
মোঃ আব্দুল্লাহ আল মাছুম ।।
অধ্যাপক মোঃ ইউনুস ১৯৪৪ সালের ৪ এপ্রিল বুড়িচং উপজেলার পীর যাত্রাপুর ইউনিয়নের গোপীনাথপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নামঃ মৌলভী মোঃ চাঁন মিয়া মুন্সী। তিনি গোপীনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্রীপুর ইসলামিয়া সিনিয়র মাদরাসা ও বুড়িচং জুনিয়র মাদরাসায় প্রাথমিক ও নি¤œমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করে এবং ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে কৃত্তিত্বের সাথে বৃত্তি প্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৬০ সনে কৃতিত্বের সাথে কুমিল্লা হোচ্ছামিয়া হাই মাদরাসা থেকে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে মেধা তালিকায় দশম স্থান অধিকার করেন পূর্ব বাংলার এক মাত্র ঢাকা বোর্ড থেকে। তারপর শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ হতে ১৯৬২ সনে আই.এস.সি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিনস্থ কুমিল্লা সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ হতে বি.এস.সি (সম্মান) গণিতে কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন। তিনি ১৯৬৭ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এম.এস.সি (গণিতে) প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। ১৯৬৪ সনে বি.এস.সি পরীক্ষা শেষ করে অধ্যাপক মোঃ ইউনুস কিছুদিন অস্থায়ীভাবে গণিত বিষয়ের উপর শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বুড়িচং আনন্দ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬৪ সনে বি.এস.সি পাশের পর আবার কিছুদিন গণিত বিষয়ের শিক্ষকতা করেন ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ১৯৬৭ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে এম.সি পরীক্ষা শেষ করে প্রায় ৬/৭ মাস ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বুড়িচং আনন্দ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।
এম.এস.সি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে প্রথমে ১৯৬৮ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত দেবীদ্বার সুজাত আলী কলেজে গণিত বিষয়ের উপর শিক্ষকতা করেন। জনাব মোঃ ইউনুস স্যার ১৯৬৯ সনে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস এডুকেশন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে গণিত বিভাগের প্রভাষক পদে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত চিওড়া কলেজে গণিতের শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ পর্যন্ত নিমসার জুনাব আলী কলেজে গণিতের শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। জনাব মোঃ ইউনুস ছাত্র জীবন থেকেই সরাসরি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে পড়াকালিন সময়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন।
পরবর্তীতে তিনি তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে ১৯৬৫ সনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা হল (বর্তমানে শহীদুল্লাহ হল) শাখা সভাপতি ও পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মনোনীত হন। তিনি কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৬২ সনের ছাত্র আন্দোলন ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১১ দফা আন্দোলন ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এ সময়ে তার ছাত্র রাজনীতির সতীর্থরা ছিলেন- শেখ ফজলুল হক মনি, প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক এমপি, কে.এম ওবায়ুদুর রহমান এমপি, বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি, রাশেদ খান মেনন এমপি অন্যতম। ১৯৬৯ সনে গণঅভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে শিক্ষকতাকালীন সময়ে ছাত্র ও শিক্ষকদেরকে একত্রিত করে গণ অভ্যুত্থানে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
তিনি ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর সাথে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন।
তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বক্শ নগর-পদ্ম নগর ইয়ুথ ট্রেইনিং ক্যাম্পের ডিপুটি ইন চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি তখন বক্শ নগন-পদ্ম নগর রিসিপশন ক্যাম্পের ডিপুটি ইন চিফ ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি শুনার জন্য জগতপুরের মোতালেবের মোটরসাইকেল নিয়ে কুমিল্লা থেকে সড়ক যোগে রেইসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) হাজির হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার কারণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁকে হত্যার জন্য তাঁর গ্রামের বাড়িতে হামলা করে এবং তাঁকে নাপেয়ে তাঁর গোপীনাথ পুরস্থ গ্রামের বাড়িটি তিন বার আগুণ দিয়ে পোড়ানো হয়। প্রবীণ কিংবদন্তী এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস এডুকেশন ক্যাডারের অর্থাৎ চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের (গণিত) প্রভাষকের চাকুরি ইস্তফা দিয়ে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৫ই আগস্টের বিয়োগন্তক ঘটনার পর জনপ্রতিনিধিত্ব ও কোন চাকুরি না থাকার পরও অস্বচ্ছল অবস্থায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে বিন্দু মাত্র বিচ্যুতি হন নি তিনি। যার ফলশ্রুতিতে তাঁকে ১৯৭৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় মনোনয়ন দেয়। তিনি ১৯৭৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে ১৯৮৬ সনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে, ১৯৮৮ সনে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে এবং ২০০১ সনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বি.এন.পির) মনোনয়নে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ও তিনি বি.এন.পির মনোনয়নে নির্বাচন করেন।
অধ্যাপক মোঃ ইউনুস ১৯৮৬ সনে স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচতি হয়ে জাতীয় পার্টিতে যোগ দান করেন এবং ১৯৮৬ সালে বুড়িচং এরশাদ ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা করে প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ হিসাবে দীর্ঘ দিন অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্বপালন করে ২০১০ সালে অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়া ১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য থাকাকালীন অধ্যাপক মোঃ ইউনুস স্যারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ও বদান্যতায় বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া সদরে অবস্থিত-বুড়িচং আনন্দ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (প্রতিষ্ঠা-১৯২০) ও ব্রাহ্মণপাড়ায় ভগবান উচ্চ বিদ্যালয়কে জাতীয়করণের মাধ্যমে বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়ার শিক্ষা, সংস্কৃতি অবকাঠোমোগত উন্নয়নের সূচনা করেন। বুড়িচং- ব্রাহ্মণপাড়াবাসী শিক্ষার অগ্রসরের সূচনাকারী ও পথিকৎ হিসাবে চারবারের নির্বাচিত সাবেক মাননীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোঃ ইউনুস স্যারের এই অবদানের কথা বুড়িচংবাসী কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে যুগ-যুগ ধরে। পূর্বে বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা-দুটি কুমিল্লা জেলার অন্য অংশের সাথে গোমতী নদী দ্বারা বিভক্ত ছিল। উনিই প্রথম গোমতী নদীর উপর একটি ব্রিজ স্থাপনের মাধ্যমে বুড়িচং- ব্রাহ্মণপাড়ার সাথে জেলার অন্য অংশের সংযোগ স্থাপন করে যোগাযোগ উন্নতি সাধন করেন। তিনি বুড়িচং- ব্রাহ্মণপাড়া-মিরপুর, সড়ককে সড়ক ও জনপদের আওতাভুক্ত করে সিলেট বিভাগের সাথে কুমিল্লা জেলার নতুন সড়কের যোগাযোগ স্থাপন করেন।
এ মহান কর্মবীর বুড়িচং- ব্রাহ্মণপাড়ার কিংবদন্তির তুল্য গণ মানুষের নেতা চার বারের নির্বাচিত সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য বিশিষ্টশিক্ষাবিদ ও প্রবীন রাজনীতিবীদ এরশাদ ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোঃ ইউনুস গত ২৭মার্চ ২০২১ শনিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৮ টার দিকে বার্ধক্যজনিত কারনে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না-লিল্লাহে-ওয়া ইন্না-ইলাইহের রাজিউন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর।
লেখক: সিনিয়র প্রভাষক, (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি)
কালিকাপুর, আবদুল মতিন খসরু সরকারি কলেজ ও সাবেক সভাপতি, উষা বুড়িচং
মোবাইল নম্বরঃ-০১৭১৭-৭৩৯৭৪২