ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
স্মৃতিতে আহার-বিহার
Published : Tuesday, 11 October, 2022 at 12:00 AM
স্মৃতিতে আহার-বিহারশান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
      প্রথমেই আমার পারিবারিক পরিচিতিটা সংক্ষেপে বলতে চাই। আমি দরিদ্র স্কুল শিক্ষকের সন্তান। আমার পিতা ১৯৪৪খ্রি: কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার (থানা) বরকোটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। নিজ গ্রাম পার্শ্ববর্তী মোহাম্মদপুর। তাঁর বেতন ছিল পঁচিশ টাকা। আমার জন্ম ১৯৪৩খ্রি: ১৫ আগস্ট। যৌথ পরিবার। পিতামহ-পিতামহীসহ কাকা-পিসিমা সমেত পরিবারের সদস্য সংখ্যা তখন আটজন। বসতবাড়ি ছাড়া চাষাবাদী জমি প্রায় চারএকর (৪০০ শতক)। এক ফসলী এবং শীতকালে রবিশস্যের উৎপাদন হতো সামান্য। সুতরাং গ্রাম্য প্রবাদস্বরূপ ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা।
    আমাদের এলাকা নিস্নাঞ্চল বিধায় প্রায় বছর বন্যায় কবলিত হতো। যে বছর বন্যা হতো না, সেবছর আমাদের তেমন অভাব হতো না। তবে প্রায় বছরই অন্নকষ্টে দিনাতিপাত করতে হয়েছে, উপোসও থাকতে হয়েছে অনেকদিন। সে সময় চালের বিকল্প হিসেবে কাউনের চাল ও মিষ্টি আলু খেতে হতো। শীতকালে জমিতে খেসারি ডাল (কলাই) চাষ হতো, এ ডাল সারা বছর খেতে হতো। এ ডাল দিয়ে ‘ডালের বড়া’, তেঁতুল মিশিয়ে ‘টক ডাল’ এবং সাধারণভাবে ডাল রান্না হতো। বাড়ির দু’দিকে দু’টি পুকুর ছিল, মাছ চাষ হতো না। তবে বন্যার ফলে পাড় উপচিয়ে বাইর থেকে নানাধরনের মাছ পুকুরে আসত। সেজন্য মাঝে মাঝে মাছ খাওয়া যেত। এই দু’পুকুরের শরিক ছিল ছয় পরিবারের, এজন্য মাছ ভাগাভাগি করে নিতে হতো।
    গ্রামে সকালবেলায় স্বল্পসময়ের জন্য একাটি হাট বসত। আমরা বলতাম-আড়ং। দুধ-মাছ-চালই প্রধান সামগ্রি এবং ২/৩টি মুদি দোকান ইত্যাদি। সাপ্তাহিক বাজার দু’দিন বসত বিকেলবেলায় স্কুলসংলগ্ন। সেখান থেকেই সাপ্তাহিক বাজার-সামগ্রি ক্রয় করা হতো সাধ্যানুযায়ী ও প্রয়োজনীয়ানুযায়ী। এচিত্রটি শুধু আমাদের পরিবারের নয়, মোটামুটি সার্বজনীন। কাজেই খাদ্যের উপকরণ হিসেবে বাহুল্য বর্ণনা দেবার সুযোগ নেই।
    যদিও আমার পিতা শিক্ষক, কৃষক পরিবার হিসাবেই পরিচিত ছিল। আমাদের পরিবারে গবাদি পশু অর্থাৎ হালচাষের জন্য গরু পালন করা হতো। এতে গাভী যদি কখনও বাছুর দিত, আমরা দুধ খেতে পারতাম।
    নিত্যদিনের খাবার কখনও একধারায় তৈরি হতো না। অন্নসংস্থান থাকলে তরকারির বাহুল্য তেমন না হলেও কোনো বিশেষ চাহিদা থাকত না। হয়ত বাড়ির পাশে মাচায় লাউ ধরেছে, তা কেটে এনে কখনো মাসকলাই অথবা পুকুর থেকে ছোট চিংড়ি ধরে রান্না হয়েছে, সঙ্গে ধন্যা  (ধনিয়া) পাতা, কাঁচা মরিচ অথবা বড় একটি কুমড় কেটে তার সঙ্গে শুটকি বা ছোট চিংড়ি, অথবা দুলর্ভ নোনা ইলিশের কিছুটা অংশ দিয়ে রান্না হলে, কিংবা কচুর শাকের সঙ্গে কশ্চিৎ সীমের বিচিসহ শুটকি দিয়ে রান্না হলে- সেদিন তৃপ্তি সহকারে তো অনেক ভাত খাওয়া যেত। তা কোনো উল্লেখযোগ্য খাদ্য সামগ্রি নয়, কিন্তু আমার জীবনের একসময়ের স্মৃতিধর স্বপ্নিল প্রাণস্পর্শী খাদ্যউপকরণ।
    গ্রামে বিবাহাদি অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত হলে তখন তরকারি বাহুল্যে মন ভরে যেত, পেট পুরে খাওয়া যেত। ভাতের সঙ্গে-মাছ ভাজা, বেগুন ভাজা, সুক্তোর ডাল (ডালের সঙ্গে মরিচ থাকত না, এলাচি লেবুর পাতা থাকত সুগন্ধির জন্য), লাউ দিয়ে মাছের মাথা দিয়ে তরকারি, বড় মাছের কালিয়া, মাছের মাথা ও চিকন চাল দিয়ে গরম মশলাসহ ঝালঝাল মুড়োঘন্ট, টক (চাট্নি নয়) অর্থাৎ ঝোলবেশি, টমোটো অথবা জলপাই বা পুরানো তেঁতুলসহ কুমড়ের ফালি, ছোট মাছ দিয়ে তৈরি হতো। এ টক পান করতে হতো। তারপর পায়েস বা মিষ্টিান্ন-মিষ্টান্নের মধ্যে কিসমিস থাকতো। আ:, কি ভুড়িভোজ। এসব নিমন্ত্রণে কম করে হলেও ৭/৮ রকমের তরকারি থাকত।
    নিমন্ত্রণে অতিথি আপ্যায়িত হতেন কলাপাতায় এবং মাটিতে সারিবদ্ধভাবে বসে। কোনো ত্রুটি বরদাস্ত করা হতো না। কারণ, সমাজ বলে একধরনের শক্তিশালী কর্তা বা মাতব্বর গোষ্ঠি সবকিছু তদারকি করতেন। পান-তামাকের ব্যবস্থা তো থাকতে হবেই। অনেক পরে বিড়ি-সিগেরেটের চল হয়।
    হিন্দু পরিবারের যে কোনো অনুষ্ঠানে মাংসের প্রচলন ছিল না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিরামিষ তরকারি অবধারিতভাবে প্রচলন ছিল। বিশেষত পূজো-আর্চায়, বৈষ্ণব-সেবায় অথবা কোনো ধর্মীয় উৎসবে। সেক্ষেত্রে চাল-ডাল মিশেল খিচুরি, সাথে লাবড়া অর্থাৎ অনেকপ্রকার সবজিসমেত (মিশেল) তরকারি, টক ও পায়েস। গ্রামে কেবলমাত্র শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে চিড়া-মুড়ি-খই গুড় সমেত দধির (দই) ব্যবস্থা থাকত। এখন নয়, তখন তা অনেকটাই নির্ধারিত সামগ্রি দিয়ে আপ্যায়ন করতে হতো।
    ছোটবেলায় জাতি-ধর্মের মধ্যে নিমন্ত্রণে বা আপ্যায়নে সীমাবদ্ধ ছিল। কুসংস্কারের মধ্যে খাওয়ার ব্যাপারই কঠোরভাবে পালন করা হতো। ছোটবেলায় পারিবারিকভাবে মাংস খেয়েছি খুব কম। তাও কবুতর, হাঁস বা কছপের মাংস। উল্লেখ, অনেক পরিবারের সকল সদস্য মাংসভোজী ছিলেন না। সেজন্য মাংস রান্না হতো ভিন্ন চুলায়, ভিন্ন পাত্রে। অনেক ক্ষেত্রে খেতে হতো নিত্য খাওয়ার জায়গায় নয়।
    আসলে আমি যে অঞ্চলে বা এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছি, এখানে সাচ্ছন্দ্যভাবে জীবন যাপনের ক্ষেত্রে ধনাঢ্য পরিবার তেমন ছিল না। জীবন-মান প্রায় সমান্তরাল বলা চলে। তাই খাদ্য সামগ্রির মধ্যে মাছ-ভাত-শুটকি-নিরামিষ এবং নিত্য অন্নের সঙ্গে সামান্য উপকরণ হলেই চলত। একটু বেগুন ভর্তা, শীতকালে ধন্যাপাতার বাটা, শুটকি ভর্তা, পান্তাভাতে নুন ও পোড়া মরিচ ইত্যাদি। তারপরও যখন কোনো কারণে অতিথির আগমন ঘটলে তাঁকে তো আর অবহেলা করা যায় না। ব্যতিক্রম অর্থাৎ উন্নত ব্যবস্থা করতে হয়, তা তখন সামর্থ্যরে সাথে সংগতি রক্ষা করার বিষয়টি বিবেচ্য হতো না। অতিথির সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করার জন্য তৎপর হতে হতো।
    মনে পড়ে, বাড়িতে পিসেমশায় এসেছেন। দেখেই আমি বা আমরা কেউ না কেউ কাঠের একজোড়া খড়ম এবং হাত-পা ধোয়ার জন্য এক ঘটি জল রেখে দিতাম এবং সঙ্গে সঙ্গে তামাক সেবনের জন্য হুকোটায় নতুন জলভর্তি করে তামাক সাজিয়ে টিক্কায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে সামনে ধরে থাকতাম। এদিকে ঠাকুরমা (পিতামহী) জামাইকে আপ্যায়নের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। ঘরের মাচানের (গ্রাম্যভাষায় ‘কার’) উপর তাঁর গুপ্তধন লুকিয়ে রেখে দিতেন। যা অনেক চেষ্টা করেও হদিশ পেতাম না, তিনি চিড়া-মুড়ি-নাড়ু-গুড় নিয়ে নীচে নেমে কাউকে আদেশ করতেন-বাড়ির যাদের গাভী দুধ দেয়, তা দোহন করে আনতে। যথা আজ্ঞা পালন করা হতো, দুধ গরম করে জামাইকে বড় পিড়িতে বসিয়ে পরিবেশন করা হতো। আমি বা আমরা পাখা দিয়ে বাতাস করতাম এই জন্য যে, যদি ঠাকুরমা দয়াপরবশ হয়ে একটি নাড়ু বা মুড়ি/চিড়ার মোয়া হাতে তুলে দেন। একথা কেউ কী বিশ্বাস করবেন? বিশ্বাস করতে হবে। এটা নিরেট বাস্তব ঘটনা।
    পাড়ার গাছি সুরেন্দ্র দাস। গাছি অর্থাৎ শীতকালে খেজুরগাছ কাটতেন তিনি। তিনি প্রচুর পরিমাণে খেতে পারতেন। এজন্য পারতপক্ষে কেউ নিমন্ত্রণ করতে চাইত না। যদি নিমন্ত্রিত হতেন, আমরা পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর খাওয়ার দৃশ্য দেখতাম। তাঁর খাওয়ার মধ্যে একধরনের নান্দনিক ব্যাপার ছিল। প্রতিটি তরকারির জন্য একথালা ভাত। থালা তো নয়, কলাপাতা ভর্তি। এভাবে যত তরকারি, তত থালা ভাত খেতে পারতেন। শুনেছি, কোনো কারণে শহরে এলে হোটেলে পেট-চুক্তি খাবার খেতেন এবং হোটেলে বাড়ন্ত করে ছাড়তেন। বলে রাখি, এখানে যাকে তরকারি বলছি, হিন্দুরা বলত ‘ব্যঞ্জন’ এবং মুসলমানরা বলত ‘ছালন’।
    ছোটবেলায় মুসলমানদের খাওয়া দেখিনি। তারা মোরগ-মুরগী পালন করত, এজন্য ডিম ও মাংস খেতে পারত। তবে আমরা যেখানে নিমন্ত্রণ শব্দটি উচ্চারণ করেছি, তারা বলত ‘জেফৎ’/‘যেফৎ’। শুনেছি এসব অনুষ্ঠানে মাসকলাইর ডালের সঙ্গে গজারমাছ দিয়ে রান্না হতো। বড় আয়োজনে গরু জবাই হতো। ইত্যাদি।
    বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের প্রথমে যখন কুমিল্লা শহরে ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হই, তখন থাকবার ব্যবস্থা হয় শহরের ছাতিপট্টি এলাকায় সুপারিবাগানে গুহবাড়িতে। এই বাড়িটি মদনমোহন গুহের, তাঁর পৌত্র হলেন অধ্যাপক অজিতকুমার গুহ, যিনি ঢাকা জগন্নাথ কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান। কলেজ ছুটিতে তিনি কুমিল্লা আসতেন, থাকতেন। কলেজে ভর্তি হয়ে ছাতিপট্টিতে ‘বিবেকানন্দ হোটেলে’ দু’বেলা আহার করি। প্রতি বেলা নয় আনা, মাস শেষে তেত্রিশ টাকা নয় আনা। ভাত-নিরামিষ তরকারি, মাছ বা ডিম ও যতক্ষণ না পেট ভরে ডাল-ভাত। মুখরোচক অনেক প্রকার তরকারি রান্না হতো। মাছের কালিয়া, তেল কই, সরিষা ইলিশ, পাবদামাছের ঝোল, পাঁঠার মাংস ইত্যাদি। বাঁধাধরা তরকারির বাইরে অন্যকিছু খেতে গেলে অতিরিক্ত দাম দিতে হতো। গ্রামে হাঁসের ডিম সিদ্ধ খেয়েছি। হোটেলে ডিমের ঝোল রান্না হতো।
    ছয়মাস পর গুহ পরিবার আমাকে বাড়ির ভেতরে থাকবার জায়গা করে দেন এবং খাওয়ার দায়িত্ব নেন। গুহরা প্রতিবেলা কম করে হলেও পাঁচ রকম তরকারি দিয়ে খাওয়া-দাওয়া করতেন। প্রথম প্রথম প্রতিবেলায় খাবার ছিল আমার কাছে উৎসবের ভোজনের মত। আমি প্রথম পোলাও ও চাট্নি খেয়েছি গুহবাড়িতে। এছাড়া পঞ্জিকা দেখে পারিবারিক অনেক অনুষ্ঠান হতো-তাতে খাবারের পদ (ম্যানু) হতো ভিন্ন ভিন্ন। তা পুজো বিষয়ক হলে নিরামিষের বাহুল্য থাকত। নিরামিষের পদ (ম্যানু) যে কতপ্রকার তা নামই জানতাম না। দুর্গাপূজোর পর কালীপূজোর পর দ্বিতীয়া তিথিতে ভাইফোঁটা এবং অন্নকূট অর্থাৎ একশত আট প্রকারের নিরামিষ তরকারি। প্রতিটি আইটেমে (পদ) তৈল বা ঘি-এর ব্যবহার থাকত অধিক পরিমাণ। আমার তো পেট খারাপ হওয়ার অবস্থা। গুহ-পরিবারের আদি নিবাস ঢাকা (মুন্সীগঞ্জ) বিক্রমপুরের পাইকপাড়া। তাঁদের রান্নার কৌশল কুমিল্লা অঞ্চল থেকে আলাদা। বিশেষত সরিষা দিয়ে কাসুন্দি তৈরি করা, কাউনের চাল দিয়ে পায়েস বানানো, আতপ চাউলের গুড়া দিয়ে নানা ধরনের পিঠা-পুলি তৈরি করা, আউশের চাউলের ফেনাভাত খাওয়া, গ্রাম থেকে মোটা চাউল এনে দিলে তা ভেজে গুড়া করে মশলা দিয়ে ছাতু তৈরি করা ইত্যাদি। আমি গ্রামের বাড়ি গেলে তা নিয়ে আসতে হতো।
    ইলিশ মাছের কতধরনের রান্না- তা তো জানতাম না। বাড়িতেও কেউ রান্না করতে পারত না। বর্ষাকালে মাঝে মাঝে ইলিশের নৌকা হাটবারে আসত। একটি মাছ যেন বাধ্য হয়ে বাবা কিনে নিতেন, সাথে কাঁচাকলা। ইলিশের রান্না হলে বাড়িটি গন্ধে মউ মউ হয়ে যেত। বাড়ির সকলেই বুঝে যেত। ইলিশের ছোট্ট টুকরার ভাজা, সাথে ইলিশের তেল, কাঁচাকলা দিয়ে ইলিশের ঝোল এবং অন্যদিন মাথা দিয়ে কুমড় বা লাউ তরকারি-একেবারে তৃপ্তিদায়ক ভুড়িভোজ। কিন্তু গুহবাড়িতে সর্ষে ইলিশ, ভ্যাপে ইলিশ, বেগুন বা কুমড় দিয়ে ইলিশের ঝোল, ইলিশের দু’পেয়াজি, ইলিশের চরচরি, ইলিশের মাথার সাথে কচুর লতা (লতি) দিয়ে একধরনের তেল চরচরি ইত্যাদি।
    আজ ভাবতে অবাক হই, গ্রামে আমি পারিবারিক বা নিমন্ত্রণে যে সকল মাছ বা সবজির তরকারি খেয়েছি, তাতে কোনো বৈচিত্র্য ছিল না। কিন্তু গুহ-পরিবারে থাকতে এসে আমার রুচিই পাল্টে গিয়েছিল। তখনই বুঝে গেলাম, রান্নাও একটা শিল্প। জেনে গেলাম অধ্যাপক অজিতকুমার গুহ একজন বিখ্যাত রন্ধনশিল্পী। পরবর্তীতে তার সাক্ষ্য পেয়েছি বহুবার, বহুক্ষেত্রে।
    আমি ব্যক্তিগতভাবে ভোজন বিলাসী নই। কিন্তু বিয়ের পর আমার স্ত্রী নানা ধরনের আধুনিক রান্না শিখেছিলেন। তিনি বিয়ের পর গুহপরিবারে প্রায় একবছর ছিলেন, তখন আন্তরিকভাবে রান্না কাজে মনোযোগী হয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। ফলে আমার পরিবারের সনাতনী রান্না পদ্ধতি পাল্টে যায়। কলেজে শিক্ষকতা করি, সীমিত আয়ের মধ্যেও রুচিকর খাওয়া-দাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। এধারা এখনও অব্যাহত।
    যুগের হাওয়া বলে কথা। এখন পারিবারিক রান্নায় নানা প্রকারের মাছ-মাংস-সবজির ম্যানু (পদ) থাকে। চার/পাঁচ প্রকারের না হলে যেন খাওয়াই হয় না। অতিথি অভ্যাগত হলে দই-মিষ্টি বাড়তি, সকালের নাস্তায় খিচুড়ি, রুটি-তরকারি-ডিম। এ পরিবর্তনটা প্রতিটি পরিবারেই এসেছে। পান্তা ভাত বা চিড়ামুড়ি দিয়ে কেউ এখন নাস্তা করে না।
    শহরে সম্ভ্রান্ত পরিবারের কেউ মারা গেলে তাঁর স্মরণ-উৎসবে লুচি-আলুর দম-বুটের ডাল-চাট্নি-দই-মিষ্টি পরিবেশন হতো। এখন তা পাল্টে গেছে। সর্বাবস্থায় রাজসিক খাবারের আয়োজন সামর্থ অনুযায়ী বা মর্যাদা রক্ষার্থে-বাহারি সব বিষয়-আশয়। বোঝা যায় না, অনুষ্ঠানটি বিয়ের, না অন্নপ্রাশনের অথবা শ্রাদ্ধবিষয়ক। আনন্দ-বেদনা খাবারের বেলায় এক আসনে আসীন। আগে পর্ব অনুযায়ী খাওয়ার ম্যানু (পদ) তৈরি হতো। বোঝা যেত-কোনটি আনন্দ-উৎসবের, কোনটি নিতান্ত ঘরোয়া এবং দুঃখ বেদনার।
    ‘খাদ্য’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো জীবনধারণ ও দেহের পুষ্টি সাধনের জন্য অপরিহার্য ভোজ্যবস্তু। ছোটবেলায় যে খাদ্য খেয়েছি, তাতে জীবনধারণ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আহার্য অর্থাৎ খাদ্যদ্রব্য বা ভোজ্যবস্তু কতটা ছিল, দেহের পুষ্টিসাধনে কতটুকু সহায়ক ছিল তা জানি না। যা পেয়েছি, তা-ই খেয়েছি। সবকিছুই স্বাদে-আহলাদেই খেয়েছি, পেট ভরলেই তৃপ্তি পেয়েছি। তাকে ভোজন বা ভক্ষণ হিসেবেই ধরে নেয়া যায়। ভোজ্য অর্থাৎ খাওয়ার যোগ্য হলেই চলত।
    সময় পাল্টে গেছে। একসময় নিমন্ত্রণ পেলে মনটা আনন্দে নেচে উঠত। এখন ভয় পাই। তা কী বয়সের কারণে, না নিজ গৃহে খাবারের আয়োজন মানসম্মত হওয়ায়? এখন তো অনেক ভালো ভালো খাবার পাওয়া যায়, ক্রয় করবার সামর্থও আছে। দেহের যে পরম শক্র জিহ্বা, সে তো সদা প্রস্তুত স্বাদ নিতে। কিন্তু শুধু বাধা আর বাধা। তাহলে বাঁচব কিভাবে? আপ্তবাক্য হলো-‘মানুষ খেয়ে মরে, না খেয়ে বাঁচে’। কথাটার ব্যাখ্যা হলো-পরিমিত আহার গ্রহণ, শরীরের উপযোগী আহার্যবস্তু গ্রহণ, বয়সের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেঁচে থাকার জন্য খাবার গ্রহণ। বাঁচতে গেলে খেতে হবে, তবে বাঁচার জন্য যতটুকু দরকার ততটুকু। একসময় পোলাও-বিরানী-মাংস অঢেল খেয়েছি, তখন এগুলো ছিল দুলর্ভ। এখন সহজলভ্য, অথচ নিষেধের বেড়াজাল দিয়ে ঢাকা। তখন মনে হয়-অভাবের সময়টাই ভালো ছিল। ছোটবেলার অখাদ্য-কুখাদ্যই ছিল অমৃতসমান। সে সময়ের খাওয়ায় যে তৃপ্তি পেয়েছি, মুখরোচক খাদ্যে সে স্বাদ পেলাম কই? তখনই প্রশ্ন জাগে-খাদ্যগ্রহণে মন ভরে, না পেট ভরে?
তবে যে কথাটি কবি জসীম উদ্দীন বলেছেন, তা যতই কাব্যিক হোক, গ্রামবাংলার মানুষের অন্ত:করণের যে আন্তরিকতা অকৃত্রিম ছিল বা আছে, তা অবশ্যই দুলর্ভ। তিনি যখন কবিতায় বলেন-
আমার বাড়ি যাইও ভোমর
বসতে দেব পিঁড়ে,
জলপান যে করতে দেব
শালি ধানের চিঁড়ে।

শালি ধানের চিঁড়ে দেব,
বিন্নি ধানের খই,
বাড়ির গাছের কবরী কলা,
গামছা-বাঁধা দই।

আম-কাঁঠালের বনের ধারে
শুয়ো আঁচল পাতি,
গাছের শাখা দুলিয়ে বাতাস
করব সারা রাতি।