জঙ্গিদের পাহাড়ে গিয়ে চিকিৎসা দিতেন শাকির
Published : Friday, 28 October, 2022 at 12:00 AM
নিজস্ব প্রতিবেদক: ভূখণ্ড বিচ্ছিণ্যে নীলনকশাকারী দুর্গম পাহাড়ের সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের’ (কেএনএফ) কাছ থেকে জঙ্গি প্রশিক্ষণ নেওয়া তরুণদের ঢাকা থেকে গিয়ে প্রতিমাসে চিকিৎসা দিতেন ডা. শাকির বিন ওয়ালী। শাকির নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্য। একই সঙ্গে তিনি সংগঠনের দাওয়া বিভাগের প্রধান।
এর আগে ২০১৫ সালে নতুন সংগঠনটির প্রথম আমির মাইনুল ইসলাম ওরফে রক্সি, শামিন মাহফুজ ওরফে স্যারকে ডা. শাকির বিন ওয়ালী ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আবু সাঈদের সংস্পর্শে আসে জেলখানায়। তখনই তারা জেলখানায় বসে পরিকল্পনা করেন নতুন জঙ্গি তৈরির পরিকল্পনা। ২০১৯ সালে কক্সবাজারের একটি হোটেলে মিলিত হয় তারা। এই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন শামিন, রক্সি, মসীন এবং বিকাশ ও তমাল নামে আরেকজন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) প্রধান মো. আসাদুজ্জামান।
তিনি জানান, প্রতি মাসে একবার করে দুর্গম পাহাড়ে জঙ্গি সংগঠনটির প্রশিক্ষণ শিবিরে যেতেন ডা. শাকির বিন ওয়ালী। সেখানে তাদের কোনো সদস্য অসুস্থ বা কোনো রোগে আক্রান্ত হলে তিনি চিকিৎসা দিতেন। মূলত নতুন জঙ্গি সংগঠনটির অসুস্থ সদস্যদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্যই প্রতি মাসে তিনি একবার করে প্রশিক্ষণ শিবিরে যেতেন। আবার তিনি যখন ঢাকায় থাকতেন তখন তিনি নতুন জঙ্গি সংগঠনটির প্রধান শামিন মাহফুজ ওরফে স্যারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতেন। ফোনে সদস্যদের অসুস্থতার লক্ষণ শুনে ব্যবস্থাপত্র পাঠাতেন।
তিনি বলেন, গত দুই দিন আগে সংগঠনের দাওয়া বিভাগের প্রধান শাকিরকে আদালতে তোলা হলে তিনি জবানবন্দি দিয়েছেন। তার জবানবন্দি ও তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর ডেমরা এলাকা থেকে এই জঙ্গি সংগঠনের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে সিটিটিসি। গ্রেফতাররা হলেন— নাটোরের মো. আব্দুল্লাহ (২২), কুমিল্লার চান্দিনা মো. তাজুল ইসলাম (৩৩), নারায়ণগঞ্জের মো. জিয়াউদ্দিন (৩৭), মাদারিপুরের মো. হাবিবুল্লাহ (১৯) ও নারায়ণগঞ্জের মো. মাহামুদুল হাসান (১৮)। গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে তিনটি মোবাইল ফোন, ফতওয়া সংক্রান্ত ১২ পাতা কাগজ জব্দ করা হয়।
তিনি বলেন, গত ১৩ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা থেকে হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হওয়া আবরুর হক আবারারকে (১৮) গ্রেফতার করে সিটিটিসি। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে, পরদিন রামপুরা এলাকা থেকে সদ্য এমবিবিএস পাস করা শাকির বিন ওয়ালীকে গ্রেফতার করা হয়। চিকিৎসক শাকির নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্য এবং তিনি ঢাকা থেকে দুর্গম পাহাড়ে গিয়ে আহত ঘরছাড়া তরুণদের চিকিৎসা দিতেন।
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, গ্রেফতাররা বিভিন্ন সময় জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে হিজরতের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছিল। গ্রেফতার আব্দুল্লাহ আনসার হাউজ (সেইফ হাউজ) পরিচালনা করতো। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে নতুন জঙ্গি সংগঠনের যেসব সদস্য হিজরতের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে যেত তাদের এই আনসার হাউজে জায়গা দিত আব্দুল্লাহ। পরে সেই আনসার হাউজ থেকে আব্দুল্লাহ এই নতুন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য পার্বত্য অঞ্চলে পাঠাতো। গ্রেফতার তাজুল ও হাবিবুল্লাহ নতুন জঙ্গি সংগঠনের যেসব সদস্যরা আনসার হাউজে আসতেন তাদেরকে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে রিসিভ করে নিয়ে আসতেন।
সিটিটিসি প্রধান বলেন, আবরারকে জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, চিকিৎসক শাকিরের পরামর্শে তিনি ঘর ছেড়েছেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শাকিরকে গ্রেফতার করি। শাকির কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস পড়াশোনা করেছেন। তিনি জঙ্গি সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকলেও সে আরেক হুজুরের নির্দেশে তরুণদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করা কাজ করতো। এছাড়া জঙ্গি সংগঠনটির সঙ্গে প্রশিক্ষণ শিবিরে থাকা পাহাড়ি সন্ত্রাসী সংগঠন কেএনএফ সদস্যরা আহত হলেও সেখানে গিয়ে চিকিৎসা করতেন শাকির বিন ওয়ালী।
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, চিকিৎসক শাকিরকে জিজ্ঞাসাবাদে আমরা একজনের নাম পেয়েছি। তিনি দেশের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করেছেন এবং একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনে চাকরিও করতেন। তার নাম হচ্ছে মহসিন ওরফে রিয়েল। সে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে নতুন জঙ্গি সংগঠনটির একজন শীর্ষ নেতা হিসেবে কাজ শুরু করেন।
দুইদিন আগে আদালতে জবানবন্দিতে শাকির বলেছেন, নতুন সংগঠনটির প্রথম আমির মাইনুল ইসলাম ওরফে রক্সি। ২০২১ সালের আগ পর্যন্ত রক্সি ছিলেন এই সংগঠনের আমির। ২০২১ সালে রক্সিকে গ্রেফতার করে সিটিটিসি। গত দুয়েক দিন আগে আমরা রক্সিকে আবার রিমান্ডে এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। রক্সি আমাদের জানায়, এই সংগঠনের মাস্টারমাইন্ড শামিন মাহফুজ ওরফে স্যার। ২০১৪ সালে শামিন মাহফুজ ওরফে স্যারকে গ্রেফতার করে ডিবি। এর আগে রক্সিও ২০১৫ সালে একবার গ্রেফতার হয়েছিলেন। রক্সি ও শামিন যখন একসঙ্গে জেলখানায় ছিলেন। তখন তারা সেখানে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আবু সাঈদের সংস্পর্শে আসে। আবু সাইদের সংস্পর্শে এসে তারা বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আলোচনা করে। এই তিনজন জেলখানায় বসে নতুন সংগঠনটি তৈরি করার পরিকল্পনা হয়। পরিকল্পনা হয় রক্সি ও শামিন জেলখানা থেকে বের হওয়া জঙ্গি ও বাইরে থাকা জঙ্গিদের নিয়ে শক্তিশালী একটি জঙ্গি সংগঠন গঠন করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী জামিনে বের হয়ে রক্সি ও শামিন কাজ শুরু করে। এই ধারাবাহিকতায় তারা সংগঠনের সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একটি ক্যাম্পের সন্ধান শুরু করে।