতি শিক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে সরকার। দেশের সর্বস্তরের মানুষ শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। এতে শিক্ষাক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটবে বলে সবাই আশা প্রকাশ করছে। তবে শিক্ষার নতুন ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নে অনেক চ্যালেঞ্জও সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে এখন থেকেই সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষকদের ব্যাপকভাবে ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষকদের আর্থিক দিকটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
শিক্ষার অধিকতর মান উন্নয়ন এবং তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কিছু সুপারিশ করা হলো- এক. শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান সরকারি-বেসরকারি, এমপিও-নন-এমপিও বৈষম্য দ্রুততার সঙ্গে নিরসন করে অভিন্ন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা। দুই. বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য সরকারি শিক্ষকদের অনুরূপ বাড়ি ভাড়া ও উৎসব ভাতা নিশ্চিত করা। তিন. শ্রেণিকক্ষকে আরও আকর্ষণীয়, মনোগ্রাহী করার জন্য শিক্ষকদের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা। চার. শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল নির্ধারণ করা। পাঁচ. বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিতে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, শিক্ষানুরাগী ও স্বচ্ছ মনের ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তকরণ। ছয়. শিক্ষার যাবতীয় নীতিনির্ধারণের সর্বস্তরে শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। সাত. চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বৈশ্বিক দক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদ তৈরি করা। আট. শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা।
শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, শিক্ষা ও শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয়টি সরকারের একার কাজ নয়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এক. শিক্ষকদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষকতা অন্য আর দশটি পেশার মতো শুধু চাকরি নয়। শিক্ষকতা একটি মহান ব্রত। অন্যান্য পেশায় চাকরিজীবন শেষ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পেশার সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু একজন শিক্ষক গ্রহণযোগ্য, অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি জ্ঞান বিতরণ করে থাকেন। দুই. একজন শিক্ষক শুধু শিক্ষার্থীদের কাছে অনুকরণীয় নন, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকসহ সমাজের সবার কাছে অনুকরণীয়। সুতরাং তাদের চাল-চলন, আচার-আচরণ, পোশাক-আশাক সবকিছুতেই সতর্ক, গ্রহণযোগ্য ও সাবধানী হতে হবে। তিন. শিক্ষকরা সমাজ বিনির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। রাষ্ট্রীয়, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এমন কোনো ভূমিকা থাকা উচিত নয়, যা শিক্ষকতার মহান পেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ক্ষুণ্ণ করে। চার. জাতীয় যে কোনো দুর্যোগ, দুঃসময়ে শিক্ষকরা সবকিছুর ঊর্ধ্বে থেকে ত্যাগের মানসিকতা নিয়ে জাতির পাশে দাঁড়ান। ভবিষ্যতেও তা সমুন্নতকরণে অধিকতর মানসিকতার শক্তি অর্জন করতে হবে।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ, সেক্রেটারি, ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব টিচার্স ইউনিয়ন