ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
দ্বিতীয় ঢেউ ও টিকার অজানা তথ্য
Published : Wednesday, 31 March, 2021 at 12:00 AM
দ্বিতীয় ঢেউ ও টিকার অজানা তথ্য অধ্যাপক ডা: মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ।।

প্রথমে করোনাভাইরাস আক্রমন ধরা পড়ে চীনের উহানে ২০১৯ সনের শেষের দিকে। ক্রমে তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, আমাদের দেশে প্রথম সংক্রমন ধরা পড়ে ২০২০ সনের ৮ই মার্চ। বছরের বেশি সময় ধরে চলা এ মহামারীর সংক্রমন ও মৃত্যু একাধিকবার ওঠানামা করেছে গত শনিবার (২১.০৩.২০২১) করোনা সংক্রমনের ৫৪ সপ্তাহ (১৪-২০ মার্চ, ২০২১ইং) শেষ হয়েছে। এ সপ্তাহে মোট ১৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসময়ে অর্থাৎ গত ১০ সপ্তাহের মধ্যে এটা সর্বোচ্চ সংখ্যক মৃত্যু। অথচ গত ফেব্রুয়ারি ২০২১ এ দৈনিক গড় মৃত্যু ১০ এর নীচে ছিল। ৫৩তম সপ্তাহে মোট ১২ হাজার ৪৭০ জন নতুন রোগী সনাক্ত হয়েছে। এ সময়ে পরীক্ষার সংখ্যা বিবেচনায় রোগী শনাক্তের হারও বেড়েছে। রোগী শনাক্তের হারও ছিল ৮.৯৩ শতাংশ। এর আগের সপ্তাহে এটি ছিল ৫.৬০ শতাংশ। এসব দেখে অনেক মহামারী বিশেষজ্ঞরা এটাকে দ্বিতীয় ঢেউ বলেই আখ্যায়িত করতে চাচ্ছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানাচ্ছে রাজধানীতে বর্তমানে ১০টি সরকারি এবং ৯টি বেসরকারি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে মোট শয্যাসংখ্যা রয়েছে ৩২৪৪টি। এরমধ্যে বর্তমানে ভর্তি আছেন ১৯৯২ জন (২১/০৩/২০২১ পর্যন্ত)।  অন্যদিকে এসব হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা সংখ্যা ২৮৬টি। এর মধ্যে ভর্তি আছে ২১৫জন এবং খালি আছে ৭১টি শয্যা। রোগী ভর্তির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে খুব শিগগিরই হাসপাতালসমূহে শয্যা সংকট দেখা দেবে। আইসিইউ সংকট তীব্র আকারে ধারন করতে পারে। প্রতিদিনই আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় থেকে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে নানাহ সুপারিশ প্রেরণ করা হয়েছে। কিন্তু কোন মন্ত্রণালয়ই সুপারিশগুলো যথাযথ আমলে নিচ্ছে না। মাত্র ১৫ দিনে ২৫ লাখ লোক কক্সবাজার ভ্রমণ করেছেন। মুখে বলা হচ্ছে বিবৃতিতে লেখা হচ্ছে জনসমাগম হ্রাস করুন। স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলুন কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তার বিপরীত। কিন্তু জনগণের প্রত্যক্ষ সহায়তা ছাড়া এ সংক্রমন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
এদিকে মহামারী প্রতিরোধের বৃহত্তম অস্ত্র হচ্ছে টিকা। কিন্তু টিকা গ্রহণের গতিও অনেক কম। অনেক গুজবও ছড়ানো হচ্ছে রক্ত জমাটের ব্যাপারটি আমাদের দেশে একজনের ক্ষেত্রেও ঘটে নি। বাইরে দু-একটি ঘটনা ঘটেছে তবে বৈজ্ঞানিকেরা তার প্রতিকারও খুজে বের করতে পেরেছেন। অক্সফোর্ডের টিকা নিয়েছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও ফরাসী প্রধানমন্ত্রী জ্যঁ ক্যাসেক্স। এ টিকা নেবেন জার্মানীর চেন্সেলর  এঙ্গেলা মার্কেলও। জার্মানী ও অস্ট্রিয়ার একদল চিকিৎসক রক্ত জমাট বাধার কারণ ও প্রতিকার খুজে পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন। ২০.০৩.২০২১ তারিখের ২৪ ঘন্টায় বিশ্বে ৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে বিবিসি ও গার্ডিয়ান জানিয়েছে।
ইদানিং প্রায়ই গণমাধ্যমে খবর আসছে যে “অমুকে টিকা নেয়ার পরও করোনায় আক্রান্ত হযেছেন”। এর পেছনে কি কারণ থাকতে পারে তা কিন্তু বিজ্ঞ সাংবাদিক বন্ধুরা কিছুই উল্লেখ করেন না। তার ফলে সাধারণ মানুষ বুঝে যে, “করোনার টিকা কোন কাজ করে না”। তাই শুধু শুধু টিকা নিয়ে ঝামেলা করব কেন? এটা একটা বিরাট বিভ্রান্তি এবং স্বাস্থ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে। টিকা দেয়ার পরও কোন ব্যক্তি ঠিক কি কি কারণে কোভিড’১৯ এ আক্রান্ত হতে পারে তা জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের মানুষ অক্সফোর্ড এস্ট্রাজেনিকা কোম্পানি আবিষ্কৃত কোভিড’১৯ এর ভ্যাক্সিন “কোভিশিল্ড” টিকা হিসেবে নিচ্ছে। উৎপাদনের তারিখ থেকে ছয়মাস আয়ু সম্পন্ন এ ভ্যাক্সিন অন্যান্য ভ্যাক্সিনের তুলনায় বেশ মুল্য সাশ্রয়ী এবং এটা ২০০-৮০০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় সংরক্ষণ/পরিবহন করতে হয়। এ ভ্যাক্সিন নতুন ইউ,কে স্ট্রেইনের উপর একই রকম কার্যকরী আর সাউথ আফ্রিকান এবং ব্রাজিলিয়ান স্ট্রেইনের উপর এর কার্যকারিতা কতটুকু সেটা নিয়ে গবেষণা চলছে। কোভিশিল্ড ভ্যাক্সিনের দুটি ডোজ। প্রথম ডোজ নেবার সর্বোচ্চ তিন সপ্তাহ পর টিকা গ্রহণকারী ৮০% মানুষের মধ্যে প্রয়োজনীয় এন্টিবডি (ইম্যুনিটি) তৈরি হয়। অর্থাৎ টিকা নেবার পর প্রথম তিন সপ্তাহে যে কেউ এবং তিন সপ্তাহ পর (১০০-৮০)=২০% ব্যক্তি কোভিড’১৯ এ আক্রান্ত হতে পারেন। এখন পর্যন্ত অধিকাংশ গবেষণা বলছে ১২ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দেয়া উত্তম। বাংলাদেশেও সম্ভবত এ পদ্ধতি গ্রহণ করা হবে। ১২ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দেয়ার আরও ৪ সপ্তাহ পর সর্বোচ্চ এক বছরের (?) জন্য আরও শক্তিশালী ইম্যুনিটি তৈরি হয় ৮০% ভাগ মানুষের মধ্যে। অর্থাৎ পূর্ণ ডোজ নেবার পরও (১০০-৮০)=২০% মানুষ কোভিড’১৯এ আক্রান্ত হতে পারেন। তাহলে কি এ ভ্যাক্সিন ভাল না? আমেরিকান ঋউঅ-এর হিসেবে-যে ভ্যাক্সিন কমপক্ষে ৫০% মানুষকে ইম্যুনিটি দেবে সেটাই কার্যকরী ভ্যাক্সিন। তাহলে এ ২০% মানুষ কি কখনোই নিরাপদ নয়?- অবশ্যই নিরাপদ। কারণ ৮০% মানুষের ইম্যুনিটি তৈরি হলে সেটা হয়ে যাবে হার্ড (ঐবৎফ) ইম্যুনিটি যা করোনা সংক্রমনের চেইন ভেঙ্গে দেবে এবং করোনাকে নির্বংশ করবে। অন্যথায় সম্ভবত এক বছর পর আমাদের আবার এ টিকা নিতে হবে।
করোনার দুই ডোজ টিকা নেবার পর মাস্ক কেন পরবো? কারণ আপনি ২০% এর একজন হতে পারেন। যাদের শরীরে টিকা দেবার পর ও ইম্যুনিটি তৈরি হয় নাই। যদিও হয় তবুও মাস্ক পরতে হবে কারণ আপানার শরীরে ইম্যুনিটির জন্য করোনা সুবিধা করতে না পেরে কিছু দিন দূর্বল হয়ে চুপচাপ ঘুমিয়ে থাকতে পারে। যে সময়ে আপনার থেকে ইম্যুনিটি বিহীন কারো শরীরে তা প্রবেশ করতে পারে। তাতে আপনার কি ক্ষতি?-সেই লোকটি আপনার কাছের কেউ হতে পারে। আর করোনা এভাবে ছড়ানোর সুযোগ পেলে অথবা জামাই আদর পেলে শ্বশুর বাড়ি (পৃথিবী) ছেড়ে আর যাবে না। কোভিড’১৯ এর ঢেউ এর পর ঢেউ চলতেই থাকবে। প্রতি বছর আমাকে আপনাকে এ ভ্যাক্সিন নিতে হবে ছেলে মেয়েদের স্কুল কলেজ খুলবে না। দেশ বিদেশে ঘুরা যাবে না। কব্জি ডুবিয়ে বিয়ে বাড়িতে কাচ্চি বিরিয়ানী খেতে পারবো না। তাই টিকার উপর আস্থা রাখুন এবং ধৈর্য্য ধরুন। নিজে টিকা নিন, অন্যকে টিকা নিতে উৎসাহিত করুণ এবং পৃথিবী থেকে করোনার পরিপূর্ণ বিদায়ের পূর্ব বা টার্গেট জনগোষ্ঠির (৮০-৯০%) ইম্যুনিটি অর্জন না করা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। সেটাই এখন পর্যন্ত আমাদের সামনে একমাত্র আশার আলো। তাই কমপক্ষে ৫টি সতর্কতা অবশ্যই পালন করুন-
১.    মাস্ক পরুণ ও জনাকীর্ণতা এড়িয়ে চলুন
২.    নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন
৩.    সাবান দিয়ে বা সেনিটাইজার লাগিয়ে কিছুক্ষন পর পর হাত পরিচ্ছন্ন রাখুন
৪.    হাত দিয়ে চোখ, নাক, মুখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন
৫.    প্রতিদিন সকালে ৫মিনিট ও রাত্রে ৫ মিনিট জলীয় বাষ্প নাক দিয়ে শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করুণ।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও সভাপতি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা অঞ্চল