
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
আমার নামটি উচ্চারণ করলেই তার বহুমাত্রিক পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন- প্রথমেই বুঝা যায় যে আমি সৃষ্টি-বৈচিত্র্যে ‘মানুষ’ নামে পরিচিত। আমার আকৃতিই প্রাথমিকভাবে সাক্ষ্য দেয়। নামটি উচ্চরণের সাথে সাথে ধরে নেয়া যায়, আমি ভারতবর্ষ তথা এই উপমহাদেশের কোনো না কোনো অংশের অধিবাসী। এ অর্থে আমি নামের কারণে ‘বাঙালি’ সম্প্রদায় বিশিষ্ট বাংলাদেশের নাগরিক। বাংলাদেশে বাঙালি সম্প্রদায় বাস করলেও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আমি যে সনাতনপন্থী হিন্দু তা বুঝতে অসুবিধা হয়না। প্রসঙ্গত বলতে হয় আমার নাম ‘শান্তিরঞ্জন ভৌমিক’, অনেকই ‘শান্তি’ বলে সম্বোধন করে। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে কেউ শান্তিবাবু, শান্তিস্যার (যেহেতু শিক্ষকতা করেছি), শুধু শান্তি (জ্যেষ্ঠজন বা গুরুজন) সম্বোধন করেন। আবার কেউ নামটি বিকৃত করে শাইন্ত্যা, শানু, শোনো- এ নামেও ছোটবেলায় সম্বোধন করতে শুনেছি। লেখাপড়া করে যখন সমাজের একশ্রেণির মান্যগণ্যদের কাতারে চলে আসি, কলেজে চাকরি করার বদৌলতে আর কেউ নামটি বিকৃত করে উচ্চরণ করে না। বলতে হয়- ‘শান্তি’ নামটি বা শব্দটি উভয় লিঙ্গবাচক। সেজন্য আমি যেহেতু পুরুষকুলের সেজন্য শুদ্ধ নাম হলো ‘শান্তিরঞ্জন’। তখন আমি যে একজন পুরুষমানুষ তা বুঝা যায়। ‘ভৌমিক’ পদবীটি অপ্রয়োজনীয় একটি মূল্যহীন পাথর বিশেষ। হিন্দুদের বর্ণ বিন্যাসে বা নির্ধারণে কে কোন সম্প্রদায়ের তা নির্ণয় করার অভিপ্রায়ে একসময়ে তথাকথিত কুলীনরা বিভাজনের সুবিধার্থে বর্ণপ্রথা প্রবর্তন করে হিন্দুদের জাত-পাত নির্দেশ করার জন্য কাল্পনিক পদবী সৃষ্টি করে এ প্রথা প্রচলন করে। একসময় একটি সামজিক অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হতো। এখন যে কেউ তার সুবিধার জন্য যে কোনো পদবী গ্রহণ করতে পারে। সুতরাং পদবী বিষয়টি এখন আর তেমন গুরুত্ব বহন করে না। কেবলমাত্র মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ব্যতিক্রম। বিয়ের আগে পিতার পদবী ব্যবহার করে, বিয়ের পর স্বামী নামক অপরিচিত ব্যক্তিটির সবকিছুই অনুসরণ করতে হয়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় আছে-
‘বাসা বদল গোত্র বদল
বদল হলো পদবী
এক নিমিষে মুছে গেলো
মেয়ে বেলাকার ছবি।’
জলের রং নেই, নেই কোনো আকৃতি। তাই যে পাত্রে জল ধারিত হয়, সে পাত্রের রংই তার রং, একটি পাত্রের আকৃতিই জলের আকৃতি। অবিকল সমাজে একজন নারী বা মেয়ের জীবন পরিক্রমার মতো। অবশ্যই তা অমানবিক। কাজেই হিন্দুদের নামের পরে যে পদবী ব্যবহার করা হয়, তা গোঁদের উপর বিষফোঁড়া। ত্যাগ করাই শ্রেয় এবং সামাজিকভাবে দায়মুক্তি হিসেবে বিবেচ্য। আমার আবেদনে মৌখিক সমর্থন জানালেও সংস্কারে উত্তরণ ঘটাতে কেউ আগ্রহবোধ করে না। গ্রামে বাড়ি নির্ধারিত হতো- সরকার বাড়ি, ভূইয়াবাড়ি, মিত্রবাড়ি, চৌধুরীবাড়ি ইত্যাদি। এখন নানা কারণেই এ পরিচিতির অবলুপ্তি ঘটেছে। এখন বলে মাস্টারবাড়ি, মন্ত্রির বাড়ি, চেয়ারম্যানের বাড়ি। তাও আর থাকছে না।
আমার নামটি উচ্চরণ করলে সহজেই বুঝা যায়- আমি একজন হিন্দু বা হিন্দুপরিবারের সন্তান। এটা অনেকটা ধর্মভিত্তিক পরিচয়। হিন্দুপরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি বলেই স্বাভাবিকভাবে এ পরিচয়। কিন্তু আমি কতটা হিন্দু হয়েছি, তার কোনো বিচার বিশ্লেষণ নেই। হিন্দুপরিবারের কতগুলো আচার-অনুষ্ঠান-সংস্কার এবং বিশ্বাস রয়েছে, তা এখন প্রথাগত। এর বাইরে কেউ যেতে চায় না, তাকে আঁকড়িয়ে ধরে থাকতে ভালো লাগে, ধারাবাহিকভাবে পরম্পরা যে ধারা চলে আসছে, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা কি তাও তলিয়ে দেখে না। কাজেই হিন্দু যে ধর্ম পালন করে, তা-ই হিন্দুধর্ম। এভাবেই প্রতিটি ধর্মের মৌলিক বিশ্বাস অন্ধানুকরণে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।
প্রতিটি মানুষ পৃথিবীতে বাসযোগ্য পরিবেশে জীবনযাপন করতে চায়। এজন্য সুপ্রাচীনকাল থেকে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের অভিজ্ঞতায় কতগুলো নীতি-আদর্শ বা প্রবর্তন করা হয়েছে। যেমন বলতে পারি- সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, শিক্ষানীতি, স্বাস্থ্যনীতি এবং ধর্মনীতি। প্রতিটির উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীতে মানবগোষ্ঠী যেন সুন্দরভাবে সহনশীল পরিবেশে বন্ধুভাবাপন্ন হয়ে বসবাস করতে পারে। এর মধ্যে দেখা যায়- সমাজনীতি ও ধর্মনীতি কোনো একসময় অতি কাছাকাছি চলে এসেছে এবং একসময় ধর্মনীতি প্রাধান্য বিস্তার লাভে তৎপর হয়ে সমাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। ফলে আজ সমাজনীতি ও ধর্মনীতি একাকার হয়ে গেছে। দু’নীতি যখন একত্রিত হয়ে জোরদার হলো, তখন রাষ্ট্রনীতির উপর প্রভাব বিস্তার ঘটাতে তৎপর হলো। মানুষ যে কোনো কারণেই ধর্মনীতিকে সমীহ করে, মান্য করে, যুক্তিহীন আত্মসমর্পণ করে নিজেদের বুদ্ধিমত্তাকে প্রদমিত করে রাখে। ফলে রাষ্ট্রনীতি তখন স্বাধীনভাবে জনকল্যাণে নিজেকে তেমনভাবে উৎসর্গ করতে পারে না। যেহেতু ধর্মীয় মতবাদ বা বিশ্বাসে বিভাজন রয়েছে, তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘিষ্ঠের বিষয়টি জগদ্দল পাথরের মতো সামনে এসে দাঁড়ায়। মানুষ যতই বুদ্ধিমান, জ্ঞানী, হৃদয়বান, উদার হোন না কেন ধর্মীয় নীতির উপস্থিতির ফলে ম্রিয়মান হয়ে পড়েন। লাভ-ক্ষতির বিষয়টি তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এই হিসেবের কাছে সত্যিকার অর্থে মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে। দ্বন্দ্বটা সৃষ্টি হয় প্রাধান্য বিস্তারে, পরিচয়টা তখন সমাজপতি বা রাষ্ট্রপতির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে না, থাকতে পারে না। তখন তাকে পরীক্ষা দিতে হয়, সে বা তিনি কতটা ধার্মিক। এক্ষেত্রে হূমায়ুন আজাদের কথা মনে পড়ে গেলো। তিনি লিখেছেন- ‘যিনি বা যারা মসজিদ ভাঙে, তারা দাবি করে তারা ধার্মিক। আবার যারা মন্দির বা দেবালয় ভাঙে, তারাও দাবি করে তারা ধার্মিক। আর যারা ভাঙাভাঙির মধ্যে নেই, তাদেরকে ঐ দু’শ্রেণির লোকেরা বলে নাস্তিক।’ যেহেতু এখন সকলেই ধার্মিক হতে চায়, সেজন্য নাস্তিকের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমে গেছে, যাচ্ছে।
এই পরিক্রমায় ধর্মীয় আধিপত্যের কারণে আমাদের বাংলাদেশ এখন এক মহা সংকটের মধ্যে আটকে গেছে। যেহেতু বাংলাদেশের অধিকাংশ অর্থাৎ ৯০% অধিবাসী মুসলমান, তারা নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে দাবি করে, মনে করে এবং এ শক্তিতে শক্তিশালী। আর অন্য ধর্মাবলম্বীরা হলো সংখ্যালঘু। ১৯৭২খ্রি: পবিত্র সংবিধানে এরূপ কোনো বিভাজন ছিল না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সংবিধানের শিরোদেশে জিয়া সরকার ‘বিসমিল্লাহ’ এবং এরশাদ সরকার ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ সংযোজন করে একটি মাত্র বার্তা বাংলাদেশের জনগণকে জানান দেয় যে, বাংলাদেশ কেবলমাত্র মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের, অন্যদের জন্য নয়। অথচ...
বাংলাদেশ একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে জন্মলাভ করেছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও নামে নয়মাস বাঙালি ৩০ লক্ষ প্রাণদান করে তিনলক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে দেশটি স্বাধীন করেছে পঞ্চাশ বছর আগে। তখন কেবলমাত্র যুদ্ধ করেছিল বাঙালি- তাদের পরিচয় তখন ধর্মভিত্তিক ছিল না। এক জাতি এক দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ। তাই ৭১ এর সংবিধানে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হলো- বাংলাদেশের মালিক জনগণ, বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা-বাংলা, জাতীয়তাবাদ হিসেবে পরিচিতি হলো- ‘আমরা সবাই বাঙালি’। রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে কোনো অবস্থায় ধর্ম প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।
ধর্মের নামে কোনো রাজনীতি করা যাবে না। পাকিস্তান আমলের ধর্মভিত্তিক সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হলো। ধর্ম পালন করা হবে ব্যক্তিগতভাবে, তাতে রাষ্ট্র বাধা দিবে না। ধর্ম নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি চলবে না। সংবিধানে ব্যাখ্যাসহ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ নামক স্তম্ভটিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা হলো। এই পরিক্রমার ছেদ বা অবসারণ ঘটল ১৯৭৫খ্রি: ১৫ আগস্টের পর বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নিধন করে। আমাদের স্পষ্ট মনে থাকার কথা। বঙ্গবন্ধু যখন ১৯৭২খ্রি: ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে মুক্তমানুষ হয়ে লন্ডন ও দিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে মহানায়কের মর্যাদায় বিমান থেকে বাংলার মাটিতে পা রাখলেন, লক্ষ লক্ষ জনতা ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে অভ্যর্থনা জানাল, এই অভূতপূর্ব মুহূর্তের প্রতি সেকেন্ড/মিনিট আজও স্মরণযোগ্য গৌরবদীপ্তি অভিযাত্রা হিসেবে জাজ্বল্যমান হয়ে আছে মানুষের মনে। এই মহামানব মহানায়ক বাঙালি জাতির ত্রাণকর্তা রমনার রেইসকোর্সে জনসমুদ্রে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন- ‘কবিগুরু, আপনি একদিন বলেছিলেন- রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি। আজ দেখে যান- আপনার সেদিনের কথা মিথ্যা প্রমাণিত করে বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে। বাঙালি আজ স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’ এই স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক আমি। আমি বিংশ শতাব্দীতে পঞ্চাশের দশক দেখেছি, ষাটের দশক উদযাপন করেছি, ১৯৭০খ্রি: গণতান্ত্রিক রায়ে বাঙালির অধিকার আদায়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ভোটের মাধ্যমে রায় প্রদান করেছি। ১৯৭১ খ্রি: মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও মননে-বিশ্বাসে-চেতনায় মুক্তিযুদ্ধকে অকুন্ঠ সমর্থন জানিয়ে গৌরবান্বিত হয়েছি। মুক্তিযুদ্ধকালীন ও স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বুক উঁচু করে উচ্চারণ করেছি- আমি বাঙালি, বাংলাদেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ আমার মাতৃভূমি-জন্মভূমি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে, আমাদেরকে এই অধিকার দিয়েছেন চিরকালের জন্য।
এই বাংলাদেশে ৫০ বছরের মধ্যে ৪৬ বছর আমাকে শুনতে হচ্ছে, আমি বাঙালি নই, আমি হিন্দু। বাংলাদেশ শুধুমাত্র মুসলমানদের, অন্যদের নয়। আমরা সংখ্যালঘু। আজন্ম যাদের সঙ্গে জীবন কাটালাম, তারা আমাকে চিনে না, আমিও এখন চিনতে পারছি না। তাহলে আমার গন্তব্য কোথায় ?
আপন মনে হাঁটছিলাম। পেছন থেকে অবিকল বঙ্গবন্ধুর দরাজগলায় একজন বলছেন-
যাচ্ছ কোথায় ?
ভয়ে পিছন ফিরে তাকাই না। কাকতাড়ুয়ার ভয়ে এমনিতেই আতংকগ্রস্ত।
বলছি- ‘জানি না।’
‘আমার তো মনে হয়, ভয়ে-আতংকে পালাচ্ছ’,
কী বলব বুঝতে পারি না। বলছি-‘অনেকটা তা-ই’।
‘কেন ? বাংলাদেশ কি তোমার দেশ নয়, তোমার জন্মভূমি নয়, তুমি কি বাঙালি নও।’
‘একদিন-অনেকদিন তা-ই ভাবতাম। এভাবেই যাপন করতাম। এখন মনে হচ্ছে বাংলাদেশ আমার নয়, আমি বাঙালি ছিলাম, এখন হিন্দু হয়ে গেছি’।
‘এটা তোমার ভুল ধারণা। বলি, বঙ্গবন্ধু কি কোনোদিন বাংলাদেশের মানুষদের বাঙালি ভিন্ন অন্যভাবে দেখতেন ? তিনি বলেন নাই-
‘আমি যদি ভুলে যাই আমি বাঙালি, সেদিন আমি শেষ হয়ে যাবো, আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার দেশ, বাংলার মাটি আমার প্রাণের মাটি, বাংলার মাটিতে আমি মরবো।’
‘একথা কি বলেন নি ? তিনি কি বাংলাদেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন কোথাও। তাঁর রক্ত তো বাংলাদেশের মাটিতে মিশে আছে, প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে তিনি জাগরুক আছেন। ভয় পাচ্ছ কেন?’
‘ভয় পাই, মরতে চাই না বলে, কোথায় গেলে প্রাণে বাঁচতে পারব, কোথায় গেলে নির্ভয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারব-এজন্যই ঘর থেকে বের হয়েছি। কিন্তু কোথায় যাব, তা তো জানি না।’
‘শুধু বাঁচার জন্য ভয়ে ভয়ে যাত্রা। বলি-বাংলাদেশ কি তোমার দেশ নয়, জন্মভূমি ছেড়ে কোথায় গিয়ে নির্ভয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারবে ? সুখ পাবে ?’
‘কী করব। হিন্দু হয়ে গেছি তো, বাঙালি ছিলাম, এখন আমাকে হিন্দু বানিয়ে অধিকারহীন করে ফেলেছে।’ এই কথা বলতে বলতে ভাবলাম, আসলে কী আমার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে কথা বলছে ? পেছন ফিরে কাউকে দেখতে পেলাম না। শুধু শতবর্ষী খেজুরগাছটা আগের মতো দাঁড়িয়ে আছে। শীতকালে এখনও মিষ্টি রস দেয়। গাছটির দিকে তাকিয়ে মনে কেন জানি সাহস জাগল। বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছি বলে আমি বাঙালি, হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি বলে আমি তথাকথিত হিন্দু। আমার হিন্দুত্ব পরিচয়ের জন্য জন্মভূমি হারা হচ্ছি, বাঙালি হওয়ায় আমি রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে নিষ্পৃষ্ট হচ্ছি- তা আজ থেকে ত্যাগ করলাম। আমি যে মানুষ তা তো ত্যাগ করা যাবে না, তাহলে যে আমার অস্তিত্ব থাকবে না, পরম্পরা থাকবে না, পূর্বপুরুষের দায় থেকে মুক্তি পাবো না-এভাবে মননে পেছনে হাঁটতে শুরু করে আবিষ্কার করলাম- কোথাও হিন্দু নেই, অন্য কেউ নেই, যতটুকু আছে শুধু মানুষ। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় বলি- ‘আজ বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়’।
কহিল গভীর রাত্রে সংসারে বিরাগী,
‘গৃহ তেয়াগিব আজি ইষ্টদেব লাগি,
কে আমারে ভুলাইয়া রেখেছে এখানে ?’
দেবতা কহিলা, ‘আমি’। শুনিল না কানে।
........................................
দেবতা নি:শ্বাস ছাড়ি কহিলেন, ‘হায়-
আমারে ছাড়িয়া ভক্ত চলিল কোথায়।’
আমি সংখ্যালঘু নই, সংখ্যাগুরুও নই। আমাকে তাড়াবে কে ? ‘আমরা ছিলাম, আমি আছি, আমি থাকব- চিরদিন এই বাংলায়।
‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’।