ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
প্রবাস আয় প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অবস্থান এবং করণীয়
Published : Thursday, 7 July, 2022 at 12:00 AM
প্রবাস আয় প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অবস্থান এবং করণীয়এ কে এম আতিকুর রহমান ||
কিছুদিন আগে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্রিফ’-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ গত বছর প্রবাস আয় প্রাপ্তিতে বিশ্বের ১০টি দেশের মধ্যে সপ্তম স্থানে ছিল। ২০২০ সালেও বাংলাদেশ একই অবস্থানে ছিল। তবে ২০২১ সালে প্রাপ্ত প্রবাস আয় দুই হাজার ১৭০ কোটি ডলার থেকে ২.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ২২০ কোটি ডলারে। ২০২১ সালে অন্য ৯টি দেশের অর্থাৎ ভারত, মেক্সিকো, চীন, ফিলিপাইন, মিসর, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, ইউক্রেন ও ভিয়েতনামের প্রবাস আয় ছিল যথাক্রমে ৮৯ বিলিয়ন, ৫৪ বিলিয়ন, ৫৩ বিলিয়ন, ৩৭ বিলিয়ন, ৩২ বিলিয়ন, ৩১ বিলিয়ন, ১৯ বিলিয়ন, ১৮ বিলিয়ন ও ১৮ বিলিয়ন ডলার।
বরাবরের মতো প্রবাস আয়ে প্রথম স্থানটি ভারতের দখলেই ছিল। তবে পাকিস্তানের অবস্থান ছিল বাংলাদেশের আগে, ষষ্ঠ স্থানে। উল্লেখ্য, প্রথম ১০টি দেশের ছয়টি এশিয়ার দেশ, যার মধ্যে তিনটিই দক্ষিণ এশিয়ার।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২১ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রবাস আয়ের পরিমাণ ছিল ১৫৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৭ শতাংশ বেশি। তবে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের প্রবাস আয় বৃদ্ধি পেলেও শ্রীলঙ্কার আয় কমেছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালের জন্য বাংলাদেশের প্রবাস আয়ে প্রবৃদ্ধির হার ২ শতাংশ অনুমান করা হয়েছে। অন্যদিকে ২০২১ সালে ভারতের প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ২০ শতাংশ থাকলেও ২০২২ ও ২০২৩ সালের জন্য পাকিস্তান ও ভারতের প্রবৃদ্ধির হার অনুমান করা হয়েছে যথাক্রমে ৮ ও ৫ শতাংশ। এ বছর শ্রীলঙ্কার প্রবাস আয় আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে। সার্বিকভাবে ২০২২ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবাস আয়ের প্রবৃদ্ধি ৪.৪ শতাংশ হতে পারে।
আমরা জানি, প্রবাস আয়ের বড় উৎস দেশের মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যসহ উন্নত দেশগুলো। বলতে গেলে ওই সব দেশে কর্মরত প্রবাসীর সংখ্যা কোন দেশের কত এবং প্রতিটি দেশের দক্ষ-অদক্ষের কর্মীদের অনুপাত কী, তা খুবই গুরুত্ব বহন করে প্রবাস আয় প্রবাহের পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য। ২০২১ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স উৎসর পাঁচটি দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র (৭৬.৬ বিলিয়ন ডলার), সৌদি আরব (৪০.৭ বিলিয়ন ডলার), চীন (২২.৯ বিলিয়ন ডলার), রাশিয়া (১৬.৮ বিলিয়ন ডলার) ও লুক্সেমবার্গ (১৫.৬ বিলিয়ন ডলার)। রেমিট্যান্স প্রেরণকারী উল্লেখযোগ্য অন্যান্য দেশের মধ্যে ছিল সিঙ্গাপুর, জাপান, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, দক্ষিণ কোরিয়া ইত্যাদি।  
বাংলাদেশের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে, ১৯৭৬ থেকে ২০২২ সালের মে মাস পর্যন্ত বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীর মোট সংখ্যা এক কোটি ৪১ লাখ ৩৮ হাজার ১৪০। এর মধ্যে ৩৩ শতাংশ সৌদি আরব, ১৭ শতাংশ সংযুক্ত আরব আমিরাত, ১১.১৫ শতাংশ ওমান, ৭.৪৮ শতাংশ মালয়েশিয়া, ৫.৯৭ শতাংশ সিঙ্গাপুর, ৫.৮১ শতাংশ কাতার, ৪.৪৮ শতাংশ কুয়েত এবং বাকিরা অন্যান্য দেশে গেছেন। অর্থাৎ অধিকসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর গন্তব্য ছিল মধ্যপ্রাচ্য। বলতে গেলে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও সিঙ্গাপুর ছাড়া অন্য সব দেশে বাংলাদেশের অভিবাসী কর্মীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
১৯৭৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পেশাজীবী শ্রেণিতে দুই লাখ ৩৬ হাজার ৯৭৮ জন (১.৮৪ শতাংশ), দক্ষ ৪৪ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫৫ জন (৩৪.৫৪ শতাংশ), আধাদক্ষ ২০ লাখ চার হাজার ৭৩৯ জন (১৫.৫৪ শতাংশ) এবং অদক্ষ ৬২ লাখ এক হাজার ৭১১ জন (৪৮.৮ শতাংশ) কর্মী বিদেশে গেছেন। বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের অভিবাসী কর্মীদের প্রায় অর্ধেকই ছিলেন অদক্ষ। প্রফেশনাল বা দক্ষ কর্মীদের তুলনায় অদক্ষদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা অবশ্যই অনেক কম হয়ে থাকে। যেসব দেশের দক্ষ অভিবাসী কর্মীর হার অদক্ষ কর্মীর তুলনায় যত বেশি, সেসব দেশের রেমিট্যান্সের পরিমাণ তত বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ ছাড়া উন্নত বিশ্বে যেসব দেশের অভিবাসী কর্মীর সংখ্যা যত বেশি, সেসব দেশের প্রবাস আয়ের পরিমাণ ততই বেশি হবে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ইত্যাদি উন্নত দেশে চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতাদি অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক বেশি। ওই সব দেশে বাংলাদেশের অভিবাসী কর্মীর সংখ্যা অভিবাসী কর্মী প্রেরণকারী অন্যান্য দেশ; যেমন—ভারত, মেক্সিকো, চীন, ফিলিপাইন, মিসর, পাকিস্তান ইত্যাদির চেয়ে কম বলেই তাদের তুলনায় আমাদের প্রবাস আয়ের পরিমাণ কর্মী সংখ্যার আনুপাতিক হার অনুযায়ী আসে না।
আমরা যদি ভারত ও বাংলাদেশ প্রতিবছর কতজন কর্মী বিদেশে প্রেরণ করে এবং এই দুটি দেশ প্রতিবছর কী পরিমাণ রেমিট্যান্স পেয়ে থাকে তার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করি, তাহলেই দেখতে পাব আমাদের কর্মীদের আয় ভারতের আয়ের চেয়ে কত কম। ২০১৩ ও ২০১৪ সাল ছাড়া অন্যান্য বছর দুটি দেশ থেকে প্রায় কাছাকাছি সংখ্যার কর্মী বিদেশে গেছেন। কিন্তু প্রতিবছরের প্রবাস আয়ের পরিমাণের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে পার্থক্যটা খুবই বড়, বলতে গেলে বাংলাদেশের প্রবাস আয়ের পরিমাণ ভারতের আয়ের এক-পঞ্চমাংশ। ভারতের এ পরিমাণ প্রবাস আয়ের পেছনে অবশ্য অন্যান্য কারণও রয়েছে।  
নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলাদেশ তার অভিবাসী কর্মী সংখ্যার তুলনায় অনেক কম রেমিট্যান্স পেয়ে থাকে। বাংলাদেশ সরকার ভালোভাবেই অবগত আছে যে তার অভিবাসী কর্মীদের মধ্যে দক্ষ কর্মীর চেয়ে অদক্ষ কর্মীর সংখ্যাই বেশি। দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টিতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে তেমন ইতিবাচক ফল আমরা এখনো দেখতে পাই না। সাধারণ শিক্ষার প্রসারণের চেয়ে কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে অধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। যেসব সেক্টরে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া যায়, সেসব সেক্টরে আমাদের অভিবাসী কর্মীর সংখ্যা কম। বিশ্ব শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী জনশক্তি তৈরি করা ছাড়া আমাদের বিকল্প কোনো পথ নেই। যেসব দেশ থেকে অধিক পরিমাণে রেমিট্যান্স প্রেরিত হয়; যেমন—আমেরিকা, সৌদি আরব, চীন, রাশিয়া, লুক্সেমবার্গ, সিঙ্গাপুর, জাপানসহ বেশির ভাগ দেশেই শীর্ষ রেমিট্যান্সপ্রাপ্ত দেশের কর্মীর চেয়ে আমাদের কর্মীর সংখ্যা কম এবং যাঁরা আছেন তাঁদের বেশির ভাগই কম বেতনের কর্মে নিয়োজিত। এ বিষয়ে লক্ষ রেখে ওই সব দেশে উপযুক্ত কর্মী প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশের কর্মীদের অভিবাসন বা নিয়োগ ব্যয় খুব বেশি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১১ থেকে ২০২০ সময়কালে কাতারে যেতে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার এজেন্সি ফি পরিশোধ করতে হয়েছে। মালয়েশিয়ায় যাওয়া কর্মীদের জনপ্রতি চার হাজার ৭০০ ডলার রিক্রুটিং এজেন্সিকে দিতে হয়েছে। অত্যধিক অভিবাসন ব্যয়ের কারণে প্রকৃত রেমিট্যান্সের পরিমাণ খুব কম হয়ে থাকে। যদি কর্মীবান্ধব নিয়োগপ্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাংলাদেশ তার কর্মীদের বিদেশে পাঠাতে পারত, তাহলে এজেন্সিকে যে পরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হয় তার ৭০ থেকে ৯০ শতাংশই কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর রেমিট্যান্স ব্যয় অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কম হলেও (৪.৩ শতাংশ) আরো হ্রাস করা অর্থাৎ এসডিজির নির্ধারিত ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা আবশ্যক। আমরা জানি, বাংলাদেশ সরকার বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণকে উৎসাহিত করার জন্য কয়েক বছর ধরে প্রণোদনা দিয়ে আসছে। ফলে রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের পরিবার আর্থিকভাবে যেমন লাভবান হচ্ছে, তেমনি বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণও বেড়েছে। তবে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো এখনো বন্ধ করা যায়নি। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বৈধ চ্যানেলে অর্থ প্রেরণে উৎসাহিত করার জন্য প্রণোদনা একটি সাময়িক ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু প্রণোদনা প্রদান রেমিট্যান্স ব্যয় হ্রাস করার উপায় হতে পারে না।
বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ কোন দেশে মোট কতজন বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত রয়েছে তার প্রতিবছরের ডাটা সংরক্ষণ করে না। কোন দেশে এ পর্যন্ত মোট কতজন কর্মী গেছেন তার হিসাব পাওয়া গেলেও প্রতিবছর কতজন ফেরত আসছেন তার কোনো তথ্য সংরক্ষণ করা হয় না। এ ছাড়া অবৈধ পথে (ভ্রমণ ভিসায় বা পাচার হওয়া) বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশিদের সঠিক তথ্যও পাওয়া যায় না। অথচ অভিবাসী কর্মীদের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এসব তথ্য জানা প্রয়োজন।
শুধু অভিবাসী কর্মীর সংখ্যা বাড়ানোই নয়, অধিক আয়ের উপযুক্ত কর্মী তৈরি করে অধিক আয়ের উন্নত দেশগুলোতে সেসব কর্মী প্রেরণের জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অবশ্যই সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অধিক আয়ের গন্তব্য। আমরা যদি সেটি করতে পারি, তবেই ভারত বা বেশি রেমিট্যান্স প্রাপক দেশগুলোর মতোই আমাদের প্রবাস আয় কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব