
জুলফিকার নিউটন ||
ছোটবেলা
থেকেই অসংখ্য বই ও অজস্র পত্রিকা পড়ে আমারও সাধ হত লিখতে। কিন্তু কি লিখব।
কেমন করে লিখব, কার জন্যে লিখব, যা লিখব তার অর্থ কী, এসব আমার কাছে
পরিষ্কার ছিল না। বারো বছর বয়সে আমার হাতে পড়ে দেবিদ্বার রেয়াজউদ্দিন পাইলট
হাই স্কুলের লাইব্রেরির আলমারির চাবি। ক্লাস শেষে লাইব্রেরি রুমে যাই,
আলমারি খুলি, যত ইচ্ছা পড়ি। রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ, উপন্যাস, গীতবিতান;
শরৎচন্দ্রের দেবদাস, পথের দাবি, দেনা পাওনা, শ্রীকান্ত, কাজী নজরুল
ইসলামের-রিক্তের বেদনা, মৃত্যু ক্ষুধা, অগ্নিবীণা, বিষের বাশি, সৈয়দ মুজতবা
আলীর-চাচা কাহিনী, দেশে বিদেশে, শবনম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের-পদ্মা নদীর
মাঝি, পুতুল নাচের ইতিকথা, দিবারাত্রির কাব্য, সৈয়দ ওয়ালি উল্লাহার লাল
সালু, চাঁদের অমাবাস্যা, শওকত ওসমানের ক্রীতদাসের হাসি, জননী, বিভূতিভূষণ
বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালি, অপরাজিত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবি,
চাঁপা ডাঙ্গার বউ, গণদেবতা, সত্যজিৎ রায়ের গোয়েন্দা ফেলুদার রহস্য কাহিনী,
প্রফেসর শঙ্কুর অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী। কোনটা ছেড়ে কোনটা পড়ি? আমার নেশা ধরে
যায়। সেই বয়সেই আমার চোখে পড়ে ‘আর্ট’ বলে একটি কথা। দৈনিক সংবাদের পাতায়।
কথাটা মনে গেঁথে যায়। তার মানে কী তা আমার জানা ছিল না। কিন্তু সাহিত্যে
তার নমুনা কী সেটা তো আমার চোখের সামনেই ছিল। রূপকে বাদ দিয়ে সায় নয়,
সারকে বাদ দিয়ে রূপ নয়। তখন থেকেই আমার নজর রয়েছে রূপের উপরে, মন রয়েছে
সারের উপরে। বলতে গেল চৌদ্দ বছর বয়সেই আমার উপনয়ন হয়। আর্টের গুরুগৃহে
উপনয়ন। রবীন্দ্রনাথ ও টলস্টয়ের লেখা পড়েই আমার সাহিত্যে চর্চার হাতে খড়ি
শুরু হয়। একটি জিজ্ঞাসার উত্তর পাই। কেমন করে লিখব? কেমন করে লিখলে আর্ট
হবে?
কিন্তু তখনো আমার বাকি ছিল জানতে কী লিখব? প্রশ্ন সে বয়সে জানবার
কথাও নয়। আমি যখন ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্র তখন লাইব্রেরি থেকে নিয়ে
পড়ি টলস্টয়ের ‘হোয়াইট ইজ আর্ট’। বইখানা আমাকে খুবই নাড়া দেয়। ইতিমধ্যে
টলস্টয়ের ওয়ার এন্ড পিস, আনা কারোনিনা, রিজারেকশান, দান্তের ডিজাইন কমেডি,
গ্যাটের ফাউস্ট, আয়রণ হ্যান্ড, ম্যার্ক্সিম গোর্কির মা, পৃথিবীর পথে;
দস্তভস্মির ক্রাইম এন্ড পানিসমেন্ট, দি উডিয়েট, দি ইনসালটেড দি এন্ড দি
ইনজুরড; মার্ক টোয়েনের আদম এন্ড ইভ, ওয়াজ ইন হ্যাভেন অর হেল? জাঁ পল
সার্ত্রের, বিয়িং এন্ড নার্থিংনেস, আলবেয়ার কাম্যুর-দি ফল, দি প্লেগ,
আউটসাইডার, হেনরিক ইবসেনের-এ ডলস হাউস, অ্যান এনিমি অব দি পিপল, আর্নেষ্ট
হেমিওয়ের এ ফেয়াররুয়েল টু আমর্স, ফর হোম দি বেল টুলস, দি এন্ড ম্যান এন্ড
দি সি, নুট হামসুনের হাঙ্গার, গ্রোথ অব দি সয়েল, আনাতুল ফ্রান্সের দি রেড
লাইফ, দি ব্লুম অব লাইফ, টমাস মানের দি ম্যাজিক মাউন্টেন, ডেথ ইন ভিনিস,
বুড্ডেন ব্রুকস, জন গলস্ ওয়ার্দীর দি ফোর সাইত সাগা, দি সিলভার স্পুন,
হেরম্যান হেসের-ডেথ এন্ড লাভার, জার্নি টু দি ইষ্ট, আন্দ্রেজিদের-ইফ ইট
ডাই, দি কাউন্টার ফিটারর্স, বারট্রান্ড রাসেলের অটোবায়োগ্রাফি, বরিস
পাস্তেরনাকের ডক্টর জিভাগো, মিখাইল শলোকভের-ভার্জিল সয়েল আপটান্ড, হারভেষ্ট
অন দি ডন্, সল বেলোর সিজ দি ডে, দি ভিক্টিম, আইজ্যাক সিঙ্গারের ইন মাই
ফাদার্স কোর্ট, গিম্পেল দি ফুল, ভিক্টর হুগোর-লা মিজারেবল, গিওওভার্নি
বোক্কাচিওর-ডেকামেরন, মিসেল সার্ভেন্টিসের-ডন কুইকজোট, স্তাঁদালের দি রেড
এন্ড দি ব্ল্যাক, এরিয়া মারিয়া রেমার্কের থ্রি কমরেডস, দি স্পার্ক অফ লাইফ,
হারমান মেলভিলের মবিডিক, আলেকজান্ডার সলজেনিভিসিনের-ক্যান্সার ওয়ার্ড,
চিনুয়া আচিবির থিংকস ফল অ্যাপার্ট, ফ্রানৎস কাফকার দি ট্রায়াল, দি ক্যাসল,
হাওয়ার্ড ফাস্টের স্পার্টাকাস, সাইলাস টিম্বারম্যান, আলেক্স হেলির-রুটস,
গুস্তাভ ফ্লোবেয়ারের-মাদাম বোভারি, চার্লস ডিকেন্সের ডেভিড কপারফিল্ড,
অলিভার টুইস্ট, এ টেল অফ টু সিটিজ, গ্রেট এক্সপেকটেশনস, আলেকজান্দার
ডুমার-কাউন্ড অব মান্টিক্রিস্টো, থ্রি মস্কেটিয়ার্স, টমাস হার্ডির-ফার ফ্রস
দি ম্যাডিং ক্রাউড, চার্লস ডিকেন্সের ডেভিড কপারফিল্ড, গ্রেট একসাপেকটেশন,
এ টেল অফ টু সিটিজ, মার্কেজের ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউট, দি এ্যাটম
অব দি প্যাটিয়ার্ক, ক্লোদ দি প্যালেস, দি উইন্ড, গুন্টার গ্রাসের টিন
ড্রাম এবং ইউরোপীয় সাহিত্য আমি তন্ময় হয়ে পড়েছিলাম।
টলস্টয়ের বিচারে ও
বেশির ভাগই আর্ট নয় কিংবা আর্ট হিসেবে খাটো। আর্ট তাহলে কী? আমি যদি আমার
শিক্ষানবীশ সমাপ্ত করে সাহিত্যিক রূপে আত্মপ্রকাশ করি তাহলে আমি কী লিখব।
সত্য নিয়ে লিখব। টলস্টয় উদ্ভাবন পছন্দ করতেন না। মস্তিস্ক থেকে যা উৎপন্ন
তার পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি ছিলেন অলংকরনেরও বিরোধী। যে যা অনুভব করেছে তা
সরলভাবে প্রকাশ করবে, সহজ ভাষায়। তিনি নিজেও শেষ বয়সে সেই সাধনায় নিমগ্ন
ছিলেন। তবে টলস্টয় শেষ বয়সে ছিলেন একজন নীতিবাদী। তাঁর সুনীতি কুনীতির
মাপকাঠি মেনে নিলে সাহিত্য বা আর্টের রস থেকে জীবনের পনেরো আনা বাদ দিতে
হয়। কারণ সেটা ভালো নয়, মন্দ। সাদা নয়, কালো। জীবনকে যেমন ভালো মন্দ, সাদা
আর কালো, এই দুই ভাগে বিভক্ত করা যায় না, প্রকৃতিকে যেমন সৎ আর অসৎ, আলো আর
অন্ধকার এই দুইভাবে বিভক্ত করা যায় না, করলে দুটোকেই স্বীকার করতে হয়,
তেমনি সাহিত্যকেও। আর্টকেও। এটা ছিল টলস্টয়ের সমসাময়িক পাশ্চাত্য সাহিত্র
পড়ে আমার প্রত্যয়। তাই টলস্টয়ের সত্যের উপর জোর আমি মেনে নিলেও নীতির উপর
জোর মেনে নিতে পারিনি। যে টলস্টয় আর্টিষ্ট তারই অনুসরণ করেছি। যিনি
মরালিষ্ট তার নয়। নীতিবোধ যে আমার ছিল না তা নয়। সংসারের বিনিময়ে আত্মাকে
বিক্রয় করা আমার চোখে চূড়ান্ত কুনীতি। কিন্তু সাহিত্য মাত্রেই হবে
সুনীতিসম্মত এতে আমার রসবোধ সায় দেয়নি। আর্ট যদি শুধু পাপের শাস্তি আর
পুণ্যের পুরস্কার বন্টন করতে নিযুক্ত থাকে তবে তাকে ফিরে যেতে হয়
পাশ্চাত্যে রেনেসাঁসের পূর্ববর্তীকালে। রেনেসাঁস থেকে আধুনিক যুগের সূচনা।
তাই রেনেসাঁসকে আমি মনে প্রাণে বরণ করেছিলাম। পাশ্চাত্য বলে বর্জন করিনি।
আধুনিক বলে গ্রহণ করেছিলাম।
কাদের জন্য লিখব? কেউ বলতেন মানব কল্যাণের
জন্যে, কেউ সমাজ সংস্কার বা সমাজ বিপ্লবের জন্যে, কেউ নৈতিক উন্নয়নের
জন্যে, কেউ দেশ উন্নয়নের জন্যে, কেউ মনোরঞ্জনের জন্যে, কেউ লোক শিক্ষার
জন্যে। বর্তমান লেখকদের মতো আগের লেখকদের কাঞ্চনভাগ্য তেমন প্রসন্ন ছিল না।
তাই কেউ বুক ফুলিয়ে বলতেন না, টাকার জন্যে। টাকা যাঁরা নিতেন তাঁরা লজ্জার
সঙ্গে নিতেন। ‘বঙ্গবন্ধু গান্ধী লেনিন’ গ্রন্থের জন্য গান্ধী গবেষণা
পুরস্কার প্রাপ্তিতে শওকত ওসমান আমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন, কখনো টাকার জন্যে
লিখবে না। আমি তাঁর সেই উপদেশ শিরোধার্য করেছিলাম। কিন্তু আর্টের জন্যে
আর্ট এই তত্ত্বে তিনিও বিশ্বাস করতেন না। আমি কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষ
পর্বের ইউরোপীয় সাহিত্যিকদের মতো বিশ্বাস করতাম যে আর্টের জন্যেই আর্ট।
অর্থাৎ আর্ট আর কারো উদ্দেশ্য নয়, নিমিত্ত নয়। সে নিজেই একটা এন্ড বা
উদ্ধিষ্ট। ধর্মের প্রতি তার ভক্তি থাকতে পারে, নীতির প্রতি শ্রদ্ধা, সমাজের
প্রতি তার দায়িত্ব থাকতে পারে, দেশের প্রতি কর্তব্য, মনোরঞ্জনেও তার আনন্দ
থাকতে পারে, লোক শিক্ষার পরিতৃপ্তি, কিন্তু তাই বলে সে কারো প্রজা নয়। সেও
একজন রাজা। পাঠকরা তাকে যা দেন, তা এক প্রকার নজরানা। প্রকাশকরা দেন
রয়ালটি।
এর পরের প্রশ্ন, আর্টের সার্থকতা কী? আদৌ লিখব কেন? সৃষ্টি করব
কেন? কে এমন মাথার দিব্যি দিয়েছে যে আমাকে আর্টের জন্যে আর্ট করতে হবে? আমি
তো ইচ্ছা করলে ইতিহাসও রচনা করতে পারি। যেমন বঙ্গবন্ধু করেছেন,
বঙ্গবন্ধুপন্থীরা করেছেন, বিপ্লবীবাদীরা করছেন। আমি তো মিডিয়াও চালাতে
পারি। যেমন আমার পুরোগামীরা করছেন। জীবনে করবার মতো কত রকম কাজ আছে, সেসব
ছেড়ে সাহিত্য সৃষ্টি? এত গুরুত্ব যার সে তো আজ বাদে কাল বাসি হয়ে যেতে
পারে, কেউ মনেও রাখবে না লেখকের নাম। তেমন নাটক বা তেমন উপন্যাস কখানাই বা
লেখা হয়েছে যা সব সময় তাজা? সেই কখানার রহস্য কী? তাঁর একখানাও দি না পারি
তো কেন এই দূর্গম যাত্রাখানা, জনপ্রিয়তা বা অর্থপ্রাপ্তি যখন লক্ষ্য নয়?
লক্ষ্য কি তবে একুশে পদক ও একাডেমী পুরস্কার? দেশব্যাপী যশ? দেশময় সম্মান?
কিন্তু অধিকাংশের কপালেই জুটেছে অনাদার, অবহেলা, লাঞ্ছনা, ব্যর্থতা ও
অবলুপ্তি। আমি হয়তো অধিকাংশেরই সামিল। কিন্তু কলম যতক্ষণ আমার হাতে আছে
ততক্ষণ আমিও পৃথিবীর একজন মনিব। কী থাকবে, কতটুকু থাকবে, সেটা বিবেচ্য নয়।
বিবেচনার বিষয় হচ্ছে, ওর সার্থকতা কী? কেন লিখব? কেন সৃষ্টি করব? না করলে
কী আসে যায়?
একজন হয়তো আপন মনে গান গেয়ে চলেছে। কিংবা দূরবর্তী আরেকজনের
কানে পৌঁছে দিচ্ছে তার সূরের সাম্পানকে। প্রথম ক্ষেত্রে আর্ট হচ্ছে আত্ম
আবিস্কার। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আত্মপ্রকাশ বা পরিচিতি। তেমনিভাবে একটি তৃতীয়
ক্ষেত্রও আছে। সেখানে আর্ট হচ্ছে জগৎ প্রকাশ ও পরিচিতি। যে জগৎ একজনের
ভিতরে ও বাইরে। আট দশ হাজার বছর আগেকার গুহাচিত্র পাওয়া গেছে। তাতে সেকালের
গুহামানব তার নিজেকে প্রকাশ করেছে, সঙ্গে সঙ্গে তার চেনা জানা জগৎকে। সে
যুগে রিলিজয়ন ছিল কিনা বলা যায় না। কিন্তু আর্ট ছিল। আমরা ধরে নিতে পারি যে
যারা ছবি আঁকত তারা গানও গাইত, নাচও নাচত। নাটক ও কাহিনী এসে থাকবে, আরো
পরে। ব্যালাড থেকে এপিক ও এপিক থেকে ক্লাসিক পর্যায়ে উপনীত হতে হাজার হাজার
বছর লেগে থাকবে। একজন থেকে দু’জন দু’জন থেকে হাজার জন যোগ দিয়েছে।
যে
লেখে তার দেশ আছে, যুগ আছে। কিন্তু যা লেখা হয় তা দেশ থেকে দেশান্তরে ও যুগ
থেকে যুগান্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সূর্যের আলোর মতো। সমুদ্রের তুফানের মতো।
বাইরের মানুষটার জাত কুল বংশ পরিচয় আছে। ভিতরের মানুষটার তা নেই। তার
লেখনীর মুখ দিয়ে যা নিঃসৃত হয় তা যদি অদি গভীর স্তরের বাণী বহন করে আনে তবে
তা গ্রীকের না বাঙ্গালীর না চৈনিকের না আরবের না পারসিকের না ইংরেজের না
ফরাসীর না জার্মানের না রুশের না নরওয়েজিয়ানের ও গণনা লঘুচেতাদের। মুক্তমতি
মানুষের কাছে পৃথিবীর সকলেই আত্মার আত্মীয়।
আমার কাছে আর্ট একটা
অন্বেষণ। রিয়ালিটিকে আমি ধরতে চুঁতে প্রাফপন চেষ্টা করেছি। প্রথমে আমার
ইন্দ্রিয় ও মন দিয়ে, তারপর আমার লেখনী দিয়ে। এক একটা সুরকে, একটা ভাবকে এক
একটা ইঙ্গিতকে বা আভাসকে হরিণের মতো তাড়া করেছি। হরিণকে হয়তো পাইনি, তার
বদলে হয়তো পেয়েছি শকুন্তলাকে। যে কথা লিখতে চেয়েছিলাম সে কথা লেখা হয়নি।
হঠাৎ আপনা লেখা হয়ে গেছে অন্য কথা। কবিতার বদলে ভ্রমণ কাহিনী। ভ্রমণ
কাহিনীর বদলে উপন্যাস। কখনো হরিনের বদলে শকুন্তলা, কখনো শকুন্তলার বদলে রাজ
সিংহাসনে। শকুন্তলা এসে উপেক্ষিতা হয়ে ফিরে গেছে। আর্টের অন্বেষণ মিডিয়ার
খাতিরে কতবার যে স্থগিত রাখতে হয়েছে তার ঠিক নেই। কিন্তু সে সব পরবর্তী
জীবনের কথা। যে সময়ের কথা বলছিলাম সেটা আমার শিক্ষাণবীশির বয়সের।
সেই
বয়সেই উপলব্ধি করি যে আমি চাই আর না চাই আর্টও আমাকে তাড়া করে নিয়ে যায়
ঝড়ের মতো। আমাকে ধ্বংসভ্রংশ করে, শান্ত ক্লান্ত বিপর্যস্ত করে নিষ্পেষিত ও
নিঃশেষিত করে অদৃশ্য হয়ে যায়। এর নাম কি ইনস্পিরেশন, না ইমপালস, না
ক্ষ্যাপামি? আমি লিখছি না আমাকে দিয়ে লেখানো হচ্ছে? একটু আগে বলেরিছ আমি
একজন মনিব। কিন্তু মনিরে ও মনিব আছে। আমাকে সে তার খেয়াল খুশি মতো বা তার
প্রয়োজন মতো গাধা খাটুনি খাটায়। সৃষ্টি চক্র অহরহ আবর্তিত হচ্ছে। আমি রথের
দড়ি ধরে টানছি। আমাকেও বেগার খাটিয়ে নিচ্ছেন বিধাতা। আমি ভাবছি আমিই দেব।
তা জানতে পেলে হাসছেন অন্তর্যামী।
আর্টের সার্থকতা কী? হওয়া। না হয়ে তার
গতি নেই, হয়েই তার সার্থকতা। হলেই যে অমর হতে হবে এমন কী কথা আছে। সব লেখা
বাঁচেনা। যেটা বাঁচে সেটাকে আর পাঁচ জনে বাঁচিয়ে রাখে বলে বাঁচে। গ্রীক
নাট্যকারদের নাটকের অল্প কয়েক খানাই বেঁচে আছে। হয়তো ওর চাইতেও সেরা নাটক
ছিল। হারিয়ে গেছে, পুড়ে গেছে, পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আলেকজান্দ্রিয়ায়। একবার
লেখা হয়ে গেলে লেখকের উচিত নির্লিপ্ত হওয়া। যেটাকে নিয়ে এত পরিশ্রম এত
প্রত্যাশা সেইটিই হয়তো অল্পায়ু। সেটার কোথাও কোনো খুত আছে বলে নয়। যেটা
নিখুঁত নয় সেইটিই হয়তো ক্লাসিক হয়ে যায়। কেন যে এমন হয় কেউ ঠিক জানে না।
চলবে....