
দেশের কারাগারগুলোর অনিয়ম ও
অব্যবস্থাপনার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ কুমিল্লায় বন্দি নির্যাতনের ঘটনা।
কারাগার সংশোধনাগার হলেও সেখানে নিয়মবহির্ভূত যেসব ঘটনা ঘটছে তাতে আমরা
বিস্মিত। কুমিল্লার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি নির্যাতনের ভিডিও 'ভাইরাল'
হওয়ায় ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কারাবন্দিকে মেঝেতে ফেলে পেটানোর দৃশ্য ভিডিওতে দেখা গেলেও জ্যেষ্ঠ কারা
পরিদর্শক তা কীভাবে অস্বীকার করেন? কারা কর্তৃপরে বক্তব্য অনুযায়ী, তার
ওয়ার্ডে ইয়াবা, গাঁজা ও টাকা পাওয়া গেছে। যে বন্দি ২৬ বছর ধরে কারাগারে আটক
রয়েছেন, তার কাছে নিষিদ্ধ বস্তু আসছে কোত্থেকে? কারাগারের সিসিটিভির
সার্ভার ক থেকে ভিডিও বাইরে প্রকাশ হওয়াও সেখানকার নিরাপত্তার জন্য
হুমকিস্বরূপ। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি, একজন কারাবন্দি প্রিজন
সেলে বসেই ইন্টারনেটে অন্যদের সঙ্গে জুম বৈঠক করেছেন। এর বাইরে কারাগারে
আসা নতুন বন্দিদের নিলামে বিক্রি, টাকার বিনিময়ে বন্দির সঙ্গে স্বজনদের
সাাৎ পাইয়ে দেওয়া, মুক্তি পাওয়ার পর বন্দিদের কারা ফটকে পুনরায় গ্রেপ্তারের
হুমকি, কারাগারের ক্যান্টিন ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, কারা হাসপাতালে অসুস্থ
হিসেবে বন্দিদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়া, কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া- এমনকি
কারাগারে সাজাপ্রাপ্ত আসামির সঙ্গে নারীর একান্ত সময় কাটানো প্রভৃতি ঘটনাও
ইঙ্গিত করছে কারাগারগুলো কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
অনেক েেত্র
কারাগারের কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া এসব অনিয়ম সংঘটিত হতে পারে না।
এর আগেও কারাগারে বন্দি নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে বেশ কয়েকবার।
কুমিল্লায় বন্দি নির্যাতনের ঘটনায় ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং
সহকারী প্রধান কারারীসহ অন্য একজন কারারীকে বরখাস্ত ও অন্য তিন কারারীকে
সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। কারাগারের কোনো অনিয়ম সামনে এলে এমনটাই করা
হয়। প্রশ্ন হলো, রুটিনমাফিক তদন্ত কমিটি গঠন এবং কর্মচারী দু-চারজনের লঘু
শাস্তির মাধ্যমে কারাগারের 'সর্বাঙ্গে ব্যথা' সারবে কীভাবে? এটা বলার অপো
রাখে না যে, কারা প্রশাসনের রল্প্রেব্দ রল্প্রেব্দ অনিয়ম-দুর্নীতি ছড়িয়ে
পড়েছে। এমনও অভিযোগ রয়েছে, আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য ঠিকাদারদের
বন্দিদের নি¤œমানের খাবার সরবরাহের সুযোগ দিয়েছেন কারাগারের দুর্নীতিবাজ
কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের বিরুদ্ধে নিয়োগ-বদলি বাণিজ্যেরও অভিযোগ রয়েছে।
সার্বিক বিবেচনায় কারাগারগুলোর প্রতি প্রশাসনের বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি হয়ে
পড়েছে।
কারা অধিদপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী- 'কারাগার আধুনিক সভ্যতায়
বন্দিদের সংশোধন ও সুপ্রশিতি করে সভ্য সমাজের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার
প্রতিষ্ঠান।' কারাগার নিজেই যেখানে অসুস্থ, যেখানে এর তত্ত্বাবধায়কদের
বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ; সেখানে কারাগারগুলো যে তার মূল দায়িত্ব থেকে
অনেক দূরে রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী,
দেশের কারাগারগুলোতে সব সময়ই ধারণমতার দ্বিগুণ, এমনকি তিন গুণ পর্যন্ত
বন্দি থাকে। অধিকসংখ্যক মানুষের চাপে স্বাভাবিক জীবনযাপনই যেখানে দুঃসাধ্য,
সেখানে কারাগারের মতো জায়গায় বন্দিরা কীভাবে থাকেন, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ
হওয়ার প্রয়োজন নেই। বন্দিদের থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসা-সর্বোপরি কারাগারের
পরিবেশ নিয়ে যেসব অভিযোগ রয়েছে, তার সবকিছু হয়তো রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব
নয়। তবে সদিচ্ছা থাকলে সীমিত আয়োজনের সর্বোচ্চ ব্যবহার অসম্ভব নয়।
যেমন
কারাগারগুলোতে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়লেও প্রতিটি কারাগারে একজন মানসিক
চিকিৎসক রাখা খুব জটিল কিছু নয়। একই সঙ্গে কারবন্দিরা যাতে কারাগারে সদয়
আচরণ পেতে পারেন সেজন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিণের ব্যবস্থা করা
দরকার। অপরাধীদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনা এবং তাদের আলোর পথ দেখানোর ভূমিকা
পালন করতে কারাগারে যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। উন্নত বিশ্ব
কারাগারকে যথার্থ অর্থেই সংশোধনাগার বানাতে পারলে বাংলাদেশ কেন পারছে না?
কারাগারের পরিবেশ উন্নয়নের স্বার্থে সমাজেও অপরাধপ্রবণতা কমাতে দৃষ্টি
দেওয়া প্রয়োজন। কারাগারে যেসব অনিয়ম রয়েছে সবার আগে সেখানেই মনোযোগ দেওয়া
দরকার। আমরা আশা করি, কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি নির্যাতনের ঘটনায়
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে জড়িতদের এমন শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, যা
অন্যদের জন্যও শিণীয় হয়ে থাকবে।