চিরায়ত সাহিত্য
(তাঁর) কবিতা নিয়ে কোনও সমালোচকের মন্তব্যের সূত্রেজীবনানন্দ দাশ ||
১. রামেন্দ্র দেশমুখ্য’র বই রিভিউ করতে গিয়ে নীরেনবাবু বলেছেন : ‘জীবনানন্দ দাশ’এর আত্মঘাতী ক্লান্তি থেকে তিনি মুক্ত। ‘আত্মঘাতী ক্লান্তি আমার কবিতার প্রধান আবহাওয়া নয়, কোনও দিনই ছিল বলে মনে পড়ে না। আত্মঘাতী ক্লান্তির অভিযােগ প্রতিষ্ঠা করবার জন্য তিনি লাস কাটা ঘর’এর কবিতাটি বেছে বের করেছেন। এ-কবিতাটি প্রায় ১২/১৪ বছর আগে রচিত হয়েছিল। কবিতাটি ংঁনলবপঃরাবনয়, কবিতাটি ফৎধসধঃরপ ৎবঢ়ৎবংবহঃধঃরড়হ মাত্র;কবিতাটি পড়লেই তা বোঝা যায়। ঐধসষবঃ বা খবধৎ বা গধপনবঃযএর ‘আত্মঘাতী ক্লান্তি’র সঙ্গে শেক্সপীয়র’এর যা সম্পর্ক ও কবিতার ক্লান্তির সঙ্গে লেখকের সম্পর্কটুকুও সেই রকম। কবিতাটিতে ংঁনলবপঃরাব হড়ঃব শেষের দিকে ফুটেছে; কিন্তু সে তো লাসকাটা ঘর’এর ক্লান্তির বাইরে-অনেক দূরে-প্রকৃতির প্রাচুর্যের ও ইতিহাসের প্রাণ-শক্তির সঙ্গে একাত্ম করে আনন্দিত করে রেখেছে কবিকে। তবু নীরেনবাবু লাস কাটা ঘর’এর নায়ককে নায়কের স্রষ্টার সঙ্গে ওতপ্রোত করে না জড়িয়ে কবিতাটি আস্বাদ করতে পারেননা মনে হয়। তিনি কি শেক্সপীয়র’এর গধপনবঃয বা ইধৎফড়ষঢ়য, উড়মনবৎৎু বা এড়ষনং মনে করেন?
তা ছাড়া লাস-কাটা ঘর’এর কবিতাটিকে তো আমার সমগ্র কাব্যের একটি শ্রেষ্ঠ ৎবঢ়ৎবংবহঃধঃরাব হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। ঐ কবিতাটির নিকষে আমার সমস্ত কাব্য অধ্যয়ন করতে যাওয়া ভুল।
২.
‘আত্মঘাতী ক্লান্তি’ বা আজকের যুগের যে-কোনও রকম ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে হলে শুধু ‘আশাবাদী মনোভাব’ কবচের মতন যে-কোনও জ্ঞান-বিজ্ঞানালয় থেকে কিনে আনলে চলবে না। সে-মনোভাব আশাবাদী হতে পারে, কিন্তু তা আরোপিত ও আড়ষ্ট-স্বাভাবিক ও সর্বজনীন নয়। প্রচুর হয়েছে শস্য, কেটে গেছে মরণের ভয়’। বালভাষিত, কিন্তু কবিতা নয়, শস্য প্রচুর হলেই ‘মরণের ভয়’ কেটে যায় না আজকের এই জটিল শতাব্দীতে, শিশুকে এ কথা কে বোঝাবে? নীরেনবাবু হয়তো মনে করেন এ-রকম কতকগুলো লাইন লিখতে পারলেই কবিতা হয়, আশাবাদী মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায় এবং আত্মঘাতী ক্লান্তির থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব; বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিরও উদয় হয়। কিন্তু স্বর্গের সিঁড়ি এত সোজা নয়।
৩.
আধুনিক কবিতায় যে-‘আমি’র ব্যবহার করা হয়-যেমন ‘ইতিহাসযান’এ একটু-আধটু করেছি-সে-‘আমি’-যে কবির নিজের ব্যক্তিগত সত্তা মোটেই নয়, কবি-মানসের কাছে সমাজের ও কালের রূপ যেভাবে ধরা পড়েছে তারই প্রতিভূ-সত্তা আধুনিক কাব্য পড়বার সময় অনেক আলোচকই তা মনে রাখেন। না; ফলে ‘ইতিহাসযান’এর জায়গায়-জায়গায় যে-ক্লান্তিÍআত্মঘাতী কিনা জানি-সে-সব কবির নিজেরই ব্যক্তিগত ক্লান্তি মনে করে ওঁরা কবিতা পাঠ করতে পারেন। কিন্তু এ-রকম কাব্যপাঠ সমালোচকদের নির্বিচার আত্মপ্রসাদ ছাড়া আর কিছুই নয়।
৪.
জ্ঞান-বিজ্ঞানালয়ের প্রাচুর্য আজকাল অনেক। ওরা প্রত্যেকেই বিজ্ঞানী ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির মালিক। কবি তা জানে। নিজেও সে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি মেনেই চলে; না হলে সে কবি হিসেবে দাঁড়াতে পারত না। কিন্তু এ-বিজ্ঞান প্লাকার্ড-মারা বড় বড় সাইনবোর্ড টানানো ফলিত বিজ্ঞানের নগরীর থেকে গৃহীত হয় না-এ-বিজ্ঞানকে ইতিহাস, সমাজ ও অর্থনীতির গতি-পরিণতির মর্ম হৃদয়ঙ্গম করে স্থিত করতে হয়েছে কবিমানসের ভিতর; আমি বলেছি কবিমানসের ভিতর;সাধারণ যুক্তিবাদী মনের ভিতরে উপরােক্ত গতি-পরিণতির ধারা স্থিরীকৃত হয়ে ক্রমপরিণত জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমর্থন পায় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিরীতির প্রচলনে; কিন্তু এই অন্য রূপ মানসের সম্পর্কে এসে হয়ে ওঠে কবিতা, সমর্থন পায় ারংরড়হ এ উজ্জ্বল কবিদৃষ্টির উৎসারণে।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করলেই কবিতা আশাবাদী হয়ে ওঠে একথা মনে করা ভুল। অৎহড়ষফ'এর সে-যুগের উপযোগী বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিশক্তি ছিল, কিন্তু তার কবিতা নিরাশাবাদী, অথচ ভধপরষব আশাবাদের চেয়ে তা কত উন্নত ও সংহত। মহৎ গ্রীক কবিদের কাব্যে নীরেনবাবুর আশাবাদ কোথায় ? এৎববশ ঞৎধমবফু’তে তখনকার শতাব্দীসহ পরম বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিপ্রতিভারই-বা অভাব কোথায়? রবীন্দ্রনাথ’এর শেষ লেখার দৃষ্টিনীতি সবচেয়ে বেশি আধুনিক, বৈজ্ঞানিক; বইয়ের ১১নং-এর মহান কবিতাটি নীরেনবাবুর আশাবাদে সংশোধিত হতে পারল না; না হয়ে ভ লোই হয়েছে: আমরা বিজ্ঞান ও কবিতা সবই পেয়েছি। ঊষরড়ঃ অগস্ত্যর নীতি অবলম্বন করে পান করেছেন বিজ্ঞান-দৃষ্টিরীতি অবৈজ্ঞানিক হয়ে উঠেছে কে বলবে?-কিন্তু কবিতা তার প্রচুর হয়েছে শস্য কেটে গেছে মরণের ভয়’এর চেয়ে বড় নিরাশাবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এতই তা উজ্জ্বল ও আন্তরিক যে, তাকে আশাবাদ ছাড়া কী আর বলতে পারা যায়।
আধুনিক অনেক সমালোচকই কতকগুলো শব্দ, বাক্য ও স্লোগানের দাস-মাত্র, যুক্তিবিচার ও অন্তদৃষ্টির ধার ধারেন না। “আশাবাদ’, আশাবাদী মনোভাব, ‘বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি’ ইত্যাদির ছেলেমানুষি বাজারি অর্থ ঘুচিয়ে প্রত্যেক বিশিষ্ট কবির সম্পর্কে তাদের কবিতার প্রতিভানুষঙ্গে ব্যবস্থিত হয়ে এঁদের যথার্থ সত্য সংজ্ঞা লাভ করা প্রয়োজন। এর মানে এ নয় যে, কবিতার ভাবপ্রতিভাই সব, বৈজ্ঞানিক চেতনা অবান্তর; তা নয়; বৈজ্ঞানিক ও নানা শ্রেষ্ঠ চেতনার ভিতর থেকেই মহৎ কবিতা জন্মলাভ করছে। সে কবিতা যদি আগামী প্রভাতের সূর্যসমাজ ঘোষণা করে তবে ভালোই। কিন্তু এ-ঘোষণা কাব্যশরীরী হয়ে এসেছে। বলেই এর ঔৎকর্ষ; এ-ঘোষণা রয়েছে, কাব্য নেই-তার কী মূল্য? এ-ঘোষণা নেই, অন্য ঘোষণা রয়েছে কাব্যাত্মক হয়ে-এরও শ্রেষ্ঠ মূল্য।
জ্যৈষ্ঠের পূর্বাশায় একটি কবিতার বইএর আলোচনা-প্রসঙ্গে সমালোচক শ্রী নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী জীবনানন্দ দাশ’এর কবিতা সম্বন্ধে একটি কথা বলেছেন যা সমর্থনযোগ্য নয়। সমালোচকের ব্যক্তিগত মতামতের কণ্ঠরোধ করা অনুচিত, কিন্তু তার প্রতিবাদ যদি সম্ভব হয় তবে তা জানিয়ে রাখা উচিত। জীবনানন্দ স্বয়ং সে-প্রতিবাদ করেছেন, তার প্রতিবাদ প্রতিবাদ-মাত্র নয়-এ-যুগের কবিতার উপর একটি সুন্দর, সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ।-পূর্বাশা সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য’র মন্তব্য।
নদীমাতৃক
আরিফুল হাসান ||
দুঃখগুলো ফুরিয়ে গেলে আমাদের আর কী বলার থাকে? আমরা তিনজন চুপচাপ বসে থাকি গোমতির পাড়ে।
গোমতির এ পাড়টা ঝোঁপঝাড় আর কাঁটাগাছে ভরা। স্থানীয়রা এদিকটায় আসে না। তবু দুয়েকটা পাতাকুড়ানি মেয়ে বাঁশঝাড়ের তলা ঝাড়ু দিয়ে বস্তায় পাতা ভরে। আলের কাছে তাদের মা হয়তো এ পাতা দিয়ে আগুন ধরায়। চুলায় সেদ্ধ হতে থাকে ন্যায্যমূল্যের মোটা ভাত। আমরা আঁড় চোখে পাতাকুড়ানি মেয়েদেরকে দেখি। আমাদের মধ্যে আলমাস একটি মাটির ঢেলা ছুড়ে মারে গোমতির জলে। ছোট্ট একটি ঢেউ তুলে সেটি টুপ করে ডুবে যায়। কিন্তু তার অনুরণন থাকে বহুক্ষণ। মাঘের শেষ, নইলে স্রোতের তোড়ে ঢেলা নিক্ষেপের ফলে তৈরি ঢেউয়ের বৃত্তটি এতক্ষণে স্রোতের তোড়ে ভেসে যেত। নদী হচ্ছে স্রোত, বুঝলি সাইফুল, নদীর অপর নামই স্রোত। স্রোত না থাকলে নদী মরে যায়। তখন এক টুকরো মাটির ঢেলার আঘাতই নদীবক্ষে রসিয়ে রসিয়ে ব্যাথা দেয়। এই দেখ না, কেমন টুপ করে ডুবে গেলো ঢেলাটি, কিন্তু তার রণন পেছনে ছেয়ে আছে বহুক্ষণ। দূরে একটি বালু তোলার ট্রলার নির্জনতাকে ফালাফালা করে কেটে যাচ্ছে। বিকেলের মৃদুমন্দ বাতাসে আলমাসের নদী সম্পর্কে বক্তব্য শোনে আমরাও আমাদের ভেতরে একটি মরা নদী অনুভব করি।
শীত চলে যাচ্ছে। বসন্ত আসি আসি করেও কিছুটা বিলম্ব করছে। তবু এই বিকেলের আবহাওয়ায় গোমতি বিধৌত বাতাস আমাদের কাছে স্বর্গতূল্য মনে হতে থাকে। নাগরিক যন্ত্রণার ধকল, যানজট-জনজট ছিড়ে এই একটুকরো বিকেল আমাদের প্রাণের গানকে জাগিয়ে তুলে। তখন আমরা নদীর সাথে মিশে যেতে থাকি। আর যতই নদীর সাথে মিশে যেতে থাকি ততই আমাদের দুঃখবোধ পালিয়ে যেতে থাকে। যেতে যেতে একসময় মনে হয় এ জীবনে আর দুঃখ নেই। দূঃখ যেনো দূরাগত ছাই। র্ধু ছাই! কিসের আবার দুঃখ মানবজীবনে? তারপরও দুঃখ আসে। আমরা তখন নদীর দুঃখে মগ্ন হই এবং গভীর ভেতরের দেশে একটি মরা নদী হাহাকার করে উঠে।
পাতাকুড়ানি মেয়েদুয়েকটি শনশন করে বাঁশপাতা ঝাড়ু দিয়ে জমাচ্ছে। এদের মধ্যে একজনের বয়েস তেরো কি চৌদ্দ আরেকজনের আঠারো হবে। আঠারো বয়েসের মেয়েটিকে একটু প্রতিবন্ধী প্রতিবন্ধী টাইপ মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে মানে দূর থেকে দেখে আমরা অনুমান করে নিয়েছি। আরেকটি বছর সাতেকের মেয়ে তাদের পেছনে পেছনে দুতিনটি চালের বস্তাজুড়ে দেয়া বড় বস্তাটা টেনে টেনে নিয়ে এগুচ্ছে। তারা শনশন করে ঝাড়ু দিতে দিতে কখনো কখনো আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে আবার কখনো কখনো আমাদের দৃষ্টির খুব কাছে চলে আসছে। আমরা কখনোকখনো তাদের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছি আঁড়ভাবে আবার কখনো কখনো দৃষ্টিকে ফিরিয়ে নিচ্ছি মরাস্রোতের নদীতে। নদীর পানিতে একটা কি মাছ পানির দুচার আঙুল উপরে লাফিয়ে উঠে আবার টুপ করে জলে ডুবে নিমজ্জিত হয়ে যায়। ছোট্টমতন মাছ। সাইফুল বলে, চাপিলা মাছ। এই মাছ লাফানোর মানে খুব শীঘ্রই বৃষ্টি আসবে। আসবে? আমরা আগ্রহে অপেক্ষা করি। সাইফুল বলে, আসবে। আচ্ছা, যদি এই মাঘের শেষাশেষিতে বৃষ্টি হয় তাহলে নাকি ফসলের খুব ভালো হয়? সাইফুল উল্টো আমাদের প্রশ্ন করে বসে। আমরা উত্তর দিবো কোত্থেকে? আমি আলমাসের মুখের দিকে চাই, সেও আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। শেষে আমাদের দুজনের চোখ সাইফুলের মুখের উপর স্থির হলে সে বলে, বাদ দাও এসব কথা। এবার বলো, কি গান শুনতে চাও?
ছলাৎ ছল, ছলাৎ ছল, ছলাৎ ছল। ঘাটের কাছে গল্প বলে নদীর জলÑ সাইফুলের গানে বিকেলটা ভেঙে টুকরো টুকরো হতে থাকে। আমরা পাড়ের গাছপালার মতো স্থির হয়ে যেতে থাকি। নোঙর আঁকি বুকের ভেতর কোনো সমুদ্রে। ক্রমশ সে সমুদ্রের ঢেউ ফেনায় রূপায়িত হয়। ফেনা জমে গাঢ় হতে হতে একসময় একটা দ্বীপের আকৃতি নেয়। আমরা সবুজশূণ্য সে দ্বীপে হাঁটুমুড়ে বসে কাঁদতে থাকি। আমাদের ভেতরের কান্না কেউ দেখে না। অশ্রগুলো পাথর হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। ক্রমশ সে পাথর ভেঙে গুরুগুরু হয়। আর তার থেকে উৎপন্ন হয় মায়াবীজ। মায়াবৃক্ষের নিচে আমরা বসে বসে বিলাপ করি। আমাদের বিলাপের ধ্বনি সাগরপৃষ্টের বুকে কুয়াশা হয়ে সবকিছু ঢেকে দেয়। ক্রমশ আমরা দেখতে পাই গাঢ় কুয়াশার ভেতর আমাদের দ্বীপগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, আমাদের সমুদ্র হারিয়ে যাচ্ছে। অতঃপর নিজেদেরকে হারিয়ে আমরা আবার ফিরে আসি আমাদের গোমতি নদীর পাড়ে। যেখানে স্রোতগুলো মরতে মরতে মন্থর হয়ে গেছে। যেখানে চর পরে পরে গতিপথ বিঘ্নিত হচ্ছে আর আমাদের লোভ সেখানে দখল ও বালি উত্তোলনে মত্তহয়ে পড়ছে।
শন শন শন করে পাতা ঝাড়ছে পাতাকুড়ানি তিনটি মেয়ে। হঠাৎ কি যেনো দেখো ছোট্ট মেয়েটি চিৎকার করে উঠে। আমরা দেখতে পাই, আঠারো বছরের মেয়েটি, যাকে আমরা প্রতিবন্ধি ভেবেছিলাম সে তড়িৎ গতিতে একটি গাছের ডাল ভেঙে বাগিয়ে ধরেছে, আর তার সামনে ফনা তুলে নাচছে একটি ভয়ানক গোখরো।
প্রতিবন্ধীর মতো দেখতে মেয়েটি মোটেও ভয় পাচ্ছে না সাপটিকে। সাপটিও উপায়ন্তর না দেখে যেনো পালাতে ভুলে গেছে। শরীরের অর্ধেকটা একটা মরা ঘাসের ছোফার সাথে পেঁচিয়ে বাকি অর্ধেকটা ফনা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। এ অবস্থা ছোট্ট মেয়েটিকে একটু আগে ভয় দেখালেও এখন সে বেশ আনন্দ পাচ্ছে তাতে। তেরো বছরের মেয়েটিও হাসছে খিলখিল করে। কিশোরিরা হাসলে খুব সুন্দর দেখায়। থাক, হাসুক ওরা। ওদের হাসতে অবকাশ দিয়ে আমরা আবার নদীর দিকে মুখ ফিরাই। আলমাস উঠি উঠি করেও আরেকটু বসে থাকতে চায়। সাইফুলেরও উঠতে মন চায় না। আরেকটু বাদে সূর্য ডুববে। ক্ষীণসোঁতার নদীটির বুকে সূর্যাস্ত দেখলে আমাদের মনে আরও বেশি দুঃখবোধ জাগ্রত হয়। কারবালার লাল টকটকে আভা তখন সমস্ত নদীর পানিটাকে ফুরাতের জল করে তুলে। আমরা দেখতে দেখতে ডুবে যাই। সূর্য ডোবার সাথে সাথে আমরাও ডুবে যাই।
মেয়ে তিনটি বোধয় সাপটিকে নিয়ে এখনো খেলছে। তাদের হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। ছোট মেয়েটি বোধয় বলে উঠেÑ আপা, সাপের মাথায় মণি আছে না? হ হ, আছে তো। মেঝো মেয়েটি বলে। এবার বড় মেয়েটি হাতের লাঠিটিকে শূণ্যে একপাক ঘুরিয়ে বলে, হ, আছে তো; আমিও শুনছি। যাহ! ওসব মিছে কথাÑ মেঝ মেয়েটি বলে। মিছে কথা কি লো, সত্যি সত্যি আছে। ছোটটি মেঝোটির আঁচল হয়তো জড়াতে জড়াতে বলে। সত্যি আছে? মেঝোটির চোখে এবার বিস্ময়। তারা হয়তো তিনজনই বিস্ময়ের চোখে চেয়ে আছে সাপটির দিকে। হয়তো গোখরোর মাথার চক্করটিকেই তারা মণি হিসেবে ভাবছে। বড় মেয়েটিকে বলতে শুনিÑ ওই যে চক্র, ওইহানে থাকে মণি। যা, আন গাÑ মেঝোটি হয়তো বলে। তোর কি জীবন মরনের ভয়ডর নাইÑ বড়টির গলা শোনা যায়। ছোটটি কেঁদে উঠে, আমারে মণি আইনা দাও, আমারে মণি আইনা দাও।
মণি কিরে? ও সব মিছে কথাÑ বড় মেয়েটির কণ্ঠ এবার চড়ে। পাশ থেকে আশ্বাসের সুরে মেঝোটি বলে, আপা, মণি মানে সাত রাজার ধন। একবার পাইতে পারলে জীবনে শুধু সুখ আর সুখ। এবার হয়তো বড় মেয়েটির মনেও অদূর কোনো সুখের ছবি ভাসেÑ সত্যি কইতিছস? মণি পাইলে আর গরিব থাকবো না? গরীব কীরে? রাজা হয়া যামু, রাজাÑ মেঝো মেয়েটির কণ্ঠে উদগ্রীবতা। তখন হয়তো বড় মেয়েটির মনেও কিছু একটা খেলে যায়। সে বলেÑ কিন্তু মণি পাইতে হইলে তো সাপকে জিন্দা ধরতে হইবো। ধরমু ক্যামনে? তুই পারবি আপুÑ মেঝো মেয়েটির কণ্ঠে বিশ্বাস। সত্যি পারবো? হ্যাঁ পারবি। তখন হয়তো বড় মেয়েটি লাঠি ফেলে গোখরোর ফণাটি ঝাপটে ধরতে এগিয়ে যায়। আমরা তিনজন নদীর সোঁতা থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারি না।
মানুষ......................
খললিুর রাহমান শুভ্র ||
মানুষ মারবলে গভীরে সূক্ষ্ম কারুকাজ
আকাশ-পাখ-িফুল-সমুদ্র-প্রবাল
র্কপোরটে সভ্যতায় প্রাগতৈহিাসকি মাল
মূল উপাদান বর্বিতনহীন
মোড়ক সংকলন বান্ধব
মূলত চরম নঃিসঙ্গ দলবদ্ধতা তার সমাজ
সৃজনে জ্ঞানী ধ্বংসে অস্তত্বিনাশী-মূঢ়
গলিে কীটনাশক পঁিপড়কেে শখোয়
বাঁচার বদ্যিা
ঘরাশ্রয়ী কন্তিু পলায়ন বলিাসী
অলৌককিে গরষ্ঠিরে যারপরনাই মুগ্ধতা
র্ধমে জন্মর্বীযরে একচোখা আগুনরঙা সংলাপ
বশ্বিাসে যুক্তহিীন ''বচিার মানি তালগাছ আমার''
প্রমেে নাজুক বরিহে নীল আখ্যান
দখেতে অহংিস্র স্বভাবে সহস্রধারা
পুঁজবিাদ রক্তে স্লোগানে সাম্যবাদী
মানুষ চরিকালরে র্দুবোধ্য সংকতে
বড়শরি কাঁটার ন্যায় জজ্ঞিাসা চহ্নি
গরল-অমৃতরে কড়কড়ে উত্তপ্ত পাত্র
মানুষ গহীন ভালোবাসার মতন এককেটি ক্ষত
০৭।৪।২০২০
কুমল্লিা