ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
বাদুরতলা কমার্শিয়াল ইন্সটিটিউট কুমিল্লা ও একজন দিলীপ কুমার পাল (ভুতু)
Published : Monday, 3 October, 2022 at 12:00 AM
বাদুরতলা কমার্শিয়াল ইন্সটিটিউট কুমিল্লা ও একজন দিলীপ কুমার পাল (ভুতু)শাহজাহান চৌধুরী ।।
ঠিক ঠিক ঠিক ঠিক একটানা শব্দে এক তরুন একটা যন্ত্রের বুকে আঙ্গুল চালাচ্ছে যেন ঝড়ের গতি। এটা নাকি টাইপ রাইটার। চিত হয়ে শুয়ে একটা মানুষ যদি বিশাল হা করে উপর দিকে তাকিয়ে থাকে মনে মনে চিন্তা করলে তেমনই লাগবে। কতগুলো লোহার কাঠির উপর টুপির মতো আবার তাতে ইংরেজি এ বি সি ডি লেখা।
ক্লাশ ফোর এ পড়া কালিন টাইপ করা কাগজ দেখেছি মেশিনটা দেখিনি। শেষ পযন্ত দেখাও হলো। একদিন বাবার হাম্বার সাইকেল নিয়ে দিনের বেলা বাদুর দেখতে বাদুরতলা যাওয়ার পথে ঠিক ঠিক আওয়াজ শুনে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখলাম। বেশ বড় একটা টিনশেড ঘর তার ভেতর প্রায় গোটা ১৫ মেশিন কয়েকটি মেশিনে কিছু ছেলে কাজ করছে। তবে  তুরুনটির পেছনে একটি ছোট বোর্ডে লিখা দিলীপ কুমার পাল, এডভোকেট।  বিস্ময়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে চলে আসলাম।
তারপর বিভিন্ন সময় টাইপ এর প্রয়োজনে সেখানে গিয়েছি, বিশেষ করে “খেলাঘর” “উদীচীর” প্রয়োজনে এবং দিলীপ কুমার পাল হয়ে গেলেন প্রিয় “ভুতু” দা তার আদরের নাম। পরিচয় হলো তাঁর ছোট ভাই কুমিল্লার সামজিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রিয় জন বাবলুদার সাথে তারা ভাইবোন সবাই সাংস্কৃতিক অঙ্গনের লোক।
একসময় সাংবাদিকতা করতে যেয়ে সর্টহ্যান্ড ও টাইপ শেখার জন্য ভর্তি হয়ে গেলাম। কমার্শিয়াল ইন্সটিটিউটে তখন প্রায় ঘরের লোকই হয়ে গেলাম। আমি নাটক করি তাদের বোনরা গান করেন, শহরের সংস্কৃতি অঙ্গনে নামকরা পরিবার। তিন বোনের বড় বোন শেফালী পাল (লক্ষ্মী) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সাথে জড়িত মেঝ বোন গীতা পাল (কুট্টি) নিবদিতা বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছোটবোন মিতা পাল (ফুলু) বাখরাবাদ গ্যাস এর কর্মকর্তা ও বিশিষ্ঠ রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী ও শিক্ষক। ৪ ভাইয়ের মধ্যে ভতুদা, বাবলুদা বাবার গড়া স্কুল চালান আর দু ভাই দেশের বাইরে থাকেন।
একসময় টাইপ রাইটার আবিষ্কারে দাপ্তরিক কাজের গতি বাড়িয়ে দিয়েছিল। মানুষের দৈনন্দিন কোট কাচারীর দলিল দস্তাবেজ চাকুরীর দরখাস্ত, করতে টাইপ রাইটারের ভুমিকা বিস্ময়কর। আবার অফিস আদালতে টাইপিস্ট নিয়োগের ফলে টাইপ শেখা ছিল আবশ্যিক “কমার্শিয়াল ইন্সটিটিউট” থেকে টাইপ শিখে বৃহত্তর কুমিল্লার কত জনের জীবন বদলে গেছে।
ভুতু’দার বাবার টাইপ স্কুলের এর যাত্রা শুরু ৩০ এর দশকের প্রথম দিকে। এডভোকেট দিলীপ কুমার পাল ওরফে ভুতুদার বাবা অমর চন্দ্র পাল এর হাতে। ঢাকা সোনার গাঁয়ের পাল বংশের ছেলে অমর চন্দ্র পাল একসময় কলকতা চলে যান সেখানে তিনি চাকুরী নেন কলকাতা জর্জ টেলিগ্রাফ ইন্সটিটিউটে। সেখানেই তিনি টাইপ করা শেখেন। ১৯২৫ এর দিকে তিনি কুমিল্লা এসে ওঠেন বর্তমান দৈনিক কুমিল্লার কাগজের পেছনে একটি বাসায় এবং দুই তিনটি টইপ রাইটার নিয়ে রামঘাট এর কাছে একটি ঘরে স্কুল শুরু করেন।
কয়েক বছর পর বাদুরতলা অবনি ঘোষের বাড়ির এই যায়গা ভাড়া নিয়ে স্কুলের সূচনা করেন। ১৯৪৮ সালে সরকার থেকে অনুমোদন নিয়ে কুমিল্লা কমার্শিয়াল ইন্সটিটিউট কুমিল্লা নামে ইন্সটিটিউট খোলেন। ৪৭ এ দেশ বিভাগের সময় অবনি ঘোষ কলকাতা যাওয়ার সময় বসত ভিটাসহ যায়গাটি অমর চন্দ্র পালের কছে বিক্রি করে যান।
ভুতুদার বাবা মৃত্যুর আগে প্রতিষ্ঠানটি তাকে এবং বাবলুদাকে দিয়ে যান। ভুতুূদার টাইপ করার দক্ষতা এমন, টাইপের বিষয়টি শুনেই তিনি ঝড়ের গতিতে টাইপ করে দেন।
কম্পিউটার আসার পর অনেকেই তাকে কম্পিউটারে কাজ করতে বলেছেন কিন্তু তিনি টাইপ রাইটারেই সাচ্ছন্দ বোধ করতেন। স্কুল জীবন থেকেই তিনি টাইপ করতেন।  বিদ্যায়তনে (পরে ফরিদা বিদ্যায়তন) প্রাথমিক, ঈশ্বর পাঠশালায় মাধ্যমিক, ভিক্টোরিয়া কলেজ হতে ডিগ্রী এবং কুমিল্লা ল কলেজ হতে ওকালতি পাশ করে টাইপিং এর পশাপাশি তিনি ওকালতি করেন। তিনি একজন রোটারিয়ান।
 ছোট ভাই বাবলুর মৃত্যুর পর দিলীপ কুমার পাল (৮৪) ভেঙ্গে পড়েন ২০২২ সালে ৯০ বছর আগে বাবার হাতে গড়া ইন্সটিটিউট বন্ধ করে দেন।