ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
জীবনবোধ ও জীবনদর্শন
Published : Wednesday, 27 July, 2022 at 12:00 AM
জীবনবোধ ও জীবনদর্শনজুলফিকার নিউটন ||
চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীতে ১৯৮৪ সালে কাজানজাকিস’ এর সেন্ট ফ্রান্সিস আসিসির জীবনী গ্রন্থটি পড়তে শুরু করি। আসিসির জীবনের ত্যাগ, আত্মসমর্পণ এবং ভালবাসা যে অসাধারণভাবে বিদ্যমান ছিল তার একটি পরিচয়লিপি এ গ্রন্থটিতে আছে। এটি একটি জীবনী উপন্যাস। উপন্যাসের পরিধিতে এবং গঠন পদ্ধতিতে একটি ত্যাগের এবং আত্মনিবেদনের অসাধারণ ব্যঞ্জনা গ্রন্থটিতে আছে। উপন্যাস পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, বিধাতাকে পেতে হলে সর্বস্ব ত্যাগের মধ্য দিয়ে তাকে পেতে হয়। জীবনে চাঞ্চল্য থাকে, নানাবিধ আকর্ষণ থাকে এবং নানাবিধ ইচ্ছার আহ্বান থাকে। এ সমস্ত কিছুকে অগ্রাহ্য করে একটি নিবেদনের মধ্যে নিজেকে একাগ্র করা অত্যন্ত কঠিন। সেই নিবেদনের চিত্র এই গ্রন্থটিতে আছে।
কোন কোন পর্বে ইসলামের মধ্যে আমরা এই বিনয় এবং বিচিত্ততার অনেক নিদর্শন পাই। আল্লাহ তায়ালা কোরান শরীফে বলেছেন, “মহান করুণা প্রবণের দাস তারাই, যারা মৃত্তিকার উপর বিনম্র চরণে হাঁটে।” যে ব্যক্তি আল্লাহকে অনুসন্ধান করে সে তার প্রতিটি পদক্ষেপের সময় চিন্তা করে যে তার এ পদক্ষেপ আল্লাহর সপক্ষে না বিপক্ষে। যদি এ পদক্ষেপ আল্লাহর বিপক্ষে হয়, অন্য পক্ষে পদক্ষেপ যদি আল্লাহর সপক্ষে হয়, তখন সে আনন্দের সঙ্গে সে পদক্ষেপ আরও দ্রুততর করে। সূফী দাউদ তাই’ সম্পর্কে কথিত আছে যে তিনি একবার ওষুধ গ্রহণ করেছিলেন। চিকিৎসক তাকে বললেন, “আপনি এ ওষুধটা দ্রুত কার্যকর হওয়ার জন্য একটু হাঁটুন।” দাউদ উত্তর করলেন, “আমি এ ভেবে লজ্জিত হচ্ছি যে শেষ বিচারের দিন আল্লাহ যখন আমাকে জিজ্ঞেস করবেন আমি কেন ব্যক্তিগত স্বার্থে পদচারণা করেছিলাম, তখন আমার উত্তর দেবার কিছু থাকবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।” যিনি সাধনা করেন, আল্লাহর প্রতি যার আকর্ষণ প্রবল এবং যিনি পার্থিব সম্পদের জন্য ব্যাকুল না তিনি পথ চলবেন ধীরে এবং বিনম্র পদক্ষেপে, তার শিরোদেশ আনত থাকবে এবং তিনি সম্মুখ ছাড়া অন্য কোন দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না। যদি কারও সঙ্গে পথে তার দেখা হয়, তিনি সরে যাবেন না। তিনি তার সঙ্গে কুশল জিজ্ঞাসায় মিলিত হবেন। আবার তিনি যদি অনেকের সঙ্গে হাঁটেন তাহলে অন্য সকলকে পিছনে ফেলে তিনি এগিয়ে যাবেন না। কেননা এতে অহমিকা প্রকাশ পায়। আবার অন্য সবার পেছনেও থাকবেন না, কেননা অতিরিক্ত বিনয়ও চিত্তের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত বিনয়ও এক ধরনের স্পর্ধার মত। মানুষকে পথ হাঁটতে হবে শব্দহীন পদচারণায়, দ্রুতগতি কারও কাম্য হওয়া উচিত নয়। সেজন্যই সূফীরা বলেন, “আমাকে এমনভাবে পথ চলতে হবে যাতে কেউ আমাকে প্রশ্ন করলে আমি যেন উত্তর দিতে পারি যে আমি আল্লাহর পথে যাচ্ছি। আল্লাহই আমার পথনির্দেশ দেবেন। যথার্থ পদক্ষেপ যথার্থ চিন্তা থেকে আসে। আল্লাহকে নিকটে রেখে অর্থাৎ তার সান্নিধ্য অনুভবে রেখে আমাদের পথ চলতে হবে। তাছাড়া, পৃথিবীর মাটিও তো আল্লাহর সৃষ্টি এবং এ মাটিতে পা রাখতে হবে শ্রদ্ধার সঙ্গে, বিনয়ের সঙ্গে এবং মহিমময় সানন্দ স্বীকৃতিতে। কাজানজাকিস’এর উপন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে আমি এ কথাগুলো বললাম। এ উপন্যাসের মধ্যে সানফ্রংন্সিসের ক্ষুধা সহ্য করবার বিবরণ আছে।
ক্ষুধা মানুষের বুদ্ধিকে তীক্ষ করে এবং তার মন, এবং স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। রসূলে খোদা বলেছেন, “তোমার উদরকে ক্ষুধার্ত রাখ এবং তুমি তৃষ্ণার্ত থাক এবং তোমার শরীরকে বস্তুশূন্য রাখ, যেন তোমার হৃদয় এ পৃথিবীতে আল্লাহর দর্শন লাভ করতে পারে।” এর অর্থ হচ্ছে প্রচুর আহার্য গ্রহণ করলে তৃপ্তিতে মানুষের ক্লান্তি আসে এবং তৃষ্ণা নিবারিত থাকলে মানুষ নিশ্চিন্ত থাকে, উজ্জ্বল বস্ত্র পরিধান করলে অহমিকা জাগে এবং তখন সে অবস্থায় আল্লাহর চিন্তা মানুষের চিত্তে স্থান পায় না। সুতরাং মানুষ যখন অহমিকাকূন্য হবে, বস্ত্রের অভিমান থাকবে না এবং আহার্যের পরিতৃপ্তি থাকবে না, তখন সে আল্লাহর কথা ভাববে। ক্ষুধা যদিও শরীরের জন্য ক্ষতিকর কিন্তু ক্ষুধা আত্মাকে পরিচ্ছন্ন করে এবং সেই পরিচ্ছন্ন আত্মা আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হয়। ইতর প্রাণীর স্বভাব হচ্ছে সর্বমুহূর্তে খাদ্য গ্রহণে ব্যস্ত থাকা। আমরা সর্বদাই লক্ষ্য করি প্রাণিকুল খাদ্য সন্ধানে ও খাদ্য গ্রহণে সদা ব্যতিব্যস্ত। কিন্তু মানুষ তো ইতর প্রাণী নয়, সে সমৃদ্ধ মানসের অধিকারী, সুতরাং খাদ্যের জন্য ব্যাকুল সে সতত থাকবে এটা কাম্য নয়। যে ব্যক্তি খাদ্য গ্রহণ করে শরীরকে সজীব রাখতে চায়, আবার যে ব্যক্তি ক্ষুধাকে লালন করে চিত্তবৃত্তির সমৃদ্ধি চায়, এ দুইয়ের মধ্যে বিপুল পার্থক্য রয়েছে। প্রাচীন আরবীতে একটি প্রবাদ আছে, “কোন মানুষ বাঁচবার জন্য খাদ্য গ্রহণ করে, আবার কোন মানুষ খাদ্য গ্রহণ করবার জন্য বাচে। প্রথম মানুষ আদম, স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন লোভের জন্য।”
সূফী তত্ত্বজ্ঞরা বলেন যে খাদ্য গ্রহণের ইচ্ছা আছে, সেই ইচ্ছাকে জাগ্রত রেখে খাদ্যগ্রহণ করছে না, এরকম ক্ষুধা তাৎপর্যহীন। খাদ্যগ্রহণের লোভ যখন থাকবে না, তখনই মানুষ ক্ষুধা-পিপাসায় কাতরতার উর্ধ্বে উঠবে। তারা আরও বলেন, “মানুষ তখনই ঘুমোতে যাবে যখন নিদ্রা তাকে জয় করবে এবং তখনই কথা বলবে যখন কথা না বলে সে পারবে না এবং তখনই আহার্য গ্রহণ করবে যখন অনশনে সে পীড়িত।” সূফী তত্ত্ববিদরা ক্ষুধার্ত হওয়াটাকে সাধনার অঙ্গ হিসাবে বিবেচনা করেছেন এবং সেজন্য এর একটি নীতিনির্ধারণ করেছেন। এভাবে সাধনার অঙ্গ হিসাবে যে অনশন, তাকে তারা ফাকা বলেছেন। তাঁরা বলেন যে যিনি সাদিক অর্থাৎ যার সাধনায় আন্তরিকতা আছে, তিনি দু’দিন দু'রাত্রি খাদ্যগ্রহণ করবেন না। কেউ কেউ আরও নিষ্ঠুর অনুশাসন বেঁধে দিয়েছেন। তারা বলেছেন, “৪০ দিনে মাত্র একবার খাদ্য গ্রহণ করবেন। তারা অনশনের জন্য এ ব্যাখ্যা দেন যে অনশন হচ্ছে এক ধরনের ব্রত বা সাধনা। খাদ্য গ্রহণ করে পরিতৃপ্ত হয়ে আমরা আমাদের নিম্নস্তরের অনুভূতিগুলোকে লালন করি কিন্তু খাদ্য গ্রহণ না করে আমরা আমাদের উচ্চস্তরের অনুভূতিগুলোকে জাগ্রত করি।” মনে রাখতে হবে ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হয়ে যে সাহায্যের জন্য হস্ত প্রসারণ করে সে কিন্তু সাধক নয়, সাধক হচ্ছেন তিনি খাদ্যের প্রতি যার কোনও মোহ নেই, যার কোনও আকাঙ্ক্ষা নেই, যিনি তার দুর্বল প্রবৃত্তিগুলোকে শাসনে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। আবুল আব্বাস বলেছেন, “আমার আনুগত্য এবং অনানুগত্য নির্ভর করে দুটো রুটির ওপর, যখন আমি রুটি গ্রহণ করি তখন আমি পাপকে নিকটে দেখি এবং যখন আমি রুটি গ্রহণ করি না, তখন আমি পুণ্যের স্বাদ পাই। আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন হওয়া যাকে সূফীরা বলেছেন মুশাহাদাত’ তা তখনই সম্ভব হবে, যখন আমরা মুশাহাদাতের মধ্য দিয়ে যাব। মুশহাদাতের অর্থ হচ্ছে কষ্ট সহ্য করা।
ক্ষুধার একটি তত্ত্বগত ব্যাখ্যা আছে। সাধনার জন্য কামনাকে শাসনে রেখে এবং চিত্তের প্রবৃত্তিগুলোকে অস্বীকার করে যে জীবন যাপন তার দিকে লক্ষ্য রেখেই সূফীরা ক্ষুধার কথা বলেছেন। শরীরকে সম্পূর্ণ লাঞ্ছিত করে ক্ষুধার্ত থাকলে সাধনার পথ সুগম হয় না। সুতরাং সূফীদের ক্ষুধা সম্পর্কে প্রদত্ত ব্যাখ্যাকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে।
শিল্প সম্পর্কে আমরা অনেক সময় অনেক কথা শুনি, ছবিও আমরা দেখি, ছবির প্রশংসা বিভিন্ন লোকের মুখে শুনতে পাই, আবার ছবি বুঝতে পারি না এমন কথাও অনেকের মুখে উচ্চারিত হয়। কিন্তু শিল্পকর্ম যথার্থ যে কি, কোন কোন উপাদান দিয়ে চিত্র তৈরি হয় এবং শিল্পী কোন দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দেখেন এটা যারা শিল্প উপভোগ করতে চান তাদের জন্য একান্ত প্রয়োজন।
শিল্পী যে দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দেখছেন, অবিকল সে দৃষ্টি আমার না থাকতে পারে কিন্তু আমি যদি অনুভব না করতে পারি শিল্পী কি দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দেখছেন, তাহলে শিল্পীর সৃষ্টিকে আমি প্রশংসা করতে পারব না। এটা সম্ভবপর নয়। মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে তার দৃষ্টির বৈভব। আমাদের চোখ আছে, আমরা চেয়ে দেখি, কিন্তু আমরা জন্মসূত্রেই দৃষ্টিকে পাই না। যেমন আমরা জন্মসূত্রেই ভাষাকে পাই না। একটি শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন সে তার ভাষার অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তেমনি সে দৃষ্টির অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে অর্থাৎ তার ভাষা প্রকাশের ক্ষমতা থাকে এবং দেখবার ক্ষমতা থাকে। কথা বলার ক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এবং ক্রমান্বয়ে সে যখন বড় হয়, বিভিন্ন। লোকের সংস্পর্শে আসে, মানুষের উচ্চারণ শোনে, সেগুলো সে অনুকরণ করে। ক্রমান্বয়ে বুদ্ধিবৃত্তি যখন তার সজীব হয় তখন সে যথার্থভাবে যুক্তিসঙ্গতভাবে কথা বলতে শেখে। তেমনি দৃষ্টির ক্ষেত্রেই একথা সত্য। অর্থাৎ প্রথমে শিশু যা দেখে সে দেখার অর্থ হচ্ছে-বস্তুকে চিহ্নিতকরণ। এটা ক্রমশঃ প্রবল আকার ধারণ করে। শিশু প্রথমে তার মাকে চিনতে শেখে যে একান্তভাবে তার ঘনিষ্ঠ, সে পিতাকে চিনতে শেখে এবং অবশেষে ক্রমান্বয়ে মাতার সঙ্গে অন্য মহিলার পার্থক্যও সে নির্ণয় করতে শেখে। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে সে যে মাকে চিনে ফেলছে তা নয় কিন্তু ক্রমান্বয়ে ঐ দৃষ্টির অধিকারটা সে লাভ করতে থাকে। এভাবে দৃষ্টির অধিকার লাভ করে সে মানুষ দেখতে শেখে। অর্থাৎ পরবর্তী পর্যায়ে একজন যখন শিল্পী হবে তখন শিল্পীকে মনে রাখতে হবে যে শুধু দৃষ্টির অধিকার নিয়েই নয়, দেখার ক্ষমতা নিয়েই নয়, দেখবার বস্তু নির্ণয় করা এবং অবশেষে যথার্থ দৃষ্টি দিয়ে দেখা, এটাই হলো শিল্পীর প্রধান কর্ম।