
শাহীন শাহ্ ।।
লেখার
মধ্যেই লেখকের সমস্ত চাওয়া-পাওয়া কামনা-বাসনা বাস করে। মানুষের ভেতরের
অপ্রকাশিত সুখ-দুঃখের মর্মকথা প্রকাশিত হয়ে থাকে। তবে লেখা ও লেখক যে সবসময়
এককথা বলবেন সে-নিশ্চিয়তা দিতে পারি না। একজন লেখক যা বলতে চাচ্ছেন তার
লেখায় তা নাও প্রকাশ পেতে পারে। অনেক সময় লেখক হৃদয়ান্তঃকরণে যা বলতে
চাইছেন তার লেখায় সেসব কথা পরিস্ফুট হচ্ছে না। কারণ তার বিশ্বাস আর
বাস্তবতায় বিস্তর ব্যবধানই পার্থক্যের কারণ বটে। বলতে চাচ্ছি-সবায় কী লেখে?
না, সবায় লেখে না, কেউ কেউ লেখে। কবি জীবনান্দদাশ শত বছর আগে লিখেছিলেন,
সবায় কবি নয়, কেউ কেউ কবি। জীবনান্দদাশের আগে ও পরে, এমনকি সমকালীন অনেক
কবি, লেখক উপন্যাস- প্রবন্ধ আরও অনেক বিষয় নিয়ে লিখেছেন। তিনি গভীরভাবে
কবিদের কবিতা পড়ে,উপলব্দি করে, ঐতিহাসিক কথাটি হয়তবা আক্ষেপ করে লিখেছেন
যে, ‘সবায় কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। সৃষ্টির আদি থেকে এখন পর্যন্ত লাখো-কোটি
বছরের পরিক্রমায় সভ্যতার ক্রমবিকাশে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে মানুষ। কালের
বিবর্তনে সময়ের ঘূর্ণন চাকায় সভ্যতার যে সু-বাতাস লেগেছে তা মানুষের
সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের কারণে। অর্থাৎ রাশি রাশি লেখা যা সাদাকাগজে নির্মিত
বইয়ের বুকে-পিঠে মুদ্রিত হওয়ার কারণে । বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জায়গাটার
অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে লেখা। গোটা দুনিয়ার আমূল পরিবর্তনের জায়গাটা হচ্ছে
মানুষের লেখা। লেখককে মূল্যায়নের আসল জায়গটা হচ্ছে তার সৃষ্ট লেখাসমগ্র ।
আজকে শুদ্ধকবি জীবনান্দদাশ নেই, রয়ে গেছে তার বাড়ির সবুজাভ আঙিনা, ধান
সিঁড়ির সোনালি-মাঠ, জলজ বাতাসে নিত্য করা সবুজ মাঠের সোনালি ফসল । মাইকেল
মদুসূদন দত্ত নেই, আছে তার –খরস্রোতা কপোতাক্ষ নদ, পল্লীকবি জসিম উদ্দীনের
সুজন বাদিয়ার ঘাট, আছে আসমানীর বুকের উদার জমিন। আল মাহমুদের সোনালী কাবিন ও
মায়ের নোলক। জীবনান্দদাশ থেকে আল মাহমুদ পর্যন্ত এরা সবাই গত। এদের ভরাট
উপস্থিতি নেই, নেই কোনো নতুন সৃষ্টির সমারোহ। কিন্তু প্রকৃতির বহুমাত্রিক
রূপ আজও আছে এই বাংলায়, নেই প্রকৃত মানুষ, যাদের আঙুলের ডগায় শব্দ খেলা
করবে, মাতিয়ে রাখবে মানব হৃদয়। স্পর্শ করবে এক হৃদয় থেকে আরেক হৃদয়ে । শব্দ
চাষের চাষী-ই আমাদের স্বপ্নলোকের চাওয়া। শুধুমাত্র একটি লেখাই লেখককে নিয়ে
যেতে পারে এক অনন্য উচ্চতায়। অনন্য লেখার কারণে তিনি বেঁচে থাকবেন
অমরত্বের সোনালি পথে। এই বোধ থেকে সব্যসাচী লেখক কবি সৈয়দ সামসুল হক সমস্ত
কিছু বিসর্জন দিয়ে লেখতে চেয়েছেন। সৈয়দ হক ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ইংরেজি
বিষয়ে ভর্তি হয়েও তিনি হুটকরে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। তার বোধে জাগে যে, কী হবে
এত কষ্ট করে লেখাপড়া করে! তিনি পণ করে ফেলেছেন- লিখেই জীবিকানির্বাহ করবেন।
হ্যাঁ, তিনি পেরেছেন এবং ঢের বেশি পেরেছেন। অন্য সবের মতো আমি বিষ্ময়
মানি, সৈয়দ হকের কী দুঃসাহস! তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্র দেশে বইবিমূখ
পরিবেশে শুধু লিখে জীবনযাপন! জীবনটাকে টেনে নেওয়া! এক কথায় সৈয়দ হকের
দুঃসাহস এবং আমি মনে করি নিজের উপর অসীম বিশ্বাসই তাকে নিয়ে গেছে বড় বড়
লেখকদের কাতারে। বলতে দ্বিধা নেই, নেই কোন সংকোচ, সৈয়দ হকের বহুমাত্রিক
লেখাই তাকে সাহস যুগিয়েছে। তিনি যে, লেখক তার চেয়ে তার লেখার দিকেই মানুষের
অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে, তার অমর র্কীতি ‘পায়ের
আওয়াজ পাওয়া যায়’ কিংবা ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়’ এবং আরো অনেক লেখা তার অমর
সৃষ্টি। একজন লেখক সাদা মসৃণ কাগজের বুকে-পিঠে কালির কলমের সাহায্যে, যে
সামরাজ্য নির্মাণ করেন তা চিরস্থায়ী হয়ে যায় মানব হৃদয়ে। অনেক সময় দেখা যায়
পাঠকেরা লেখকের লেখার চেয়ে লেখককেই প্রধান্য দেয়। লেখক শিবিরের বড় বড়
সাহিত্যিকের নাম দেখে চোখ বন্ধ করে তার রচিত বইখানা লুফে নেন। লেখক শিবিরে
এদের একেকটি নাম যেন একেকটি বড় বিজ্ঞাপন। প্রতি বছর বইমেলায় গড়ে তিন
হাজারের অধিক বই প্রকাশিত হয়। দুঃখ সংবরং না করে বলতেই হচ্ছে পাঠকমহল বিশেষ
কিছুসংখ্যক লেখকের বইয়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। অধিকাংশ লেখকই অপ্রকাশিত
থেকে যায়। এর চেয়ে দুঃখজনক সংবাদ আর কী-ই বা হতে পারে । জ্ঞানের গভীরে
বিচরণের জায়গাটা যদি প্রশস্ত করা না যায়, পথটি যদি সুমসৃণ না হয়, তাহলে
পাঠকমহল তাদের কাক্সিক্ষত জায়গায় পৌঁছানো বড়ই দুরূহ হবে। এমনকি জাতীয়
দৈনিকের সম্পাদক মহোদয়দের মধ্যে কেহ কেহ বড় বিজ্ঞাপনী নাম দেখে তাদের লেখা
গুরুত্ব দিয়ে ছাপেন। তাহলে পরে অপ্রকাশিত অপার সম্ভাবনাময় লেখকদের সুযোগ না
দিলে, তাদের চর্চার জায়গাটা প্রসারিত হওয়ার কোন সুযোগ থাকবে না। মহান
একুশের বইমেলায় প্রতিবছর শতপ্রতিকূলতা ডিঙিয়ে নিজেকে হাজির রাখি। আমার
উপলব্দি থেকে আমার চোখ নিয়োগ দিয়েছি পাঠকের দিকে। অধিকাংশ পাঠকই ছুঁটছেন বড়
বড় লেখকের দিকে। বড় বড় লেখকদের অনুকূলে। যেন এদের চোখে লেখা নয়, লেখকই পরম
প্রিয় মানুষ। সেলফি তোলা এবং লেখকের কলমের খোঁচায় অটোগ্রাফই যেন তাদের
সর্বোচ্চ পাওয়া। তাদের বোধে পরম প্রশান্তির স্নিগ্ধ আলোয় আলোয় কিছু সময়ের
জন্য হলেও পাঠক নিজেকে গৌরবান্নিত মানুষ মনে করেন। মনে হচ্ছে লেখকের লেখার
বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করার সময় তাদের হাতে নেই। এমনিতে এদেশের মানুষের
জীবনবোধে কিংবা জীবনাচারে একটি সত্য ফুঁটে ওঠে। সেটি হচ্ছে-সময়ের সমুদ্র
থেকেও তাদের চলনে-বলনে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কোনো জো নেই যে, তারা লালন করে
অভ্যস্ত একটি সত্য একমুহুর্ত সময় তাদের হাতে নেই। পরম সত্য কথা হলো -
লেখকের লেখাকে যদি গভীরভাবে ধারণ করি, তাহলে লেখকইতো ধারণ হয়ে যায়। লেখক
ঠাঁই হয়ে যায় পাঠক থেকে পাঠকের হৃদয়ের গভীরতম জায়গায়। পাঠকদের শিক্ষণীয়
বিষয় যদি কিছু থেকে থাকে, তবে সেটা হলো এই- শিক্ষা যথেষ্ট নয়। যেখানে
শিক্ষা এবং বুদ্ধির জোর যথেষ্ট থাকে না, সেখানে মানব হৃদয় বড় হয় না।
শিক্ষার পর আরো শিক্ষা চাই যাতে করে দৃষ্টিসীমা আরো প্রখর হয়। পাশাপাশি
এইটাও খেয়াল রাখতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক আছে কী না। পুঁজিবাদ সমাজে সৃষ্টি
করার চাইতে সাহেব হবার দিকেই ঝোঁকটা বেশি পরিলক্ষিত হয়। যেখানে চিত্তের
চেয়ে অর্থ-বিত্তবৈভবের সুখ বেশি মানুষ কামনা করে। বিত্তশালী হওয়ার অস্থির
প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে সমাজের এক বিশেষ স্তরের মানুষ। পুঁজিবাদ
ব্যবস্থাপনায় রাষ্টের নাগরিকগণ চরম দুর্বিত্তায়নের শিকার হচ্ছে দিনকে দিন।
খুন, গুম, অপহরণের মতো অনৈতিক কাজ ঢুকে পড়েছে সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে।
সাম্য-শান্তি চলে যাচ্ছে স্বর্গের দূর সীমান্তে। এখান থেকে সরে আসতে হলে
দরকার সাহিত্যচর্চা বাড়ানো। বাড়ানো দরকার সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র। সাহিত্য-
ব্যক্তির বিকাশ ঘটায় তা বলা যায় নিশ্চিতভাবে। সাহিত্যের অন্যতম কাজই হচ্ছে
সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করে মানুষকে বিবেকবানে পরিণত করা। সাহিত্য আনন্দ দেয় এ
আমরা মানি, এটি কেবল বিনোদনের অনুষ্ঠান নয়, যেমন নয় প-িত তৈরীর পাঠশালা।
তবুও সাহিত্য এই দুইয়ের সংমিশ্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এই প্রসঙ্গে -
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সাহিত্যের শিক্ষা মস্তিষ্কের নয়,
হৃদয়ের’। পরম সত্যকথা হলো - হৃদয়বান মানুষেরাই বিবেকবান। প্লেটো একজন
বিখ্যাত দার্শনিক ছিলেন। তার লেখাকে তার রাষ্ট্রের জনগণ বিশ্বাস করেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন - রাষ্ট্র শাসন করবে দার্শনিকেরা, সৈনিকেরা করবে যুদ্ধ,
শ্রমিকেরা করবেন উৎপাদন। প্লেটোর এই কালজয়ী লেখাটি ঐখানকার মানুষেরা
বিশ্বাস করছেন বিধায়, প্লেটো হতে পেরেছিলেন বিশাল আকাশের মতো হৃদয়বান লেখক।
খৃষ্টপূর্ব ৪৫০ অব্দে প্রাচীন গ্রীক অর্থাৎ আনুমানিক প্রায় ২৫০০ বছর
পূর্বে পৃথিবীর প্রথম আধুনিক সংস্কৃতির পীঠস্থান। ঐ সময়ে এথেন্সের লেখকেরা
তিনটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিয়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা করতেন। সেগুলি
হলো- সত্য, বিশ্বাস ও বিবেক। যা সত্য তা বিশ্বাস করে বিবেক-বুদ্ধি খাঁটিয়ে
সংস্কৃতির পরিধি বৃদ্ধি করেছিলেন। তাদের ধারণায় মানুষই সবকিছু বিচারের
মাপকাঠি। সত্য ও বিশ্বাস থেকে দার্শনিক সক্রেটিসকে বিন্দুমাত্র টলাতে
পারেনি বলে, এই মহান মানুষটি মৃত্যুদণ্ড হাসি মুখে বরণ করে নিয়েছিলেন। তিনি
চাইলে দেশ ত্যাগ করে মৃত্যুদ- থেকে বাঁচতে পারতেন। না, তিনি তা করেন নি।
কিন্তু তিনি তা করলে আর সক্রেটিস হতেন না। ২৪০০ বছর ধরে মানুষের মনে আর
প্রশ্নের উদ্রেক হতো না, কেন সক্রেটিসকে মরতে হয়েছিলো? তার সময়ে গ্রীসের
বিখ্যাত হিব্সের লাইব্রেরির দরজার সামনে খোঁদাই করা যে কথাটি, সেটি হচ্ছে
আত্মার ঔষধ, অর্থাৎ তাদের বিশ্বাস বই হলো আত্মার চিকিৎসার প্রধান উপকরণ।
একজন লেখক লেখার পূর্বে তার কল্পনা, ভাবনা এবং চিন্তার বিশুদ্ধ প্রকাশ
ঘটিয়ে কাগজে মুদ্রিত করে স্থান করে নেয় পুস্তিকার ভেতর, সংবাদপত্রে কিংবা
অন্যান্য মাধ্যমে। সবশেষে সঞ্চালিত হয় পাঠকদের হৃদয়ে। একটা বিষয় স্পষ্টত
প্রতিয়মান হচ্ছে যে, দিনকে দিন লেখক শিবিরে লেখকের সংখ্যা সংকুচিত হয়ে
আসছে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে এটি একটি অশনি সংকেত। পূর্ববঙ্গে অর্থাৎ
বর্তমানের বাংলাদেশে তিরিশের দশকের লেখক শিবিরে লেখকের মান এবং সংখ্যা যা
ছিল পঞ্চাশের দশকে এসে কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। ৬০ এর দশকে লেখক শিবিরে
লেখকের সংখ্যা মোটামোটি বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে উল্লেখিত দশকের তুলনায় লেখকের
সংখ্যা বৃদ্ধি পায়নি বরং কমেছে। সাহিত্যের মান এবং উজ্জ্বলতা ফিকে হয়ে
আসছে। এর কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। অতিমাত্রায় সৃজনশীল প্রশ্নের উপর
নির্ভরতা। রচনামূলক প্রশ্ন প্রনয়ণ এখন আর নেই। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা
হ্যাঁ এবং না দিয়ে উত্তর দিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। কোনো বিষয়ের উপর রচনা,
ভাবসম্প্রসারণ সিলেবাসে যথাযথ না থাকার কারণে আমাদের আগামীর আশার জায়গাটা
প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার
জায়গাটা। মুক্তমনা মানুষের সংখ্যা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে-
হারিকেন থেকে যেমন বেশি আলো আশা করা যায় না, তেমনি অপরিকল্পিত
শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বহুমাত্রিক আলোকিত মানুষ বেরিয়ে আসবে তা বোকারাও
বিশ্বাস করবে না। বরং এইটাই আশা করতে পারি- ব্যবহৃত হারিকেন থেকে আলোর
চেয়ে ধোঁয়াই নিগর্ত হবে বেশি। একজন লেখক অবশ্যই মুক্তমনা ও মননশীল মানুষ।
সত্য কথনে- সত্য বচনে তিনি হবেন আপসহীন মনোভাব সম্পন্ন মানুষ। তার লেখা,
তার জীবনাচারের সাথে যথেষ্ঠ মিল থাকবে। তিনি তার উপলব্দির জায়গা থেকে
জীবনব্যাপি যা লিখে যান, সেটা আর লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন তা হয়ে
যায় লেখাসমগ্র। আর এই সমগ্র কর্মকা- যখন সাদাকাগজে মুদ্রিত হয়ে বইয়ে
রূপান্তর হয়ে যায়, আর সেটি একজন লেখকের জন্য হয়ে যায় অসামান্য কীর্তি বা
দলিল। আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মানুষেরা যখন লেখকের রেখে যাওয়া বইয়ের উপর
চোখ রাখে নির্বিষ্ট মনে, আর তখনই লেখকের সার্থকতা। বইয়ের ভিতর শিলালিপিই
লেখককে নিয়ে যায় অমরত্বের পথে। আলোকিত হয় সমাজ, আলোকিত হয় সভ্যতা। মনে রাখা
দরকার - ‘বই শুধু কাগজের উপর মুদ্রিত শব্দবাক্যের ঝুড়ি নয়। বই হচ্ছে
মানুষের কল্পনা ও চিন্তার বিশুদ্ধ প্রকাশ’। বই প্রসঙ্গে ড: মোহম্মদ
শহীদুল্লাহ বলেন,‘আমাকে মারতে চাইলে চাকু-ছুরি কিংবা কোন পিস্তলের প্রয়োজন
নাই বরং আমাকে বইয়ের জগৎ থেকে দূরে রাখো’। এছাড়া চিনদেশের মানুষেরা
বিশ্বাস করেন যে, বই হলো এমন একটা বাগান, যা পকেটে নিয়ে ঘুরা যায়। কালের
ঘুর্ণন চাকায় সভ্যতার যে আলো ছড়ায়, তা লেখকের লেখার কারণেই। লেখক চিরস্থায়ী
নয়, তাদের আয়ূর সীমা আছে, তারা অনন্তকাল বেঁচে থাকেন না। কিন্তু লেখকের
লেখা থেকে যায় পুস্তিকার বুকে-পিঠে। একজন লেখকের লেখাই পৌঁছে দেয় লেখককে
অমরত্বের পথে। সভ্যতার বিকাশ যত বেশি ঘটবে, কুসংস্কার - কু-প্রবৃত্তি তত
অন্ধকারে চলে যাবে। সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তি, বিধবা বিবাহ প্রচলন ও সামন্তীয়
শাসন বিলুপ্তি কিংবা রহিত হওয়ার পেছনে যুগে যুগে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন
কলম সৈনিকেরা। তাদের লেখায় ও আন্দোলনের অগ্নিশিখার দহনে দগ্ধ হয়েছে শত
অনিয়ম, কুসংস্কার, জরা-জীর্ণতা। তাই সকল সংকীর্ণতা, ও সীমাবদ্ধতা থেকে
বেরিয়ে আসতে হলে- লেখককে নিয়ে না ভেবে, লেখকের ভাবনা, আবেগের জায়গা ও
লেখকের লেখা নিয়েই আমাদেরকে ভাবতে হবে এবং করতে হবে গবেষণা। জনপ্রিয় লেখক
মানে গুরুত্বপূর্ণ লেখক নয়। সময়ের ব্যবধানে জনপ্রিয়তা স্থির থাকে না। এ কথা
সবসময়ই প্রমাণিত। তাই লেখককে নয়, বিশ্বাস করতে হয় লেখকের লেখাকে। সবশেষে
প্রেমেন্দ্র মিত্রের একটি বিখ্যাত কবিতার কয়েকটি লাইন উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ
করছি:- যারা আজো জন্ম লয় নাই,
তাহাদের প্রেম ব্যর্থ নাহি হয় যেন এমন করিয়া লোভের ক্ষুধার ফাঁদে
ফের যদি ফিরে আসি আরো আলো চক্ষে যেন আসি নিয়ে বুকে আরো প্রম যেন আনি পৃথিবীকে আরো যেন ভালো লাগে।
লেখক: অধ্যাপক, কলাম লেখক ও প্রাবন্ধীক
মোবাইলঃ ০১৭২০-১৮৩০৩৯