ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
বাজারের আগুনে যেভাবে দগ্ধ আমরা
Published : Saturday, 9 April, 2022 at 12:00 AM
বাজারের আগুনে যেভাবে দগ্ধ আমরাইকবাল খন্দকার ||
ইসলাম ধর্ম মতে, রমজান রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস। আর এ দেশের মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় রমজান কিসের মাস, তা হলে উত্তর দেবেÑ রহমত, বরকত, মাগফিরাত ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মাস। উত্তরটা কেন এমন হবেÑ তা বুঝিয়ে বলার দরকার নেই, ব্যাখ্যা দেওয়ার দরকার নেই। কারণ সবাই বোঝে, সবার কাছেই ব্যাখ্যা আছে। শুধু জানা নেই সমাধান। হয়তো জানা আছে। কিন্তু প্রকাশ বা প্রয়োগের ক্ষমতা নেই। কেননা বাজার যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, দ্রব্যমূল্য কমানো-বৃদ্ধি করা যাদের হাতেÑ তারা গভীর জলের মাছ। চাইলেই দেখা যায় না, ধরাছোঁয়া তো যায়ই না।
ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা বিশ^াস করেন, রমজান মাসে শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। ফলে শয়তান চাইলেই স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারে না। তা হলে জিনিসপত্রের এই যে আকাশচুম্বী দাম, এই যে সাধারণ মানুষের সীমাহীন ভোগান্তিÑ এর সঙ্গে কারা জড়িত? নিশ্চয়ই শয়তানের প্রতিনিধিরা। তারা আমাদের আশপাশেই বিচরণ করে, মানুষের মতোই আচরণ করে। প্রকৃত অর্থে তারা কি মানুষ? শয়তানের কাজ মানুষের অনিষ্ট করা। কিন্তু মানুষ হয়েও যদি মানুষেরই অনিষ্ট করে, তা হলে তার বা তাদের নাম কীভাবে মানুষের খাতায় থাকে?
ছোটবেলা থেকে আমরা জেনে আসছি, বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। অথচ বেগুন, শসা, পেঁয়াজ, আলুÑ কোনোটার কাছেই যাওয়া যায় না দামের উত্তাপের জন্য। ভালো কথা। দাম বেশি হওয়ার সুবাদে যদি কৃষকরা দুটো বাড়তি পয়সার মুখ দেখে, সেটি আনন্দের। তাদের দারিদ্র্য যদি ঘোচে, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারেনÑ তা হলে সেটি স্বস্তি ও শান্তির। কিন্তু আদৌ কি তা হচ্ছে? কোনো পরিবর্তন কি এসেছে কৃষকদের ভাগ্য বা জীবনযাপনে? না, আসেনি। আসার কোনো লক্ষণও নেই। কারণ বাড়তি দামের কানাকড়িও কৃষকদের হাতে যায় না, পকেটে যায় না।
এ ক্ষেত্রে পুরোমাত্রায় সুবিধাভোগী হচ্ছে ‘সিন্ডিকেট’। অথচ এই সিন্ডিকেটের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার শতভাগ ক্ষমতা কর্তৃপক্ষ রাখে। কিন্তু প্রয়োগ করে না। আর এই সুযোগে ‘সিন্ডিকেট’ই হয়ে উঠেছে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। একজন সেদিন কথায় কথায় বললেন, সিন্ডিকেটকে আজকাল আর সিন্ডি‘কেট’ বলার সুযোগ নেই। তারা এতটাই ক্ষমতাধর হয়ে গেছে যে, বলতে হবে সিন্ডি‘টাইগার’। মানে, বিড়াল থেকে বাঘ। কথাটা হাসির ছলে বলা হলেও হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। এর মানে, ওজন আছে কথাটার। চাইলেই ওড়ানো যায় না, অন্যদিকে ঘোরানো যায় না। তবে যেটা করা যায়, সেটি হলো নিজেকে বধির ও অন্ধ করে রাখা যায়। কিছু শুনলাম না, কিছু দেখলাম না। কর্তৃপক্ষ সেটিই করছে। না শোনা ও দেখার ভান করে বসে থেকে সিন্ডিকেটকে দিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাবলিকের গলা কাটাচ্ছে। আর পাবলিকও গলা পেতে দিয়ে বসে আছে কাটার জন্য। অথচ সবাই একযোগে প্রতিবাদ করলে অবশ্যই সুফল পাওয়া যেত।
কোথাও যদি কোনো অঘটন ঘটে, তা হলে আমরা প্রতিবাদ করি। এই প্রতিবাদের অংশ হিসেবে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করি। কিন্তু বাজারজুড়ে এই যে ‘অঘটন’ ঘটেই যাচ্ছে, আমরা কেন প্রতিবাদ করছি না? হ্যাঁ, টুকটাক প্রতিবাদ হচ্ছে। বিভিন্ন কর্মসূচিও পালিত হচ্ছে। কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এসব প্রতিবাদ ও কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছে কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল। আর এখানেই হয় সমস্যাটা। কারণ দেশের সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক দল তথা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে চায়। তাই তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে না এসব কর্মসূচিতে। অথচ কর্মসূচিগুলোর নেতৃত্ব যদি সাধারণ মানুষ দিতÑ তা হলে প্রতিটা কর্মসূচিই প্রাণ পেত, জোরালো হতো, দাবি আদায়ের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করত। এদিকে সাধারণ মানুষ চিন্তাও করে না রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করার। তারা স্বল্পদামে জিনিস কেনার জন্য সরকারি ট্রাকের পেছনে লাইন দিতে রাজি। কিন্তু মানববন্ধনের জন্য লাইনে দাঁড়াতে রাজি নন। অত সময় নেই তাদের। ইচ্ছাও নেই। এর মানে, শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদ জিনিসটা আর করা হয়ে উঠছেই না, বরং মুখ বুজে মেনে নেওয়া হচ্ছে দ্রব্যমূল্য সংক্রান্ত অন্যায়Ñ যে অন্যায় বছরের পর বছর ধরে হয়ে আসছে আর রমজানে নিচ্ছে ভয়ঙ্কর রূপ।
আগে রমজানে বেগুনের দাম বেড়ে যেত। যারা সচেতন, তারা তখন বেগুনি খাওয়া কমিয়ে দিতেন। কিন্তু এখন যে অবস্থা, এতে খাওয়া-দাওয়া একেবারে ছেড়ে দিতে হবে। কারণ এখন সবকিছুর দামই বাড়তি। তাই তালিকার বাইরে রাখলে সবই রাখতে হবে। গল্পের সেই লোকটার মতো যে কাণ্ড করবেন, সে সুযোগও নেই। এক লোক জিনিসপত্রের দামের ব্যাপারে ভীষণ সচেতন। যখন যে জিনিসটার দাম বাড়ে, তখনই সেটি বাদ দিয়ে দেন খাদ্য তালিকা থেকে। একদিন তার এক বন্ধু এলো তার বাড়িতে। দেখে তার টেবিলে লবণের পট ছাড়া আর কিছু নেই। বন্ধু অবাক হয়ে বলে উঠল, এ কী? লোকটা বললÑ না মানে, খেয়াল করলাম একমাত্র লবণের দামটাই বাড়েনি। তাই...।
‘বাজারে আগুন’, ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি’-এসব কথাবার্তা দিয়ে আমরা সাধারণত কাঁচাবাজারের জিনিসপত্রের বাড়তি দামের বিষয়টাই বুঝে থাকি। অথচ আমাদের ভোগান্তি কেবল কাঁচাবাজারকেন্দ্রিক নয়। আমাদের ভোগান্তি বহুমুখী ও অসীম। গ্যাসের বিষয়টাই চিন্তা করা যাক। এমনিতেই দুদিন পর পর গ্যাসের দাম বাড়ে। এর ওপর রমজানের প্রথম দিনই কেন সারাদেশে গ্যাস সংকট দেখা দিতে হবে? কেন এই গ্যাস সংকটের কারণে মানুষ ঘরে ইফতারি তৈরি করতে না পেরে দোকানে দোকানে ছুটবে আর দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে ইফতারি কিনবে? গ্যাস নয় শুধু, যে কোনো সময় যে কোনো সংকট বা বিপর্যয় দেখা দিতেই পারে। কিন্তু সেটি দীর্ঘস্থায়ী কেন হবে? কেন দ্রুত কাটিয়ে ওঠার মতো সক্ষমতা থাকবে না? কেন এটিকে ‘সুযোগ’ হিসেবে কাজে লাগাবে কেউ কেউ? কেন বাড়তি দ্রব্যমূল্যের চাপের সঙ্গে আরও চাপ যুক্ত করে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ কথাটার ভয়াবহতা আরেক দফা বৃদ্ধি করবে? সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ছে নিয়মিত বিরতিতে। এতে খুব যে তারা টাকা জমাতে পারছেন, তা নয়। কারণ বাড়তি বেতনের টাকা জলের মতো ভেসে যাচ্ছে জিনিসপত্রের বেড়ে যাওয়া দামের পেছনে। এর মানে, সরকার বাড়তি বেতন দিলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক অবস্থার কোনো উন্নতি হচ্ছে না।
অথচ সরকারের ফান্ড ঠিকই খালি হচ্ছে। ফান্ড যেন খালি না হয়, এদিকটি বিবেচনা করে হলেও জিনিসপত্রের দাম কমানো উচিত। জিনিসপত্রের দাম কমালে হবে কী, নিয়মিত বিরতিতে বেতন না বৃদ্ধি করলেও চলবে। কারণ আগের বেতনেই বাজারসদাই করে টাকা আরও থেকে যাবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কর্তৃপক্ষ কি আদৌ বিষয়টি এভাবে ভাবে? মনে তো হচ্ছে না। ঢাকা শহরের জ্যাম কমানোর জন্য কত কত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এতেও তেমন কোনো উপকার মিলছে না। আর জিনিসপত্রের দাম কমে যাবে কোনো রকম পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়াই? এটি কি বিশ^াসযোগ্য? যদি বিশ^াসযোগ্য হয়Ñ তা হলে যেভাবে আপনি-আমি মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছি, সেভাবেই এঁটে রেখে দেওয়া যেতে পারে। আর যদি বিশ^াসযোগ্য না হয়Ñ তা হলে সংকোচ ভুলুন, মুখটা একটু খুলুন, প্রতিবাদের আওয়াজ তুলুন।

ইকবাল খন্দকার : কথাসাহিত্যিক ও টিভি উপস্থাপক