স্মরণ :....................
চলে গেলেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী
----সুরজিৎ রায় চৌধুরী ||
কুমিল্লার
কৃতি সন্তান ও বাংলাদেশ জাতীয় সংবিধানের অন্যতম নক্সাবিদ একুশে পদক
প্রাপ্ত বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও অধ্যাপক সমরজিৎ রায় চৌধুরী গত ৯ই অক্টোবর
রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে শিল্পীর বয়স
হয়েছিল ৮৫ বছর। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী গভীর শোক প্রকাশ
করেছেন। তিনি বেশ কিছুদিন যাবত হার্ট ও ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছিলেন। শিল্পী
সমরজিৎ রায় চৌধুরী স্ত্রী, দুই ছেলে-মেয়ে, বৌমা ও দুই নাতি-নাতনি সহ অসংখ্য
বন্ধু-বান্ধব, ছাত্র-ছাত্রী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
অধ্যাপক সমরজিৎ
রায় চৌধুরী ১৯৩৭ সালে কুমিল্লার বাঞ্ছারামপুরে এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ
করেন। কুমিল্লার প্রসিদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী স্কুল ঈশ্বর পাঠশালা হতে
মেট্রিকুলেশন শেষ করে ঢাকায় অবস্থিত তৎকালীন গভঃ আর্ট কলেজে ভর্তি হন এবং
১৯৬০ সালে কৃতিত্বের সাথে শিক্ষা সমাপন করে একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে
যোগদান করেন। ছাত্র এবং শিক্ষক হিসেবে তিনি সরাসরি শিল্পাচার্য জয়নুল
আবেদীন, পটুয়া কামরুল হাসান, শিল্পগুরু শফিউদ্দিন আহমেদ, শিল্পী আনোয়ারুল
হকের মতো শিল্পীদের সাহচর্য লাভ করেন। তিনি শিক্ষকতা পেশার পাশাপাশি নিয়মিত
শিল্প চর্চা করে গেছেন। অংশ গ্রহণ করেছেন দেশে -বিদেশে অনুষ্ঠিত সহস্রাধিক
যৌথ প্রদর্শনীতে; করেছেন ছয়টি একক প্রদর্শনী। অসংখ্য বইয়ের প্রচ্ছদ,
অলঙ্করণ, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের লোগো অঙ্কিত হয়েছে এই
শিল্পীর হাতে।
১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশ জাতীয় সংবিধানের অন্যতম
নক্সাবিদ এই শিল্পী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সুপ্রীম কোর্ট, বাংলাদেশ বিমান
বাহিনী, পল্লী-কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী, দ্বিতীয় সাফ
গেমস সহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ও ইভেন্টের লোগো নির্মাতা এই কৃতি শিল্পী।
দীর্ঘ
৪৩ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা শেষ করে ২০০৩
সালে অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন এবং একই বছর শান্ত মারিয়াম
ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনলজি নামক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিন
হিসেবে যোগদান করেন। ২০১০ সালে পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংখ্যাতিরিক্ত
অধ্যাপক হিসেবে তিনি নিয়োগ লাভ করেন।
শিল্পী ও অধ্যাপক সমরজিৎ রায়
চৌধুরী সারা জীবনের কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০৯ এ সুলতান পদক, ২০১৩ তে
শিল্পকলা পদক, ২০১৪ সালে একুশে পদক অর্জন করেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য
সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এই গুণী শিল্পী।
শিল্পী সমরজিৎ রায়
চৌধুরীর চিত্রকলায় বাংলার লোকজ মোটিফের ব্যবহার ঘুরে ফিরে চলে আসে।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, পটুয়া কামরুল হাসান বা পরবর্তীতে রশীদ চৌধুরী ও
কাইয়ুম চৌধুরীর কাজে বাংলার লোকজ শিল্পের বিভিন্ন উপাদান বা উপকরণের
ব্যবহার লক্ষণীয় যা সমরজিৎকে বিভিন্ন সময়ে উদ্বুদ্ধ করে। শুরুতে সমরজিৎ রায়
চৌধুরী ফিগারেটিভ কাজে মনোনিবেশ করলেও ধীরে ধীরে শিল্পীকে মূর্ত এবং আধা
বিমূর্ত দুই ধরনের কাজের অনুশীলন করতে দেখা যায়।
শিল্পী সমরজিৎ রায়
চৌধুরী নিজস্ব স্টাইল বা ঢং প্রয়োগ করে নিজের শিল্পকে এমন এক পর্যায়ে
উত্তীর্ণ করেছেন যেখানে তিনি সৃষ্টি করেছেন এক ভিন্ন স্বকীয় ধারা যা তাঁর
চিত্র সম্ভারকে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্যতা। তাঁর কাজে দেখা দেয় বাংলার প্রকৃতির
নির্মল মনোরম পরিবেশ, গাছ, পাখি, ফুল বা কখনো কখনো ছবিতে উঠে আসে বাংলার
নারী, খেটে খাওয়া মানুষের মুখোচ্ছবি অথবা তাঁর ছবিতে মেলে অলঙ্কৃত হাতি বা
ময়ুরের সূক্ষাতিসূক্ষ ব্যবহার।
শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরীর ছবিতে
বিভিন্ন জ্যামিতিক ফর্মের উপস্থিতি বিশেষ ভাবে লক্ষণীয়। লাইন তাঁর ছবির
প্রাণ। প্রকৃতির বিডিন্ন উপাদান বা উপকরণকে তিনি এই লাইন বা জ্যামিতিক
ফর্মের মাধ্যমে ছন্দময় প্রকাশ ঘটিয়েছেন; গড়েছেন বা ভেঙ্গেছেন; ব্যবহার
করেছেন কখনো উজ্জ্বল রং আবার কখনো ধূসর।
শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরীর
ছবির আঙ্গিক বলে দেয় তাঁর ছবির প্রকাশ ভঙ্গিমার ভাষা; নিজস্ব আদলে গড়েছেন
ক্যানভাসের জমিন। তাঁর ছবি কখনো হয়ে উঠেছে স্মৃতিময়; উঠে এসেছে পুরোনো
ঢাকার প্রতিচ্ছবি বা ঐতিহ্যবাহী দালানের স্হাপত্য নকশা। কারণ তিনি তাঁর
জীবনের অনেকটা সময় অতিবাহিত করেছেন এই পুরোনো ঢাকাতেই।
অ্যানি এরনোর সিম্পল প্যাশন:
সরল অনুরাগের অনিন্দ্য বেদনা
এবারের
সাহিত্যে নোবেলজয়ী ফরাসি লেখিকা অ্যানি এরনো (সেপ্টেম্বর ০১, ১৯৪০—) ১৯৭৪
সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ক্লিনড আউট থেকেই অবিরত তাঁর লেখায় নিজের
জীবন ও তৎকালীন প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, পিতামাতা, নারী, এবং ভুলে যাওয়া
মানুষদেরকে নিয়ে লিখছেন। তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য বিষয় হলো, শরীর ও
যৌনতা, অন্তরঙ্গ সম্পর্ক, সময় ও স্মৃতি, সামাজিক বৈষম্য, এবং কিভাবে এইসব
জীবন অভিজ্ঞতা লিখতে হয় ইত্যাদি। এরনোর লেখা অতি ব্যক্তিগত এবং অতি
অন্তরঙ্গ অভিজ্ঞতার বয়ান — তা হোক শোকসন্তাপ নিয়ে, শ্রেণি লজ্জা নিয়ে,
জায়মান যৌনতা নিয়ে, কামনা নিয়ে, অবৈধ গর্ভপাত নিয়ে, অসুস্থতা কিংবা সময়ের
বোধ নিয়ে — সবসময় সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এবং রাজনৈতিক প্রতিফলন হিসেবে ধরা
দিয়েছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে সাহসিকতা এবং তীক্ষèতার সাথে কোন
বিষয়ের মূলে পৌঁছাতে তাঁর যে অবদান সে জন্য তিনি ২০২২ নোবেল সাহিত্য
পুরস্কার জিতেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো, হোয়াট দে সে গোজ, দি
ফ্রোজেন উইমেন, আ ম্যানস প্লেস, আ উইম্যানস স্টোরি, শেইম, আই রিমেইন ইন
ডার্কনেস, গেটিং লস্ট ইত্যাদি। রবিবাসরীয়ের এই সংখ্যায় এরনোর অন্যতম থিম
শরীরও যৌনতা নিয়ে লেখা উপন্যাস সিম্পল প্যাশনের পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন
হাসিব উল ইসলাম।
সিম্পল প্যাশন স্বল্পদৈর্ঘ্যের একটি সহজ গল্প, বিবাহিত
এক পুরুষের সাথে গল্পকথকের তীব্র আসক্তি ও কামনার বিবরণ, এবং ভেঙ্গেচুরে
ফেলা এক অন্তর্দৃষ্টির আখ্যান। প্রবল অনুরাগ, আত্মসংযমের অভাব, এবং
অর্থহীনতা এবং এই তিন বিষয়ের সম্পর্কই উপন্যাসের মূল উপজীব্য।
‘I measured time differently, with all my bodz.’
Simple Passion, Annie Ernaux
এরনোর
উপন্যাস শুরু হয় এক গ্রীষ্মে, উত্তম পুরুষের জবানিতে, অত্যন্ত সরাসরিভাবে
কথকের প্রথমবার এক্সরেটেড সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে। কথকের মনে
হয়, যৌনতায় যেমন আত্মপরিচয়, নীতিনৈতিকতা বিলীন হয়ে যায়, লেখার উদ্দেশ্যও
তা-ই। এই উপন্যাসও দুই বছরের এক শরীরী প্রেমের গল্প যেখানে কথক পুরুষটির
ব্যবহারের নোট নেন, বিশ্লেষণ করেন তার প্রভাব। কামনা এখানে এতোই
সর্বগ্রাসী, কথকের সময় কাটে শুধু পুরুষটিকে কাছে পাওয়ার আকাক্সক্ষায়।
পুরুষটি বিজাতীয় এবং বিবাহিত। সে আসে তাঁর ইচ্ছে মাফিক। মাঝখানে ঝুলে থাকে
কথকের তীব্র অপেক্ষা, মানুষটার অসাড়তার যাতনা। তবুও একত্রে কাটানো
মুহূর্তগুলো তাঁর কাছে যুগপৎ অনির্বচনীয় সুন্দর ও পরাবাস্তব বলে মনে হয়।
এবং সে এক অর্থহীন, বিরল আশা নিয়ে মগ্ন থাকে বেঁচে থাকার নেশায়। এমনকি
সন্তানদেরকেও বুঝতে দিতে চান না তাঁর কামনার দিনরাত্রি।
এরনোর বয়ানে এই
অভিজ্ঞতা একটা রোগের মতোন হয়ে ধরা পড়ে। কথক বলেন, “
I had no future other than the telephone call fixing
our next appointment.” সে আনন্দ উপভোগ
করে ভবিষ্যতের যন্ত্রণা হিসেবে। মানুষটার অনুপস্থিতে তাঁর একমাত্র আনন্দ
হচ্ছে নতুন নতুন জামাকাপড় কেনা এবং সেগুলো পরা। নামহীন মানুষটা, পুরো
উপন্যাসে যাকে ‘অ’ বলে সম্বোধন করা হয়, পুরোটা সময় জুড়ে কথকের ওপর ভর করে
থাকে; মূলত তাঁকে আছর করে লোকটার যৌনতা। বাকী সময়টা তাঁর কাছে মনে হয় অসীম
শূণ্যতা। কিন্তু কথক অপরিচিতের বেদনায় ভোগে। অর্থহীন মনে হয় সবকিছু।
শেষমেশ সিধান্তে আসেন, আমরা যাদেরকে ভালোবাসি পরিশেষে তাঁরা অচেনাই থেকে
যায়। তিনি বলেন, “