ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার বন্ধ হোক
Published : Friday, 16 September, 2022 at 12:00 AM
ড. সুলতান মাহমুদ রানা ||
গত ৭ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে স্কুলছাত্র মিনহাজুল ইসলাম মিনাজ নিহত হলে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। এ বিষয়ে কয়েক দিন ধরে গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাদেশ-ভারত একে অন্যের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশের জনসাধারণকে আশ্রয়, প্রশিক্ষণ, যুদ্ধ সহায়তা দিয়েছে।
প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্রটির প্রতি বাংলাদেশের মানুষের যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সীমান্তে বাংলাদেশের নাগরিকদের হত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে। বিষয়টি আমাদের ব্যথিত করে। রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সীমান্তে হত্যা বন্ধের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিন থেকে সামনে আসছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরেও এ বিষয়ে স্পষ্ট আলাপ-আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। তবু এ বিষয়ে চূড়ান্ত সমাধানের কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান নয়।
দুই দেশের সম্পর্ক নানা দিক থেকে বেশ উষ্ণ এবং ইতিবাচক। ফলে আমাদের মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে ইতিবাচক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও এমন হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি কি সমাধানযোগ্য নয়? ২০১৮ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সীমান্ত সম্মেলনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ভারত। ওই বছর সীমান্তে হত্যা একবারে বন্ধ হয়নি, তবে উল্লেখযোগ্য হারে কমে ১৪ জনে নেমে এসেছিল। গত এক দশকের মধ্যে এই পরিসংখ্যানটিই সবচেয়ে কম।
সামান্য অজুহাতে কিংবা বিনা কারণে বাংলাদেশের নিরীহ ও নিরপরাধ ব্যক্তিদের প্রাণ হারাতে হচ্ছে, যা আমাদের দেশের সার্বভৌমত্বের গায়ে কালি লেপনের শামিল। উভয় সরকারের উচ্চ পর্যায়ে সীমান্তে মানুষ হত্যা বন্ধের সমঝোতা বারবার হলেও ভারতীয় বিএসএফ কর্তৃক বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটছে কেন?
গত জুলাইয়ে সীমান্ত সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকায় আসেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের মহাপরিচলাক পঙ্কজ কুমার সিং। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় সব ঘটনাই রাতে ঘটে এবং যেসব হতাহতের ঘটনা ঘটে তারা সবাই অপরাধী। ’ জুলাইয়ে (১৭-২১ জুলাই) ঢাকায় বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে পাঁচ দিনের সীমান্ত সম্মেলন হয়। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিপ্রধান মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ তখন বলেছিলেন, ‘বৈঠকে বাংলাদেশ সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার বিষয়ে জোর দিয়েছে। বিএসএফ এ নিয়ে একযোগে কাজ করতে রাজি। ’ ওই বৈঠকের পর আগস্টে, অর্থাৎ গত মাসেও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। ২৪ আগস্ট পঞ্চগড়ের অমরখানা সীমান্তে আবদুস সালাম নামে এক বাংলাদেশিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৩১ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিংনগর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ভেদু নামে একজন নিহত হন।

সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রত্যাশা এবং অঙ্গীকার নতুন নয়। দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ভারত এই প্রতিশ্রুতি অনেক দিন ধরেই দিয়ে আসছে। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। ওই সম্মেলনে সীমান্ত হত্যা ছাড়াও চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ, সীমান্ত অপরাধসহ অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে আছে ফেলানী। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর অনন্তপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ফেলানী মারা যায়। ফেলানীর লাশ অন্তত পাঁচ ঘণ্টা কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকে। কাঁটাতারে ঝুলে থাকা কিশোরী ফেলানীর লাশ দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছিল। তখন দাবি তোলা হয়েছিল, ফেলানী যেন সীমান্তে শেষ হত্যার ঘটনা হয়। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
ভারতের সঙ্গে চীনেরও সীমানা রয়েছে। সেখানে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করলেও গুলি ছোড়ার অনুমতি নেই। আবার পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সীমানা বিরোধে দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ পর্যন্ত হয়েছে। কিন্তু সেখানে বেসামরিক মানুষকে গুলি করে মারার ঘটনা নেই। ইউরোপের অনেক দেশেরই প্রতিবেশীর সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে। একমাত্র বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তেই এভাবে বেসামরিক মানুষকে অকাতরে মৃত্যুর ভাগ্য মেনে নিতে হয়। প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে এভাবে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকলে এই অঞ্চলে যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিরাপত্তাবলয়ের কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে, তা ব্যাহত হবে। তাই সবার আগে সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে উদ্যোগী হতে হবে। আর এই উদ্যোগ প্রতিবেশী ভারতের পক্ষ থেকেই আসতে হবে।
ভারত ও বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত সব সময়ই সংবেদনশীল হওয়ায় সব ধরনের সমস্যারও মীমাংসা হওয়া খুব জরুরি। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে নিয়মিত বৈঠক হয়। কিন্তু সমাধান না হওয়ার রহস্যটি আমাদের অজানাই থেকে যাচ্ছে। সীমান্তে হত্যা বন্ধে প্রথম যে পদক্ষেপটি গ্রহণ করা জরুরি সেটি হলো, সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করা। গত ১১ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠে সীমান্ত হত্যা নিয়ে প্রকাশিত ‘কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে’ শিরোনামে সম্পাদকীয়তে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের তাৎপর্য তুলে ধরে উল্লেখ করা হয়, ‘মাদক, অস্ত্রসহ বিভিন্ন চোরাচালান, মানবপাচারসহ অন্য সব অপরাধ কর্মকাণ্ড কিভাবে রোধ করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। সব কিছুর আগে এ বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার যে সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র (লিথাল উইপন) ব্যবহার করা হবে না। ’ এ ক্ষেত্রে ভারতের সীমান্তে দায়িত্বরত নিরাপত্তা বাহিনীর যৌক্তিক ও সহনশীল আচরণ একটি স্থায়ী ইতিবাচক সমাধানের পথ তৈরি করে দিতে পারে।

লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়