
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
যতীন
ডাক্তার (ডা: যতীন্দ্র চন্দ্র দাস) এইচ.এম.বি পাশ করে প্রথমে ঢাকায় এক
হোমিওপ্যাথি ঔষদের দোকানে চাকরি নেন। তিনি দাউদকান্দি থানার ১৫নং মারুকা
ইউনিয়নের মাদলা গ্রামের অধিবাসী। তাঁর পিতা সনাতন দাস ভূমি অফিসে চাকরি
করতেন, তখনকার ম্যাট্রিকুলেশন পাশ। বড় ভাই মনীন্দ্র চন্দ্র দাস চান্দিনা
পাইলট স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক। বি.এ পাশ। হোমিওপ্যাথি ডাক্তার ছিলেন।
চান্দিনা বাজারের পশ্চিম পার্শ্বে কালী বটগাছের পাশে বাসা ও চেম্বার ছিল।
শিক্ষক হিসেবে সুনাম থাকলেও ডাক্তার হিসেবে পরিচিতি ছিল ব্যাপক। যতীন
ডাক্তার ম্যাট্রিকুলেশন পাশ। তাঁদের আরও দু’ভাই ছিল।
যতীন ডাক্তারকে
বিয়ে দেয়া হয় বরকোটা গ্রামের মিত্রবাড়ির বড় ছেলে যোগেশ মিত্রের দ্বিতীয়
কন্যার সঙ্গে। স্ত্রী মাদলা গ্রামেই থাকতেন। যতীন ডাক্তার ছুটি পেলে বাড়িতে
আসতেন। কী কারণ বিস্তারিত জানি না। এক বর্ষায় যতীন ডাক্তারের স্ত্রী গলায়
কলসী বেঁধে বাড়ির পুকুরে ডুবে আত্মহত্যা করেন। এ নিয়ে নানা কথা, নানা
কাহিনি। আমি স্কুলের উপরের শ্রেণির ছাত্র। আত্মহত্যার কথা শুনেছি, কিন্তু
সত্যিকার অর্থে কেউ আত্মহত্যা করতে পারে তা বিশ্বাস করতাম না। এই
মাদলাগ্রামের পাশ দিয়ে মামা বাড়ি যেতাম, আর ভয়ে ভয়ে যতীন ডাক্তারের বাড়ির
দিকে তাকাতাম। ভয় করত, গা শিহরিত হতো, নিজেই নিজেকে হত্যা করতে পারে, এক
অভাবনীয় অলৌকিক কাহিনী মনে ধাক্কা দিত।
যতীন ডাক্তারের সঙ্গে দেখা হয়
আমি যখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ১৯৬১খ্রি: ভর্তি হই। তিনি নানুয়া দিঘির
পূর্ব-উত্তর কোণায় চিত্ত দারোগার বাসার প্রবেশ মুখে লম্বালম্বি কেরোসিন
টিনের তরজার বেড়া দেয়া ঘরের উত্তরাংশে থাকতেন। দক্ষিণাংশে রেশনের দোকান।
যতীন ডাক্তার তাঁর কক্ষটি বেড়া দিয়ে সাজিয়ে নিয়েছেন। একপাশে তিনি ঘুমান,
ছোট অংশে রান্নার ব্যবস্থা এবং দরজার মুখে কক্ষটি তাঁর চেম্বার। স্ত্রীর
মৃত্যুর পর ঢাকায় যাননি। মৌনব্রত অবলম্বন করেছেন, কারও সঙ্গে কথা বলেন না,
রোগীরা নিজের রোগের কথা বলে যায়, তিনি কখনও লিখে কিছু জানতে চান, কত টাকা
দিতে হবে, তাও লিখে জানান। চুল-দাড়ি কাটেন না, কিন্তু পরিপাটি করে রাখেন।
সকালেই প্রাত:কৃত্য শেষ করে দিঘিতে স্নান করেন, স্নানের আগে রান্নার আয়োজন
করে ফেলেন। একসাথে চাউল-ডাল-আলু বা অন্য কিছু। লবণ-হলুদ-মরিচের গুড়া দিয়ে
একপাত্র উনুনে বসিয়ে আগুন ধীরয়ে স্নান করতে যান। তাঁর ভাষ্যানুযায়ী কে যেন
এরই মধ্যে ঘরটি লেপে একটি ছোট্ট পাত্রে লবণ ও দু’টি কাঁচামরিচ রেখে দিয়ে
যান। যতীন ডাক্তার কাঁচামরিচ খুবই পছন্দ করেন। স্নান সেরে এসে তা দেখতে
পেয়ে অবাক হতেন, এখন অভ্যাসের মধ্যে নিয়মিত হয়ে গেছে। ভেজা গামছা পরে কী
যেন তর্পণ করেন এবং চুল-দাড়ি বিন্যাস করে শুকনো কাপড় পরে খেতে বসেন। যা
রান্না হয়েছে, তার কোনটাই ফেলনা নয়। সকালে কিছুটা অংশ গরম গরম খেয়ে নেন,
বাকীটুকু দুপুরের আহার। রাত্রে মুড়ি-দুধ। এভাবেই চলছে।
প্রতি শুক্রবার
আমরা আস্তে আস্তে তাঁর চেম্বারে গিয়ে জড় হতাম এবং একটা নির্মল আড্ডার স্থান
হয়ে ওঠে। তিনি তো কথা বলেন না। আমরা অনেকটাই বেপোয়ারা। আড্ডার সদস্যরা
হলেন- আকবর হোসেন (মন্ত্রী), বক্কু সিংহের দু’শ্যালক রমেন ও বেনু দত্ত,
চুনী-ফনী দে দু’ভাই, নবাব বাড়ির সাবের আহমেদ, গুপ্ত জগন্নাথ বাড়ির উকিল
সুরেন্দ্র সাহার ছেলে শান্তিময় সাহা, অন্যজন মনমা ধর, ইউসুফ স্কুলের বিএসসি
শিক্ষক বূদেব ভট্টাচার্যের ছোট ভাই তপন ভট্টাচার্য প্রমুখ। আমি মাঝে মাঝে
উপস্থিত হতাম। আমি যাঁদের কথা উল্লেখ করেছি তাঁরা আমার সিনিয়র। ১৯৬২খ্রি:
শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্ররা আন্দোলন করে তপন
ভট্টাচার্য-অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন। তাঁর নামে হুলিয়া জারি হয়, তিনি পালিয়ে
ভারতে চলে যান। তিনি বিকম এর ছাত্র ছিলেন। তারপরও আড্ডাটা চলতে থাকে।
১৯৬৪খ্রি: ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়, ১৯৬৫খ্রি: পাক-ভারত
যুদ্ধ-আড্ডার সদস্যরাও নানাভাবে নিজেদের মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমি অনার্স
ক্লাশের ছাত্র। যতীন ডাক্তারও কখন কোথায় চলে গেছেন, কিছুই জানি না। খোঁজ
নেয়ার প্রয়োজনও বোধ করিনি।
১৯৭১খ্রি: মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি যখন আগরতলা
কৃষ্ণনগরে মেশোমশায়ের বাসায় স্ত্রীসহ আশ্রয় নিই, তখন দুর্গা চৌমোহিনীতে
রাস্তার পাশে যতীন ডাক্তার হোমিওপ্যাথি চেম্বার দিয়ে ডাক্তারি করছেন, দেখতে
পাই। প্রথমে চিন্তে পারিনি। কারণ, চুল-দাড়ি নেই, অনর্গল কথা বলেন,
চেম্বারেও বিকেল বেলায় নিখাদ আড্ডা বসে। মধ্যমনি তিনি, বক্তাও তিনি। তাঁর
বক্তৃতার বিষয়বস্তু বহুমাত্রিক, তবে সেসময় প্রধান বিষয় মুক্তিযুদ্ধ।
যতীন
ডাক্তার বক্তা হিসেবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিষয়বস্তু সত্যমিথ্যা মিশালো। তবে
মিথ্যাকে এতটা আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করলে তাৎক্ষণিভাবে বিশ্বাস না করে
উপায় থাকত না। পরে যখন এসব কথাগুলো নিয়ে ভাবতাম, তখন মানসিক দ্বন্দ্ব
সৃষ্টি হতো। যেমন-
১. আমি ১৯৭১ খ্রি: ৯ এপ্রিল ত্রিপুরা চলে যাই। আগরতলা
শহরে মাসের শেষ দিকে গিয়েছি। যতীন ডাক্তার বলছেন, বঙ্গবন্ধু আগরতলায় এসে
গেছেন। শুনে তো অবাক। জিজ্ঞেস করি- ‘কীভাবে খবর পেলেন ?’ ‘খবর কীভাবে
পেলাম, তা বড় কথা নয়, তিনজন বঙ্গবন্ধুর চেহারার ব্যক্তিকে দেখা গেছে। একজন
কুঞ্জুবনে মেলিটারি ক্যাম্পে, একজন সাম্ভ্রূম-বিলোনিয়ায় চট্টগ্রাম-নোয়াখালী
এমপিদের সঙ্গে, অন্যজন ট্রাকে করে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন-
দেখতে পাওয়া গেছে।’ ‘তিনজন কেন?’ ‘বলা তো যায় না- গোয়েন্দা আছে না? সেজন্য
আসল বঙ্গবন্ধু কোনটি- এ খবরটা ২/১ দিনের মধ্যে জানতে পারব।’ দ্বন্দ্বে পড়ে
গেলাম। বলে কি ? বঙ্গবন্ধু পালিয়ে ত্রিপুরায় এসে গেছেন ? একবার বিশ্বাস হয়,
পাঁচবার মিথ্যা বলে মনে হয়। কিন্তু মে মাসে যখন ছবিসহ বঙ্গবন্ধুকে
গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানি সৈনিক দু’জন বিমানবন্দরে একটি চেয়ারে বসিয়ে
পাহারা দিচ্ছে দেখি, সকল দ্বন্দ্ব দূর হয়ে যায়। যতীন ডাক্তারের প্রতি
বিরক্ত হই। দু’দিন পর গিয়ে যখন বললাম- ‘আপনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এ মিথ্যা
রটনা কেন করলেন ?’ নিষ্পৃহ উত্তর- ‘শরণার্থীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে
গোপনীয়ভাবে ভারত সরকারের নির্দেশ ছিল।’ এমনভাবে কথা বললেন, যেন তিনিও একজন
পরিকল্পনাকারী নীতিনির্ধারক।
২. জুনমাসের দিকে তিনি এক দীর্ঘ বক্তৃতা
দিলেন। বললেন-এখন প্রবাসী সরকারের সঙ্গে ভারত সরকারের বোঝাপড়া চলছে।
ভারত-বাংলাদেশকে যুদ্ধে সহায়তা করবে কি না বা বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র
হিসেবে শত্রুমুক্ত করবে কি না । জানতে চাইলাম- বিষয়টি বিস্তারিত বলুন, যদি
জানা থাকে। বললেন- সবকথা তো সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাবে না। বলাও ঠিক হবে না।
ভারত প্রস্তাব দিয়েছে, প্রবাসী সরকার যদি বাংলাদেশের কিছুটা অংশ ভারতকে
ছেড়ে দেয়, তাহলে বাংলাদেশকে সর্বপ্রকার সহযোগিতা করবে। কী প্রস্তাব।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে যতীন ডাক্তার বলছেন- আদি ত্রিপুরা অর্থাৎ কুমিল্লাকে
ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে এবং সিলেটকে আসামের সঙ্গে দিয়ে দেয়, তাহলে ভারত
সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। কারণ, এ যুদ্ধে ভারতেরও তো লাভক্ষতি
চিন্তা করতে হবে।’ আবার দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম। জানি, কুমিল্লা বা ১৯৪৭ খ্রি:
পর পাকিস্তানের অংশ হলেও জেলা হিসেবে ত্রিপুরাই লেখা হতো, ১৯৬০ খ্রি: পর
পাকিস্তান সরকারের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জেলা কুমিল্লা হয়ে যায়। মূলত
কুমিল্লা জেলা ত্রিপুরা রাজ্যেই একটি সমৃদ্ধ অংশ, তদ্রƒপ সিলেটও। তা কী
সম্ভব হবে? কুমিল্লা জেলা যদি ভারতের অংশ হয়ে যায়, আমি বা যতীন ডাক্তার তো
তখন ভারতবাসী হয়ে যাবো। বলে কি ? এক দোলাচল অভিযাত্রা। ভাল লাগার মধ্যে
মিশ্র অনুভূতি, অসম্ভবের মধ্যে আশার আলো, কষ্টের মধ্যে সুখানুভব। যতীন
ডাক্তারকে বললাম, আপনার কথার তো কোনো আগামাথা খুঁজে পাই না, যা
বিশ্বাসযোগ্য নয়, যা অসম্ভব তা কী করে মানবে প্রবাসী সরকার ?
যতীন
ডাক্তার বলছেন- ‘ভারত কি লাভ ক্ষতি হিসেব করবে না ? যদি না মানে, তবে
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কোনো সহায়তা করবে না ? আস্তে আস্তে মুসলমান
শরণার্থীরা দেশে চলে যাবে, প্রবাসী সরকারের সদস্যরা হয়ত যেতে পারবে না।
যুদ্ধ দীর্ঘয়াতি হবে। ভারত সরকার হিন্দু এককোটি শরণার্থীকে পুনর্বাসিত করে
দিবে।’
এমনভাবে যতীন ডাক্তার বলল, মনে হয় প্রত্যক্ষ দলিল বা ভারত
সরকারের নথিপত্রের খসড়া দেখেছে। তাহলে আমার কী হবে ? আমার চাকরি, আমার
বাবা-মাসহ ভাইবোন যারা বাংলাদেশে রয়েছে, আমার সম্পদগুলোও সঙ্গে নেই। একদম
দিশেহারা হবার উপক্রম।
এভাবে যতীন ডাক্তার ৮/১০ বছর মৌন ছিল, আর কথা বলা
যখন শুরু করেছেন, তখন তাঁর চেম্বারে তিনিই তো একমাত্র বক্তা এবং বক্তৃতার
বিষয়বস্তুর মধ্যে যে কল্পকাহিনি তা সেপ্টেম্বরে গিয়ে বুঝতে পারলাম- ‘রণে আর
রমনে মিথ্যাচারই শ্রেয়।’ যতীন ডাক্তার মিথ্যাচারের এতটা বিশ্বস্ত করে
কীভাবে উপস্থাপন করত, তাও তো একটি শিল্প (আর্ট)।
যতীন ডাক্তার স্ত্রীর
আত্মহত্যার পর বিয়ে করেননি। গেল সপ্তাহে খবর পাই ৯১ বছর বয়সে নি:সঙ্গতায় ও
বার্ধক্যে জর্জরিত হয়ে কষ্ট পেয়ে মারা গেছেন। তাঁর আত্মার শান্তিকামনা করি।
তাঁর কথা বিশেষভাবে মনে পড়ল। আসলে যতীন ডাক্তাররা সমাজের কোনো প্রতিনিধি
নয়, কিন্তু সামাজিক পরিমণ্ডলে অলংকার বিশেষ। বাঙালি স্বভাবের মধ্যে একধরনের
কল্পনা বিলাসী মানসিকতা রয়েছে তা যাপন করতে না পারলেও পালতোলা নৌকার মাঝি
হওয়া যায়। যতীন ডাক্তার এরূপ একজন মাঝি ছিলেন।
লেখক: সাহিত্যিক, গবেষক ও সাবেক অধ্যাপক
মোবাইল: ০১৭১১-৩৪১৭৩৫