
ফেসবুকে একটি পোস্ট
দেওয়াকে কেন্দ্র করে ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার
দীঘলিয়ায় অন্তত ২০টি বাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট, ১৫টি দোকান ভাঙচুর ও
লুট এবং চারটি মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। নড়াইলের সংসদ সদস্য ও জেলা
প্রশাসক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার দীঘলিয়া
সাহাপাড়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়ি, দোকান ও মন্দিরে ভাঙচুর ও
অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে তিনি তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা
জানিয়েছেন। ফেসবুককেন্দ্রিক আরেক পোস্টকে কেন্দ্র করে গত মাসের এক ঘটনায়
বেশ কিছুদিন থেকে আলোচনায় রয়েছে নড়াইল।
আজ নড়াইলকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, এ
তো বাংলাদেশের হাজার বছরের ছবির সঙ্গে মেলে না। আমার ইতিহাস কী বলছে? এই
ভূখণ্ডে হাজার বছর ধরে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, চাকমা,
সাঁওতালসহ সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী একসঙ্গে সম্প্রীতি বজায়
রেখে বসবাস করে এসেছে। সব স্রোত এক ধারায় এসে মিলিত হয়ে বাঙালি সংস্কৃতিকে
সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করেছে। বাঙালি সংস্কৃতির মূল কথাই তো অসাম্প্রদায়িকতা ও
সম্প্রীতি। স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব, উন্নতি, মর্যাদা ও শক্তির অন্যতম
অবলম্বন বাঙালি সংস্কৃতিপ্রসূত অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রনীতি। বাংলাদেশের
সংবিধানের অন্যতম মৌলিক আদর্শও তো বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। অথচ
একটি চিহ্নিত অপশক্তি সব সময় এ দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার
অপচেষ্টা করেছে।
বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।
বাঙালি সংস্কৃতি ও চেতনা এ দেশের মূল চালিকাশক্তি। মহান মুক্তিযুদ্ধে
ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পেছনের চালিকাশক্তি ছিল এই অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির
ঐতিহ্য। বাংলাদেশে এক শ্রেণির ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী ধর্মকে
তাদের রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করে আসছে। বাংলাদেশকে একটি
সাম্প্রদায়িক দেশের তকমা লাগানোর জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীও
সক্রিয়।
নড়াইলে আজ যে ঘটনা ঘটছে, তা সামাজিক অবক্ষয়, মূল্যবোধহীনতা ও
সমাজদূষণেরই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। দীর্ঘস্থায়ী তৎপরতায় সমাজে পরিবর্তন ঘটানো
ছাড়া এ রোগের নিরাময় ঘটবে না। আর এ ক্ষেত্রে দরকার হবে রাজনৈতিক
দল-নির্বিশেষে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সমাজকে
সুস্থ করে তুলতে পরিকল্পিতভাবে সমাজ বদলের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া এখন জরুরি হয়ে
দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোরও দায় রয়েছে। সম্মিলিত নাগরিক
প্রয়াস ছাড়া এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে না।
দেশের মানুষ অনেক বেশি সচেতন।
সব ধরনের ধর্মীয় ঘৃণা ও সন্ত্রাসী আক্রমণকে মোকাবেলা করার জন্য তারা
ঐক্যবদ্ধ। কাজটা শুরু করা দরকার। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে তাই আরো বেশি যত্নশীল
হতে হবে। নিতে হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সম্প্রীতির
ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে আবহমান বাঙালির জীবনবোধকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে
দিয়ে।