ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
জীবনের বন্দিত্বকেই কি আমরা তবে উদযাপন করছি...
Published : Sunday, 24 July, 2022 at 12:00 AM
জীবনের বন্দিত্বকেই কি আমরা তবে উদযাপন করছি...মনজুরুল আজিম পলাশ ||
দৈনন্দিন জীবনে অন্তর্জাল এবং নানা যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের জীবনকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা কি দুদণ্ড সময় নিয়ে আমরা একটু ভাবি! এ সংক্রান্ত আমাদের বেশিরভাগ সক্রিয়তা যে অপ্রয়োজনীয় তা কি একবার আমরা চিন্তা করেছি! আমরা কি মূলত একটা চাপিয়ে দেয়া জীবন যাপন করছি! জীবনের এইসব জঞ্জাল পরিষ্কার করতে করতে জীবনের জন্যে বরাদ্দকৃত মূল সময়টা আমরা হারিয়ে কি বসছি না!
এখন প্রতিদিন কোন না কোন ফোন আসে যা ঠিক আমার প্রয়োজন নয়! কোন এক বিক্রয় প্রতিনিধির সেবা কেমন ছিল তা আমাকে বলতে হবে! পাড়ার সুপারস্টোরে কোন পণ্যে অফার দেয়া হলো তা আমাকে জানানো হবে! অথবা আমাকে অংশগ্রহণ করতে বলা হবে কোন জরিপ কাজে! আমি যে এসব ব্যাপারে অনাগ্রহী এটা জানাতে জানাতেও অনেক সময় নষ্ট হয়ে যাবে! ফোনের টেক্সট ম্যাসেজগুলোও বেশিরভাগ অপ্রয়োজনীয়! আমার অনুমতি না নিয়েই আমাকে ম্যাসেজ পাঠানো হচ্ছে! আমি আগ্রহী কি অনাগ্রহী তা না জেনেই আমাকে সারাদিন ম্যাসেজ দেয়া হচ্ছে! এমনকি মধ্যরাতে ম্যাসেজ আসার শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে! সেই ম্যাসেজগুলো মুছে দিতেও আমাকে প্রচুর সময় ব্যয় করতে হচ্ছে! আর মুছে না দিলে আমার ফোনের জায়গা দখল হচ্ছে বা প্রয়োজনীয় ম্যাসেজ চাপা পরে যাচ্ছে এই সমস্ত অপ্রয়োজনীয় ম্যাসেজ-জঞ্জালে!
প্রতিদিন মেইল খুলেও দেখি বেশিরভাগ অপ্রয়োজনীয় মেইল! কিভাবে কিভাবে যেন আমাদের মেল্ ঠিকানা ছড়িয়ে যাচ্ছে, শেয়ার হচ্ছে! প্রতিদিন যে মেলগুলো আসে তা দেখে অবাক হয়ে যাই! অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় মেলের মধ্য থেকে খুঁজতে থাকি সত্যিকার প্রয়োজনীয় মেল্! অপ্রয়োজনীয় মেলগুলো মুছে দিতেও অনেক সময় নষ্ট হয়! আর এগুলো না মুছলে মেলের জন্যে বরাদ্দকৃত মোট জায়গা (জিবি) ভরাট হতে থাকে! আমি এমন অনেককে জানি যারা মেল্-জঞ্জাল না সরাবার কারণে তাদের মূল মেলাটি-ই আর পরিচালনা করতে পারছিলেন না! দিন দিন এভাবেই আমাদের অনিচ্ছার-অনাগ্রহের মেল্ দিয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে জীবন! এই মেল্ যে আপনি আর পেতে চাননা- সেটাও জানানোর সুযোগ থাকে খুব কম প্রেরক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই! এইরকম দু একটি প্রতিষ্ঠানের মেল্ আমি বন্ধ করতে পারলেও আবার কোত্থেকে শুরু হয় নতুন মেল্-উৎপাত! কোনভাবেই যেন থামানো যাচ্ছেনা এই অনিচ্ছুক মেল্ পাওয়ার যন্ত্রনা!
ফেসবুক পরিচালনায় আমরা কিছুটা পরিমিত-নিয়ন্ত্রিত থাকতে পারলেও ম্যাসেঞ্জারের ম্যাসেজ-উৎপাত কিন্তু বন্ধ করা যায় না কিছুতেই! আমি ম্যাসেঞ্জার খুলে দেখেছি যে আমাদের পাওয়া বেশিরভাগ ম্যাসেজ অপ্রয়োজনীয় এবং অর্থহীন! এর মধ্যে কর্পোরেট এবং সামাজিক ম্যাসেজ দুটোই পরে! অনলাইন স্বাধীনতার সাথে কর্পোরেট ভব্যতার অভাব এবং সামাজিক দ্বায়িত্বহীনতা যোগ হলে যা হয় আমাদের ম্যাসেঞ্জার হচ্ছে তার এক জীবন্ত উদাহরণ! যে কোন উৎসব-পার্বনে ম্যাসেঞ্জারে বয়ে যাবে স্টিকারের বন্যা! গিফ নামক এক ধরণের ঝলমলে-জীবন্ত অক্ষরের সামন্ত রুচির যন্ত্রনাও যুক্ত হয়েছে বেশ কিছুদিন ধরে! যে ম্যাসেঞ্জার এতদিন (অন্তত কিছুদিন) সুন্দর পরিচ্ছন্ন রেখেছিলাম মুহূর্তের মধ্যে তা এলোমেলো-নষ্ট হয়ে যাবে আর একদম তলিয়ে যাবে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাসেজগুলো! পরম যত্নে অনেকটাই বিরক্তিতে প্রচুর সময় নিয়ে এইসব অপ্রয়োজনীয় ম্যাসেজ-স্টিকার-গিফ মুছে মুছে আবার তবে ম্যাসেঞ্জারকে মুক্ত করতে হবে-ফিরে পেতে হবে অপহৃত ম্যাসেঞ্জার!
অর্থাৎ-আমি আসলেই হিসাব করে দেখেছি-প্রতিদিন যে ফোনকল আমরা নিচ্ছি, আমাদের ফোনে যে ম্যাসেজ আসে, প্রতিদিন যে ই-মেল্ আমরা পাচ্ছি, ম্যাসেঞ্জারে যে ম্যাসেজগুলো আমরা পাই-এর বেশিরভাগই হচ্ছে অপ্রয়োজনীয়! এবং এগুলো শুধু মুছে দিয়ে নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখতেই আমাদের প্রচুর সময় নষ্ট হচ্ছে! আর মুছে না দেয়ার ঝামেলা ইতোমধ্যে আলোচনা করেছি! মানে দৈনন্দিন জীবনে অন্তর্জাল এবং যোগাযোগ প্রযুক্তির একজন সামান্য-নিয়মিত ব্যবহারকারী হিসেবে আমাদের উপর এমন এক যোগাযোগ-জীবন চাপিয়ে দেয়া হয়েছে যা আমরা চাইনা! কিন্তু এখানে খুব মজা এবং বিপদের একটা বিষয় কিন্তু থেকে যাচ্ছে! এই চাপিয়ে দেয়া জীবনটা আমাদের অনিচ্ছার ধারাবাহিক চর্চায় হলেও, আমরা এই ব্যাপারে একদম সচেতন নই বলেই-এই চাপিয়ে দেয়া জীবনটাই আমরা মেনে নিচ্ছি এবং এরই সাথে বসবাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি! মানে, একটা ভয়াবহ জীবন বন্দিত্বকেই আমরা অনেকটা উদযাপন করা শিখে গেছি! বিষয়টা চরমভাবে বিপদেরই মজা বৈকি-এতো জীবন বিপন্নতায় অভ্যস্থতা!
সবমিলিয়ে, অপ্রয়োজন-অনিচ্ছার একটা জীবন আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে! এবং এই চাপানোটাকেই আমাদের জীবন হিসাবে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে! কে চাপিয়ে দিলো এই জীবন? এই শত্রু কিন্তু বিমূর্ত নয় একদম! পুঁজিবাদের অসভ্য বাজার সংস্কৃতি এই কাজটা করেছে! এর সাথে যুক্ত হয়েছে সমাজের অবশিষ্ট সামন্ত-গ্রাম্য প্রবণতা! একচেটিয়া এবং দায়িত্বহীনভাবে এরা কাজগুলো করে এবং করেই চলেছে! আমাদের মত অনুন্নত দেশে গ্রাহক অসচেতন-অধিকারহীন পরিবেশে আরো ভয়াবহ এবং রুচিহীনভাবে কাজগুলো হচ্ছে! এদের কাছে মানুষ এখন একাধিক পণ্যের নিছক এক ভোগ-মাধ্যম মাত্র! এদের কাছে মানুষ মানেই ক্রয়-ভোগ করবার এক অবিরাম যান্ত্রিক পদ্ধতি বা সক্ষমতার নাম! মানুষ মানেই ক্রেতা মাত্র! সে-ই বড় মানুষ যার ক্রয় ক্ষমতা বেশি! সুতরাং তার পোস্টবক্স ভর্তি করে দাও সেবা-পণ্যের লিফলেটে, ফোন ব্যস্ত রাখো নানা অফারে, টেক্সট করতে থাকো গরুর মাংস যে দশ টাকা কেজিতে কমলো, ইমেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাঠাতে থাকো প্রতিষ্ঠান-পণ্যের গুনগান, ম্যাসেঞ্জার ভারী-ক্লান্ত করে দাও কর্পোরেট বিজ্ঞাপন আর সামাজিক রুচিহীনতায়! পণ্যে-অফারে মানুষের সবটা দখল করে নাও! পণ্যে পণ্যে মুড়িয়ে মানুষকেও পরিণত কর বড় একটি গ্রাহক-পণ্যে!
এই বৃত্তে আমরা বন্দি থাকবো না এর থেকে কিছুটা হলেও বের হতে চেষ্টা করবো এটা হচ্ছে মৌলিক এক প্রশ্ন! আমরা কি মেনে নেবো তাহলে এই অসভ্য-অভ্যস্ততা যা দিনশেষে আমাকে মানুষ নামের এক অসহায় দাসে পরিণত করে আসলে! আমরা কি আমাদের পোস্টবক্স-ফোন কল আর ম্যাসেজের সময়-জায়গাগুলো এভাবে বিলিয়ে দেব তাদের জন্যে যারা আমাদের কেবল তাদের পণ্যের সেবাদাস বানাতে চায়? আমরা কি আমাদের ইমেলের দখল-স্থান তুলে দেব এই-সব প্রতিষ্ঠানদের যারা আমি না চাইলেও কেবল মেল্ করতেই  চাইবে? আমরা কি এভাবে ম্যাসেঞ্জার খুলে রাখবো কর্পোরেট বিজ্ঞাপন আর সামাজিক অপমানের জন্যে! আমরা কি সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে অপ্রয়োজনীয় এবং অনিচ্ছুকভাবে পাওয়া জঞ্জালগুলো নিয়েই এভাবে সময় কাটাতে বাধ্য হবো?
না, আমি অন্তত হবো না! আমি চিৎকার করে বলবো-এটা ঠিক নয়! আমার অনিচ্ছায় আমাকে কেউ ক্রমাগত ম্যাসেজ বা ইমেল পাঠালে আমি তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক-আইনগত ব্যবস্থা নেবো! আমি নাম না জানা সেই মানুষটার কথা ভাববো যিনি গ্রামীণ ফোনকে বাধ্য করেছিলেন যাবতীয় টেক্সট পাঠানো বন্ধ করতে! আমিও প্রয়োজনে এইসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একটা লিগ্যাল নোটিস বা মামলা ঠুকে দিবো আমার জীবনকে এভাবে দখল-বিপন্ন করবার জন্যে! আমি ঘুরে দাঁড়াবো! আমি বলতে থাকবো-আমার অনিচ্ছায় জীবনটাকে কেউ এভাবে ছিনিয়ে নিতে পারবে না! পৃথিবীতে স্বল্প সময়ের জন্যে পাওয়া আমার এই মহামূল্যবান জীবনটাকে আমি বাজার সংস্কৃতি আর মানুষের রুচিহীনতার খোরাক করতে চাইনা কিছুতেই!
পরিচ্ছন্ন-নির্ভার-নির্জন জীবন আমার অধিকার...