ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
‘কাজ নেই তো খৈ ভাজ’
Published : Tuesday, 19 July, 2022 at 12:00 AM
‘কাজ নেই তো খৈ ভাজ’শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
বিংশ শতাব্দীর আশির দশকের কোনো এক সময়ে ‘অলক্ত’ সম্পাদক তিতাশ চৌধুরীর বাসায় সাহিত্যিকদের এক আড্ডা বসেছিল। এই আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন ভিক্টোরিয়া কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ আবদার রশীদ, তিনি অনুবাদ কর্মের জন্য বাংলা একাডেমির পুরস্কারপ্রাপ্ত। এছাড়া ছড়া, কবিতা ও উপন্যাসও লিখে খ্যাতিমান হয়েছিলেন। উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ আনোয়ারা বেগম (রানু আপা)। তিনি লেখিকা, কৃষ্ণচন্দর ‘গাদ্দার’ ও অন্যান্য বই অনুবাদ করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এছাড়া কবিতা-উপন্যাস ও জীবনীগ্রন্থও লিখেছেন। উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মিন্নাত আলী। তিনি খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক হিসেবে সকলের পরিচিত। তিনিও বাংলা একাডেমির পুরস্কারপ্রাপ্ত। তাঁর ‘আমি দালাল বলছি’ বইটি বহুল পঠিত ও আলোচিত। উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক সরদার জয়েনউদ্দিন। তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক এবং বাংলা একাডেমির পুরস্কারপ্রাপ্ত। উপস্থিত ছিলেন ভিক্টোরিয়া কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি কবি। অধ্যাপক লায়লা নূর, তিনি অলক্ত পত্রিকার নিয়মিত লেখক ও ‘অলক্ত সাহিত্য পরিষদে’র সভাপতি। এই আড্ডায় আমারও উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল।
তিতাশ চৌধুরী তখন রানীর দিঘির দক্ষিণ পাড়ে সুরসাগর হিমাংশু দত্তের বাসার দোতলায় থাকতেন। বাড়িটি সরকারের রিক্যুউজিশান করা সম্পত্তি। নীচতলায় থাকতেন একজন পুলিশের ডিআইবি কর্মকর্তা। তিনি প্রফেসর জোহরা আনিসের ভাসুর। এ বাসায় জোহরা আনিসও বহু বছর বাস করেছিলেন। দোতলাটি তিতাশ চৌধুরী ‘অলক্ত সাহিত্য পরিষদে’র নামে  বরাদ্দ নিয়ে নিজেরা থাকতেন এবং পরিষদের নামে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বার্ষিক পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা অনুদানও সংগ্রহ করতেন। এ বিষয়টি ব্যাপকভাবে কেউ জানতনা, আমরা কতিপয় জানতাম।
আড্ডার মূল বিষয়বস্তু সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং নিজেদের সৃষ্টিশীলতা সম্পর্কে নানা অভিজ্ঞতার মজার যতসব কথাবার্তা। অবশ্যই আমার জন্য দুর্লভ স্মৃতি। ওই আড্ডায় একটি রসালো ঘটনা ঘটে। আনোয়ারা বেগম-কাজী নজরুল ইসলাম- মিন্নাত আলী- তাঁরা তিনজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৫ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম এ পাশ করেছেন। তাঁরা সহপাঠী। আনোয়ারা বেগম যখন কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ, তখন তাঁর বয়স পঞ্চাশোর্ধ। এই বয়সেও তিনি আকর্ষণীয়া ছিলেন এবং যুবতী বয়সে মানুষের মনকে চঞ্চল করার মতো যে সুন্দরী ছিলেন, তা বুঝতে কোনো অসুবিধা হতো না। তাঁর পিতৃনিবাস খুলনা। আড্ডার এক ফাঁকে অধ্যক্ষ মিন্নাত আলী আনোয়ারা বেগমকে বললেন-‘এম এ পরীক্ষার পর দুটি চিঠি লিখে আপনাকে পাঠিয়েছিলাম। তার প্রাপ্তি সংবাদ পাইনি।’ আনোয়ারা বেগম এ বিষয়ে উত্তর দিতে কোনো আমল দেননি বা আগ্রহ দেখালেন না। আমরা এ প্রসঙ্গটি সকলেই শুনলাম। যথারীতি আড্ডা চলছে। এক ফাঁকে মিন্নাত আলী সাহেব পুনরায় এই কথাটি আনোয়ারা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন। তখনই অধ্যক্ষ আবদার রশীদ হাসতে হাসতে বললেন, ‘মিন্নাত আলী সাহেব, এখন উত্তর লিখে জানালে কোনো লাভ বা সুযোগ হবে ?’ আমরা একযোগে হেসে উঠলাম। মিন্নাত আলী সাহেব মাথা নীচু করে থাকলেন, আনোয়ারা বেগম বিব্রতবোধ করলেন।
কোনো কোনো বিষয় বা ঘটনা আছে, তাৎক্ষণিক তার যে আমেজ বা মেজাজ থাকে, সময় উত্তীর্ণ হয়ে গেলে তার আর সেরকম আবেগ বা শিহরণ থাকে না। তাতে স্মৃতি রোমন্থন করা চলে, সুখানুভূতিটি ভোঁতা হয়ে যায়, ধার দিলেও কাজে আসে না।
এতসব ভূমিকা উপস্থাপন করলাম এজন্য যে, ইদানিং কুমিল্লায় অনেকেই নজরুল বিষয়ে গবেষণা বা লেখালেখি করছেন এবং বিষয়বস্তু ‘শতবর্ষ আগের ঘটনাকে নিয়ে নানা আবিষ্কার-প্রচেষ্টা।’ যার মধ্যে অনেক বিষয় উল্লেখ হচ্ছে, তা অনেকটাই বালখিল্য। যেমন কুমিল্লা-মুরাদনগর-দৌলতপুরে ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ৩ আষাঢ় নজরুল-নার্গিস বিবাহ প্রসঙ্গটি নিয়ে একশ্রেণি লেখক কোমর বেঁধে আদা জল খেয়ে নেমেছেন। তাদের দাবি- নজরুলের সঙ্গে নার্গিসের বিয়ে হয়েছিল। এবং এ বছরও তাঁদের ১০১তম বিবাহবার্ষিকী পালন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। এ অনুষ্ঠানে নজরুল-প্রমীলার বিবাহ প্রসঙ্গটিকে আমল দিতেও তারা নারাজ ছিলেন। প্রসঙ্গটি যখন এ পর্যায়ে বাড়াবাড়ির দিকে এগিয়ে চলেছে, আমার মনে হয়েছে, সামগ্রিক বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং একপেশে।
ধরে নিলাম- নজরুল-নার্গিসের বিয়ে হয়েছিল অথবা হয়নি। তাতে লাভ ক্ষতি কতটুকু। সবাই জানে- বিয়ের দিন নজরুল বীরেন সেনের সঙ্গে রাতেই কুমিল্লায় চলে এসেছিলেন। এখানে বিয়ের পর বা বিয়ে না করে তা স্পষ্ট নয়। নজরুল যে সে রাত্রে চলে এসেছিলেন, জীবনে কোনোদিন দৌলতপুর আর যাননি, নার্গিসের সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাৎ হয়নি। অথচ একশ্রেণি লেখক দৌলতপুরে খাঁ বাড়ির খাটে তাঁদেরকে বিবাহোত্তর বাসর করাচ্ছেন, কলকাতায় নার্গিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে তাঁদের মধ্যে কথাবার্তার সংলাপও জুড়িয়ে দিচ্ছেন। এতকিছু হিসাব-নিকাশ কেন ? শতবর্ষ আগে যে ঘটনা ঘটে গেছে, তা এখন সত্য-মিথ্যা একটি সিদ্ধান্ত নিলে নজরুল-নার্গিসের কি লাভ হবে ? যেমনটি মিন্নাত আলী ও আনোয়ারা বেগমের ব্যক্তি জীবনের একটি ঘটনার মতো। যে সত্যটুকু আমরা নির্মল ও নির্মোহভাবে উপলব্ধি করি, তাহলো নার্গিস নজরুলকে কোনোদিন ভুলেনি, তদ্রƒপ নজরুলও। নার্গিস নজরুলের জন্য ১৫/১৬ বছর অপেক্ষা করেছিলেন। তখন তাঁর মনের অবস্থাটা হয়ত বা অভিমান ভরা ছিল। যেমন গানে আছে-
তুমি আমায় নাইবা বাসলে ভালো তাতে আমার দু:খ নাই।
দু:খ শুধু একটাই আমার তুমি আমায় বুঝ নাই,
কষ্ট শুধু একটাই আমার তুমি আমায় চিন নাই।
যদিও নজরুল গানের মাধ্যমে উত্তর দিয়েছেন-
‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই
কেন মনে রাখ তারে।
ভুলে যাও ভুলে যাও একবারে।
............................
আমি কি ভুলেও কোনেদিন এসে
দাঁড়িয়েছি তব দ্বারে,
ভুলে যাও মোরে ভুলে যাও একেবারে।’
তারপরও বিয়েটা হালাল করার প্রচেষ্টায় অক্লান্ত। নজরুল-জীবনী পাঠে আমরা দেখি, নজরুল তাঁর সাহিত্য রচনায় নার্গিসকে নিয়ে সারাজীবন অনেক গান-কবিতা-ছোটগল্প-উপন্যাস-চিঠিপত্র লিখেছেন। তাতেই প্রমাণিত হয়, নজরুল নার্গিসকে ভুলে যাননি। এমন কি নার্গিসের রচনায়ও নজরুলের উপস্থিতি ছিল বা আছে প্রাসঙ্গিকতায়। সুতরাং নজরুল-নার্গিস বিষয়ক লেখালেখি বা গবেষণার ক্ষেত্র আলাদা। অবশ্যই বিবাহ প্রসঙ্গ নিয়ে বাড়াবাড়ি নয়।
আমরা সকলেই জানি মুরাদনগর দৌলতপুরের আলি আকবর খানই নজরুলকে প্রথমে কুমিল্লায় নিয়ে এসেছিলেন। এজন্য তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাই। তিনি নজরুলকে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত একটি উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করতে। তাই একান্তভাবে নজরুলকে পাওয়ার জন্য যে ঘটনা সৃষ্টি করেছিলেন, তাতে সফলকাম হননি। আজীবনের জন্য নজরুলকে পেতে চেয়েছিলেন, চিরদিনের জন্য তাঁকে হারালেন।
অনেকে লেখেন-আলি আকবর খান নজরুলের বন্ধু বা বন্ধুস্থানীয়। বিষয়টি আদৌ সত্য নয়। আলি আকবর খান নজরুলের চেয়ে বয়সে বেশ কয়েক বছরের বড়, নজরুল তাঁকে ‘চাচা’ সম্বোধন করতেন। জ্যেষ্ঠ বিধায় সম্মান করতেন। কলকাতায় যখন আলি আকবর খান অসুস্থ হয়ে পড়েন, নজরুল তাঁকে সেবা-শুশ্রƒষাও করেছেন। এই বিষয়টি কমরেড মুজফ্ফর আহমদের মন:পূত ছিল না। তিনি আলি আকবর খানকে ভালো জানতেন না। মুজফ্ফর আহমদের মাধ্যমেই আলি আকবর খানকে আমরা চিনি-জানি। নজরুলকে কুমিল্লায় আমন্ত্রণ জানানো বিষয়ে জানতে পেরে তিনি বারণ করেছিলেন, কিন্তু নজরুল তা শুনেননি। পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ আমরা সকলেই জানি। এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে হলে নজরুল-বিষয়ক লেখকগণ মুফজ্ফর আহমদের ‘কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা’ বইটিকেই আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনায় রাখছেন। একথা তো ঠিক যে, মুজফ্ফর আহমদ নজরুলের বন্ধু ছিলেন না, ছিলেন ‘বান্ধব’। দৌলতপুরের ঘটনা জানার পর মুজফ্ফর আহমদ অধ্যাপক ফকির চাঁন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে ত্রিশ টাকা ধার নিয়ে সোজা কুমিল্লায় এসে নজরুলের বিপর্যয় সময়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁকে সঙ্গ দিয়ে মানসিক বিপর্যয় থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং সাথে করে কলকাতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আলি আকবর খান সম্পর্কে মুজফ্ফর আহমদ যে ধারণা পোষণ করতেন, তা কি শুধু অমূলক ছিল ? আমি নজরুল বা মুজফ্ফর আহমদকে বিখ্যাত করার জন্য আলি আকবর খানকে সেভাবে মূল্যায়ন করতে চাই না। কিন্তু ঘটনাপ্রসঙ্গে প্রাপ্য অবস্থান বিষয়ে এর বেশি কোনো যুক্তি উপস্থাপন করাই হবে উদ্দেশ্যমূলক। কারণ পরবর্তীতে এ ঘটনার সূত্র ধরে আলি আকবর খান তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার আজিজুল হাকিমের সঙ্গে নার্গিসকে বিয়ে দিয়েছেন। উল্লেখ্য, আজিজুল হাকিমও কবি ছিলেন, তিনি নার্গিসের চেয়ে প্রায় চার বছরের কনিষ্ঠ ছিলেন। তাঁদের দাম্পত্যজীবন ছিল নিরুত্তাপ। সন্তান উৎপাদন ছাড়া কোনো বৈচিত্র্য ছিল না। তা কোনো নজরুল-গবেষণা প্রসঙ্গ নয়। তারপরও কেউ কেউ নজরুল-নার্গিসকে নিয়ে লিখতে গিয়ে নার্গিস-আজিজ সম্পর্কে অনেক পৃষ্ঠা অযথা অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা লিখে গবেষণা কর্ম হিসেবে দাবি জানিয়ে আসছেন।
উদ্দেশ্যমূলকভাবে কেউ কেউ নজরুল-প্রমীলা বিষয়টিকে এড়িয়ে যেতে চান। এটা ব্যক্তিগত অভিরুচি। আমরা জানি-প্রমীলার সঙ্গে নজরুলের বিয়ের আগে নজরুল প্রমীলাকে উদ্দেশ্য করে অনেক কবিতা ও গান রচনা করেছেন। বিয়ের পর আর এ ধারার কোনো সৃষ্টি লক্ষ্য গোচর হয়নি। কিন্তু নজরুল-প্রমীলার যে দাম্পাত্যজীবন এবং এ জীবনের ঘটনাপ্রবাহ বাঙালি সমাজে কয়টি আছে ?
প্রমীলা যখন ১৯৩৯ সালে অসুস্থ হয়ে পড়েন, নজরুল স্ত্রীর রোগমুক্তির জন্য চিকিৎসা ও যে সেবা প্রদান করেছেন, তা কি অনন্য নয় ? স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য গাড়ি কেনার কিস্তি না দিতে পারায় কোম্পানি তা ফেরৎ নিয়ে যায়, বাড়ি করার জন্য বালিগঞ্জের জমি কিনেছিলেন, তা বিক্রি করে দেন, একে একে বই-এর স্বত্ত্ব বিক্রি করে দেন, গানের স্বত্ত্ব স্বল্পমূল্যে বিক্রি করে দেন। হোমিওপ্যাথি-আয়ুর্বেদী-এলোপ্যাথি-টোট্কা, পানি পড়া অর্থাৎ যখন যে যা বলেছেন তা তিনি প্রাণের বিনিময়ে করেছেন। এমন কি বরদারণ মজুমদার নামে একজন স্কুলের প্রধান শিক্ষক, যিনি যোগ সাধনায় রোগমুক্তির পরিচর্চা করতেন, তাঁকেও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে নজরুল অধ্যাত্মিকতার পরম পরাকাষ্ঠা যাপন করেছেন। ফলশ্রুতিতে তিনি নিজেই চিরতরে অসুস্থ হয়ে গেলেন। স্বামী হিসেবে স্ত্রীর জন্য এই যে সেবা বা আত্মত্যাগ, সংসার জীবনে কি দুর্লভ ঘটনা নয় ? প্রশ্ন- এতটা কেন ? শুধু কি কর্তব্যবোধ ? তার মধ্যে কি কোনো জীবন-মরণ মেলবন্ধনের ইতিবৃত্ত নেই ? এ নিয়ে কিন্তু নজরুল গবেষকগণ ততটা উচ্চবাচ্য করেন না।
একটি দৃশ্য প্রায়ই ফেইজবুকে দেখি-প্রমীলার নিম্নাঙ্গ অবশ, তিনি শোয়া অবস্থায় অসুস্থ স্বামী নজরুলকে শিয়রের কাছে বসিয়ে খাইয়ে দিচ্ছেন। শুনেছি, শুয়ে শুয়ে স্বামীর জন্য রান্নাও করতেন। যতদিন প্রমীলা দেবী অসুস্থ ছিলেন, অর্থাৎ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নজরুল অসুস্থাবস্থায় একদিনের জন্যও কাছ ছাড়া হননি। কবিকে চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে হলেও ফিরে এসে স্ত্রীর কাছেই থাকতেন সারাক্ষণ। এসব বিষয়গুলো হৃদয় দিয়ে, তৃতীয় নয়নে দেখতে হবে, অনুসন্ধান করতে হবে-  দাম্পত্যজীবনের প্রেমের যে ঐশ্বর্য এবং কতটুকু মানবিক ও হৃদয়সঞ্জাত তা ‘নজরুল-প্রমীলা’ আজ শাশ্বত উদাহরণ হয়ে আছে।
আজহার উদ্দীন খান লিখেছেন-
‘বরদাচরণ মজুমদারের নিকট হতে অধ্যাত্ম শিক্ষা সম্বন্ধে নানা কথা জেনে তিনি (নজরুল) কোরান, গীতা, চন্ডী, উপনিষদ, পুরাণ, তন্ত্র প্রভৃতি গভীরভাবে অনুশীলন আরম্ভ করলেন। বাড়ির চিলেকোঠায় কালী প্রতিমা স্থাপন করে সকাল-সন্ধ্যা মন্ত্রজপ করতে শুরু করলেন। কোন কোন বার নিরম্বু উপবাস করে ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে পূজা গৃহেই দিন দুই কাটিয়ে দিতেন।’
জীবনের সবদিক দিয়ে যখন বিফলকাম হলেন তখন নজরুল এক দুরারোগ্য ব্যাধির কাছে আত্মসমর্পণ করলেন ১৯৪২ সালের ৯ জুলাই। তিনি সংবিৎ হারান ঐ বছরের ১০ আগস্ট। শেষের দিকে তিনি ধ্যান সাধনায় কিছুকাল ডুবে গিয়েছিলেন, পরলোকতত্ত্ব নিয়েও তিনি খুব উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন।
উপর্যুক্ত বিষয় নিয়ে কেউ গবেষণা করতে আগ্রহী হন না। বিশেষত কুমিল্লায় এক শ্রেণি লেখক নজরুল-নার্গিস-আলি আকবর খান-এ তিনজনকে প্রচণ্ডভাবে প্রতিষ্ঠা দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। সফলকাম তো হননি, বরং পাঠককে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলছেন। মজার ব্যাপার হলো- তারা এবং তাদের অনুসারীরা এগুলোকেই গবেষণা কর্ম হিসেবে দাবি করে আসছেন। বিষয়টা আমার কাছে মনে হচ্ছে- ‘কাজ নেই তো খৈ ভাজ’-এর বেশি কিছু নয়।
আমরা অনেক ব্যাপারে ইচ্ছা-অন্ধত্ব হিসেবে অভিনয় করতে ভালোবাসি। সেজন্যই অসুস্থ হয়েও প্রমীলা যে স্বামীকে সেবা করে গেছেন নিরলসভাবে তা চোখে পড়ে না, মনেও সায় দেয় না। প্রমীলার হাতে না খেলে অসুস্থ কবির যেন তৃপ্তি হতো না। মাঝে মাঝে কাছে বসিয়ে কবিতার বই থেকে সুন্দর সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন প্রমীলা। কবি কিছুটা উৎফুল্ল হতেন। প্রমীলার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্বামীকে মমতায়, ভালোবাসায়, সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে গেছেন। প্রমীলা-নজরুলের প্রেম জাগতিক আবার চিরন্তনও বটে। সেনপরিবারের সান্নিধ্যে এসে নজরুল নিজেকে যেমন উজ্জীবিত করেছিলেন, প্রমীলাও স্বামী হিসেবে নজরুলকে পেয়ে নির্ভার জীবনের স্বস্তি লাভ করেছিলেন।
সুতরাং আমাদের জানতে হবে নজরুলকে নিয়ে কুমিল্লার কোন প্রসঙ্গটি নিয়ে গবেষণা করা যায়। সস্তা বাহবা পাওয়ার সময় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। যেমন মিন্নাত আলী সাহেবের ১৯৫৫ সালের প্রেমপত্র আশির দশকে নতুন কোনো আমেজ সৃষ্টি করতে পারেনি।