
বর্তমান
বিশ্বে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ করোনাভাইরাসের মহামারি। সারা বিশ্বে গত
দুই বছরে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন প্রায় ৫৯ লাখ মানুষ। আর
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে,
পরিবেশদূষণের কারণে এক বছরেই মারা গেছেন কমপক্ষে ৯০ লাখ মানুষ। অর্থাৎ
করোনাভাইরাসে মৃত্যুর তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
আর এর মধ্যে ৭০ লাখ
মানুষেরই মৃত্যু হয়েছে শুধু বায়ুদূষণের কারণে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব
মৃত্যুর বেশির ভাগই হচ্ছে নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোতে, যা কোনো কোনো
দেশের মোট মৃত্যুর ৯০ শতাংশেরও বেশি। বায়ুদূষণের দিক থেকে বাংলাদেশের
অবস্থাও অত্যন্ত খারাপ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের আটটি প্রধান শহর রয়েছে
পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায়। শুধু বায়ুদূষণ নয়, পানি ও
মৃত্তিকাদূষণসহ অন্যান্য দূষণের দিক থেকেও বাংলাদেশের অবস্থা অত্যন্ত
খারাপ। ফলে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনি ও লিভারের রোগ
দ্রুত বাড়ছে।
পরিবেশদূষণ রোধে দেশে অনেক আইন রয়েছে। সেসব আইন
বাস্তবায়নের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংস্থা
রয়েছে। কিন্তু আইনের সঠিক বাস্তবায়ন নেই বললেই চলে। এর কারণ সংশ্লিষ্টরা
সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছে না। সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি
ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে এমন
চিত্র। প্রতিবেদনে দেখা যায়, দূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অবৈধ অর্থ
লেনদেনের রীতিমতো মহোৎসব চলে। তীব্র দূষণকারী কারখানাও অনায়াসে পরিবেশ
ছাড়পত্র পেয়ে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্প-কারখানার পরিবেশ ছাড়পত্র দিতে
শ্রেণিভেদে ৩৬ হাজার থেকে এক লাখ আট হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেন
হয়। ৬৬ শতাংশ শিল্প-কারখানার পরিবেশ ছাড়পত্রই এই প্রক্রিয়ায় দেওয়া হয়। দেশে
বায়ুদূষণের একটি প্রধান কারণ ইটখোলা। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে
দেখা যায়, কোনো কোনো অঞ্চলে ৯০ শতাংশের বেশি ইটখোলা লাইসেন্স বা পরিবেশ
ছাড়পত্র ছাড়াই চলে। অভিযোগ রয়েছে, তারাও অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে স্থানীয়
প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই ‘ব্যবসা’ চালাচ্ছে। শহরাঞ্চলে অসংখ্য ফিটনেসহীন
গাড়ি অনবরত বায়ুদূষণের কারণ হচ্ছে, অথচ যাদের সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করার কথা
তারা তা করছে না। ফলে উন্নত হওয়ার বদলে দেশের পরিবেশের অবনতিই বেশি হচ্ছে।
এমন পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন উচ্চ আদালত। তার মধ্যে আছে,
দেশের কোন কোন এলাকার বাতাস সবচেয়ে দূষিত এবং এই দূষণের উৎস কী, সেটা
চিহ্নিত করে তা কমানোর জন্য কর্মপরিকল্পনা দেওয়া, সার্বক্ষণিক বায়ুমান
পর্যবেক্ষণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উপযুক্ত স্থানে পর্যাপ্ত ‘কন্টিনিউয়াস
এয়ার মনিটরিং স্টেশন’ (সিএএমএস) স্থাপন করা, একই সঙ্গে বিপজ্জনক ও
অস্বাস্থ্যকর বায়ু থেকে জনগণকে রক্ষায় সতর্কতামূলক সংকেত পদ্ধতি চালু করা। এ
ছাড়া পোড়ানো ইটের বিকল্প পদ্ধতি উন্নয়নের জন্য ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর
দপ্তরের নির্দেশনা বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনাও চাওয়া হয়েছে।
যেসব
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, কোনো সভ্য দেশে চলতে
পারে না। আমরা চাই, উচ্চ আদালতের নির্দেশনাগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করা
হোক। পরিবেশদূষণ রোধে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হোক।