
ড. মাহবুব হাসান ||
পঞ্চাশোর্ধ্ব
আফরোজা হাসান খান কাঁচাবাজার থেকে বাসায় ফিরে হাঁফাচ্ছিলেন। বললেন, আর
পারি না। তিনি কী পারছেন না সেটা আমি বুঝেছি। কাঁচাবাজারের তরিতরকারির
দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনি আর ব্যয় বাড়াতে পারছেন না। তার আয় সীমিত। সেই
আয়েই সংসার নির্বাহ করতে হয় তাকে। গত পনেরো দিনে জেনেছি সয়াবিন তেলের দাম
বেড়েছে, চালের দাম বেড়েছে, মাছ-মাংসের দাম বেড়েছে। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার
ধকল তিনি সহ্য করছেন বাসে যাতায়াত করতে গিয়ে। মূল্য বাড়ার এই তালিকা কত
বড়, কত বিস্তৃত সেটা তিনি বেশ টের পাচ্ছন। জীবনকে তার ভারবাহী এক গর্ধব বলে
মনে হচ্ছে। যারা মূল্য বাড়ানোর তরিকার লোকজন তারা এই শীতেও [শৈত্যপ্রবাহে]
ঠাণ্ডা হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিয়ে দিব্বি হেসেখেলে টুপাইস কামিয়ে নিচ্ছেন। তার
দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন? তিনি বারদুয়েক জোরে জোরে শ্বাস টানলেন। মনে মনে
নিজেকে শাসালেন। বেশি উত্তেজিত হয়ো না।
রোদে পিঠ মেলে দিয়ে তিনি চায়ে
চুমুক দিলেন। হাতে তুলে নিলেন আমাদের সময় পত্রিকা। লিড আইটেমের শিরোনাম
‘ব্যয়ের চাপে কাবু মানুষ’। এই শিরোনাম তাকে অনেকটাই অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয়।
পরের শিরোনামও তার চোখ এড়ালো না। ‘খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার
আহ্বান’। কে বা কারা সেই আহ্বান করেছে তা জানার আগ্রহ বোধ করলেন না তিনি।
কারণ ওইসব আহ্বানে কান দেয় না সরকার। অতীতে বহুবারই এমনটা দেখেছেন তিনি।
পাশের শিরোনাম দেখেই তার চোখ কুঁচকে গেল। তার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল এর পরও
কীভাবে মনে করেন যে, জনগণ আপনাদের ভোট দেবে?
২.
ঢাকা মহানগরে
যারা বাস করেন [পরিসংখ্যান বলছে সোয়া ২ কোটিরও বেশি মানুষের বাস এই
মহানগরে।] তাদের মধ্যে ৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে খাদ্যপণ্যের মূল্য বাড়া নিয়ে
কোনো টেনশন নেই। তারা বাজারে গিয়ে তা মাছ-মাংস বা কাঁচাবাজারের অনেক
খাদ্যপণ্য কেনেন দামের কোনো ওজর-আপত্তি ছাড়াই। মূল্য বাড়া নিয়ে কোনোরকম
টেনশন নেই তাদের মধ্যে। বাকি ৯৫ শতাংশ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। [পড়ুন
আমাদের সময়/৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২। এই রিপোর্টটি পাঠককে নিত্যদিনের দরকারি
খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনের কারণগুলো যেমন জানাচ্ছে তেমনি কারা এবং
কীভাবে তা বাড়ছে, সেই বাস্তব সত্য তথ্যও উল্লেখ করেছে।]
সাধারণ মানুষের
যে নাভিশ্বাস উঠছে আজ দেশের বিভিন্ন জেলা এবং ঢাকা মহানগরের প্রান্তিক
কাঁচাবাজারের মূল্যচিত্র দেখলেই তা বোঝা যায়। ‘রাজধানীসহ পাঁচ জেলার
বাজারচিত্র বলছে, সব ধরনের পণ্যের দামই বাড়ছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং
করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবও বলছে, বছরের ব্যবধানে বেশিরভাগ
নিত্যপণ্যের দাম অনেক হারে বেড়েছে।
টিসিবির নিয়মিত তথ্য পর্যবেক্ষণ করে
প্রয়োজনীয় দশটি পণ্যের (চাল, ডাল, আটা, খোলা সয়াবিন তেল, চিনি, আদা,
ব্রয়লার মুরগি, ফার্মের ডিম, গুঁড়াদুধ ও গরুর মাংস) মূল্যবৃদ্ধির হার হিসাব
করে দেখা গেছে, গত বছরের (২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি) তুলনায় এ বছর (২০২২
সালের ফেব্রুয়ারি) এসব পণ্যের দাম ১৯ দশমিক ৩০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ বছরের
ব্যবধানে এসব পণ্য কেনায় ভোক্তার গড় খরচ বেড়েছে ১৯ শতাংশেরও বেশি। খরচ
বাড়ায় এসব পণ্যের অনেকগুলোই বাজার তালিকা থেকে বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন
ভোক্তারা।
টিসিবি ও বাজারদরের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এক বছরের
ব্যবধানে চিকন চালের দাম ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং মোটা চালের দাম ৩ দশমিক ২৬
শতাংশ বেড়েছে। খোলা আটা ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ ও প্যাকেটজাত আটার দাম ২৬ দশমিক
৮৭ শতাংশ বেড়েছে। প্যাকেট ময়দার দামও ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়েছে।
এদিকে
প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলে ২৩ শতাংশ, খোলা সয়াবিন তেলে ২৯ দশমিক ৩৯
শতাংশ এবং পাম তেলে ৩০ দশমিক ১৯ শতাংশ দাম বেড়েছে। এক বছরে মসুর ডাল (মোটা
দানা) ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ, চিনি ১৪ দশমিক ৮১ শতাংশ, আদার দাম ২২ দশমিক ২২
শতাংশ বেড়েছে। ফার্মের ডিমের দাম এক বছরে ১৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। গরুর
মাংসের দাম ১৩ শতাংশ বেড়েছে এবং ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ৭ দশমিক ১৪
শতাংশ। গুঁড়াদুধের দামও এক বছরে ব্র্যান্ডভেদে ২ দশমিক ৬৫ থেকে ৭ দশমিক ২১
শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বাজারচিত্র বলছে, দীর্ঘসময় ধরে মানুষকে ভোগাচ্ছে
চালের বাজার। দুই বেলার জন্য মোটা চাল কিনে খেতেও গরিবের কষ্ট হচ্ছে। গত
বছরের শেষদিকে ৪৮ টাকার মধ্যে কেনা গেলেও বর্তমানে রাজধানীর বাজারে ভালো
মানের মোটা চাল ৫০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। রাজধানীর খুচরা বিক্রেতারা
বলছেন, দুই সপ্তাহের ব্যবধানে চিকন চালের দাম কেজিতে নতুন করে ২ টাকা
বেড়েছে। [ব্যয়ের চাপে কাবু মানুষ/আমাদের সময়/০৯/০২/২২]
এই রিপোর্টই
আমাদের ব্লাডপ্রেশার বাড়িয়ে দিল নাকি সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা
দেখিয়ে দিচ্ছে, তা ভাবারও সময় পাচ্ছে না তারা। তারা বাজারচিত্র দেখবে নাকি
প্রতিদিনের জন্য খাদ্যপণ্য কেনার টাকা-কড়ি জোগাড়ে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াবে?
করোনা মহামারী আমাদের অর্থনীতিকে কীরকম বিপর্যস্ত করেছে সেটা কেবল দেশের
চাকরিজীবী ও গরিব মানুষরা টের পাচ্ছে। কত শতাংশ মানুষ চাকরি হারিয়েছে সে
হিসাব না করলেও সাধারণ মানুষ ক্ষুধার চাপে দুনিয়াদারিকে গদ্যময় মনে হচ্ছে
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতোই। আর আকাশের জ্যোৎস্নাময় চাঁদকে ঝলসানো রুটি
[পোড়া রুটি] মনে হচ্ছে তাদের কাছে। প্রতিবছর ৫-৬ লাখ টন চাল আমদানিসহ
নিত্যপণের অনেকই আমাদের আমদানি করতে হয়। তার পরও আমরা শুনতে পাই আমাদের
উন্নতি হচ্ছে। আমরা শনৈঃশনৈ উন্নতির ওপরের স্তরে উঠে যাচ্ছি। আমাদের
অর্থনীতি নিম্নআয় থেকে উন্নয়নশীল স্তরে উঠে যাচ্ছে। কিন্তু প্রান্তিক
মানুষের পেটে যে খাদ্য জুটছে না, সে খবর ফলাও হয় না। আমাদের
পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, মাথাপিছু আয় বেড়েছে ২ হাজার ৫৯১
ডলার, এ বছর [২০২০-২০২১]। অর্থাৎ বাংলা টাকায় ২ লাখ ১৯ হাজার ৭৩৮ টাকা।
প্রান্তিক মানুষের পেটে দুবেলা মোটা চালের ভাত জোটে না, তবু অর্থনীতির এই
হিসাবে [পড়ুন চক্রে] তারাও প্রতিবছর সোয়া দুই লাখ টাকার মালিক। মাথাপিছু
আয়ের এই হিসাব আমাদের যে স্বপ্ন দেখাচ্ছে, প্রতিদিনের কাঁচাবাজারের ব্যয়
তাতে জল ঢেলে দিচ্ছে। ফলে খেটে খাওয়া, ঠেলাওয়ালা, রিকশাওয়ালা, ছোট
চাকরিজীবী, শ্রমিক শ্রেণির একটা বড় অংশ তো বেকার এবং ঢাকা মহানগরের ৯শ
সাংবাদিকও এখন বেকার, এদের বাসাবাড়ির খরচ কে জোগায়? এরাও কিন্তু মাথাপিছু
আয়ের ভাগীদার। দেশটা উন্নয়নের গাড়িতে উঠে গেছে ঠিকই, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ
এক ক্ষুধা-মহামারীর ভেতরে নিমজ্জিত। এই নিমজ্জনের রূপটাই আমাদের দেখাচ্ছে
ঢাকা এবং দেশের প্রান্তিক জেলার পাইকারি ও কাঁচাবাজারের চিত্র।এবং আমরা
দেখতে পাচ্ছি পাইকারি ও খুচরা বাজারে একটি দুষ্টচক্র [সিন্ডিকেটও বলা হয়]
সব সময়ই সক্রিয়। তারা যার যার রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক পয়েন্ট অব ভিউ থেকে
পণ্যের দাম বাড়ায়। আমাদের বাজার নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ [সরকারের বাণিজ্য
মন্ত্রণালয় ও অন্য সংশ্লিষ্টরা] ওই সিন্ডিকেটের মাথামুণ্ডু নাকি চেনেন না।
তাই তাদের মূল্য বাড়ানোর কুকাজ বা অপরাধও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। এই
ধরাবাঁধা শব্দগুলো সরকারি দপ্তরে ভাঙা রেকর্ডের মতো ঘ্যানঘেনে সুরে বাজে।
এবং বাজতেই থাকে।
আমাদের উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহের পরিসংখ্যানের
পরিষ্কার তথ্য নেই। কার বা কাদের কাছে ওই উপাত্ত থাকার কথা? সে তো আমরা
জানি, বাজার নিয়ন্ত্রক সরকারি তরফের লোকজনের কাছে। কিন্তু তারা কখনই, কোনো
সময়ই সেই উপাত্ত জনগণের সামনে উপস্থাপন করেন না। কারণ সিন্ডিকেটের সদস্যদের
লাভজনক সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই কারসাজিটা তারা করেন। আবার দেশের
প্রান্তিক জেলা থেকে খাদ্যপণ্য ঢাকায় আনার জন্য ট্রাকের যে ভাড়া বাড়ানো
হচ্ছে ডিজেলের দাম বাড়ানোর কারণ দেখিয়ে, তার সঙ্গেও ওই দুষ্টচক্র জড়িয়ে
আছে। সরকারি তরফে ডিজেলের দাম বাড়ানোর কোনো দরকার ছিল না, তার পরও সরকারের
ওই প্রতিষ্ঠান দাম বাড়িয়েছে। এর সূত্রে ট্রাক ভাড়া বেড়েছে। বেড়েছে রাজনৈতিক
কর্মীদের বেআইনি, অবৈধ চাঁদাবাজি। আর এসব দুষ্টচক্রের সব দায় শোধ করে
ক্রেতা বা ভোক্তা জনগণ। যেভাবেই দেখুন না কেন, আর্থিক ক্ষতির দায়টি টানে
ভোক্ত জনগণ। তাদের ওপরই সব রকম চাপ। যারা ওই দুষ্টচক্রের মানুষ, তাদের
নিত্যপণ্য কিনতে কোনো অর্থনৈতিক চাপে পড়তে হয় না। তাদের ব্যবসা আর
বাণিজ্যের চক্রটিই তাদের চাহিদা মিটিয়ে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে ধনবান অরবিটে
[চক্রে] তুলে দেয়। দেশের শত শত কোটিপতি [পড়ুন- হাজার হাজার/ লাখ লাখ
কোটিপতি] কিন্তু মাথাপিছু আয়ের হিসাবে মাত্র সোয়া দুই লাখ টাকার মালিক। আর
যে ভিক্ষুক আপনার কাছে ভিক্ষা চায় প্রতিদিন, তারও সারা বছরের আয় সোয়া দুই
লাখ টাকা। এই রাজনৈতিক-অর্থনীতির খেলাই পুঁজিবাদী দেশগুলোর সবচেয়ে সফল
উদ্ভাবন। আর ওই কাজে নিয়োজিত আছেন পৃথিবীর অর্থনীতিবিদরা। এরা দরিদ্র
মানুষের সম্পদ কীভাবে লুটে নিতে হবে, সেই কাজ করেন। কীভাবে ফাঁকি ও মিথ্যায়
সাজিয়ে তুলতে হবে তথ্য, সেটা তারা ভালো জানেন। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত
কর্মকর্তারা তথ্য-উপাত্ত লুকিয়ে রেখে সিন্ডিকেটের জন্য লুটের দরজা ওপেন করে
রাখেন। লুটেরা ব্যবসায়ীদের দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষই
যেখানে দুষ্টচক্রের সহায়, সেখানে জনগণের কথা তারা ভাববেন কীভাবে?
দরিদ্র
মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া মানে আমাদের সিংহভাগ মানুষের রোজগারের
ব্যবস্থায় ছেদ পড়েছে। কোভিড-১৯ যেমন আমাদের সার্বিক অর্থনৈতিক কাজে বাধা
দিয়েছে, তেমনি একদিকে চতুর ও লুটেরাদের অর্থবিত্ত বানানোর নানারকম প্রণোদনা
দিয়েছে। অন্যদিকে দরিদ্রকে হতদরিদ্র্যের স্তরে নামিয়ে এনে আমাদের মতো
প্রগতিশীল ও উন্নয়নশীল দেশের কোমর নড়বড়ে করে দিয়েছে। বলতেই হবে, চাল-ডাল,
তেলসহ তরিতরকারির দাম বেড়ে গেলেও আমরা কিনতে পারি বা না পারি- তাতে কোনো
ক্ষতি নেই। আমরা তো এক স্বপ্নের রেল গাড়িতে চড়ে বসেছি। একদিন ঠিকই আমরা
পৌঁছে যাব সেই কাক্সিক্ষত জায়গায়। তাই বলব, আমরা ভালো আছি।
ড. মাহবুব হাসান : কবি ও সাংবাদিক