
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
ইমাম
হোসেন নামে একজন উদ্যমী যুবক সমাজ পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে ‘পাঠাগার
আন্দোলন’ নামে একটি সংগঠন চালু করেছে। তার সঙ্গে গেল ফেব্রুয়ারিতে (২০২২)
আমার পরিচয় ও আলাপ হয়। তখনই তার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে এগিয়ে যাওয়ার
পরামর্শ প্রদান করি। বিষয়টি ছিল প্রথাগত এবং তা ভুলেও যাই যথারীতি।
২৮
মে ২০২২ কুমিল্লা ধর্মসাগর পাড়ে পার্কে ইমাম হোসেন ‘নজরুল ইসলাম’ এর উপর
আলোচনা অনুষ্ঠান উপলক্ষে কতিপয় গুণিজনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, আমাকেও বলেছিল
আন্তরিকভাবে। সকলেই গিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত কারণে আমি যেতে পারিনি, এ দায়
আমার। এখানে না যাওয়ার কোনো যুক্তি চলে না। এ সূত্র ধরেই কিছু কথা বলা।
কুমিল্লা
শহরে দু’টি ঐতিহাসিক গ্রন্থাগার বা পাঠাগার রয়েছে। একটি
মহাপ্রাণ-মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের প্রতিষ্ঠিত ‘রামমালা গ্রন্থাগার’, অপরটি
‘বীরচন্দ্র গণপাঠাগার’। প্রথমটি এশিয়া বিখ্যাত, অপরটি ভারতবর্ষ বিখ্যাত। এ
দুটি গ্রন্থাগার এখন কালের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার উপকন্ঠে উপনীত। ‘রামমালা
গ্রন্থাগার’ প্রায় ধ্বংসের পথে, ‘বীরচন্দ্র গণপাঠাগার’ একটি গৃহপালিত
কমিটির মাধ্যমে দৃশ্যত চলমান, স্থবিরতাই এখন জলন্ত চিত্র। এছাড়া সরকারিভাবে
একটি গ্রন্থাগার রয়েছে শহরের উত্তরপ্রান্তে, আগ্রহী পাঠকগণ যাতায়াত করে
থাকেন, আবার দূরত্ব ও রিক্সাভাড়ার কথা ভেবে যাই যাই করেও যাওয়া হয়ে উঠে না।
এককালে শহরের মধ্যে- ‘বসন্তস্মৃতি পাঠাগার’ ছিল, কামিনীকুমার দত্তের
বাড়িতে ‘মৃণালিনী লাইব্রেরী’ ছিল, ভিক্টোরিয়া কলেজের লাইব্রেরীটিও ছিল খুবই
উন্নতমানের, সরকারি মহিলা কলেজের লাইব্রেরীটিতে বই-এর সংগ্রহ কম নয়,
শুনেছি- কুমিল্লার বার কাউন্সিল লাইব্রেরীতে আইনবিষয়ক বইও প্রচুর,
ব্যক্তিগত পড়াশোনার জন্য নিজস্ব লাইব্রেরী গড়ে উঠেছে কয়েকটি, এগুলো নিজেদের
প্রয়োজনের জন্য, সর্বজনীন নয়। কিন্তু স্কুলসমূহে লাইব্রেরীর পরিচিত্র
কিরূপ তা জানা নেই।
তাই এই অবক্ষয় থেকে উত্তরণের জন্য ইমাম হোসেন একটি
ইতিবাচক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে চলেছে। তবে যে কথাটি বলতে হয়- তাহলো
বর্তমানে কেউ কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নেয় না, নিতে চায় না। ঘরপোড়া
গরু বা দই মনে করে চুন খেয়ে অনেকক্ষেত্রে হতাশ হতে হয়েছে। এজন্য এখন কোনো
বিষয়টিও সহজভাবে গ্রহণ করতে পারি না। মানছি- এটা আমার মনের চিন্তার
সংকীর্ণতা।
একটি ঘটনা দিয়ে আমার অভিপ্রায়টি ব্যাখ্যা করতে চাই।
বিংশশতাব্দীর ষাটের দশকে জনাব সাইফুর রহমান জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন।
তিনি একবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের বিদায় উপলক্ষে মিলাদে আয়োজন করেন
এবং তাঁর শিক্ষক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ছাত্রদের জন্য
মিলাদের নিয়ে আসেন। যথারীতি মিলাদপর্ব শেষ হয়েছে, খাওয়া-দাওয়া হয়েছে। ড.
মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বিদায় পর্ব। তাঁকে গাড়ি করে বাসায় পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া
হচ্ছে, তখন তিনি অধ্যক্ষ সাইদুর রহমানকে বললেন- ‘সাইদুর, তোমার সবকিছু
ভালো। কিন্তু কলেজে কোনো মসজিদ দেখলাম না। তুমি একটি মসজিদ নির্মাণ করো।’
অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান বলছেন- ‘স্যার, তা সম্ভব নয়। যাঁরা কলেজটি করেছেন,
তাঁরা কিন্তু কোনো মন্দির নির্মাণ করেননি।’ এই অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান যখন
কলিকাতায় বেকার হোস্টেলের সুপার, সেখানে বঙ্গবন্ধু থাকতেন ও ইসলামিয়া কলেজে
পড়াশোনা করতেন। বঙ্গবন্ধুর উপর তাঁর প্রভাব এতটাই পড়েছিল, বাংলাদেশ
স্বাধীন হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু যখন যোগ্য ও সৎলোক খুঁজে
পাচ্ছিলেন না, তখনই অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান-এর সঙ্গে দেখা করে অনুরোধ
করেছিলেন- ‘স্যার, আমাকে একশত ভালোলোকের নাম বলুন, আমার তাঁদের দরকার’।
আমরা
জানি- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো ধর্মীয় উপাসনার মতো একটি পবিত্র অসাম্রদায়িক
প্রতিষ্ঠান। এখানে কোনো জাতি ভেদ নেই, ধর্মের বাড়াবাড়ি নেই, পড়াশোনায় কোনো
সাম্প্রদায়িকতা নেই, প্রতিজন শিক্ষক, তিনি যে ধর্মেরই অনুসারী হোন না কেন
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি সর্বজনীন ইমাম। ছোটবেলায় আমরা কোনোদিন জুতা পরে
স্কুলে যাইনি, জুতাই বা কয়জনের ছিল ? জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শিক্ষকদের
পা ছুঁয়ে প্রণাম বা সালাম করেছি, এখন সেসময়ের শিক্ষক দেখলে তা-ই করি।
৫০
বছর আগে আমাদের দেশে যত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল তার সিংহভাগের প্রতিষ্ঠাতা
কোনো না কোনো হিন্দু দানশীল ব্যক্তির। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য যেমন
অবকাঠামো নির্মাণ করে দিয়েছেন, খেলাধুলার জন্য মাঠ, সাঁতার কাঠার জন্য
পুকুর এবং জ্ঞানচর্চার জন্য একটি লাইব্রেরী বা পাঠাগারও স্থাপন করে
দিয়েছেন। এখনকার চিত্রটি ভয়াবহভাবে ব্যতিক্রম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের
দালানগুলো নান্দনিকভাবে সাজানো, খেলাধুলার জন্য মাঠ নেই, সাঁতার কাটার জন্য
পুকুর বা দিঘি নেই, জ্ঞানচর্চার জন্য কোনো লাইব্রেরীও নেই।
প্রতিটি
সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, শপিংমলে পৃথকভাবে উপাসনা করার জন্য স্থান
নির্ধারণ করা রয়েছে। এতে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো আপত্তি নেই। যত ধর্মচর্চা
হবে, তত শুদ্ধ মানুষ সমাজে বসবাস করবে- আমরা সুস্থ পরিবেশে
উদার-ব্যক্তিদের সান্নিধ্য পেয়ে আলোকিত হবো-এটাই বাঞ্ছনীয় বলে জানি-মানি।
কিন্তু আমার বক্তব্য স্পষ্ট। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনটি জরুরি ?
পাঠকক্ষ-পাঠাগার-খেলাধুলার মাঠ-সাঁতার কাটার পুকুর, না উপাসনালয় ? শিক্ষক
ছিলাম, সেজন্যই হয়ত দৃষ্টিভঙ্গিটা সংকীর্ণ। আমি তো মনেপ্রাণে
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই অকৃত্রিম উপাসনালয় বলে জেনে আসছি। ইমামতি করেছি-
জাতি-ধর্ম-বর্ণ সমৃদ্ধ ছাত্রদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে। কেউ তো শিক্ষকতাকালীন এবং
অবসরের বিশবছর পরও এই অখ্যাত ইমামকে অশ্রদ্ধা করেনি, করছে না। এই গর্বে
আমি যুগপুরুষ মহাজন। আমার ছাত্র/ছাত্রী শুধুমাত্র একটি পরিচয়েই আমাকে
পূর্ণতা দিয়েছে। এ প্রাপ্তি অপার আনন্দের অধিষ্ঠান। তার কোনো ইতি নেই, তার
বিপক্ষে কোনো যুক্তি নেই। এতসব কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে একজন ইমাম হোসেনকে
লক্ষ্য করে।
কেন পাঠাগার আন্দোলন, এই আন্দোলনের মাধ্যমে যদি সমাজ
পরিবর্তন করার ইচ্ছা বা বাসনা থেকে থাকে, তবে পৃথক কোনো প্রতিষ্ঠান
স্থাপনের প্রয়োজন আছে কি ? আমি তা মনে করি না। আজ যদি পাঠাগার আন্দোলনের
মাধ্যমে কেউ সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখতে চান, তাহলে নতুন প্রজন্মকে সেভাবে
প্রস্তুত করতে হবে এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে পাঠাগার রয়েছে বা না
থাকলে উদ্যোগ নিয়ে নতুন পাঠাগার স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা ও সহায়তা
নিয়ে এ আন্দোলনকে সহজভাবে এগিয়ে নেয়া যেতে পারে। কাজটি অনেকটা সহজ, আবার
খুবই কঠিন। কঠিন হলো প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছা ও সহযোগিতা। সমাজ বদলের জন্য
যারা নিবেদিত হতে চান, তাদের তা অতিক্রম করতে হবে লজ্জা-ঘৃণা-ভয়কে জয় করেই।
একটি পাঠাগার স্থাপন করতে হলে সুবিধাজনক স্থানে জমির দরকার, অবকাঠামো
দরকার, আসবাবপত্র দরকার, জ্ঞানচর্চার জন্য নানা প্রকার বই এর দরকার এবং
বইপড়ার জন্য সময় ও আগ্রহ থাকা দরকার। কাজেই পাঠাগার আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজ
পাল্টাতে গেলে উপর্যুক্ত ব্যবস্থাপনার জন্য অঢেল অর্থের দরকার, আর এসব
পাঠাগারে নানা বয়সী লোকের সমাগম হলে অভ্যস্ত জীবনের প্রতিফলন ঘটতে থাকলে
তখন পাঠাগার হয়ে যাবে আড্ডাখানা, বিনোদনের জায়গা। এখানে রাজনীতিচর্চা,
সামাজিক সমস্যার মীমাংসা ক্ষেত্র এবং ধর্মচর্চার বিষয়গুলো প্রাধান্য পেতে
থাকবে এবং একসময় পক্ষ-বিপক্ষের দলাদলি শুরু হয়ে যাবে, আধিপত্য বিস্তারের
জন্য ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে। অথচ প্রতিটি শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানে আবিশ্যিক একটি গ্রন্থাগার বা পাঠাগার থাকার কথা এবং প্রতি বছর
বই ক্রয়ের জন্য বাজেটও থাকে। এক্ষেত্রে পাঠাগার আন্দোলনের কর্মক্ষেত্রটি
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে পারলে কোমলমতি ছাত্র/ছাত্রীদের
আগামীর জন্য হবে সমাজ বদলের প্রাণকেন্দ্র। তাতে সমাজ পরিশুদ্ধ হবে, মানবিক
বুদ্ধির বিকাশ ঘটবে, অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা
রাখতে পারবে। রাজনীতি হবে স্বচ্ছ, মন হবে উদার ও সহানুভূতিশীল, দৃষ্টিভঙ্গি
হবে সুদূরপ্রসারী। কাজেই ইমাম হোসেনের পাঠাগার আন্দোলনের যে প্রক্রিয়া বা
অভিযাত্রা, তা আমার কাছে এক অসম্ভব যাত্রা বলে মনে হয়েছে।
আমি
স্পষ্টভাবে বলতে চাই, যে কোনো আন্দোলনের ইতিবাচক উপকরণ যদি মানুষ কেন্দ্রিক
হয়, তবে কর্মপ্রবাহ হবে স্বচ্ছ, যুযোগপযোগী, নির্মোহমূলক এবং মালিন্যহীন।
কাজটি সহজ নয়, তবে করার জন্য সংগ্রাম করে জয়ী হলে আমরা তাকে স্যালুট
জানাব। এ বিষয়টি ইমাম হোসেন ভেবে দেখতে পারে। সমাজ বদলের জন্য প্রতিটি
রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা থাকে, পেছনে থাকে ক্ষমতাবান হওয়ার আকাক্সক্ষা। ফলে
ত্যাগের বিষয়টি ঝাপসা হয়ে যায়। আমি বা আমরা কতটা সংগ্রাম করতে পারব, কতটা
সমাজকে বদল করতে পারব, মানবকল্যাণে অঙ্গীকারগুলো কতটা প্রতিফলন ঘটাতে পারব,
সহযোগীরা কতটা পথ চলতে আগ্রহী ইত্যাদি বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে
এগুতে হবে। সবক্ষেত্রে টাকা দিয়ে হয় না, মনোবল ও কর্মপরিকল্পনায় স্বচ্ছতাই
মূলধন হিসেবে একটি শুভ উদ্যোগকে সঠিক লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারে। যারা এককাজটি
শুরু করেন, তারা হয়ত সুফলটা দেখে যেতে নাও পারেন, গাছ লাগালেই ফল পাওয়া
যায় না। অপেক্ষা করতে হয়, পরিচর্যা করতে হয়, ঝড়-বৃষ্টি-তুফান থেকে রক্ষাও
করতে হয়, তবেই গাছের ফল ভোগ করা যায়। এ ফলের ভাগীদার একক কেউ নয়, গাছের
মালিকও নয়। আমি আশাবাদী একজন সাধারণ মানুষ, হতাশা আমাকে ম্রিয়মান করে না,
তবে ধৈর্যটা একটু কম। তারপরও সমাজ পরিবর্তন হয়ে উদার জ্ঞানভিত্তিক
অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ে উঠুক-এ আমার প্রত্যাশা।
লেখক: সাহিত্যিক, গবেষক ও সাবেক অধ্যাপক
মোবাইল: ০১৭১১-৩৪১৭৩৫