ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
একটি ভ্রমণের সাতকাহন
Published : Tuesday, 2 November, 2021 at 12:00 AM
একটি ভ্রমণের সাতকাহনশান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||

পঞ্চম অধ্যায়
আধুনিক যুগের কথা
    শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব তখনও জন্মগ্রহণ করেননি। তাঁর পিতা শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় পিতৃপুরুষগণের পিণ্ডদানের জন্য গয়ায় গমন করেন। শুধু পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তিলাভের জন্য নয়, প্রেতরূপী অনাত্মীর এক অতৃপ্ত আত্মার পিণ্ডদানও তাঁর গয়ায় যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল।
    বাংলা ১২৪১ সন। ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের জীবনে এই সময় একটি বিশেষ ঘটনা ঘটল। তীর্থদর্শনে যাওয়ার জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। পিতৃপুরুষগণের উদ্ধারকল্পে গয়ায় যাবেন। ষাট বছর বয়স। এই বয়সেও পদব্রজে গয়াধামে যাওয়ার ব্যাপারে কোনওরকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই মনে। ক্ষুদিরাম গয়া যাওয়ার আরও একটি কারণ হলো-হঠাৎ একদিন মেয়ে কাত্যায়ণীর প্রচণ্ড অসুখের খবর পেয়ে আনুর গ্রামে শ্বশুর বাড়িতে তাঁকে দেখতে গেলেন। মেয়ের হাবভাব ও কথাবার্তা অস্বাভাবিক মনে হলো ক্ষুদিরামের। মনে হলো, ভূতাবেশ হয়েছে। তখন চিত্ত সমাহিত করে মঙ্গলময় ঈশ্বরকে স্মরণ করলেন ক্ষুদিরাম। কাত্যায়ণীর শরীরে প্রবিষ্ট প্রেতযোনিকে সম্বোধন করে বললেন, ‘কেন আমার মেয়েকে অকারণে কষ্ট দিচ্ছ? চলে যাও বলছি।’
    কাত্যায়ণীর জবানিতে সেই প্রেতাত্মা বলে ওঠে, ‘আমি তোমার মেয়ের দেহ ছেড়ে চলে যাব যদি তুমি আমার কথা রাখো।’
‘কী কথা।’
‘যদি গয়ায় গিয়ে আমার উদ্দেশে পিণ্ডদানে রাজি হও। আমি বড্ড কষ্ট পাচ্ছি। পিণ্ডদান করলে আমার কষ্ট দূর হবে। এই ব্যাপারে আমাকে তোমার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।’
ক্ষুদিরাম এই প্রেতরূপী অতৃপ্ত আত্মাকে কথা দিলেন যে, তিনি গয়ায় তার উদ্দেশে অবশ্যই পিণ্ডদান করবেন। বললেন,‘পিণ্ডদানের পর তুমি কি সত্যিই মুক্তি পাবে?’
‘পাব।’
‘যদি পাও তার প্রমাণ কী?’
‘তার প্রমাণ আমি এখনই দিয়ে যাচ্ছি। যাওয়ার সময় সামনের নিমগাছের ওই বড় ডালটা আমি ভেঙে দিব।’ এরপর সত্যিসত্যিই ডালটা ভেঙে পড়ল। প্রেতের কবল থেকে মুক্ত হলেন কাত্যায়ণী। তাঁর অসুখও সেরে গেল।
    ক্ষুদিরাম গয়া রওয়ানা হলেন। সেটা শীতকাল। বারাণসীতে কাশী বিশ্বনাথের দর্শন পূজনের পর চৈত্রের শুরুতে গয়ায় পৌঁছলেন। মধুমাসেই গয়ায় পিণ্ডদান প্রশস্ত। এই সময় পিণ্ডদানে পিতৃপুরুষ সকলের অক্ষয় পরিতৃপ্তি হয়। প্রায় একমাস গয়া থেকে ক্ষুদিরাম যথাবিহিত সমস্ত ক্ষেত্রকার্য সম্পন্ন করলেন। তারপর শ্রীবিষ্ণুপাদপদ্মে পিণ্ডদান করলেন। রাতে বিচিত্র স্বপ্ন দেখলেন। তিনি যেন শ্রীবিষ্ণুপাদপদ্মে পুনরায় পিতৃপুরুষগণের উদ্দেশে পিণ্ডদান করছেন এবং তাঁরা যেন দিব্য জ্যোতির্ময় শরীরে ওই পিণ্ডগুলো সানন্দে গ্রহণ করছেন। হঠাৎ লক্ষ করলেন দিব্য জ্যোতিতে মন্দির পরিপূর্ণ হয়েছে। তাঁর সামনে ‘নবদুর্বাদলশ্যাম জ্যোতির্মণ্ডিততনু এক দিব্য পুরুষ সিংহাসনে বসে আছেন।’ এই দিব্য পুরুষ স্বয়ং গদাধর। তিনি ক্ষুদিরামকে সুমধুর বচনে বলছেন, ‘তোমার পুত্র হয়ে তোমার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করব। সেবা নেব তোমার হাতে।’
    স্বামী সারদানন্দ ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলা প্রসঙ্গ’-এ লিখেছেন, ‘স্বপ্নেরও অতীত ওই কথা শুনিয়া তাঁহার যেন আনন্দের অবধি রহিল না, কিন্তু পরক্ষণেই তিনি তাঁহাকে কী খাইতে দিবেন, কোথায় রাখিবেন ইত্যাদি ভাবিয়া গভীর বিষাদে পূর্ণ হইয়া রোদন করিতে করিতে তাঁহাকে বলিলেন, “না না প্রভু, আমার এরূপ সৌভাগ্যের প্রয়োজন নাই। কৃপা করিয়া আপনি যে আমাকে দর্শনদানে কৃতার্থ করিলেন এবং ঐরূপ অভিপ্রায় প্রকাশ করিলেন, ইহাই আমার পক্ষে যথেষ্ট, সত্য সত্য পুত্র হইলে দরিদ্র আমি আপনার কি সেবা করিতে পারিব।” এই অমানব পুরুষ যেন তখন তাঁহার ঐরূপ করুণ বচন শুনিয়া অধিকতর প্রসন্ন হইলেন এবং বলিলেন, “ভয় নাই, ক্ষুদিরাম তুমি যাহা প্রদান করিবে তাহাই আমি তৃপ্তির সহিত গ্রহণ করিব; আমার অভিলাষ পূরণ করিতে আপত্তি করিও না।’ শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম এই কথা শুনিয়া যেন আর কিছুই বলিতে পারিলেন না, আনন্দ দু:খ প্রভৃতি পরস্পর বিপরীত ভাবসমূহ তাঁহার অন্তরে যুগপৎ প্রবাহিত হইয়া তাঁহাকে এককালে স্তম্ভিত ও জ্ঞানশূন্য করিল। এমন সময় তাঁহার নিদ্রাভঙ্গ হইল।’
    ১২৪২ সন, ১৭৫৭ শতাব্দের ৬ ফাল্গুন, ইংরেজি ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি। শুক্লপক্ষ, বুধবার। ব্রাহ্মমুহূর্ত। চন্দ্রমণিদেবী পুত্র সন্তান প্রসব করলেন। যেমনটি অনুমান করা গিয়েছিল। নরবেশে পরমপুরুষই তাপিত এই জগৎসংসারে পদার্পণ করলেন ভক্তি ও করুণার অমৃতধারা বর্ষণ করতে। শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরামের তপস্বী কুটির শঙ্খধ্বনিতে পূর্ণ হলো। মহাপুরুষের শুভাগমনবার্তায় পরিব্যাপ্ত হলো চতুর্দিক। গয়া-গদাধরের ইচ্ছায় পুত্র লাভ। তাই পুত্রের নাম রাখা হলো গদাধর।
    আমি ২০০৮ সালে অক্টোবর মাসের ২০ তারিখ পিতৃপুরুষগণের পিণ্ডদান করতে গয়া গিয়েছিলাম। প্রথম কাজ ছিল প্রয়াত বাবা-মার পিণ্ডদান করা। কিন্তু যিনি আমাকে পিণ্ডদানের জন্য যাজন-সহায়তা করছিলেন, তিনি জানালেন যে, ইচ্ছে করলে পিতৃকুল ও মাতৃকুলের আত্মার সদ্গতির জন্য পিণ্ডদান করা যায়। তিনি মন্ত্রোচ্চারণ করবেন, আমি তাঁর সঙ্গে মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে নামগুলো সংযোজন করে দিলেই চলবে। এই সুযোগটি আমি গ্রহণ করলাম এজন্য যে, আমার আত্মীয়দের মধ্যে কেউ আগে গয়ায় পিণ্ডদান করতে আসেননি। সেখানকার পাণ্ডাদের কাছে রক্ষিত খাতায় অতীতে যাঁরা পিণ্ডদান করতে গিয়েছেন, তাঁদের নাম-ঠিকানা লেখা রয়েছে। পাণ্ডাদের খাতায় তন্ন তন্ন করে খোঁজে পূর্বপুরুষ কারও নাম পাইনি। তাই নতুন করে আমার-নাম-ধাম ইত্যাদি একজন পাণ্ডা তাঁর খাতায় লিখে নেন এবং এজন্য দক্ষিণা দাবি করেন, যথারীতি তা পরিশোধ করেছি। অন্যদের সুবিধার জন্য বলছি, এক্ষেত্রে পাণ্ডারা অনেক টাকা দাবি করেন, শেষপর্যন্ত ২০/৩০/৫০টাকায় তা রফা হয়ে যায় এবং ভবিষ্যতে আমার কোনো আত্মীয় পিণ্ডদান করতে গেলে অবশ্যই এ পাণ্ডার সঙ্গে বোঝাপড়া করে অনুমতি নিয়ে পিণ্ডদানের কাজ শুরু করতে হবে। এ এক মহা দিগদারি বা ফ্যাসাদ। ফল্গুনদীর তীরে পিণ্ডদানের পর শ্রীবিষ্ণুপাদপদ্মে আবার পিণ্ডদান এবং প্রণামী এবং সর্বশেষে অক্ষয়বটের নীচে কাজ শেষ করে অর্থাৎ সেখানকার পাণ্ডাকে তুষ্ট করে তারপর নিস্তার। সর্বক্ষেত্রেই দাবির পরিমাণ অস্বাভাবিক। কিন্তু জানা থাকলে বিনীতভাবে অনুরোধ করলে ১০/২০ টাকায় মিটমাট হয়ে যায়। অক্ষয়বটবৃক্ষের নীচে অবস্থানরত পাণ্ডাই প্রেতাত্মাদের স্বর্গগমন বিষয়টি নিশ্চিত করে দেন। এ ব্যাপারে উচ্চবাচ্য করা ঠিক নয়, তারপরও অভিনয় বিষয়টি ভক্তি ও বিশ্বাসের বিষয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
    আমি সকালে ট্রেন থেকে নেমেই অগ্রজপ্রতিম সন্তোষদার নির্দেশ মতো গয়ায় ভারত সেবাশ্রম বা সংঘ-এর অফিসে চলে যাই, তাঁরাই অটোতে সেবাশ্রমের মূল প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেন। প্রায় ১০ বিঘা জায়গা নিয়ে গয়ার ভারত সেবাশ্রম সংঘ। প্রচুর গাছ-গাছালি। গয়ার ব্যস্ততম এলাকায় এই সংঘ-শাখা যেন এক টুকরো গ্রাম। মোট ১২টি বিল্ডিং। সীমানার প্রায় শেষ প্রান্তে জি ব্লকের চারতলা বাড়িতে যাত্রীদের থাকবার সুব্যবস্থা এল প্যাটার্নের যে বিরাট তিনতলা পুরানো ধর্মশালটি সংঘগুরুর দৃষ্টিনন্দন মন্দিরের বিশাল প্রাঙ্গণের গা ঘেঁষে রয়েছে, সেটির স্থাপত্যও তারিফ করার মতো। শুনেছি, রতনগড়ের শেঠ জহুরমল গৌরীদত্ত ১৯৩০ সালে এ ধর্মশালার একতলাটি তৈরি করে দেন। তিনি ভারত সেবাশ্রম সংঘ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাণপুরুষ শ্রীমৎ প্রণবানন্দ মহারাজের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। এ আশ্রমে থাকতে কোনো ভাড়া দেওয়া হয় না। দুপুরে বিনে পয়সায় উন্নতমানের প্রসাদের ব্যবস্থা আছে। রাত্রে নয়। যাত্রীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে যে অনুদান বা চাঁদা দেন, তাতেই সেবাশ্রমের কার্যনির্বাহ হয়। এ সেবাশ্রমের ব্যবস্থাপনায় কেউ কার্পণ্য দেখাতে পারেন না। আমার তো মনে হয়েছে, জীবনের যথাসর্বস্ব দান করে দিয়ে মুক্তি লাভ করি। এটা আমার মুখের কথা নয়, অন্তরের নির্ভেজাল উক্তি। এতটাই সেবাপরায়ণতাসমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান।
    এই দীর্ঘ আলোচনায় আমার মনে হয়েছে ভক্তি-শ্রদ্ধা-আবেগ হলো ধর্মের ক্ষেত্রে শক্তিশালী অনুষঙ্গ। তার চেয়েও অধিক শক্তিধর হলো-নির্মল বিশ্বাস। বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের তাবৎ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা মতবাদগুলো। এক্ষেত্রে প্রত্যেক মতবাদই নিজের বিশ্বাসের কাছে নির্ভেজাল ও একমাত্র অবলম্বন।

(ক্রমশঃ)
লেখক: সাহিত্যিক, গবেষক ও সাবেক অধ্যাপক
 মোবাইল: ০১৭১১-৩৪১৭৩৫