ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
সশস্ত্র সংগ্রামে ন্যাপ, কমিউনিস্ট ও ছাত্র ইউনিয়ন
Published : Thursday, 11 November, 2021 at 12:00 AM
সশস্ত্র সংগ্রামে ন্যাপ, কমিউনিস্ট ও ছাত্র ইউনিয়নআবুল কাশেম হৃদয় ||
উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানে ন্যাপ, কমিউনিস্ট ও ছাত্র ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কুমিল্লা গণ আন্দোলনে ছাত্র ইউনিয়নের ভূমিকা ছিল অগ্রণী। কেন না সে সময় জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদকে নেতৃত্ব দিয়েছে ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের ভি পি মোঃ ওমর ফারুক ও জি এস মোঃ মাসুদুর রহমান। তৎকালীন ছাত্র সংসদের নেতৃবৃন্দ ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের। সত্তরের নির্বাচনে পৃথকভাবে অংশ নিলেও তারা একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয়। দেশব্যাপী প্রায় বিশ হাজার ন্যাপ, কমিউনিস্ট ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মী সম্মুখ সমরে অংশ নেয়। তাদের অধিকাংশ ছিল কুমিল্ল¬ার।
কুমিল্লা থেকে যাওয়া নেতা কর্মীরা মে মাসে ভারতের তেজপুরে এক জঙ্গলে তিন সপ্তাহ প্রশিক্ষণ নিয়ে বর্ডারের কাছে ‘ন্যাপ’ নামক স্থানে আরো প্রশিক্ষণ নেয়। এদেরকে ‘গেরিলা’ বলা হতো। প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে থেকে ২শ’ জনকে বাছাই করে আগরতলার ‘সাবরুমে’ পাঠানো হয়। সেখান থেকে অস্ত্র দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। বাংলাদেশে এসে এই দলটি ২০জন করে ১০টি করে বিভক্ত হয়ে চান্দিনা ও দেবিদ্বারের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এই দলটি ছিল বাংলাদেশ ন্যাপ, কমিউনিস্ট ও ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনীর প্রথম ব্যাচ।
সশস্ত্র সংগ্রামে ন্যাপ, কমিউনিস্ট ও ছাত্র ইউনিয়ন
ডিসেম্বর প্রথম দিকে চান্দিনা থেকে ঝলম রাস্তার ৫ কিঃ মিঃ দূরে পাকসেনাদের সাথে এদের একটি বড় সংঘর্ষ হয়। ঐ স্থানে দু’ দিকের গ্রামের মাঝে পথ দিয়ে ১৩শ’ সৈন্যের এক বিশাল পাক কনভয় যাচ্ছিল। মনির গ্রুপে ছিল প্রায় ৪০ জন, গেরিলা গ্রুপে ছিল ৮ জন। সেখান থেকে একজনকে মিত্র বাহিনীকে খবর দেয়ার জন্য পাঠানো হয়। মিত্র বাহিনী একটি সময়ে বেঁধে দিয়ে বার্তা বাহককে মুক্তিযোদ্ধাদের সরে যাওয়ার জন্য বলতে বলে দেয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সে আসতে সক্ষম হয়নি। মিত্র বাহিনী মর্টার আক্রমণ শুরু করলে অনেকগুলো মর্টার সেল পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দুটি গ্রুপের উপর। এরপর মিত্রবাহিনী মুখোমুখী হয় বিশাল পাক কনভয়ের। এ যুদ্ধে পাকবাহিনীর অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ যুদ্ধে গেরিলা গ্রুপের কেউ মারা না গেলেও এফ এফ গ্রুপের দু’জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
নভেম্বরে কুমিল্ল¬া জেলার সর্বত্র গেরিলা তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। কুমিল্ল¬ার ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকা বিশেষ করে বিবিরবাজার ও চৌদ্দগ্রামের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিবাহিনী গেরিলা কায়দায় ব্যাপক যুদ্ধ পরিচালনা করে। ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর দ্বিতীয় ব্যাচের চার শতাধিক যোদ্ধা ভারতের আসাম রাজ্যের দরং জেলার তেজপুর নামক স্থানে স্পেশাল গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে ত্রিপুরার বাইকোরাতে বেইজ ক্যাম্পে অবস্থান নেয়। এই গেরিলাদের প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন ওমর ফারুক। নভেম্বর শুরু থেকে সে ক্যাম্পে সাজ সাজ রব পড়েছিল। কারণ ক্যাম্পের গেরিলারা দেশের ভিতরে শেষ লড়াইয়ের জন্য ঢুকে পড়ার প্রস্তুতি নেয়। এটাই হবে শেষ। যুদ্ধে হয় মরবে না হয় দেশ স্বাধীন করবে এমন দীপ্ত শপথ গেরিলাদের মুখে। ৯ নভেম্বর প¬াটুন কমান্ডার ফারুক গেরিলাদের হাতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ তুলে দেন। বেইজ ক্যাম্পসহ অন্যান্য ক্যাম্প থেকে গেরিলা বাহিনীর ৭৮ জন গেরিলা একত্রিত হয়ে ১০ নভেম্বর চৌদ্দগ্রাম থানার ভৈরব নগর সাব ক্যাম্পে আসেন। এখানে মুক্তিযোদ্ধা তাহের দেশে প্রবেশের পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী বেতিয়ারা চৌধুরী বাড়ির পাশে এ্যামবুশ পাতা হয়। সোর্সের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পাকবাহিনীর অনুপস্থিতির কথা জানা গেলে গভীর রাতে মুক্তিযোদ্ধারা রওনা দেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল নোয়াখালী সেনবাগ ও কানকির হাটে একটি মুক্তাঞ্চল গঠন করা। ৮৭ জনের এই দলটিতে নেতৃত্ব দেন নিজাম উদ্দিন আজাদ। ১১ নভেম্বর গভীর রাতে দলটি সারিবদ্ধভাবে মহাসড়কের ওপর উঠার সময় সড়কের পাশে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা হানাদার বাহিনী অতর্কিত ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। ‘হল্ট’ কমান্ড দেয়ায় দলের যোদ্ধারা ধান ক্ষেতে শুয়ে পড়ে। কিন্তু নয়জন রাস্তার ওপরে ওঠে পড়ায় তাঁরা নিজেদের হায়েনার বুলেট থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ধান ক্ষেতের শুয়ে থাকা গেরিলারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ায় পিছু হটে যান। অতর্কিত আক্রমণের সময় অস্ত্র শস্ত্র বস্তাবন্দি থাকায় সেখান থেকে পাল্টা গুলি ছোঁড়া সম্ভব হয়নি। গুলিতে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাওয়া শহীদের লাশ দু’দিন বেতিয়ারার খোলা প্রান্তরে পড়ে থাকে। লাশগুলোকে কোন রকমে মাটি চাপা দেওয়া হয়। দেশ স্বাধীন হবার পর স্থানীয় চেয়ারম্যান আগা আজিজুল হক ও গ্রামবাসী বেতিয়ারায় যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ৯ শহীদের দেহাবশেষের হাড়-গোড়, কঙ্কাল জড়ো করে গণকবরে সমাহিত করেন। সেদিন গুলিতে যারা শহীদ হয়েছিলেন তারা হলেন নিজাম উদ্দিন আজাদ, জহিরুল হক (দুদুমিয়া), বশিরুল ইসলাম (বশির মাস্টার), আওলাদ হোসেন কাইয়ুম, সফিউল¬াহ, মোঃ শহীদুল¬াহ, কাদের মিয়া, সিরাজুল ও মুনির।
গেরিলা বাহিনীর প্রথম ব্যাচের কমান্ডার ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোস্তাফিজুর রহমান, ডেপুটি কমান্ডার জাকির হোসেন, প্রধান সমন্বয়কারী আবদুল হাফেজ ও দ্বিতীয় ব্যাচের কমান্ডার ছিলেন মোঃ ওমর ফারুক, ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন মেজর (অবঃ) তৌহিদুজ্জামান সিকদার।
( লেখক: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও দৈনিক কুমিল্লার কাগজ সম্পাদক)