
বাংলাদেশের
বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের জীবন-জীবিকায় রীতিমতো বিপর্যয় নেমে এসেছে।
সিডর-আইলা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক আম্ফান-ইয়াস নামের ঘূর্ণিঝড় ও
জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় বেড়িবাঁধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এখনো অনেক এলাকায়
ভাঙা বাঁধ পুননির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। দিনে দুবার করে ঢুকছে জোয়ারের পানি।
লবণাক্ততা গ্রাস করে ফেলছে উপকূলীয় জেলাগুলোর কৃষিজমি। ব্যাহত হচ্ছে
চাষাবাদ। বেকার হয়ে পড়ছে উপকূলের কৃষি শ্রমিকরা। মিঠা পানির উদ্ভিদ ও ফলের
গাছ মরে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে মিঠা পানির মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী।
নলকূপেও উঠে আসছে নোনা পানি। অতিরিক্ত লবণাক্ততা জনস্বাস্থ্যেও প্রভাব
ফেলছে। উচ্চ রক্তচাপসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বাড়ছে
মাতৃ ও শিশুমৃত্যু। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে
যাচ্ছে। অসহায় দরিদ্র মানুষ এলাকায় থেকে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছে।
ক্রমেই
বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। বেশি করে গলছে মেরু অঞ্চলের বরফ। বাড়ছে
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। ফলে অনেক দেশেরই উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে সেই অভিঘাত। উপকূলীয় ১৮টি জেলার অনেক নিম্নাঞ্চল
ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিকে আরো অসহনীয় করে তুলেছে
একের পর এক ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস। ভেঙে যাচ্ছে উপকূলে থাকা অতি দুর্বল
বেড়িবাঁধ। মানুষের ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে যাচ্ছে। জমির ফসল নষ্ট হচ্ছে।
পুকুরের মাছ ভেসে যাচ্ছে। প্রতিদিন দুবার করে আসা জোয়ারের পানিতে তাদের
দুর্দশা চরমে উঠছে। রান্না করার জন্য একটু শুকনা মাটি পেতে ভাটার জন্য
দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এভাবে কত দিন বেঁচে থাকা যাবে এমন প্রশ্ন সেসব
এলাকার মানুষের।
বর্তমানে উপকূলে যে বেড়িবাঁধ রয়েছে তার বেশির ভাগই
নির্মিত হয়েছে পঞ্চাশের দশকে। সে সময় জোয়ারের পানির উচ্চতা কম ছিল বলে
বাঁধও ছিল কম উচ্চতার। ১৯৯২ সালে সরকারিভাবে গঠিত জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটি
বাঁধ আরো প্রশস্ত এবং আরো উঁচু করার সুপারিশ করেছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ
নেতৃত্বাধীন সরকার ডেল্টা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ২০১৩ সালে ৪০ কোটি ডলার
ব্যয়ে উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প (সিইআইপি) হাতে নেওয়া হয়। ২০১৯ সালের
মাঝামাঝি পর্যন্ত মাত্র ১৩০ কিলোমিটার বাঁধ উন্নয়ন করা সম্ভব হয়েছে। আরো
কিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে। কিন্তু সেসব প্রয়োজনের তুলনায় যেমন সামান্য,
তেমনি বাস্তবায়নের গতিও অত্যন্ত ধীর। পাশাপাশি বেড়িবাঁধ রক্ষায় উপকূলীয়
এলাকার অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ বন্ধ করতে হবে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ
চিংড়ি চাষের জন্য জমিতে নোনা পানি আনতে বাঁধে সুড়ঙ্গ করা হয়। এতে বাঁধ
দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বড় জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসের সময় ভেঙে যায়।
বিভিন্ন
জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে দুই কোটিরও বেশি মানুষ চরম
ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
উপকূলীয় মানুষের জীবন বাঁচাতে ও বাস্তুচ্যুতি ঠেকাতে দ্রুত প্রয়োজনীয়
ব্যবস্থা নিতে হবে।