
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
(পূর্বে প্রকাশের পর)
৩ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশে ফিরি। ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লা শহর মুক্ত হয়, সেদিন চলে আসতে মন চাইছিল, এবার আবেগকে কর্তব্যবোধের শৃঙ্খল দিয়ে বেঁধে রাখি এবং ভাইবোন স্ত্রী সহ এক মেসোতাত ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ৩ জানুয়ারি সরাসরি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। কুমিল্লা শহরে প্রবেশ করে প্রথম সুপারিবাগানে গুহ পরিবারে যাই। বেনুদার (অশোক গুহের) জন্য তাঁর মা বাবা পাগল প্রায়। বৌদি তিন সন্তানসহ তখনও কলকাতায়। সে ইতিহাস মর্মান্তিক ও হৃদয় বিদারক। সন্ধ্যায় বাড়ি পৌঁছি। বাবা মা সন্তানদের ফিরে পেয়ে আত্মহারা। কীভাবে আমাদের গ্রহণ করেছেন তা তো বর্ণনা চলেনা। সন্তানদের আবেগের সাথে নানা কথা বলে বুকে জড়িয়ে ধরেন। কাঁদেন হাসেন। আমরা যে বেঁচে আছি, জীবিত অবস্থায় ফিরে এসেছি এর চেয়ে আনন্দের আর কী বা হতে পারে। ঈশ্বরকে অসংখ্যবার ধন্যবাদ কৃতজ্ঞতা জানিয়েও যেন ঋণ পরিশোধ করা যাবে না। পাড়ার লোকেরা সংবাদ পেয়ে রাত্রে অনেকে এসেছেন। আমাদের এলাকায় ৪/৫টি বাড়ি পুড়ানো হয়েছে। ৫/৬ জন লোক নিহত হয়েছে। তাঁরা সবাই হিন্দু সম্প্রদায়ের। বাবা পালিয়ে পালিয়ে মৃত্যুকে এড়িয়ে বেঁচে গেছেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিদ্দিক মিঞা বাধ্য হয়ে পাকহানাদার বাহিনির সহযোগিতায় আবদ্ধ হলেন। তাই স্বাধীনতার ঊষা লগ্নে নিখোঁজ হয়ে যান। আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তিনি কি এতটাই পাকিস্তানপ্রেমী ছিলেন? মুক্তিযুদ্ধ কালীন থানা থেকে এগারজনের একটি তালিকা তাঁকে দেয়া হয় যেন তাঁদেরকে ধরিয়ে তথা পাকড়াও করে খবর দেয়া হয়। সিদ্দিক মিঞা সাহেব তো গোপনে তাঁদেরকে সরে যাওয়ার জন্য আগাম খবর পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এগার জনের মধ্যে একজন হিন্দু উপেন্দ্র চন্দ্র সাহা তিনি স্কুল শিক্ষক ছিলেন, অনেকটাই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের লোক ও ভারতের অন্ধ অনুসারী। তিনি অকুতোভয়ে বাজারে যত্রতত্র পাকিস্তান সরকারকে গালিগালাজ করতেন, কারো অনুরোধ বা সাবধানতা তোয়াক্কা করতেন না। সেজন্য তাঁকে একবার থানায় নিয়ে যায়। দৈবক্রমে বেঁচে যান। তারপরে তিনি আরও বেপোয়ারা হয়ে ওঠেন। তাই অগাস্টের দিকে তাঁর বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। বড় ভাই অধরচন্দ্র সাহাকে গুলি করে হত্যা করা হয়, উপেনবাবু পালিয়ে যাওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হন, প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু স্বাধীনতোত্তর চিকিৎসার অবহেলায় কাঁধে গুলির আঘাতটি ক্ষত বিস্তার লাভ করে এবং কষ্ট পেয়ে মারা যান। তিনি আমার শিক্ষক ও বাবার বন্ধু ছিলেন।
তখন রাত্রি আঁধার হল, সাঙ্গ হল কাজ
আমরা মনে ভেবেছিলোম আসবে না কেউ আজ।
মোদের গ্রামে দুয়ার যত রুদ্ধহল রাতের মতো-
দুয়েক জনে বলেছিল, 'আসবে মহারাজ'।
৮ জানুয়ারি খবর পাই, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পাবেন। তিনি ফিরে আসবেন। আনন্দের বাঁধভাঙা জোয়ার চারদিকে, কী প্রাণশক্তি ও বিশ্বাস-ভক্তির অনাবিল উচ্চকণ্ঠ-বাঙালি মননচর্চায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার উদ্বোধন- ২০১৮ সালে কল্পনাও করতে কেউ পারবে না।
প্রথম কথা- শেষ কথা
আমাদের নয়নমণি বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন দেশে বীরবেশে আসছেন। খবর পাওয়া গেলো ১০ জানুয়ারি আসবেন। গ্রামে রেডিও ছিল না। তবে স্কুলের ট্রেনজেস্টারটি আমাদের বাড়িতে ছিল।
১০ তারিখ সকাল থেকে লোকজন আসতে থাকে। ৮ টার মধ্যে আমাদের বাড়ি লোকে লোকারণ্য, উঠানভর্তি লোক। খড়ের গাদা ভেঙে বসার ব্যবস্থা হলো। উঠানের মাঝখানে একটি গোল টোলের উপর ট্রেনজেস্টারটি ফুল ভ্যুলিয়ম দিয়ে বসানো। ধারা বিবরণী চলছে। পিনপতন নীরবতা। রুকু (রুকুনউদ্দীন, আমার ছোট সময়ের সহপাঠী) বলছে- 'দোস্ত, আমি ছয়টি বেটারি আনছি তোমারটি শেষ হলে আমারটি লাগাইও।' ধারা বিবরণী চলছে, আমরা যেন বঙ্গবন্ধুর সহযাত্রী, লন্ডনের হিঞ্চু বিমান বন্দরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডাওয়ার্ড হীথ বরণ করে নিলেন, দিল্লীর বিমানবন্দরে পৌঁছলেন বঙ্গবন্ধু। রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অভ্যর্থনা জানালেন, অভাবনীয় সম্মান প্রদর্শন করলেন। তারপর ঢাকা তেজগাঁও-এ অবতরণ। লক্ষ লক্ষ জনতা অভ্যর্থনা জানালো। মিছিল করে রমনা রেইস কোর্সে, বঙ্গবন্ধু আবেগী ভাষণ দিলেন সংক্ষিপ্ত। এক সময় রেডিওর ধারা বিবরণী শেষ হলো। উঠোনে সমস্ত দিন অভুক্ত অবস্থায় পরম আগ্রহে, শ্রদ্ধায় ও আনন্দে আমরা কাটিয়ে দিলাম। ঘরে রান্নবান্নাও বন্ধ ছিল। ক্ষুধা তৃষ্ণা অনুভব করিনি। করে নাই কেউ। কেউ যেন বাড়ি যেতে চাচ্ছিল না। সন্ধ্যার পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বঙ্গবন্ধুর গল্প করতে করতে ধীর লয়ে আপন আলয়ের পথে পা বাড়াল গ্রামবাসী।
ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়
তোমারি হউক জয়।
তিমিরবিদার উদার অভ্যুদয়,
তোমারি হউক জয়।
হে বিজয়ী বীর, নবজীবনের প্রাতে
নবীন আশার খড়গ তোমার হাতে,
জীর্ণ আবেশ কাটো সুকঠোর ঘাতে-
বন্ধন হোক ক্ষয় তোমারি হউক জয় ।
পরের কথা-
আজ স্বাধীন বাংলাদেশে ৪৭ বছর অতিক্রান্ত হচ্ছে। বার বার মনে হয় আমি ভীতু, কাপুরুষ, সুবিধাবাদী এবং পরশ্রীকাতর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেঈমান ও অকৃতজ্ঞ । অভিধানে অকৃতজ্ঞ ও কৃতঘ্ন এরূপ দুটি শব্দ আছে। প্রথমটির অর্থ- যে উপকারীর উপকার স্বীকার করে না। আর দ্বিতীয়টির অর্থ- যে উপকারীর অপকার করে। এই ৪৭ বছরে এই দুটি শব্দের যথার্থতা দেখেছি, অস্বীকার করতে পারব না। কী ত্যাগের বিনিময়ে আজ স্বাধীন দেশের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করছি? অন্নজল ভোগ নয়। কথা বলার অধিকার, মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো, ভোগ করার অদম্য আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ থেকে সবকিছু নাগালের মধ্যে পেয়ে স্পর্শ করছি । কিন্তু কোন অধিকারে, কোন ত্যাগের বিনিময়ে? এজন্যই কী জাতীয় পতাকাটা হয়ে যায় বিচিত্র রং-এর, জাতীয় সঙ্গীতটা হয়ে যায় সাম্প্রদায়িক, বাঙালিয়ানা গন্ধে কটু, বাংলাদেশের স্থপতি নিহত হয়ে যান সপরিবারে, স্বাধীনতা বিরোধীদের গাড়িতে উড়ে জাতীয় পতাকা? যাঁরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলেন, তাঁরা আখ্যায়িত হন বিপথগামী হিসেবে, তাঁদের ভাগ্যে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্য সুবিধা জুটেনা। আর আমি বা আমরা দিব্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে চলেছি ৪৭ বছর। একবারের জন্যও কি নিজেকে প্রশ্ন করে পরিশুদ্ধ হতে পেরেছি? বলতে কি পেরেছি-
কোথা মিথ্যা রাজা, কোথা রাজদণ্ড তার।
কোথা মৃত্যু, অন্যায়ের কোথা অত্যাচার।
ওরে ভীরু, ওরে মূঢ় তোলো তোলো শির ।
আমি আছি, তুমি আছ, সত্য আছে আছে স্থির।
তারপরও স্বপ্ন দেখি আর ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে হারিয়ে যাওয়া নিজেকে খুঁজি । শহীদদের স্মরণ করে দু'দণ্ড দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করি। আর, আর দায়মুক্তির জন্য নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রায়শ্চিত্ত করি ।
হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান ।
মানুষের অধিকারে বঞ্চিত করেছ যারে,
সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
(ক্রমশঃ)
লেখক: সাহিত্যিক, গবেষক ও সাবেক অধ্যাপক
মোবাইল: ০১৭১১-৩৪১৭৩৫