শ্রীলঙ্কা কত দিন এভাবে তারা উৎসব করতে পারেনি...
Published : Tuesday, 13 September, 2022 at 12:00 AM
হতে পারে তাদের রাজকোষে শূন্য লক্ষ্মীর হাহাকার, হতে পারে তাদের রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিশ্বাস-অবিশ্বাস্যের সংকট প্রকট। গেল কয়েক মাসে 'শ্রীলঙ্কা' মানেই যেন শুধু তলিয়ে যাওয়ার গল্প! তাদেরও যে ঐশ্বর্য রয়েছে, তাদেরও যে লড়াই করার মন রয়েছে, তা বোধহয় দেখিয়ে দিল 'ক্রিকেট'। দুবাইয়ে এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের হৃদয় ভেঙে চ্যাম্পিয়ন হলো শ্রীলঙ্কা। ২৩ রানের এই জয়ে শুধু মরুর মুকুটই উঠল না তাদের মাথায়, পকেটেও এলো ২০ লাখ মার্কিন ডলারের অর্থ পুরস্কার। দুঃসময়ে এর মূল্যই বা কম কি !
এই ডলার নেই বলেই তো নিজেদের দেশের এশিয়া কাপ ছেড়ে দিতে হয়েছে আরব আমিরাতে। বিদেশি সব দল খেলতে যাবে, তাদের গাড়িতে জ্বালানি দিতে পারবে না বলেই তো দুবাইয়ে গিয়ে অতিথি হয়ে নামতে হয়েছে লঙ্কান দলকে। বঞ্চিতের ভেতরে জমে থাকা সব অপূর্ণতাই যেন পূর্ণতা পেল এই ট্রফি জিতে। মহেন্দ্র আর গোটাবায়ার মতো সব 'রাজাপাকসে'ই যে লঙ্কানদের জন্য দুর্ভাগ্য না, তা এ দিন বোধহয় সবাইকে দেখিয়ে দিলেন হার্ডহিটার ভানুকা রাজাপাকসে। চাপের মুখে ভেঙে পড়া নয়, বিস্ফোরিত হতে হয়- মনের এই বলই ষষ্ঠবারের মতো এশিয়ার সেরার স্বীকৃতি দিল শ্রীলঙ্কাকে।
ভানুকা রাজাপাকসে, ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা, মাধুশঙ্কাদের নিয়ে গড়া এক সাহসী-লড়াকু শ্রীলঙ্কাকেই যেন দেখল এবারের এশিয়া কাপ। মনে করিয়ে দিল নব্বই দশকের জয়সুরিয়া, কালুভিথারানা, রানাতুঙ্গাদের সেই দলটিকেই। যাঁরা হারার আগে কখনোই হার মানত না ! শানাকাদের এই দলটিও তেমনই। তা নাহলে ৫৮ রানে টপ অর্ডারের পাঁচ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর দলের স্কোর ১৭০ রানে পৌঁছাত না।
শুরুতে পাকিস্তানি পেসার নাসিম শাহ আর হারিস রউফের যে গতি, যে সুইং, যে আগ্রাসন, তার সামনে মাথা না ঝুঁকিয়ে চার-ছক্কা মারার মতো বুকের পাটা খুব বেশি থাকে না। ঘণ্টায় ১৫১ কিলোমিটার, মাইলের হিসাবে ১৯৪। এই গতিতেই এদিন বোলিং করে গেছেন রউফ। ঘণ্টায় ১৪২ কিলোমিটারে ছুটেছেন নাসিম শাহ, হাসনাইন কিছুটা কমে ১৩৮ কিলোমিটার। পাকিস্তানের এই পেসত্রয়ী এ দিন শুরুতেই যেন তপ্ত দুবাইকে জ্বলন্ত উনুন বানিয়ে নেন।
গতির এই ঝড়ের সঙ্গে বাতাসের মতো সুইং- ফর্মে থাকা লঙ্কান ওপেনার কুশল মেন্ডিস প্রথম বল সামলে গিয়েই বোল্ড হয়ে যান। গুনাতিলাকা শূন্য রানে রউফের বলে বোল্ড হয়ে যান তেমনই এক ইন সুইংয়ে। সাহসী যোদ্ধার মতোই তলোয়ারের সামনে ঢাল না নিয়ে পাল্টা তলোয়ার চালিয়ে যায় এরপর লঙ্কানরা। আর কে না জানে সাহসীদের সঙ্গে ভাগ্যও সহায় হয়। শুরু হয় লঙ্কানদের প্রতিরোধ, ৫৮ রান তুলতে যেখানে ৭ বাউন্ডারি হাঁকিয়েছিল লঙ্কানরা। পরের ১২ ওভারে সেখানে পাঁচ ছক্কা আর ৯ চার।
আইপিএলে ফর্মের তুঙ্গে থাকা লঙ্কান দুই ব্যাটার ভানুকা রাজাপাকসে আর হাসারাঙ্গার চালিয়ে খেলার সেই সেশনে কিছুটা যেন ঘাবড়ে গিয়েছিলেন পাকিস্তানি বোলাররা। চাপে থাকা কোনো দল যে এভাবে বাউন্ডারি হাঁকাতে পারে তা যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না সাদাব খানদের। অনেকটা হতবিহ্বল ফিল্ডাররা তাই কিছু ভুল করে বসেন মাঝের ওভারগুলোতে। ষষ্ঠ উইকেটে রাজাপাকসে আর হাসারাঙ্গার জুটি থেকে ৩৬ বলে ৫৮ রান আসার পর কিছুটা সময় ম্যাচে ফিরে পাকিস্তানি বোলাররা। কিন্তু ফিল্ডারদের ক্যাচ মিস ভুগিয়েছিল তখন রউফ-নাসিমদের। দুটি জীবন পেয়ে রাজাপাকসে শেষ পাঁচ ওভারে ১৮০ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট চালিয়েছেন। ইনিংসের শেষ বলটিতেও ছক্কা হাঁকিয়েছেন, তাঁর ৪৫ বলে ৭১ রানের ইনিংসটির মধ্যে লঙ্কানরা খুঁজে পেয়েছিল লড়াইয়ের পুঁজি।
এশিয়া কাপের শিরোপা উৎসব করবে পতাকা নিয়ে বাইকে রাস্তায় নেমে পড়েছেন ভক্তরা। ছবি: এএফপি
সেই পুঁজি ভাঙতে হয়নি শ্রীলঙ্কাকে। বল হাতে ইনিংসের প্রথম ওভারটিতে ওয়াইড-নো মিলিয়ে মোট ১০টি বল করেন মাধুশঙ্কা। বছর একুশের এই তরুণ পেসার যে প্রচণ্ড চাপের মুখে ছিলেন, তা ওই ওভারেই পরিস্কার হয়ে যায়। লঙ্কান দিকে বাতাস ঘুরে যায় ইনিংসের চতুর্থ ওভারে। মাধুশানের লেগ সাইড দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া বলটি খেলতে গিয়ে বাবর আজম শর্টফাইন লেগে ক্যাচ তুলে দেন মাধুশঙ্কার হাতে। অবশ্য ক্যাচ তুলে দেন বলাটি বোধ হয় ঠিক হবে না, ক্যাচটি দুর্দান্তভাবে তালুবন্দি করে নেন ফিল্ডার। পরের বলটিতে বোল্ড হয়ে যান ফখর জামান। ঠিক এখানেই প্রথম ধাক্কাটি খায় পাকিস্তান।
ম্যাচটি যে জিতেই যাবে- সেই তর্ক থেকে দূরে সরতে থাকেন তাদের সমর্থকরা। ভরসা ছিল রিজওয়ান। ৪৯ বলে ৫৫ রানও করেন তিনি। কিন্তু রিজওয়ানের ব্যাপারে একটি বদনাম বেশ পুরোনো- দলের প্রয়োজন অনুযায়ী স্ট্রাইকরেট তুলতে পারেন না। তা ছাড়া নিজেকে শতভাগ ফিটও দাবি করতে পারবেন না তিনি। তাই ৩০ বলে ৭০ রানের দরকার যখন তখন হাঁসফাঁস করতে করতেই আউট হয়ে যান রিজওয়ান। এরপর তো সবই তাসের ঘর। ৯৩ থেকে ১২২ রানের মধ্যে একে একে মাথানত হয়ে যায় ইফতেখার, নেওয়াজ, রিজওয়ান, আসিফ আর খুশদিল।
দুবাইয়ের গোটা গ্যালারির চাঁদতারায় তখন নীরবতা। নিশ্চিত কলম্বোয় তখন আনন্দের সাগরে, কতদিন হয়তো এভাবে তারা উৎসব করতে পারেনি।