
আবুল কাশেম হৃদয় ||
(পূর্বে প্রকাশের পর)
বিকাল তিনটায় আবু তাহেরের সভাপতিত্বে কালির বাজার স্কুলে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মুক্তিবাহিনী গঠনের আহবান জানিয়ে বক্তৃতা করেন অধ্যাপক খোরশেদ আলম, আবুল কালাম মজুমদার প্রমুখ।
লাকসামে ‘মুজিব ক্লাব’ এর উদ্যোগে ১৩ নং পূর্ব উত্তরদা ইউনিয়নে আওয়ামী সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা এম, এ, মান্নান, লাকসাম থানা প্রজেক্ট অফিসার নজরুল ইসলাম ও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাজী আলতাফ আলী প্রমুখ।
১৫ মার্চ কোতয়ালী থানার শিমপুরে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। আবদুল মজিদ ভূঞার সভাপতিত্বে বাংলাদেশ অর্জনে বঙ্গবন্ধু আহুত আন্দোলনকে সফল করার আহবান জানিয়ে বক্তৃতা করেন অধ্যাপক খোরশেদ আলম, অধ্যাপক আবদুর রউফ, আলী তাহের মজুমদার প্রমুখ।
অন্যদিকে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলীর সভাপতিত্বে ঝাউতলা ছাত্রলীগ শাখা গঠনের উদ্দেশ্যে এক সভা হয়। এতে যে কোন ত্যাগ স্বীকারে ছাত্রদের প্রস্তুত থাকার আহবান জানানো হয়।
১৬ মার্চ কুমিল্লা শহরে আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির এক জরুরি অধিবেশনে কুমিল্লা শহর আওয়ামী লীগের সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এতে অধ্যাপক খোরশেদ আলম এম,এন,এ, কে আহবায়ক, আবদুল মালেক এম,পি,এ, ডাঃ সুলতান আহম্মদ, অধ্যাপক আবদুর রউফ, মোঃ আফজল খানকে সদস্য করা হয়। চৌদ্দগ্রামে এডভোকেট মীর হোসেন চৌধুরীকে আহবায়ক ও করিম পাটোয়ারীকে সদস্য সচিব করে আঞ্চলিক সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়।
১৮ মার্চ কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের এক জরুরী সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কাজী জহিরুল কাইয়ুম। সভায় জাতীয় পরিষদের সদস্য অধ্যাপক খোরশেদ আলমকে আহবায়ক করে জেলা আওয়ামী সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। ১৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে তিনটি বিভাগ করা হয়। অর্থনৈতিক বিভাগের আহবায়ক ডাঃ সুলতান আহম্মদকে, গণসংযোগ বিভাগের আহবায়ক মীর হোসেন চৌধুরী এডভোকেটকে ও সাংগঠনিক বিভাগের আহবায়ক অধ্যাপক আবদুর রউফকে করা হয়। ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ওমর ফারুকের নেতৃত্বে গঠিত হয় ৩১ সদস্য বিশিষ্ট আরেকটি কমিটি।
২০ মার্চ বিকালে কুমিল্লা জেলা ছাত্রলীগের এক জরুরি কাউন্সিল জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সৈয়দ আবদুল্লাহ পিন্টুর সভাপতিত্বে টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্বাধীনতা আন্দোলনে ছাত্রলীগ কর্মীরা ভবিষ্যতে কিভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে আলোচনা করেন ছাত্র লীগের সম্পাদক রুস্তম আলী। সভায় কুমিল্লার ছাত্রদের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য সৈয়দ আবদুল্লাহ পিন্টুকে আহ্বায়ক ও রুস্তম আলীকে সম্পাদক করে ৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়।
২২ মার্চ সোমবার সন্ধ্যায় টাউন হলে একটি নাটক মঞ্চায়ন করা হয়। নাটকটি রচিত হয় দেশের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর। এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। নাটকটি দর্শক শ্রোতাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে।
২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসের পরিবর্তে প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শহরে সকল সরকারি ও বেসরকারি ভবন ও যানবাহনে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দেয়।
সকালে কুমিল্লা শহর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের যৌথ উদ্যোগে ‘‘আমরা জ্যোৎস্নার প্রতিবেশী’’ সংস্থা স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে একটি ভ্রাম্যমাণ সঙ্গীত দল ট্রাকে করে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে দেশাত্মবোধক সঙ্গীত পরিবেশন করে জনগণকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে।
বিকালে কুমিল্লা শহর আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, জয় বাংলা বাহিনী ও জাতীয় শ্রমিক লীগের এক শোভাযাত্রা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে টাউন হলে সম্মিলিত কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। অধিনায়ক গোলাম হোসেন সমবেত কুচকাওয়াজ পরিচালনা করেন। বিপুল জনসমাবেশের মধ্যে জেলা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান আবুল কালাম মজুমদার অভিবাদন গ্রহণ করেন। কুচকাওয়াজের ধারা বিবরণী প্রচার করেন মাইনুল হুদা। এ সময় শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান। কুচকাওয়াজ শেষে বক্তৃতা করেন কাজী জহিরুল কাইয়ুম এম এন, এ, অধ্যাপক খোরশেদ আলম এম এন এ, আবদুল মালেক এমপিএ, ডাঃ সুলতান আহাম্মদ, অধ্যাপক আবদুর রউফ, আবুল কালাম মজুমদার প্রমুখ।
এদিনই গোপন সূত্রে খবর আসে যে, পাকবাহিনী রাতে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসে পুলিশ লাইনে আক্রমণ করবে। পুলিশ সুপার খন্দকার কবির উদ্দিন আহমদসহ পুলিশ বাহিনী যুদ্ধাবস্থায় থেকে রাত কাটায় এবং স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রহরা দিতে থাকে।
২৪ মার্চ কুমিল্লা সার্কিট হাউসে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক শামছুল হক কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেন। এখান থেকে পুলিশ সুপার খন্দকার কবির উদ্দিন আহম্মদ বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ খবর ও পরামর্শ নিতেন। জেলা প্রশাসক পুলিশ লাইনে পুলিশ বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য পূর্ণ সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দেন।
এদিনও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী শহরে বিভিন্ন প্রবেশ পথে প্রহরা দিতে থাকে যাতে পাকবাহিনী সহজে শহরে প্রবেশ করতে না পারে। এজন্য বিভিন্ন স্থানে গাছ কেটে এবং বিভিন্ন বস্তা ফেলে ব্যারিকেড দেয়। এদিন বুড়িচংয়ে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসভায় সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেয়। সভায় উপস্থিত জনতা বাঁশের লাঠি, হাতে তৈরি অস্ত্র দিয়ে বাহিনীকে মোকাবেলা করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে।
৭ মার্চের পর থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামী মানুষকে কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন স্থানে ট্রেনিং দেয়া হয়। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী এ ট্রেনিং প্রদান করে।
সেই কালো রাত
২৫ মার্চ বৃহস্পতিবার। দেশের অন্যান্য ক্যান্টনমেন্টের মতো কুমিল্লা ক্যান্টমেন্টের পরিস্থিতিও ছিলো ঘোলাটে। ৫৩ ব্রিগেড কমাণ্ডার বিগ্রেডিয়ার ইকবাল শফি ভারতীয় অনুপ্রেবশকারীদের অনুসন্ধানের অজুহাতে ৪ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কিছু অংশকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং কিছু অংশকে শমসেরনগর অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। ২৫ মার্চ বেলা ১১টা নাগাদ এই রেজিমেন্টের একটি অংশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং অপর অংশ শমসেরনগর পৌছেই বুঝতে পারে ভারতীয় অনুপ্রবেশের সংবাদ মিথ্যা ছিল। তাদের ভূয়া সুসংবাদ দিয়ে সেখানে পাঠিয়ে কোনো সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ ছাড়াই পশ্চিম পাকিস্তানি ইউনিটগুলোর সকল বাঙালি ও তাদের পরিবার পরিজনকে বন্দি করে ফেলে। সেই সঙ্গে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও শমসেরনগর পাঠানোর উদ্দেশ্য সফল হয়।
এদিন কুমিল্লা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বসে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ খবরাখবর সংগ্রহ করে এবং জানতে পারে - আজ রাতে আক্রমণ চালানো হবে। নেতৃবৃন্দ গোপনীয়তা বজায় রাখতে কুমিল্লা টাউন হলের একটি গোপন কক্ষে অবস্থান নেয়। নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক খোরশেদ আলম, অধ্যাপক আবদুর রউফ, আবদুল মান্নান মজুমদার ও আবদুল আউয়াল। তাঁরা বিভিন্ন স্থানে খবরাখবর প্রেরণ করেন। পাকবাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণের খবর পেয়ে কুমিল্লা শাসনগাছায় সড়কের উপর গাছ ফেলে, গাড়ি এলামেলো করে রেখে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। এতে নেতৃত্ব দেন শাসনগাছা আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ। টমসম ব্রিজের কাঁটা তারের বাণ্ডেল এবং বাস ট্রাক রাস্তার উপর ফেলে রেখে প্রতিরোধ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। ১০ টার মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনার পদাতিক ও গোলন্দাজ ইউনিটগুলো ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে কুমিল্লা শহরে প্রবেশ করে ও থানা হেড কোয়ার্টারসহ বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ চালায় এবং কারফিউ জারি করে। পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একজন অসুস্থ পুলিশ অস্বাভাবিক গোলাগুলির শব্দে বাইরে আসে এবং বারান্দা থেকে কি ঘটেছে তা বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছু বোঝার আগেই মেশিনগানের এক ঝাঁক গুলিতে এই অসুস্থ পুলিশটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। রাত ১২ টায় গুলিবর্ষণ বদ্ধ করে পাকিস্তানি সৈন্যরা পৈশাচিক উল্লাসে পুলিশ লাইনে ঢুকে পড়ে। পুলিশটি ওখানে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে দেখে একজন পাকসেনা বেয়োনেট চার্জ করে তার জীবন নিস্পন্দন করে দেয়। হানাদার পাকবাহিনী পুলিশ লাইনে ঢুকেই পুলিশ বাহিনীর উপর অতর্কিত আক্রমণ করে। পুলিশ বাহিনীও বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যায় তাঁদের সাধারণ অস্ত্র দিয়ে। কিন্তু আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনা বাহিনীকে মোকাবেলা করা সম্ভব হয়নি। ভোরের দিকে পাকিস্তানি সেনারা পুলিশ লাইন দখল করে নেয় এবং অসংখ্য পুলিশ শহীদ হন। এ সংঘর্ষে পাকবাহিনীর বেশ কিছু সৈন্য হতাহত হয়। এরপর থেকে অপ্রতিহতভাবে সমস্ত কুমিল্লা শহরে হায়েনার দল তাণ্ডব চালায়। ভোর বেলা কুমিল্লা সার্কিট হাউস থেকে মেজর আগা ও ক্যাপ্টেন বোখারী কুমিল্লার জেলা প্রশাসক শামছুল হক খান, সিএসপি, কে ধরে নিয়ে যায়। ২৬ মার্চ সকাল ৭ টায় বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ সুপার খন্দকার কবির উদ্দিন আহমদকে। সেই সঙ্গে কুমিল্লা শহর পাকবাহিনীর দখলে চলে যায়। পরবর্তীতে কুমিল্লা ডিসি, এসপিকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে নির্মমভাবে হত্যা করে।
এদিকে রাত ১টায় ২৪ ফ্রান্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট ও ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ারদের একটি অংশ এবং তাদের সঙ্গে ১২০ মিলিমিটার মর্টারবাহী ৮০ থেকে ১০০টি যানের একটি বিরাট কনভয় কুমিল্লা ক্যান্টমেন্ট থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়।
।। বাকি অংশ আগামীকাল পড়ুন।।