
চিররঞ্জন সরকার ||
৩১ অক্টোবর থেকে আগামী ১২ নভেম্বর পর্যন্ত স্কটল্যান্ডের রাজধানী গ্লাসগো শহরে কপ-২৬ জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কপ হচ্ছে ‘কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। জাতিসংঘের উদ্যোগে গঠিত কপের প্রথম সম্মেলন হয় ১৯৯৫ সালে। এবার হচ্ছে এর ২৬তম আয়োজন। ২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর এটিই সবচেয়ে বড় জলবায়ু সম্মেলন, যেখানে প্রায় ২০০ দেশের আড়াই হাজার প্রতিনিধি উপস্থিত হচ্ছেন। বিশ্বনেতা, নীতিনির্ধারক, জলবায়ুবিজ্ঞানী, আর্থিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, বিনিয়োগকারী, জলবায়ু আন্দোলনকর্মী ও তরুণ সমাজের প্রতিনিধিরা কপ-২৬ নামের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে তাদের পরিকল্পনার ঝাঁপি খুলে বসবেন। সিদ্ধান্ত নেবেন কীভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির গতি হ্রাস করে জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করা যায়। এই সম্মেলনের সাফল্যের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে জলবায়ুজনিত বিপর্যয় থেকে পৃথিবীকে বাঁচানোর চেষ্টা কতটা কাজ করবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে এবারের সম্মেলনের সাফল্য। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জলবায়ুসংক্রান্ত প্যারিস চুক্তি থেকে সরে এসেছিলেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন কিছুটা ইতিবাচক কথা বললেও শেষ মুহূর্তে নিজের দেশের আইনপ্রণেতাদের বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছেন। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আর্থিক বরাদ্দ পেতে প্রস্তাবিত একটি আইন কংগ্রেসে ডেমোক্রেটদের একাংশের সমর্থন পায়নি। এই আইনটি পাস হলে জলবায়ু সম্মেলনে কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ৫০০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পারতেন বাইডেন। এ ঘটনা চীনকে উল্টোমুখী করতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বী আমেরিকা ইতিবাচক কোনো প্রতিশ্রুতি না দিলে চীনও বড় কোনো অঙ্গীকারে যাবে বলে মনে হয় না। সে ক্ষেত্রে যুগান্তকারী কোনো অঙ্গীকার ছাড়াই এ সম্মেলন হয়তো শেষ হবে।
বন্যা, খরা ও দাবানলের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ক্ষতির জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। অথচ এই দেশগুলোর মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ উন্নত দেশগুলোর চেয়ে ঢের কম। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাদেরই সবচেয়ে বেশি ভুগতে হচ্ছে। ফলে গ্লাসগোতে জলবায়ু সম্মেলনে কম ধনী এবং ছোট দেশগুলোর চাহিদার বিষয়ে একটি সমাধানে পৌঁছানো জরুরি। ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’ বলছে, চীন, ভারত, আমেরিকাসহ ১০ শতাংশ দেশ বিশ্বের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ৩৬ থেকে ৪৫ শতাংশের জন্য দায়ী। তারা একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে ঢুকেও সেই নির্গমনের পরিমাণে লাগাম পরাতে পারেনি। অর্থনীতির এগিয়ে চলার গতি বাড়াতে সব দেশই প্রচুর পরিমাণে কার্বন রয়েছে এমন সব জ্বালানির যথেচ্ছ ব্যবহার করছে। তাতে পরিবেশ বিষিয়ে উঠছে উত্তরোত্তর। উষ্ণায়নের গতি বাড়ছে।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে এসব দেশ রাজি হয় যে শিল্পবিপ্লব পূর্ববর্তী যে তাপমাত্রা পৃথিবীর ছিল তার চেয়ে ১.৫ ডিগ্রি বা বড়জোর ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি যাতে না বাড়তে পারে, তা নিশ্চিত করতে সবাই চেষ্টা করবে। সব দেশই মেনে নেয় যে, এটা না করতে পারলে পৃথিবী এবং মানবসভ্যতা মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এই বোঝাপড়া প্যারিস চুক্তি নামে পরিচিত। এই চুক্তিতে অঙ্গীকার করা হয় ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। বিশ্বের ২০০টি দেশ পরিবেশে কার্বন নিঃসরণ কমাতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত তাদের কর্মপরিকল্পনা কী, তা গ্লাসগোর সম্মেলনে জানাতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে। ধনী দেশগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা ২০২০ সালের মধ্যে দরিদ্র দেশগুলোকে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার দেবে যাতে তাদের পক্ষে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা সহজ হয়। কিন্তু জাতিসংঘ সম্প্রতি বলেছে, এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি। ফলে এই প্রতিশ্রুতির মাত্রা বাড়ানোর জন্য ধনী দেশগুলোর ওপর চাপ রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ মোকাবিলায় এ সম্মেলনে সর্বসম্মত ও কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সেটা হবে মানবজাতির জন্য খুবই বিপজ্জনক। আগামী দিনে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটবে বলে ইতোমধ্যে জাতিসংঘ সতর্কবাণী দিয়েছে। সম্প্রতি বিশ্বের জলবায়ু বিপন্ন মানুষের দুর্ভোগ-দুর্দশার অভিজ্ঞতার চিত্র উঠে এসেছে ৬৬টি দেশের ১৩৪ জন বিজ্ঞানীর তৈরি করা জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত গবেষণা সংস্থা, ইন্টার-গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে। আইপিসিসির প্রতিবেদনটি বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের ১১টি দেশে আগামী দিনে বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার ঘটনা বাড়বে। প্রতিবেদনটি সতর্ক করে দিয়ে বলছে, পরিস্থিতি এখন ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই এমন সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে, যা গত দুহাজার বছরেও বিশ্ববাসী দেখেনি।
আমরা অবশ্য প্রতিবছরই আবহাওয়ার অস্বাভাবিক ভেল্কি দেখছি। কোথাও সাগরে একের পর এক ঘূর্ণিঝড় তৈরি হচ্ছে। কোথাও আবার আচমকাই হাজির তুষারঝড়। পারদ এক ধাক্কায় নেমে যাচ্ছে শূন্যের অনেকটা নিচে! জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত সংস্থা বলছে, এই ভেল্কি কিছুই নয়। আরও অনেক ভেল্কি দেখাবে আবহাওয়া। এবং এর পেছনে দায়ী মানুষেরই তৈরি দূষণ। পরিবেশবিদরা বলছেন, বিন্দু বিন্দু জলে যেমন সিন্ধু হয়, তেমনই দূষণের ফলে বিন্দু বিন্দু কার্বন ডাই-অক্সাইড জমে জমে বাতাসেও কার্বন-সিন্ধু তৈরি হয়েছে। শিল্প, কল-কারখানা রোজ বাতাসে যোগ করে লাখো কোটি বিন্দু কার্বন ডাই-অক্সাইড। তার জেরেই বাড়ছে বিশ্বের গড় উষ্ণতা। খামখেয়ালি হয়ে পড়ছে আবহাওয়া। বঙ্গোপসাগরের গড় উষ্ণতা বাড়ায় যখন ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়েছে, তখন শীতে লাগাতার ঝড়ের দাপট সয়েছে ব্রিটেনও। আমেরিকার একাংশে তুষারপাত সাইবেরিয়াকেও হার মানিয়েছে! আমেরিকা ও কানাডার বিভিন্ন অংশে তীব্র দাবদাহ হচ্ছে, এমনকি তাপমাত্রা উঠছে ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর। ভয়াবহ বন্যায় পশ্চিম ইউরোপে প্রায় ২০০ জন মারা গিয়েছেন, নিখোঁজ কয়েকশ মানুষ। মস্কো ইতিহাসের দ্বিতীয় উষ্ণতম জুন পার করেছে। বস্তুত চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি দেখে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরাও। এর জন্য উষ্ণায়নকেই দায়ী করেছেন পরিবেশবিদরা। পরিবেশবিদরা বলছেন, ভেল্কির চরিত্র আরও মারাত্মক হবে ভবিষ্যতে। উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফসল উৎপাদন মার খাবে। অতিবৃষ্টিতে দেখা দেবে বন্যা। প্রাণহানির ঘটনাও বাড়বে। প্রভাব পড়বে বাস্তুতন্ত্রে।
শুধু তাই-ই নয়, এই বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রধান কারণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ আগামী চার বছরে পৌঁছবে শীর্ষবিন্দুতে। তার ফলে আগামী দশকের মাঝামাঝি সময়ে কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবকটি কেন্দ্রই বন্ধ করে দিতে হবে গোটা বিশ্বে। ব্যাপক রদবদল ঘটে যাবে পৃথিবীর জলবায়ুর। তার ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ধরন আমূল বদলে যাবে। দেখা যাবে আচরণগত পরিবর্তনও।
অথচ সভ্যতার ওপরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে এখনো তেমন আলোচনা হয় না। এই প্রভাব পৃথিবীর সব অংশ বা সব দেশের ওপর একইরকম হবে না। কিছু অঞ্চল এবং দেশের বিপদ বেশি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে নিচু এলাকা তো অংশত বা সম্পূর্ণ প্লাবিত হবেই, অন্য বহু এলাকাও ছাড় পাবে না।
হ্যাঁ, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। ধনী রাষ্ট্রগুলোকে কার্বন নিঃসরণ বন্ধ ও জলবায়ু তহবিলে টাকা দিতে বাধ্য করতে হবে। পাশাপাশি পৃথিবীর সব মানুষকেই জলবায়ু নিয়ে সচেতন হতে হবে। অভ্যাস বদলাতে হবে। বিমান ভ্রমণ, এসি, গাড়ি ব্যবহার যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য আমাদের মনমানসিকতা-অভ্যাস বদলে ফেলতে হবে। যদিও তা সহজ কাজ নয়। মানবজাতি সামগ্রিকভাবে বদলের ব্যাপারে একেবারেই স্বচ্ছন্দ নয়। পরিচিত পরিসরে থাকতে, চেনা কাজ করতেই মানুষ ভালোবাসে।
এমনকি যে ভয়াল মহামারী বিশ্বজুড়ে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, তাও মানুষের আচরণে কোনো মৌলিক বদল আনতে পারেনি। জলবায়ু পরিবর্তন ব্যাপারটা দুর্বোধ্য, খুব তাড়াতাড়ি তার ফলাফলও দেখা যায় না। এসব ঘটনা কেবল শিক্ষিত ও পরিবেশসচেতন মানুষকেই উদ্বেল করে। জনসাধারণ চিন্তিত নন, যদি না তার নিজের বাড়িতে আঘাত আসে। যেমন, এ বছরের দাবানল, প্রবল গ্রীষ্ম, বন্যা ও অভূতপূর্ব বৃষ্টি। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যারা এতটুকুও ভাবিত ছিলেন না, এই প্রথমবার তারা একটু একটু জানার চেষ্টা করছেন। আইপিসিসির প্রণেতারা দেখাচ্ছেন যে, সব রাষ্ট্র একসঙ্গে হাত মেলালে আসন্ন বিপর্যয় রুখে দেওয়া যেতেও পারে। কিন্তু পৃথিবী কি পাল্টাবে? মানুষ কি তার ভোগ কমিয়ে সংরক্ষণ বাড়াবে? তারা কি প্রকৃতির সঙ্গে লগ্ন হয়ে থাকার চেষ্টা করবে?
বিপদ কিন্তু একটি দেশকে কেবল আক্রমণ করে না, সব রাষ্ট্রকে একইভাবে করে। করোনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। জলবায়ুজনিত বিপদও কোনো দেশের একার নয়, তা সবার। সম্মিলিতভাবেই তা মোকাবিলা করতে হবে।
লেখক: কলাম লেখক