
নাগরিক
সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি।
সেই লক্ষ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়াকে গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। মানুষ ঘরে বসে
তার নানান প্রয়োজনীয়তা সারতে পারবে, পূরণ করতে পারবে অনেক চাহিদা। কিন্তু
বিষয়টি তখনই মুখ থুবড়ে পড়ে, যখন টেকসই ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দেখা দেয়। যেমনটি
আমরা দেখলাম অনলাইনে রেলের টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে। ঠিকাদারকে দিয়ে
অনলাইনে টিকিট বিক্রি করতে গিয়ে যাত্রীদের চরম ভোগান্তির মুখে ফেলে দেওয়া
হয় গত এক সপ্তাহ। অনিয়ম ও কারিগরি জটিলতার কারণে এমনটি ঘটেছে। মূলত গত তিন
দশকেও সরকারি সংস্থা রেলের টিকিট বিক্রির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাঠামো
গড়ে না ওঠারই ফল এটি।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশের ৭৭টি
স্টেশনে অনলাইন, অ্যাপ এবং কাউন্টারে সমন্বিতভাবে কম্পিউটারে প্রিন্ট করা
টিকিট বিক্রি হয়। ২০০৭ সাল থেকে অনলাইনে টিকিট বিক্রির কাজটি করে আসছিল
সিএনএস বিডি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। গত মাসের মাঝামাঝি সেই কাজের নতুন
দায়িত্ব পায় সহজ ডটকম নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান। নতুন দায়িত্ব হস্তান্তরের
সুবিধার্থে ছয় দিন অনলাইন, অ্যাপ ও কম্পিউটারে প্রিন্ট করা টিকিট বিক্রি
বন্ধ ছিল। গত শনিবার অনলাইনে টিকিট বিক্রি চালুর উদ্দেশ্যে একটি ওয়েবসাইটের
ঠিকানা প্রকাশ করে রেল কর্তৃপক্ষ। সেদিনই সকালে টিকিট বিক্রি শুরুর
কিছুক্ষণের মধ্যে ওয়েবসাইট অকার্যকর হয়ে পড়লে যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন। আর
১৯ মার্চ পর্যন্ত অ্যাপে টিকিট কাটা সম্ভব হলেও সেটিও বন্ধ ছিল। এ
পরিস্থিতিতে শুধু কাউন্টারের মাধ্যমে টিকিট কিনতে হাজার হাজার মানুষ
কমলাপুর, বিমানবন্দর, চট্টগ্রামসহ বড় স্টেশনগুলোতে ভিড় করেন।
তবে সহজ
ডটকমের ভাষ্য হচ্ছে, আগের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের টিকিট বিক্রির
প্রযুক্তিগত কার্যক্রম বুঝিয়ে দেয়নি। এরপর ওয়েবসাইটে অতিরিক্ত হিট বা ভিজিট
হওয়ার পর সমস্যা দেখা দেয়। যার অনেকগুলোই হয়েছে বিদেশ থেকে। এ জন্য সাইবার
হামলা হয়ে থাকতে পারে বলেও তাঁদের ধারণা। সাইবার হামলার আশঙ্কার বিষয়টি
অবশ্যই গুরুতর। যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে
এমনটি বলছে তারা। এর জন্য তারা দায় এড়াতে পারে না। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের
বক্তব্য হচ্ছে, আগের অ্যাপটির মালিকানা ছিল সিএনএসের। এ জন্য নতুন অ্যাপ
তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গোটা বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র
সমালোচনা দেখা দেয়। রেল কর্তৃপক্ষ জনগণের কাছে বিক্রি করা টিকিটের অর্থের
একটি অংশ ঠিকাদারকে দিচ্ছে। কিন্তু টিকিট বিক্রির ব্যবস্থাটা কীভাবে চলে,
গ্রাহকের ভোগান্তি কীভাবে কমবে, এসব বিষয়ে রেল কখনোই গুরুত্ব দেয়নি বলে
আমরা জানতে পারছি রেলের সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে। প্রথম আলোর প্রতিবেদক বলছেন,
অনলাইনে টিকিট বিক্রির বিষয়ে রেলের কোনো সক্ষমতাই নেই। এর জন্য কারিগরি
দক্ষতাসম্পন্ন কোনো লোকবলও তাদের নেই। পুরো বিষয়টি ঠিকাদারদের ওপর
নির্ভরশীল।
যে কয়টি খাতের উন্নয়নে সরকার বেশি নজর দিয়েছে, তার মধ্যে
অন্যতম হচ্ছে রেল খাত। একের পর এক বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী
সেবার মান তো বাড়েইনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। অথচ সময়ের
সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ানো হয় টিকিটের দামও। কিন্তু অনলাইনে টিকিট বিক্রির
জন্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে পারেনি। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এত দিনে
গোটা দেশের সব কটি স্টেশনে অনলাইন সুবিধা হওয়ার কথা থাকলেও সেটি হয়নি।
ঠিকাদারনির্ভরতা না কাটলে টিকিট নিয়ে এ জটিলতা শেষ হওয়ার নয়। এ বোধোদয় রেল
কর্তৃপক্ষের কখন হবে?