
চিররঞ্জন সরকার ।।
অনেক শঙ্কা ও ভয় জাগিয়ে শেষ পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং মাঝারি শক্তি নিয়ে সোমবার রাতে বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে। তবে তেজকটালের মধ্যে এই ঝড় আসায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উচ্চতার জোয়ারে ভেসেছে উপকূল। আমাদের সৌভাগ্য যে, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং সেই পর্যন্ত মহাপ্রলঙ্করী কোনো সুপার সাইক্লোনে রূপান্তরিত হয়নি। এটা ঘূর্ণিঝড়েই সীমাবদ্ধ ছিল এবং বাতাসের গতিবেগ ৮০ কিলোমিটারের ওপরে যায়নি। তার পরও সিত্রাংয়ের কারণে দেশের ১৬ জেলায় অন্তত ৪০ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে। সেখানকার সন্দ্বীপ চ্যানেলে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে তীব্র বাতাস ও ঢেউয়ে বালু তোলার ড্রেজার ডুবে আট শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে দেশের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব যদিও এখনো পাওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে যা জানা গেছে, তাতে এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে অনেক বেগ পেতে হবে। সরকারিভাবে জানানো হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে দেশের ৪১৯টি ইউনিয়নের আনুমানিক ১০ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৬ হাজার হেক্টর ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে এবং ১ হাজার মৎস্য ঘের ভেসে গেছে। এখন ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা ও পুনর্বাসনের কাজে মনোযোগ দিতে হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান জানিয়েছেন, সরকারের তরফ থেকে ঘর মেরামতের জন্য টিন দেওয়া হবে। আর যাদের মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা সুদমুক্ত ঋণ পাবেন। এ ছাড়া দুর্যোগে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হবে বলে তিনি জানান। এ কথা ঠিক যে, মৃত্যুর কোনো ক্ষতিপূরণ হয় না। তার পরও স্বজন হারানো পরিবারগুলোকে অন্তত এক লাখ টাকা দেওয়া দরকার। যাতে করে তারা অন্তত কিছুটা হলেও গুছিয়ে নিতে পারেন।
বাংলাদেশের জন্য ঘূর্ণিঝড় একটা নিয়মিত দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। কয়েক বছর ধরে একের পর এক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে। এসব ঘূর্ণিঝড়ের তা-বলীলায় জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ২০১৯ সালে হানা দিয়েছিল ঘূর্ণিঝড় ফণী। ফণীর ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছিল বুলবুল। এর পর করোনা মহামারীর সময় ২০২০ সালের মে মাসে হানা দিয়েছিল ঘূর্ণিঝড় আম্পান। যার তা-বে দেশের ২৬টি জেলার ১ লাখ ২০ হাজার ৭১২টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মোট প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছিল। আম্পানের ভয়াল স্মৃতির পর ২০২১ সালের মে মাসে আরও একটি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়। যার নাম ইয়াস। এর তা-বে মোট ২ হাজার ৯৫১ কোটি ৭০ লাখ ৩০ হাজার ৫২৭ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল। ওই বছরের ডিসেম্বরে আরও একটি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়। যার নাম জাওয়াদ। যার প্রভাবে বরিশাল, চাঁদপুর, ফরিদপুর ও মানিকগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় ফসলের ক্ষতি হয়েছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় এবার সিত্রাং হানা দিল। একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে গত চার বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। করোনা মাহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ঋতুতে ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চিন্তায় যখন দুর্যোগকবলিতরা দিশাহীন, তখন আগামী ডিসেম্বরে আরেকটি ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বছর শেষে আবার ঘূর্ণিঝড় হানা দিলে দেশবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। সে ব্যাপারেও এখন থেকে প্রস্তুত নেওয়া প্রয়োজন।
প্রশ্ন হলো, বঙ্গোপসাগরে কেন এত সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় তৈরি হচ্ছে? কেনই বা তা এত ভয়াবহ রূপ ধারণ করে? বারবার এই চরম ধ্বংসের সামনে কোনোমতে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া কি আর কিছুই করার নেই আমাদের?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘূর্ণিঝড় একটা দানবীয় ইঞ্জিনের মতো যার জ্বালানি হিসেবে কাজ করে উত্তপ্ত, আর্দ্র বাতাস। আর এর জন্য বিষুবরেখার আশপাশের সমুদ্র হচ্ছে সবচেয়ে অনুকূল স্থান। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যখন এই গরম, আর্দ্র বাতাস ওপরের দিকে উঠতে শুরু করে চোঙার মতো তখন তার নিচের খালি জায়গায় নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এর ফলে এর আশপাশের উচ্চচাপের বাতাস প্রবল বেগে ছুটে এসে এই খালি জায়গাটা পূরণ করে। তার পর এই নতুন বাতাসও উত্তপ্ত এবং আর্দ্র হয়ে ওপরে উঠতে শুরু করে আর তার চারপাশের পানিগুলো তখন আরও প্রবলবেগে ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে আসতে থাকে। ফুঁসে উঠতে থাকে সমুদ্র মহাপ্রলয়ঙ্করীরূপে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় উপসাগর এই বঙ্গোপসাগরের অবতল বা কনকেভ আকৃতি এবং অগভীর পানি যেন ঘূর্ণিঝড় উৎপাদনে জ্বালানির মতো কাজ করে। ফলে সেগুলো চোখের নিমিষে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে থাকে। এর সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের দিকে বাংলাদেশের ফানেলাকৃতির ভৌগোলিক অবস্থানও ব্যাপারটা আরও তীব্র করতে সহায়ক হয়। এ ছাড়া আমাদের উপকূলীয় অঞ্চল ঘন বসতিপূর্ণ হওয়ায় স্বভাবতই ক্ষতির পরিমাণও হয় অনেক বেশি।
কাজেই বঙ্গোপসাগরে একের পর এক ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি অনাকাক্সিক্ষত হলেও একেবারে কার্যকারণহীন নয়। প্রসঙ্গত, প্রকৃতির ওপর যথেচ্ছাচার চালানোর কারণে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, আর পরিবেশ দূষণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ। বিশ্বব্যাপী ভোগবাদী সমাজব্যবস্থা কায়েম থাকায় এবং জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর মাত্রা উত্তরোত্তর বেড়ে যাওয়ায় পরিবর্তন হচ্ছে জলবায়ু- যা বিশ্ববাসীকে একটি গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমরাও এর অনিবার্য শিকারে পরিণত হয়েছি। প্রশ্ন হলো, এ পরিস্থিতি থেকে তা হলে কীভাবে রেহাই পাব? কীভাবেই বা আমরা টিকে থাকব?
সুইডেনের এক পরিবেশ বিজ্ঞানী উমিও জলবায়ুবিষয়ক এক সম্মেলনে বলেছিলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমরা যা করতে পারি তা হলো : ১. প্রতিকারমূলক বা প্রিভেনশন, ২. অভিযোজন বা মিটিগেশন, ৩. খাপ খাইয়ে নেওয়া বা আ্যডাপটেশন, ৪. সয়ে যাওয়া, দুর্ভোগ পোহানো বা সাফারিং।
জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক বিষয় হওয়ায় ১ ও ২ নম্বরের ব্যাপারে আমাদের তেমন কিছুই করার নেই (অবশ্য উত্তরাঞ্চলে খরা ও মরুকরণ রোধে ব্যাপক বনায়ন করলে এবং দক্ষিণাঞ্চলকে সুরক্ষা দিতে সুন্দরবনকে যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করলে মাইক্রোক্লাইমেট (সরপৎড়পষরসধঃব)-এ যে পরিবর্তন আসবে তাতে ‘প্রিভেনশন’ ও ‘মিটিগেশন’ কিছুটা হলেও সম্ভব)।
‘অ্যাডাপটেশন’- যাকে বলে ষড়পধষ ংড়ষঁঃরড়হ ঃড় মষড়নধষ ঢ়ৎড়নষবস এবং ‘সাফারিং’- যা আমরা ইতোমধ্যেই করছি এবং ভবিষ্যতেও করেই যাব। কাজেই আমাদের সামনে মোটা দাগে করণীয় হলো :
১. বিজ্ঞান (ঝপরবহপব) হিসাবে ‘অ্যাডাপটেশন’কে এগিয়ে নেওয়া, ২. ছোট ছোট ‘অ্যাডাপটেশন’ প্রযুক্তি উদ্ভাবন, ৩. স্থানীয় জ্ঞান (রহফরমবহড়ঁং শহড়ষিবফমব)-এর কল্যাণে যে প্রযুক্তি বা উপায়গুলো আছে তার উন্নয়ন ঘটানো এবং ৪. আন্তর্জাতিক ফোরামে গণসংযোগ বাড়িয়ে ‘অ্যাডাপটেশন ফান্ড’-এর ব্যবস্থা করা এবং এর সদ্ব্যবহার করা।
এখানে আরেকটি কথা বলা দরকার যে, সুন্দরবন রক্ষায় আমাদের বিশেষ মনোযোগী হওয়া দরকার। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সব কটি ঘূর্ণিঝড়ের সামনে প্রায়ই ঢাল হয়ে দাঁড়ায় সুন্দরবন। ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’কে প্রতিহত করেছিল সুন্দরবন। বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে সুন্দরবন বাংলাদেশের উপকূলকে বহুবার রক্ষা করেছে। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলা সুন্দরবন অঞ্চলে আঘাত হানে। সেবারও সুন্দরবনের কাছে প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল আইলা। আইলার দুই বছর আগে ২০০৭ সালে ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার বাতাসের গতি নিয়ে এ সুন্দরবন অঞ্চলেই আঘাত হেনেছিল বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’। প্রতিবারের মতো সেবারও উপকূলীয় অঞ্চলকে প্রায় বিলীন হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল সুন্দরবন। বেসরকারি হিসাবে সিডরে প্রাণহানির সংখ্যা অন্তত ১০ হাজার। গোটা সুন্দরবন ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছিল সিডরের তাণ্ডবে। একইভাবে ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আম্পান এবং ২০২১ সালের ইয়াসের গতিও সুন্দরবন রুখে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন যদি বুক চিতিয়ে না দাঁড়াত, তবে এসব ঝড়ে প্রাণহানির সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যেত। সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি হতো। যে সুন্দরবন আমাদের ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষার বর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার রক্ষণাবেক্ষণ তো দূরের কথা, সেখানে রামপালের মতো কয়লার পাওয়ার প্ল্যান্ট বানানোর মতো অপরিণামদর্শী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। করোনা ভাইরাসই হোক, ঘূর্ণিঝড় কিংবা বন্যাই হোক, এতে ক্ষয়ক্ষতির শেষমেশ দায়ভারটা বহন করতে হয় গরিব মানুষদেরই। ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলের দিন-আনা দিন-খাওয়া মানুষদেরই সব যায়। এর একটা স্থায়ী সমাধান দরকার।
গত কয়েক দশকে উপকূলে যে আশ্রয়কেন্দ্র বানানো হয়েছে সেগুলো এখন কাজে লাগছে, আগাম সতর্কতা অনেক বেড়েছে, স্যাটেলাইট মাধ্যমে খবর পাওয়া যাচ্ছে অনেক আগে থেকেই। কিন্তু এগুলোর কোনোটাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ব্যাপারে সরকারকে ভাবতে হবে। উপকূলের মানুষদের বাসস্থান, জীবিকার টেকসই সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। আবহাওয়ার যে গতি-প্রকৃতি, তাতে সাধারণ ঘূর্ণিঝড়, সুপার সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি আগামী দিনে কমবে বলে মনে হয় না।
চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক