ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
আত্মকথায় স্মৃতি ঃ আমার একাত্তর
Published : Tuesday, 17 May, 2022 at 12:00 AM
আত্মকথায় স্মৃতি ঃ আমার একাত্তরশান্তিরঞ্জন ভৌমিক ।।
(পূর্বে প্রকাশের পর)
সেপ্টেম্বরের পর থেকে ত্রিপুরার অধিবাসীরা জয়বাংলা লোকদের প্রতি আবেগ বিসর্জন দিয়ে কঠিন অবস্থানে চলে যেতে থাকে। শরণার্থীদের জন্য তারা বঞ্চিত হচ্ছে, ভারত সরকার এত লোককে আশ্রয় দিয়ে ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিয়ে নিজের দেশের লোকদের প্রতি অবহেলা করছে। আমাদের দেখলেই ‘পাইক্যা পাইক্যা' বলতে শুরু করেছে। আমরাও মননে দুর্বল হতে শুরু করি।
পিছনের একটি কথা বলব, ভুলে গিয়েছিলাম অশোকবাবু ও আমি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম তা আগেই বলেছি। সেজন্য কৃষ্ণপদ ভট্টাচার্য মহোদয়কে আমি চিনি।
জুন মাসের শেষের দিকে একদিন সকালবেলা মেসোমশায়ের সঙ্গে দুর্গা চৌমুহনী বাজারে (কাঁচা বাজার সকালে বসত) গিয়েছি। বাজারে ঢুকে দেখি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় ব্যাগ হাতে তরকারি কিনছেন। ধুতি, হাফপাঞ্জাবী পায়ে টায়ারের সেন্ডেল তখনও তিনি মন্ত্রী, সাথে কোনো পিয়ন বা পুলিশ নেই। আমি দেখে তো অবাক এবং বার বার তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকি। মেসোমশায় বলেন- 'এদিকে আয়'। আমি অবাক বা বিস্ময়ে অন্তহীন আত্মজিজ্ঞাসায় পেছনে তাকিয়ে থাকি। একজন মন্ত্রী বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে বাজার করছেন, সঙ্গে কেউ নেই। বাজার শেষ করে বড় রাস্তায় ওঠে রিক্সা করে চলে গেলেন। আমরা বাজার করে ফিরছি। মেসোমশায় জিজ্ঞাসা করছেন 'বাজারে কার দিকে তাকিয়েছিলি। বললাম দেখলাম শিক্ষামন্ত্রী কৃষ্ণপদবাবু বাজার করছেন, সঙ্গে কেউ নেই। রিক্সা করে চলে গেলেন। তাঁর গাড়ি নেই, পুলিশ পাহারা কই'। মেসোমশায় বললেন- 'ব্যক্তিগত কাজে সরকারি যানবাহন ব্যবহার করা অনৈতিক। এখানে তা কেউ করে না। যখন অফিসে যান তখন মন্ত্রী অন্য সময় সাধারণ মানুষ। বললাম ‘পাকিস্তানে তো মন্ত্রীর আগে পিছে পুলিশ থাকে। ট্রাফিক রাস্তা পরিষ্কার করে দেয়। তিনি বললেন, 'এখানে তা চলে না। নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই, জবাবদিহি করতে হয়।
একদিন বৌদিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলাম। বৌদি সন্তান সম্ভাবা। ডাক্তার প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, দু'টাকা ভিজিট। খন্দরের ধুতি হাফশার্ট, পায়ে টায়ারের সেন্ডেল। টিনের এল সাইজের ঘর, ভরজার বেড়া- চুন-সুরকি লাগানো। যে দেশ থেকে পালিয়ে ত্রিপুরায় গেলাম ত্যাগী-ভোগী পার্থক্যটা এতটা যে হিসাব মিলানো কষ্টকর এবং বিশ্বাসযোগ্য কীনা এটাও প্রশ্ন। যে দেশে প্রাণ বাঁচাতে এলাম, এ দেশে রাজনীতি করে নিঃস্ব হয়, ক্ষমতায় গিয়ে মন্ত্রী হলেও আগের অবস্থার মতোই জীবনযাপন করতে হয়। মন্ত্রীত্ব পাওয়া কঠিন, ছেড়ে দেওয়া দ্বিধাহীন সহজ, দায়িত্বমুক্তির স্বাদ যেন স্বাধীন জীবনের অনাবিল স্বস্তিপ্রাপ্তি। কোনো আফসোস নেই, মনে কোনো বিধাও নেই।
অক্টোবরে দুর্গাপূজা দেখলাম। দলে দলে নারী-পুরুষ সমস্ত রাত্রি ঘুরে বেড়ালো। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার কথা শোনা গেল না। শ দিন মিছিল দেখতে বাড়ি ছেড়ে আবালবৃদ্ধবণিতা রাস্তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে আছে। খালি বাড়ি-ঘর, কই চুরি হয়েছে এমনটি শোনা যায়নি। অথচ ত্রিপুরা একটি পরিত্র, জনপদ, নানা দিক দিয়েই তখন অনগ্রসর। আদিবাসী তথা ত্রিপুরা ও অন্যান্য আদিবাসী এবং বাঙালি মিলে মিশে আছে। তখন তাদের মধ্যে কোনো ক্ষোভ দেখিনি।
নভেম্বর মাস এলো। মনে হলো যুদ্ধ সমাগত। জয়বাংলা সম্পর্কে নানা জল্পনা কল্পনা, আন্তর্জাতিক বিশ্বে জনমত তৈরির জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নানা দেশ ঘুরছেন। নিজের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন, অন্যের মতামত জেনে নিচ্ছেন। সীমান্তে সৈন্যদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। প্রায় সময় গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। যেদিন এ শব্দ শুনতে পেতাম না, সেদিন হতাশ হতাম। তা হলে কী থেমে গেল। দেশ স্বাধীন হবে না, দেশে ফিরে যেতে পারব না। তাহলে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একদিন মেসোতাত বড়ভাই মনোজদা ও আমি দুর্গা চৌমুহনীতে দিদির বাসায় যাই। বলে রাখি তখন আগরতলার প্রতিটি বাড়িতে ট্রেন্স কাটা হয়েছে এবং যুদ্ধকালীন কীভাবে ঢুকতে হবে তা পারিবারিকভাবে মহড়াও দেয়া হয়েছে। আগরতলা শহর বাংলাদেশের আখাউড়া বরাবর পূর্বে অবস্থিত। দিদির বাসায় চা পান করছি। এমন সময় পশ্চিম দিক অর্থাৎ আখাউড়ার দিক থেকে রকেট লাঞ্চারের শেল আগরতলা শহরের দিকে থেকে থেকে দাগা শুরু হয়। আমরা তড়িৎ গতিতে ট্রেন্সের ভিতর চলে যাই। গোটা ছয়/সাতটা ছাড়ার পর বন্ধ হয়ে যায়। আমরা কিছুটা সময় অপেক্ষা করে বের হই ও দু'ভাই কৃষ্ণনগর বাসার দিকে দৌড়াতে থাকি। বাসায় এসে দেখি কেউ নেই। কোনো সাড়া শব্দও নেই। মাসীমা মাসীমা মা মা বলে দু'ভাই ডাকতে থাকি। নয়মাসের অন্তঃসত্ত্বা বৌদি চিৎকার করে বলছে 'আমাকে বের কর'। শব্দ শুনে ঘরে গিয়ে দেখি বৌদি চৌকির নীচে, কীভাবে ঢুকে গেছেন, এখন আর বের হতে পারছেন না। দু'ভাই চৌকি তুলে ধরি, বৌদি বের হয়ে এলেন। অন্য ঘরে চৌকির নীচে মাসীমা নাতিন লিলিকে নিয়ে ঢুকে মাথার কাছে কুলা ধরে বসে আছেন। শেল পড়লে কুলাই যেন রক্ষা করবে। বিপদে কতই না ভরসা বা যুক্তিহীন নির্ভরতা।
নভেম্বর থেকেই যুদ্ধের পাঁয়তারা শুরু হয়েছে, তা আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হতে থাকে। সরকারিভাবে মাইকিং করা হয়েছে। আগরতলা শহর ছেড়ে যেন নিরাপদ স্থানে লোকজন চলে যায়। যুদ্ধ শুরু হলে শত্রুপক্ষ ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা আক্রমণ করতে চাইবে। এছাড়া কুঞ্জবন এলাকায় ভারতীয় সামরিক ঘাটি। তাদের চলাচলের সুবিধার জন্য রাস্তাঘাট মুক্ত থাকতে হবে। এইরূপ ঘোষণার পর কিশোরগঞ্জ (কাঁকড়াবন) মামার সঙ্গে আলোচনা করে বাসার সব মেয়েলোকসহ এক মেসোতাত ভাইকে সেখানে পাঠানো হলো। কিশোরগঞ্জ সীমান্ত থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে। আগরতলা তো একেবারে সীমান্তবর্তী শহর। বাসায় মেসোমশায়, চাকুরিজীবী দু'মেসোতাত ভাই, আমি ও সুভাস রয়ে গেলাম। নিজেরা রান্নাবান্না করি। কোনো মতে দিন চলে। দিন চলে অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ এবং নিত্যদিনের খবরাখবর পর্যালোচনা করেই কখন যেন সময় চলে যায়। শহরে ততটা বের হই না। জয়বাংলা অফিসগুলো জনশূন্য, চাকুরিজীবী ভাইরা সন্ধ্যায় ফিরে এলে নানা খবর পাই। বিশেষত যিনি টেলিগ্রাফ অফিসে চাকুরি করেন, তাঁর কাছ থেকেই চমকপ্রদ সংবাদ শুনতে পাই। এছাড়া রেডিও তো সর্বক্ষণ খোলা রয়েছে।