ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
আবদুল বাসেত মজুমদার আর নেই
Published : Thursday, 28 October, 2021 at 12:00 AM
আবদুল বাসেত মজুমদার আর নেইনিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুল বাসেত মজুমদার মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বুধবার (২৭ অক্টোবর) সকাল সোয়া ৮টার দিকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও তার ছেলে সাঈদ আহমেদ রাজা। বাসেত মজুমদার দুই ছেলে ও দুই মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
প্রবীণ এই আইনজীবীর জানাজা বেলা ১১টায় বনানী কেন্দ্রীয় মসজিদ ও বেলা আড়াইটায় জাতীয় ঈদগাহ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিকালে হেলিকপ্টার যোগে ঢাকা থেকে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার হরিশ্চর স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে মরদেহ নিয়ে আসা হয়। সন্ধ্যায় উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের শাঁনিচো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর আবদুল বাসেত মজুমদারকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সোমবার (২৫ অক্টোবর) তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। ফুসফুসের জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।
এদিকে বর্ষীয়ান আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদারের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষকে আইনি সহযোগিতা দেওয়ার পাশাপাশি গরিবের আইনজীবীখ্যাত আবদুল বাসেত মজুমদারের আইনাঙ্গনে অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
গরীবের আইনজীবী বাসেত মজুমদার একাধিকবার বার কাউন্সিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন সুপ্রিম কোর্ট বারের সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে।
দুঃস্থ আইনজীবীদের জন্য নিজের নামে ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেন তিনি। দেশের বিভিন্ন আইনজীবী সমিতিতে এই ফান্ড থেকে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদের সাবেক সভাপতি বাসেত মজুমদার বর্তমানে নবগঠিত বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক পদে দায়িত্বপালন করেন। আইন পেশায় ৫৬ বছরে ধরে নিয়োজিত ‘গরিবের আইনজীবী’ খ্যাত আবদুল বাসেতের জন্ম ১৯৩৮ সালের ১ জানুয়ারি।
কুমিল্লার লাকসাম (লালমাই) উপজেলার শানিচোঁ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবার নাম আবদুল আজিজ মজুমদার, আর মা জোলেখা বিবি।
স্থানীয় হরিচর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক (এসএসসি) এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে আইএ (এইচএসসি) ও বিএ পাস করেন বাসেত মজুমদার। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৬৬ সালে হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
জ্যেষ্ঠ এ আইনজীবীর বড় ছেলে গোলাম মহিউদ্দিন আবদুল কাদের ব্যবসা করেন। ছোট ছেলে সাঈদ আহমেদ রাজা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।
দুই মেয়ের মধ্যে ফাতেমা আক্তার লুনা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী। সর্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিউজিকে পড়াশোনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। ছোট মেয়ে খাদিজা আক্তার ঝুমা উত্তরা মেডিক্যাল কলেজের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর।
দুপুর আড়াইটায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত জানাজায় ইমামতি করেন মরহুমের ভাগনে মাওলানা খন্দকার মাহবুবুল হক।
এর আগে রাজধানীর বনানী কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রথম জানাজা শেষে তার মরদেহ সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে নেওয়া হয়। সেখানে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর প্রধান বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও আইনজীবীরা, মন্ত্রী, মেয়র, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, আওয়ামী আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আইনজীবী ফোরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের পক্ষ থেকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।
তবে, দুপুর পৌনে ২টার দিকে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে মরহুমের দ্বিতীয় জানাজা হওয়ার কথা থাকলেও তা বাতিল করা হয়। এরপর তার মরদেহ জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে নেওয়া হয় এবং সেখানেই দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল জানাজা সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন। এসময় মরহুমের সন্তান ব্যারিস্টার সাঈদ আহমেদ রাজা, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিবৃন্দ, অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন, সাবেক ও বর্তমান ডেপুটি ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলবৃন্দ, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এএফ হাসান আরিফ ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দসহ অসংখ্য আইনজীবী তাকে স্মরণ করে বক্তৃতা করেন।
এছাড়াও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, বাংলাদেশ আইন সমিতির পক্ষে ব্যারিস্টার সাজ্জাদ হোসেন, আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা, ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের নেতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক-স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কয়েক হাজার মানুষ জানাজায় শরিক হন। জানাজা শেষে মরহুমের মরদেহ কুমিল্লার লাকসামে নিজ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়।
বিকালে হেলিকপ্টার যোগে ঢাকা থেকে লালমাই উপজেলার হরিশ্চর স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে মরদেহ অবতরণ করে। সন্ধ্যায় উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের শাঁনিচো সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজার পর শোক-শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
জানাজায় উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার এমপি, লাকসাম উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট ইউনুস ভূঁইয়া, লালমাই উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল মালেক, সদর দক্ষিণ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাবলু, লালমাই উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাসুদুর রহমান ভূঁইয়া, এডভোকেট খোরশেদ আলম,আবুল কাশেম চেয়ারম্যান, আবদুর রহিম চেয়ারম্যান, সাংগঠনিক সম্পাদক আয়াতুল্লাহ, যুবলীগের আহবায়ক আবদুল মোতালেব, কাজী কামরুল হাসান ভূট্টো, কাউসার মোর্শেদ, আবদুর রহমান, পেরুল উত্তর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল হাশেম মজুমদার, উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি শাহপরান সওদাগর, সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান রাব্বি প্রমুখ।

বিভিন্ন মহলের শোক:
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি প্রবীণ আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদারের মৃত্যুতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন মহল থেকে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।
তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি, সাবেক রেলপথ মন্ত্রী ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুল হক মুজিব এমপি, কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার এমপি, কুমিল্লা-৫ বুড়িচং ব্রাহ্মণপাড়া আসনের এমপি এডভোকেট আবুল হাসেম খান।
বুধবার পৃথক পৃথক শোক বার্তায় তারা এ প্রবীণ আইনজীবীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান তারা।
তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি এক বিবৃতিতে বলেছেন, “আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে তার অসামান্য অবদান রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয়ে তিনি দেশকে সবসময় সহযোগিতা করেছেন।
আইনজীবী আব্দুল বাসেত মজুমদারের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন। এক শোকবার্তায় রেলমন্ত্রী বলেন, ‘আবদুল বাসেত মজুমদারের মৃত্যুতে বাংলাদেশের আইন অঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেলো। আইন অঙ্গনে ৫০ বছরেরও অধিক সময় তার দৃপ্ত পদচারণা ছিলো। তিনি ছিলেন আইনজীবীদের জনপ্রিয় নেতা। আইনজীবীদের কল্যাণ ট্রাস্ট গঠনসহ তিনি নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। দেশে আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
শোক প্রকাশ করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। শোকবার্তায় মন্ত্রী বলেন, ‘আবদুল বাসেত মজুমদারের মৃত্যুতে বাংলাদেশের আইন অঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেলো। আইন অঙ্গনে ৫০ বছরেরও অধিক সময় তার দৃপ্ত পদচারণা ছিলো। দেশে আইনর শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় তার অবদান দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে’।
শোকপ্রকাশ করেছেন শেখ ফজলে নূর তাপস। শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘আব্দুল বাসেত মজুমদার দীর্ঘ ৫ দশকেরও অধিক সময় আইন পেশায় সম্পৃক্ত ছিলেন। এ দীর্ঘ সময়ে তিনি সাধারণ মানুষের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা ও আইনি সুরক্ষা দেওয়ায় নিজ জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন। অগুণতি মানুষকে তিনি বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দিয়েছেন।’