কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি পুতিন
Published : Friday, 14 October, 2022 at 12:00 AM
ড. ফরিদুল আলম ||
নিজেদের মতো করে গণভোট আয়োজন, সেটিকে পার্লামেন্টে পাস করানো এবং পরবর্তী সময়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউক্রেনের চারটি অঞ্চলকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার পরদিনই দোেেনস্কর গুরুত্বপূর্ণ লেম্যান শহরের নিয়ন্ত্রণ হারায় রাশিয়া। এরই মধ্যে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকার পুনর্দখলও নিশ্চিত করেছে ইউক্রেন। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এলো গত ৮ অক্টোবর রাশিয়ার সঙ্গে ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সংযোগকারী কার্চ সেতুটি বিস্ফোরণে ধসে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে এই সেতুটিকে দুর্ভেদ্য হিসেবে বলে আসছিল।
বলা চলে, এই হামলার বিষয়টিকে পুঁজি করে এক ধরনের ষড়যন্ত্রতত্ত্বের আশ্রয় খুঁজছে তারা। এই সেতু ধসের পেছনে রাশিয়া, নাকি ইউক্রেন কোন পক্ষ দায়ী সেটা এখনো নিশ্চিত না হলেও রাশিয়া এটিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আখ্যা দিয়ে ১০ অক্টোবর থেকে রাজধানী কিয়েভসহ ইউক্রেনের অন্তত ১০টি শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। পুতিন এই হামলাকে প্রতিশোধ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পুতিন যে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের আশ্রয় খুঁজছেন এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে এর প্রমাণ মেলে।
পশ্চিমা বিশ্ব থেকে এর সমালোচনা করে বলা হচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ক্রমাগত পিছু হটতে থাকা রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করা তুলনামূলক খুব সহজ এবং এগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার আগে থামিয়ে দেওয়া খুবই কঠিন। রাশিয়ার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলো এই হামলার বিষয়গুলোকে ফলাও করে প্রচার করছে এবং বিষয়টি অনেকটা এ রকম যে তারা পশ্চিমা বিশ্বকে তাদের শক্তিমত্তার কিছুটা দেখিয়ে দিয়ে ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কেও যেন কিছুটা সতর্ক করতে চাইছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পুরো বিষয়টিই আসলে এত দিন ধরে চলে আসা রাশিয়ার যুদ্ধকৌশলের একটা পরিবর্তন। এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর রাশিয়ার পক্ষ থেকে আরো হামলা আসছে মর্মে ইউক্রেনকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। এখানে আরো উল্লেখ্য, রাশিয়া এমন একটি সময়ে এই হামলাকে একটি উপলক্ষ করে নিয়েছে, যখন ইউক্রেনের পশ্চিমে লাভিভ থেকে দক্ষিণে মাইকোলাইভ এবং উত্তর-পূর্বের খারকিভ পর্যন্ত একাধিক এলাকায় শীতকাল ঘনিয়ে আসছে। এই সময়টায় এই অঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা বেশি থাকে এবং এই হামলার ফলে বিদ্যুত্ব্যবস্থা বিপর্যয়ের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহেও বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে হামলাপ্রবণ এলাকা এবং হামলা হতে পারে এমন সম্ভাব্য এলাকার মানুষকে খুব বেশি প্রয়োজন না হলে ঘর থেকে বের না হওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এর থেকে অনুমান করা যায়, রাশিয়া ঠিক যা চাইছিল তেমনটা হচ্ছে এবং তারা ধারণা করছে যে আসছে শীতে তারা উপর্যুপরি এ ধরনের পরিবর্তিত যুদ্ধকৌশল অবলম্বনের মধ্য দিয়ে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আনাতোলি আস্তনোভ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইউক্রেনকে ধ্বংসাত্মক অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার আহবান জানিয়ে ‘রেড লাইন’ অতিক্রম না করার বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি এই মর্মে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন যে এর ফলে পশ্চিমা বিশ্বের কোনো লাভ না হওয়ার পরিবর্তে যুদ্ধ আরো দীর্ঘস্থায়ী হবে। রুশ হুমকির জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইউক্রেনকে আরো উন্নতমানের যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহের কথা জানিয়েছেন, যার মধ্যে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও থাকবে। জার্মানির তরফ থেকেও কিয়েভকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহের কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে ১১ অক্টোবর জি-৭ নেতারা এক ভার্চুয়াল বৈঠকে মিলিত হয়ে যত দিন প্রয়োজন তত দিন ইউক্রেনকে সব ধরনের সমর্থন দিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। একই দিনে ন্যাটো মহাসচিব জেন্স স্টলটেনবার্গ জানিয়েছেন, ইউক্রেনের যত দিন প্রয়োজন তত দিন ন্যাটো তাদের পাশে থাকবে। সব কিছু মিলিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিন যে কৌশলে এই যুদ্ধকে রাশিয়ার অনুকূলে আনতে চাইছেন, এর বিপরীতে পশ্চিমা বিশ্বের আরো আগ্রাসী উদ্যোগ গ্রহণ এটিকে অনেকটা জটিল করে তুলছে। তবে এ কথা মানতেই হবে যে এই যুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় প্রণোদনার বিষয়টি হচ্ছে ইউক্রেনীয় সেনা এবং জনগণের দৃঢ় জাতীয়তাবাদী চেতনা। আর এই জাতীয়তাবাদী চেতনার বিপরীতে রাশিয়ার সেনাদের দীর্ঘ সময় যুদ্ধের ময়দানে টিকে থাকার মানসিকতার অভাব এবং সাম্প্রতিক সময়ে পাল্টা আক্রমণের শিকার হয়ে ময়দান ছেড়ে পালানো তাদের মনোবলের ঘাটতিকে আরো প্রকট করে তুলেছে।
কোন পরিস্থিতির মধ্যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সাম্প্রতিক সময়ে লোক-দেখানো গণভোট আয়োজনের মাধ্যমে ইউক্রেনের চারটি অঞ্চলকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হিসেবে ঘোষণা করেছেন, এটি কমবেশি সবার কাছে পরিষ্কার। বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে, পুতিন মূলত যাদের ওপর বা যেসব আন্তর্জাতিক শক্তিকে নিজের বন্ধু ভেবে এবং ভরসা করে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, সময় যত গড়াচ্ছে ততই তিনি এখন উপলব্ধি করছেন যে বাস্তবিক অর্থে এই যুদ্ধে তাঁর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিশ্বশক্তি এই মুহূর্তে আর নেই। এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চীনের অবস্থান রাশিয়ার পক্ষে না থাকলেও তাদের দিক থেকে ‘রাশিয়ার আত্মপক্ষ সমর্থন করার অধিকার রয়েছে’—এই মর্মে সরকারি বিবৃতি রাশিয়ার জন্য একটি বড় উৎসাহের বিষয় ছিল। পরবর্তী সময়ে চীনের সঙ্গে অপর গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ভারত যুক্ত হয়ে পশ্চিমা বিশ্বের অনুরোধ উপেক্ষা করে রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কেনার বিষয়কে রাশিয়া এক ধরনের পরোক্ষ সমর্থন হিসেবে ভেবে নিয়েছিল। আসলে দুই মাস ধরে ইউক্রেন বাহিনী পশ্চিমা অর্থ এবং অস্ত্রের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে এবং সেই সঙ্গে তাদের সেনারা শক্ত মনোবলের সঙ্গে যেভাবে যুদ্ধ চালিয়ে রাশিয়া কর্তৃক দখলকৃত ভূখণ্ডগুলোকে একের পর এক নিজেদের দখলে নিয়ে আসছে—এ সব কিছুর সঙ্গে সঙ্গে এত দিন ধরে তুলনামূলক নীরবতা পালনকারী রাষ্ট্রগুলো যেন তাদের নীরবতা ভেঙে বাস্তবতায় ফিরে এসেছে।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর উজবেকিস্তানের সমরখন্দে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যে বৈঠক করেন সেখানে পুতিনকে চীনের পক্ষ থেকে এই যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানানো হয়। এর পরপরই চীনের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলোও যেন তাদের সুর পাল্টাতে থাকে। এই যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে প্রত্যাশিত ফল অর্জিত না হওয়ার কারণ হিসেবে চীনের বিভিন্ন গণমাধ্যম বিভিন্ন কারণ দেখাচ্ছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সেকেলে অস্ত্রের ব্যবহার, খাদ্যের ঘাটতি এবং সেনাদের নিচু নৈতিক মনোবল। উল্লেখ্য, এর আগে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোতেও এই তিনটি কারণকে চিহ্নিত করা হয়। এদিকে পুতিনের নতুন করে তিন লাখ সেনা সমাবেশকে উদ্দেশ্য করে তারা বলছে, এর মধ্য দিয়ে কার্যত যুদ্ধ পরিস্থিতি বদলাবে না। এ বছরের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও চীন ও ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেছেন, যা ইঙ্গিতবহ।
এদিকে গত ২০ সেপ্টেম্বর চীনের একটি সংবাদমাধ্যম শুধু ইরান ও উত্তর কোরিয়াকে চীনের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করে। সব মিলিয়ে চীনের নিষ্ক্রিয়তা রাশিয়াকে অনেকটা একা করে ফেলেছে। একই সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতে দ্রুত এই যুদ্ধ বন্ধ করার ওপর তাগিদ দেন। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা তুরস্কের অবস্থানের নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ করছি। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরোধী ছিলেন এবং ইউক্রেন ও রাশিয়াকে আলোচনার টেবিলে বসিয়ে উভয় পক্ষের জন্য একটা সম্মানজনক সমাধান খুঁজে বের করতে প্রয়াসী ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাশিয়ার নিজস্ব লেনদেনব্যবস্থা এমআরএইয়ের মাধ্যমে লেনদেন বাতিল করেছে। সরকারিভাবে ইউক্রেনের ভূখণ্ডকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার বিরোধিতা করে এটা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে জানিয়ে দিয়েছে, যার মাধ্যমে তুরস্ক নিজেকে মধ্যস্থতাকারীর অবস্থান থেকে সরিয়ে নিয়েছে বলা যেতে পারে।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বর্তমানে এই যুদ্ধের যে চিত্রটি পরিষ্কার হয়ে আসে তা হলো রাশিয়া যতই যুদ্ধকৌশল পরিবর্তনের মাধ্যমে হামলার তীব্রতা বাড়াতে চাইছে, পশ্চিমা বিশ্ব ততটাই রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরো কঠোরতা অবলম্বন করতে যাচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এত দিন ধরে নীরব থাকা কিছু শক্তির সরাসরি রাশিয়ার বিরুদ্ধাচরণ পশ্চিমা বিশ্বকে নিঃসন্দেহে আরো বেশি অনুপ্রাণিত করে থাকবে। এর আগে পশ্চিমা বিশ্বকে প্রয়োজনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়ে প্রচার করা পুতিনের হুঁশিয়ারি নিয়ে সন্দেহ রয়েছে খোদ রাশিয়ায়ই। বিষয়টিকে তিনি যতটা সহজভাবে উচ্চারণ করেছেন, বাস্তবে এর প্রয়োগ তার চেয়ে জটিল। রাশিয়ার ভেতরেও প্রতিনিয়ত যুদ্ধবিরোধী প্রচারণার পাশাপাশি এত দিন ধরে যেসব ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র, তাঁরাও দীর্ঘ আট মাস ধরে চলমান যুদ্ধের ফলে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশে তাঁদের বিনিয়োগকৃত অর্থসম্পদ ভোগে নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছেন। এতে তাঁদেরও ক্ষোভ বাড়ছে পুতিনের প্রতি। যুদ্ধ যতই প্রলম্বিত হচ্ছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভের পাল্লা যেন ততই ভারী হচ্ছে। শুরুতে অনেকে ন্যাটোর সম্প্রসারণের উদ্যোগকে নেতিবাচকভাবে দেখলেও বর্তমানে ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাবস্থার সব দায় গিয়ে পড়েছে রাশিয়ার ওপর। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যুদ্ধ শুরু করে পুতিন যে ভুল করেছিলেন, বারবার তিনি যেন সেই ভুলের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছেন!
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়