
ক্রীড়া প্রতিবেদক:
শেষ বলে নায়ক হওয়ার সুযোগ ছিল মাহমুদউল্লাহর সামনে। কিন্তু পারলেন না
বাংলাদেশ অধিনায়ক। আন্দ্রে রাসেলের নিখুঁত ইয়র্কারে ব্যাটই ছোঁয়াতে ব্যর্থ
হলেন তিনি। ম্যাচে লম্বা একটা সময় রাজত্ব করলেও হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়ল
বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হারল শেষ ওভারের শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ে।
শারজাহ
ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুক্রবার সুপার টুয়েলভের ম্যাচে ৩ রানে হেরেছে
বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ১৪২ রানের জবাবে তারা ৫ উইকেটে করতে পেরেছে ১৩৯
রান।
২২ বলে ৪০ রানের বিস্ফোরক ইনিংসে ক্যারিবিয়ানদের জয়ের নায়ক
নিকোলাস পুরান। বড় ভূমিকা ছিল জেসন হোল্ডারেরও। শুরুতে বিশ্বকাপ দলেই ছিলেন
না এই অলরাউন্ডার। সতীর্থের চোটে বাংলাদেশ ম্যাচের আগে দলে ঢুকে জায়গা
পেয়ে যান একাদশেও। ক্যামিও ইনিংস খেলে ও আঁটসাঁট বোলিংয়ের পর শেষ সময়ে
সীমানায় লিটন দাসের ক্যাচ নিয়ে রাখলেন অবদান। বলটি সীমানা ছাড়ালে হয়ত
অন্যরকম হতো ম্যাচের চিত্র।
শেষ ওভারে ১৩ রান প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশের।
রাসেলের প্রথম চার বলে মাহমুদউল্লাহ ও আফিফ নিতে পারেন ৯। এরপর সমীকরণ
দাঁড়ায় ১ বলে চার। সেটা মেলাতে পারেননি অধিনায়ক। তাতে মূল পর্বে একটা জয়ের
অপেক্ষা আরও বাড়ল বাংলাদেশের।
এর আগে বল হাতে শুরুটা দারুণ করে
বাংলাদেশ। ক্রিস গেইল-এভিন লুইসদের হাত খোলার সুযোগ দেননি কেউই। রানের জন্য
ছটফট করা ওয়েস্ট ইন্ডিজ তৃতীয় ওভারে হারায় প্রথম উইকেট। মুস্তাফিজুর
রহমানের লেংথ বল সজোরে লেগে ঘুরানোর চেষ্টায় স্কয়ার লেগে লুইস ধরা পড়েন
মুশফিকুর রহিমের হাতে।
সাকিব আল হাসানের থ্রো সরাসরি স্টাম্পে লাগলে
হয়তো ৩ রানে ফিরে যেতেন গেইল। এরপরও অবশ্য বেশিক্ষণ টেকেননি বাঁহাতি এই
ওপেনার। মেহেদি হাসানের গুড লেংথ ডেলিভারিতে চড়াও হতে গিয়ে হয়ে যান বোল্ড।
পাওয়ার
প্লেতে দুই ওপেনারকে হারিয়ে কেবল ২৯ রান করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। অভিষিক্ত
রোস্টন চেইস এক প্রান্ত আগলে রেখেছিলেন, কিন্তু অন্য প্রান্তে মিলছিল না
সঙ্গ।
মেহেদির অফ স্পিন ছক্কায় ওড়ানোর চেষ্টায় লং অফে ধরা পড়েন শিমরন হেটমায়ার।
ত্রয়োদশ ওভারের তৃতীয় বলে একটি সিঙ্গেল নিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান কাইরন পোলার্ড। বোঝা যায়নি ঠিক কী হয়েছিল ক্যারিবিয়ান অধিনায়কের।
পরের
বলেই ভাগ্যের জোরে মিলে বড় উইকেট। কোনো বল না খেলেই রান আউট হয়ে যান
আন্দ্রে রাসেল। চেইসের স্ট্রেট ড্রাইভ তাসকিনের পা ছুঁয়ে লাগে স্টাম্পে।
একটু এগিয়ে থাকা রাসেল ফিরতে পারেননি সময় মতো।
দারুণ বোলিং করা সাকিব
চতুর্দশ ওভারে তৈরি করেন দুটি সুযোগ। ডিপ মিডউইকেটে চেইসের ক্যাচ ছাড়েন
মেহেদি। এর আগে এই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানেরই ফিরতি ক্যাচ মুঠোয় জমাতে
ব্যর্থ হন তিনি।
এক বল পর পুরানকে দ্রুত বিদায় করার সুযোগ হাতছাড়া করে
বাংলাদেশ। চোটের জন্য নুরুল হাসান সোহানের অনুপস্থিতিতে কিপিংয়ে ফেরা লিটন
কাজে লাগাতে পারেননি স্টাম্পিংয়ের সুযোগ।
সে সময় ১ রানে থাকা পুরান পরে
বাংলাদেশকে দারুণ ভোগান। প্রথম ১৪ ওভারে কেবল ৭০ রান করা ওয়েস্ট ইন্ডিজ শেষ
৬ ওভারে যোগ করে ৭২ রান। এতে সবচেয়ে বড় অবদান পুরানের।
১৫তম ওভারে
মুস্তাফিজের ওভারে ১৪ রান নিয়ে রানের গতিতে দম দেন পুরান-চেইস। ষোড়শ ওভারে
সাকিবকে পরপর দুই ছক্কায় ওড়ান পুরান। শরিফুল ইসলামের আঁটসাঁট ওভারের পর
মেহেদিকে ওড়ান দুটি ছক্কায়।
১৯তম ওভারে ফিরে পুরানকে আউট করে দ্রুত
এগোনো ৫৭ রানের জুটি ভাঙেন শরিফুল। ডিপ কাভারে ক্যাচ মুঠোয় জমান মোহাম্মদ
নাঈম শেখ। ২২ বলে চার ছক্কা ও এক চারে ৪০ রান করেন পুরান।
পরের বলে মেলে
চেইসের উইকেট। লেগ স্টাম্পে থাকা বলের লাইন মিস করে বোল্ড হয়ে যান তিনি। ৯
ও ২৭ রানে বেঁচে গিয়ে দুই চারে ৪৬ বলে করেন ৩৯।
হ্যাটট্রিক ঠেকিয়ে
দেওয়া জেসন হোল্ডারের উইকেট সেই ওভারেই পেতে পারতেন শরিফুল। কিন্তু ডিপ
কাভারে সহজ ক্যাচ মুঠোয় জমাতে পারেননি আফিফ।
১ রানে বেঁচে যাওয়া হোল্ডার
পরের ওভারে দুটি ছক্কা মারেন মুস্তাফিজকে। শেষ ওভারেই ডোয়াইন ব্রাভোর
বিদায়ের পর ক্রিজে আসা পোলার্ড শেষ বল ওড়ান ছক্কায়। শেষের ঝড়ে ওয়েস্ট
ইন্ডিজ পেয়ে যায় লড়াইয়ের পুঁজি।
রান তাড়ায় শুরুতেই চমক দেখায় বাংলাদেশ।
নাঈমের সঙ্গে ওপেনিংয়ে পাঠায় সাকিবকে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিন সংস্করণ
মিলিয়ে ৪০৩ ইনিংসে প্রথমবার ইনিংস ওপেন করতে নেমে বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান
অবশ্য করতে পারেননি তেমন কিছু। আউট হন ১২ বলে ৯ রান করে।
তার বিদায়ে ভাঙে ২১ রানের শুরুর জুটি। পাওয়ার প্লের শেষ ওভারে নাঈমকে বোল্ড করে দেন হোল্ডার।
তৃতীয়
উইকেটে লিটনের সঙ্গে জুটি গড়ার চেষ্টায় ছিলেন সৌম্য। খুব একটা ঝুঁকি
নিচ্ছিলেন না তারা। যখন মনে হচ্ছিল জমে গেছে, তখনই ফিরে যান সৌম্য। আকিল
হোসেনের বলে শর্ট থার্ড ম্যানে ঝাঁপিয়ে ক্যাচ মুঠোয় জমান গেইল।
লিটনের
সঙ্গে সম্ভাবনাময় জুটির ইতি টেনে দেন মুশফিক নিজেই। রান রেটে অতো চাপ না
থাকলেও নেন ঝুঁকি। রবি রামপলকে স্কুপ করার চেষ্টায় হন বোল্ড।
লিটন ও
মাহমুদউল্লাহর জুটিতে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। শেষ ৭ বলে প্রয়োজন নামিয়ে আনে ১৩
রানে। ডোয়াইন ব্রাভোর শেষ বলে ছক্কায় সমীকরণ সহজ করার চেষ্টা করেন লিটন।
কিন্তু লং অনে পার করতে পারেননি হোল্ডারকে। দীর্ঘদেহী এই ফিল্ডার লাফিয়ে
ক্যাচ মুঠোয় জমান। এরপর আর পারেনি বাংলাদেশ।
৪৩ বলে চারটি চারে ৪৪ রান করেন লিটন। ২৪ বলে এক ছক্কা ও দুই চারে ৩১ রানে অপরাজিত থাকেন মাহমুদউল্লাহ।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ওয়েস্ট
ইন্ডিজ: ২০ ওভারে ১৪২/৭ (গেইল ৪, লুইস ৬, চেইস ৩৯, হেটমায়ার ৯, পোলার্ড
১৪*, রাসেল ০, পুরান ৪০, ব্রাভো ১, হোল্ডার ১৫*; মেহেদি ৪-০-২৭-২, তাসকিন
৪-০-১৭-০, মুস্তাফিজ ৪-০-৪৩-২, শরিফুল ৪-০-২০-২, সাকিব ৪-০-২৮-০)।
বাংলাদেশ:
২০ ওভারে ১৩৯/৫ (নাঈম ১৭, সাকিব ৯, লিটন ৪৪, সৌম্য ১৭, মুশফিক ৮,
মাহমুদউল্লাহ ৩১*, আফিফ ২*; রামপল ৪-০-২৫-১, হোল্ডার ৪-০-২২-১, রাসেল
৪-০-২৯-১, আকিল ৪-০-২৪-১, ব্রাভো ৪-০-৩৬-১ )।
ফল: ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩ রানে জয়ী
ম্যান অব দা ম্যাচ: নিকোলাস পুরান