রক্তের আন্ত সম্পর্ক

কাজী মোহাম্মদ আলমগীর ||
আমার
ছোট মেয়ে সপ্তম শ্রেণি। বড়দের মতো প্রশ্ন করে। উত্তর দিতে হয়। কখনো আগ
বাড়িয়ে আমিও বলি। পরিমাণে বেশিই বলি। তাতে আমি নিজেই পথ হারাই। সব মিলিয়ে
বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করি। দুশ্চিন্তাও করি। স্ত্রীর ধারণা মেয়েকে অকাল
পক্ক করা হচ্ছে। একদিন সংসারের বিরক্তির কারণ হবে এ মেয়ে। ভেবে দেখেছি,
মেয়ে যেপরিমাণ তথ্য টিভি পত্রিকা এবং মোবাইলের মাধ্যমে পায় এসবের কাছে আমি
কিচ্ছু না। বিষয়গুলো সহজ করে দিলে বরং মঙ্গল।
মেয়ে বলে মাছ হলো দু
প্রকার ঃ মরা মাছ এবং লড়া মাছ। তার কাছে সব মাছ প্রায় একেই রকম। কষ্ট করে
মাছের নাম মনে রাখতে পারবে না। সুতরাং যে মাছ লড়ে বা নড়ে অর্থাৎ জীবিত,
সেগুলো লড়া মাছ, আর যে মাছ মরে গেছে সে মাছ মরা মাছ। স্ত্রী বলে,
ফাঁকিবাজ। মাছ খাবে মাছের নাম বলতে পারবে না। স্ত্রী কথাও সত্য। আমি মনে
করি ধীরে ধীরে শিখবে।
একদিন মেয়ে পারদ বুঝার জন্য জ¦র মাপার থার্মোমিটার ভেঙ্গে এসে বলে, পারদ ধরা যায় না।
- কেন?
- পারদ কেমন দৌড় দেয়।
চুপ করে থাকি।
স্ত্রী শাসিয়ে যায়। আমি না থাকলে মার দিতো।
সেদিন
তার স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমাকে স্কুলে যেতে বললো। স্কুলের খবর যার
মাধ্যমে পাই- বেল্লাল। বললাম আবার নতুন কিছু হলো না কি। -আঙ্কেল কিছু বলতে
পারছি না। বেল্লালের উত্তর।
অবশেষে প্রধান শিক্ষকের কথা শুনতে স্কুলে
হাজির হলাম। মেয়েকে কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। যাওয়ার আগে স্ত্রীকে দশবার
বললাম, তুমি যাও, তুমি যাও।
স্ত্রী যাবে না। তার চাকরি,
ঊর্ধ্বমূল্যের বাজারে গরম মাথার উপর বরফের পুলটিস। আমার কোন চাকরি নেই।
সংসারে যা যা করি এসব হলো ফাও। অতএব আমাকে যেতে হবে। আপত্তি নেই। গেলাম।
প্রধান
শিক্ষক বললেন, ‘লাল রঙের ফুল শুকালে কালো রক্তের মতো হয়। আপনার মেয়ে নাকি
মানুষের শুকনো রক্ত দেখেছে ফেইসবুকে। পত্রিকায় দেখেছে সেই রক্ত শুকিয়ে কালো
হয়েছে। শুধু এখানে শেষ নয়। এর পেছনে সমস্ত ঘটনা সে তার ক্লাশে বলেছে। এখন
অনেক মেয়ে রাত্রে ঘুমের ভিতর রক্ত দেখে। লাল-কালো রক্ত দেখে। কেউ কেউ
মৃত্যু দেখে। মরতে দেখে। চিৎকার দেখে। নিজেরাও চিৎকার করে ওঠে। অনেক
অভিভাবক এসে বলে গেছে। ফর্সা ছিপছিপে মেয়েটা, যার রোল নং এক। শাখাঃ খ। বেশি
কথা বলে। আপনার মেয়ের নাম ধরে নালিশ করে গেছে।’
প্রধান শিক্ষকের
কথা শুনে চুপ করে রইলাম। কিছুক্ষণ পর বললাম, স্যার, আমি কী করতে পারি। আমি
আপাতত মেয়েকে স্কুলে পাঠাব না। ওকে ধমক দিয়ে লাভ নেই। আপনি নিশ্চয় স্বীকার
করবেন, আরো অনেক মেয়ে এ দৃশ্য ভার্চুয়ালি দেখেছে। অনেকে হয়তো একেই বর্ণনা
দিয়েছে কিন্তু আমার মেয়ে ঠিকঠাক বলেছে, একটু হয়তো বাড়িয়ে বলেছে। অতএব এ
শাস্তি আমার মেয়ের প্রাপ্য।
- আপনি আমার উপর রাগ করছেন।
- আরে না
স্যার। মানুষের রক্ত শুকালে কালচে হয়। গোলাপ, জবা হাতে কচলিয়ে রাখলে নীলচে
বা কালচে হয়, এ কথা আমিই বলেছিলাম। আপনি একবার ভাবেন পঁচাত্তরে একজন মানুষও
দুঃস্বপ্ন দেখে লাফিয়ে ওঠেনি। কেউ কারো কাছে দুঃস্বপ্নের কথা বলেনি। সেই
কথা ভাবলে এখন আমি নিজেই লাফিয়ে ওঠি।
- আপনি মেয়ের সঙ্গে এসব আলাপ করেছেন?
- স্যার কী বলবো! কার ছেলে মারা গেছে! তার রক্ত দেখে মেয়ে বার বার প্রশ্ন
করেছে। প্রশ্ন করাই তো স্বাভাবিক। মিথ্যা কথা বলবো মনে করেও বলিনি। কিন্তু
যতটুকু সত্য বলেছি ততটুকু মেয়ের নিকট সত্য মনে হয়নি।
- কেন মনে হয়নি।
- ওই পঁচাত্তরে এত লোক বোবা হয়েছিল এটা মেয়ের বিশ^াস হয় না ।
- আপনি কাজটি ঠিক করেন নি। একটি ছোট ঘটনা বলতে গিয়ে একটা বড় ঐতিহাসিক ঘটনা টেনে এনেছেন।
- ঠিক বলেছেন। আমার স্ত্রীও আপনার চিন্তার লেভেলে বাস করে। আমি ভাবছি মেয়েকে
নিয়ে জবাইখোলাতে যাবো, গিয়ে গরু জবাই দেখাবো, আর বলবো, এই দেখো গরুর রক্ত ,
গরুর রক্ত আর মানুষের রক্তে রঙের কোন পার্থক্য নেই। দেখো কী চমকতার লাল।
এই চমকতার লালের জন্য তোমাকে আমাকে আফসোস করা উচিত না। এই চমকতার খেলা শুধু
আমরা দেখে যাবো আর প্রতিযোগিতা করে বোবা হবো। যে আগে বোবা হতে পারে সে
বেশি সুখি, ভদ্রলোক।
- আপনি আমার উপর ক্ষেপে যাচ্ছেন।
- কী করবো?
আপনার গালে চুমু খাবো? দোষ আমার, লালফুল আর মানুষের রক্তের শেষ পরিণতি এক,
আমার কথা না বুঝে মেয়ে এই সংবাদ স্কুল পর্যন্ত নিয়ে এসেছে।
স্যার
তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। আমি সালাম দিয়ে বাসায় চলে আসি। এসে স্ত্রীকে সব
খোলে বলি। সব শুনে স্ত্রী রেগে আগুন। সে স্কুল কমিটির নিকট বিচার দিবে।
চারদিকে এতা দুর্ঘটনা- সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা তাতে কারো ঘুম ভাঙে না, কেউ
স্বপ্নে লাফিয়ে উঠে না। কোন্ কথায় কে স্বপ্নে হাই ঝাম্প দিচ্ছে, এর জন্য
আমার মেয়ে দোষী, সে স্কুলে যেতে পারবে না, এটা সে মানতে পারছে না।
আমি
মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। সে জেনে গেছে তাকে স্কুলে যেত হবে না কিছু
দিন। মেয়ে তাতে খুশি কিন্তু মায়ের তর্জন গর্জনে চুপ করে আছে।
স্ত্রী আরো এক কদম বাড়িয়ে বললো, স্কুল কমিটির সভাপতি তার খালু। সে খালুর কাছে যাবে। প্রধান শিক্ষকের নামে বিচার দিবে।
আমি
বললাম, ‘এক সপ্তাহ বা দশ বারো দিন সবর করো, নতুন কোন অভিঘাত আসে কি না,
দেখো। যদি না আসে রক্ত আর গোলাপের কালচে রং কোথায় উবে যাবে। আর যদি সত্যি
আসে তাহলেও কথা নেই। সব ভুলে যাবে লোকজন। প্রতিযোগিতা করে ভুলবে। কে কতো
আগে ভুলতে পারে।
স্ত্রী ঠাণ্ড হলো। আমরা একত্রে সিদ্বান্ত নিলাম, আমাদের
মেয়ে আপাতত স্কুলে যাবে না। বেশির ভাগ সময় আমি বাড়িতে থাকি, আমিই মেয়েকে
পড়াবো। আর এমনিতে একজন শিক্ষক আছেন, পড়া লেখা হয়ে যাবে।
দুদিন যেতে না যেতে স্কুল কমিটির সভাপতি আমাকে মোবাইলে ফোন করলেন।
- জী খালু বলেন। আমি নেহাল। মিনির হাজব্যান্ড। আমি শুনছি আপনি বলুন।
- তোমার মেয়েকে না কি স্কুলে যেতে নিষেধ করেছে প্রধান শিক্ষক?
- জী না খালু আপনি ভুল শুনেছেন। ওই যে সেদিন একটা ছেলে খুন হলো। ওই ছেলের
রক্তের দৃশ্য আমার মেয়ে ফেইসবুকে এবং পত্রিকায় দেখেছে, স্কুলে সে এসবের
বর্ণনা দিয়েছে। তাতে অন্য ছাত্রীরা ভয় পায়, তারা স্বপ্নে কেঁপে কেঁপে ওঠে,
তাদের মা বাবারা চিন্তিত, আমি নিজেই মেয়েকে স্কুলে যেতে দিচ্ছি না।
- তোমার মেয়েই এসব দেখেছে বলেছে, আর কেউ দেখে নাই? আর কেউ বলে নাই?
- খালু আমার মেয়ের নাম সুস্পষ্টভাবে ওঠেছে।
- সুস্পষ্ট বলতে তুমি কী বুঝ?
এখন
আমি কী করি। আমার মেয়ের কারণে প্রধান শিক্ষক অন্য কোন স্কুলে বদলি হোক আমি
চাই না। খালুর বড় ভাইয়ের চাচা শ^শুরের শালা শিক্ষামন্ত্রণালয়ে ডিজির
আশপাশে কোন পোস্টে আছে। যে কোন সময় প্রধান শিক্ষককে জাহান্নামে বদলি করে
দিতে পারে। একটা চেয়ারের উত্তাপে একজন হেডমাস্টার পোড়ে ছাই হয়ে যাবে। আমি
নিশ্চিত আমার স্ত্রী খালুর কাছে বিস্তারিত বলেছে। নালিশ করেছে। মূল ঘটনা
এখন ধামার নিচে চাপা পড়ে যাবে।
খালু আবার বলে, সুস্পষ্ট বলতে তুমি কী বুঝ বললে না তো।
আমি
বলি, সু-স্পষ্ট বলতে আমি বুঝি প্রধান শিক্ষক এ ঘটনা বানিয়ে বলেননি। খুন
পরবর্তী ঘটনা স্কুল পর্যন্ত গেছে, সামান্য হলেও গেছে, এর সঙ্গে আমার মেয়ে
এবং আমি কিঞ্চিৎ জড়িত কারণ আমি খুন পরবর্তী মিথিকেল ভায়োলেন্সের সঙ্গে
আগস্ট নীরবতাকে যুক্ত করতে গিয়ে সরল বা অসরল করেছি আর মেয়ে তা সুন্দরভাবে
স্কুল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। এখন আমার মাথাও গরম মেয়ের মাথাও গরম।
- তোমার মাথা গরম হতে পারে কিন্তু সপ্তম শ্রেণিতে পড়া তোমার মেয়ের মাথা গরম, এটা ভালো কথা নয়।
- তাহলে ভালো কথাটা আপনি আমাকে শুনিয়ে দিন।
- ভালো কথাটা হলো, তুমি মিনির জীবনটাকে তুলা বানিয়ে ফেলছো।
- আমি আপনার সঙ্গে একমত।
- কী বলছো নেহাল?
- জী খালু, মুরুব্বির কথা মাথা পেতে মেনে নেয়া আমার নীতির মধ্যে পড়ে। তবে
আপনি হয়তো জানেন না, শিমুল তুলার চেয়ে এখন কার্পাশ ৮০০ গ্রেডের তুলার কদর
খুব বেশি। জাপান চেষ্টা করেছে মসলিনের পেটেন্ট পেতে, পারেনি। আমাদের দেশে
আবার মসলিন যুগ ফিরে আসছে। আমাদের আগামী দিনের শ্রেষ্ট সম্পদ হতে যাচ্ছে
৮০০ গ্রেডের ফুটি কার্পাশে তৈরি মসলিন কাপড়। খালু, আপনি কি শিমুল তুলার কথা
বলছেন নাকি কার্পাশ তুলার কথা বলছেন?
- শোয়রের বাচ্চা।
- জী খালু
আমি শোয়রের বাচ্চা। আমার মেয়েটাও। তাইতো স্কুলে গিয়ে কী বলতে গিয়ে কী
বলেছে। এখন শুয়রের বাচ্চাটা কিছুদিন বাসায় থাকবে। যদি কিঞ্চিৎ মানুষ হয়। না
হলে নাই। তলে তলে দেশে গু-খাওয়া-শুয়রের সংখ্যা বাড়ছে। তাইতো এতো
গুঁতাগুঁতি এতো রক্তপাত।
মোবাইলের অপর প্রান্তে কখন খালু নেই হয়ে গেছে টের পাইনি।
খালুর সঙ্গে আমার সম্পর্ক চিরদিনের জন্য শেষ হলো।
কিন্তু, মিনি কথা শুনেছে এবং বলছে, তুমি খালুর সঙ্গে পাইজলামী করছো। (একেই মোবাইলে)
মিনি খালুর পাশেই ছিল। মিনিকে খালুটা আলুটা বুঝাতে হবে।
- তুমি খালুর পাশে থেকে সব শোনে নিয়েছো। বাজারে সবচেয়ে সস্তা এখন আলু। খালু
আর আলু, শুনতে মজা লাগছে না? এবার আগাম জাতের আলুর ফলন বেশি হয়েছে। ট্রাকে
ট্রাকে আলু বিক্রি হচ্ছে। এতো সস্তা আলু পৃথিবীর আর কোথাও নেই। পাইজলামী
করবো না তো প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে লড়বো?
- তুমি আর কোন দিন আমার সঙ্গে কথা বলবে না। তোমার সঙ্গে সংসার করতে এসে আমার জীবনটা কয়লা হয়ে গেলো।
- তুমি
আর খালু দুজনে মিলে দাঁত মেজে ফেলতে পারো। আমার বাবাও কয়লায় দাঁত মাজতো।
তবে প্রধান শিক্ষকের চাকরি যেন না যায়। অন্য কোথাও বদলি যেন না হয়।
২
সে রাতে স্ত্রী আমার বাসায় আসে না। আলুর বাসায় থেকে যায়।
আমি এবং আমার মেয়ে আবার একজন তরুণের কল্পিত খুনের ঘটনায় ঢুকে পড়ি। যদিও মেয়ে খুব ক্লান্ত। প্রশ্ন করছে ছোট ছোট এবং বেশ ধীরে।
- বাবা রক্ত লাল হয় কেন?
- রক্তে হিমোগ্লেবিন রয়েছে।
- রক্তে আর কী থাকে?
- স্বেত রক্ত কণিকা, অনুচক্রিকা।
- আর কী থাকে?
মেয়ের ঘুম পাচ্ছে। আমি বলতে থাকি, মধুমতি নদীতে সাঁতারের স্মৃতি থাকে।
- আর?
- তেরো-চৌদ্দ বছর জেলখানার নির্যাতন নিপীরণ সহ্য করার গৌরব থাকে।
- আর?
- হিন্দু মুসলীম এক সঙ্গে বাস করার স্বপ্ন থাকে
- আর?
- একটা দেশের জন্য প্রাণ দেয়ার সাহসের তুঙ্গে থেকে সমস্ত পরিবারকে নিয়ে
কোরবান হয়ে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত নিজ জাতির প্রতি অবিচল আস্থা
থাকে।
( আমার সপ্তম শ্রেণির সোনার মানিক শেষ বাক্য বুঝবে না নিশ্চিত। কিন্তু থামতে পারলাম না।)
- আহা বাবা, তোমাকে কে শুয়রের বাচ্চা বলেছে? তুমি বলে দাও তাদের, যে কোন খুন
হওয়া ব্যক্তির রক্ত যেনো শুকিয়ে না যায় তার বিচারের আগে।
(আমি আনন্দ পেতাম যদি শেষ বাক্যটি সে আমার মুখে আগে শোনে না থাকতো।)
মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। ও এখন গভীর ঘুমে তলিয়ে যাবে।
ব্রায়ান বুন
আলমগীর মোহাম্মদ ||
কিস্তিঃ ২
বেউলফ প্রাচীন ইংরেজি সাহিত্যের ভিত্তিস্তম্ভঃ
উইলিয়াম,
যাকে বিজেতা বলা হয়, তিনি নরম্যান অভিযানে ইংলিশ সৈন্যদলের নেতৃত্ব দেন।
নতুন শাসক ফরাসি ভাষার প্রাচীন একটা মাধ্যমে কথা বলতেন। যা পরবর্তীতে
ইংল্যান্ডের মানুষের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইংল্যান্ডের অধিবাসীরা
ইংরেজিতে কথা বলতেন যার উৎস ছিল জর্মন ভাষাগুলোর একটি। বেউলফ লেখা
হয়েছিল সেই ভাষায় যা আমাদের কাছে ওল্ড ইংলিশ বা প্রাচীন ইংরেজি হিসেবে
পরিচিত। এংলো স্যাক্সন ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সেটলাররা কয়েক শত বছর পূর্বে
ইংল্যান্ডে এসে থিতু হয়েছিল। কালক্রমে তাদের ভাষা বিবর্তিত ও মিশ্রিত
হয়ে যে রূপ ধারণ করেছিল সেটাকেই মূলত প্রাচীন ইংরেজি হিসেবে বিবেচনা করা
হয়। বেউলফ এই ভাষায় রচিত অন্যতম সাহিত্য যার ভাষিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক
গুরুত্ব হোমার বা ভার্জিলের গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্মের চেয়ে কম নয়।
বেউলফ
একটা মহাকাব্য। ৩১৮২ পক্তির এই কবিতা প্রাচীন ইংরেজি ভাষায় লিখিত সবচেয়ে
দীর্ঘ এবং ইংরেজি ভাষার যেকোন ফর্মে লেখা অন্যতম দীর্ঘ সাহিত্যকর্ম।
কাহিনীর শুরুতে গ্রেন্ডেল নামের এক দানব হিরোট নামের এক রাজপ্রসাদে এসে
তান্ডব চালায়। হিরোট হলো মহান রাজা হ্রদ্গারের সভাকক্ষ( বর্তমান
ডেনমার্কের কোন এক অঞ্চলে অবস্থিত)। বেউলফ নামের একজন পুরুষ যুবককে ডাকা হয়
তাঁকে উদ্ধার করতে। বেউলফ এসে দানব গ্রেন্ডেলকে জবাই করে হত্যা করেন।
দ্বিতীয় গল্পে, গ্রেন্ডেলের মা তাঁর সন্তান হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা
করেন। বেউলফের সাথে যুদ্ধে তিনি পরাহত হন এবং শেষতক তাঁর মৃত্যু ঘটে।
পরবর্তী গল্প পঞ্চাশ বছর ধরে এগোতে থাকে। বেউলফ এখন গীটল্যান্ডের রাজা।
কৃতকর্মের অনুতাপ তাঁকে তারিয়ে ফেরে। একটা দুষ্টু দানব তাঁর রাজ্যের একপাশ
দখল করে নিয়েছে। বেউলফ আরো একবার দানবের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং তাঁকে
পরাস্ত করেন। কিন্তু, তিনি এই যুদ্ধে মারাত্মকভাবে আহত হন।
বিজয়ী হিরো*
বেউলফ
গল্পের মশলা বা উপাদান প্রাচীন সাহিত্য থেকে নেওয়া। লোকমুখে প্রচলিত
লোকগল্পই মূলত বেউলফের কাহিনি। পরবর্তীতে এই বেউলফই প্রচুর ইংরেজি ও
পশ্চিমা সাহিত্যের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বা হচ্ছে। বেউলফ ভালোর
সাথে মন্দের যুদ্ধের গল্প। এডভেঞ্চার, নিয়তি, বীরত্ব, শৌর্য, রাজা ও
দানবের গল্প। বেউলফের প্লট মূলত তিনটি অংশে বিভক্ত। ফ্যান্টাসি ঘরানার
সাহিত্য হিসেবে বেউলফ বিবেচিত হলেও এটা মূলত মানুষের জানাশোনা গল্পের
লিখিত একটি রূপ। আঙ্গিকের দিক থেকে বেউলফ একটি আধুনিক সাহিত্যকর্ম।
বেউলফ
ষষ্ঠ শতকের গল্প। ইতিহাসের রেফারেন্স মূলত তাই বলে। কিন্তু, গল্পটাকে
বস্তুনিষ্ঠ করে লিখিত রূপ দেওয়া হয়েছিল এগারো শতকে। বিস্ময়কর হলেও সত্য
বেউলফের মতো এরকম মহৎ সাহিত্যকর্মের লেখকের নাম অজানা। এটার লিখিত রূপ
দেওয়া হয় খুব সম্ভবত মহান সুইডিশ শাসক ( ঈহঁঃ ১০১৭- ১০৩৫) এর আমলে।
ঐতিহাসিক নথি ঘেটে জানা যায় বেউলফ যখন লিখিত রূপ ধারণ করছিল তখন তা মূলত
চারশত বছরের পুরনো গল্প। সেসময়ের লোক্মুখে প্রচলিত ইংরেজিতে লেখা। এর
গল্পের চরিত্র বা অনুষঙ্গ যদিও দানব বা পুরাণ চরিত্র , এই সাহিত্যকর্ম
মূলত সেসময়কার কিছু ঐতিহাসিক বাস্তবতা তুলে ধরে। খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সালের
স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বাস্তব অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে এমন আর কোন কাজের সন্ধান
ইতিহাসে মেলে না।
বেউলফের সময়কাল
বেউলফের সময়কাল নিশ্চিত হওয়া
রীতিমতো অসম্ভব। ইতিহাসবিদরা হয়তো বেউলফের চরিত্র, প্লট প্রভৃতির সাথে
ঐতিহাসিক উপাদানসমূহ পাশাপাশি রেখে মেলাতে পারবেন। যেমন, ডেনমার্কের
রাজকীয়তা ও বিভিন্ন স্থানের বর্ণ্নাকে আমলে নেওয়া যায়। তবে হ্যা, বেউলফ
মূলত ব্রিটেনে থিতু হওয়া বা প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রাচীন কতিপয় জর্মন
গোত্রসমূহের মুখে মুখে প্রচলিত গল্পের লিখিত বয়ান। এর চেয়ে অন্যান্য
জর্মন, ইংরেজি ও নর্স পুরানের কিছু সাদৃশ্যও আছে। এটা পুরনো প্যাগান গল্প,
কিন্তু একজন খ্রিস্টান কবির বুননে লেখা গল্প যার চরিত্রসমূহ খ্রিস্টানিটির
আদর্শে প্রভাবিত। ষষ্ঠ শতকের শেষের দিকে বিশাল সংখ্যক যোদ্ধা প্যাগান
থেকে ক্রিস্টান মতাদর্শে দীক্ষিত হয়। ঠিক এই কারণে দীর্ঘদিন ধরে লোকমুখে
প্রচলিত বেউলফের গল্প লিখিত রূপে এসে বদলে যায়। এই বদল অনেকটা আমূল।
লিখিত রূপে [পরিবর্তন যাই থাকুক না কেন সামন্তবাদী স্যাক্সন সমাজ ও
সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে হলে বেউলফ পাঠ
জরুরি।
অনুবাদঃ আলমগীর মোহাম্মদ শিক্ষক,বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, কুমিল্লা।