
নার্গিস খান এর ‘প্রান্ত ছোঁয়া’ গল্পগ্রন্থ -
জীবনের সরল বয়ান

কাজী মোহাম্মদ আলমগীর ।।
নার্গিস খান অনেক আগ থেকে নিজকে ঋদ্ধ করছিলেন লেখালেখিতে, কবিতায় এবং গল্পে। বিশেষত গল্পে তাঁর উপস্থিতি দীর্ঘ সময়ের। নব্বই দশকে ‘চর্চা কেন্দ্র’র আড্ডা থেকে প্রকাশিত কুমিল্লায় ‘সাতজনের গল্প’ একত্রে মাটি রঙের দুই মলাটের মাঝখানে তাঁর লেখাও ছিল। সেই সাতজনের মধ্যে অনেকে পরবর্তী সময়ে চেষ্টা করেছেন, কিঞ্চিৎ সফলও হয়েছেন কেউ, আবার কেউ ধারাবাহিকতা থেকে নিজকে সরিয়ে নিয়েছেন অথবা এখনো সাধনা করেন আমাদের (পাঠকদের) অগোচরে। কিন্তু নার্গিস খান সাধনা থেকে সরে যাননি। প্রমান তাঁর দুটি গ্রন্থের একটি কবিতাগ্রন্থ -‘তোমাকে পেতে চাই, অপরটি গল্পগ্রন্থ ‘প্রান্ত ছোঁয়া’। আমরা সরাসরি তাঁর গল্প নিয়ে কথা বলতে চাই। সহজ জীবন, বেঁচে থাকার কষ্ট, প্রান্তিক মানুষের স্বপ্ন পুরণ না হওয়ার বিত্তান্ত,শহুরে স্বচ্ছল জীবনের পাঁেক, ঘরের ছেলেটি লাশ হওয়ার কাহিনী, গর্ভের সন্তান বিক্রি করে দেয়ার দুষ্ট চক্রের তৎপরতা- ইত্যাদি নানা বিষয়ে নার্গিস খান তাঁর চৈতন্যের বোধ পাঠকের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে চেষ্টা করেন। নার্গিস খান যখন এসব উপস্থাপন করেন তখন তিনি বয়ানের সবটা দখল করে বসেন। তিনি নিজে কথা বলেন। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী থাকেন। তাঁর গল্পের চরিত্ররা খুব কমেই কথা বলার সুযোগ পায়। এভাবে লেখার সুবিধা হলো চরিত্র লেখককে নিয়ে কোন অজানা গন্তব্যে যেতে পারে না। তাতে আঞ্চলিক শব্দ বাক্য ব্যবহার কমে যায়। এ বিষয়ে আমরা পড়ে আরও কথা বলবো।
বলছিলাম লেখক নার্গিস খানের গল্পের বিষয় নিয়ে। তার বিষয়ের চরিত্ররা অসহায়, এরা ক্ষতির মুখে, পরাজয়ের সোপানে নির্বিকার দণ্ডায়মান। অপ্রাপ্তিতে কোন ক্ষেদ নেই- জেদ নেই। আমরা নার্গিস খানকে কাঠ গড়ায় দাঁড় করে জিজ্ঞাস করি, এমন চরিত্রের সংখ্যা আপনার গল্পে অধিক কেন? যেমন হাজিরা খাতুন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, সে শুধু অপেক্ষায় থাকে কখন ত্রান আসবে। নূর জাহান শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে অথবা তাকে সাপে কাটে। রেশমার সদ্য জন্ম নেয়া সন্তান বিক্রি করে দেয়ার ঘটনা। কোথাও কোন প্রতিবাদ নেই। কোথাও প্রতিকারের চেষ্টা নেই। তারা বিচার প্রার্থী হয় না। কেন?
নার্গিসের মোক্ষ উত্তরটি আমরা দিতে পারি। অধিকাংশ মানুষ বাস্তবে বিচার প্রার্থী হয় না। মেনে নেয়। একজনের কাছে হয়তো বিচার দেয় যিনি শেষ আশ্রয়। তাতে করে গল্পের মেরুদন্ডটি প্রবল শক্তি নিয়ে স্থিত হয় না। বিচার চাইলেও কি গল্পের মেরুদণ্ডটি স্থিত হতো? হ্যাঁ না এর অভিমিশ্র উত্তরই শেষ কথা নয়। ছোট গল্প তো আসলে একধরণের সংকট উপস্থাপন। যে সংকটে পাঠককে ধরে রাখেন লেখক। তিনি সমাধানের সকল সম্ভাব্যতায় প্রায় নিরব নিস্তব্দ নিরপেক্ষ নিরেশ^র। ঈশ^র তিনি সংকট তৈরিতে। সমাধানের দায়িত্ব পাঠকের। কে কী ভাববে সেটা তার তথা পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার।
তাহলে একটু নরম মেরুদন্ডের গল্পে নার্গিস খান, কী করলেন আমরা একটু দেখে নিতে পারি। ‘প্রান্ত ছোঁয়া’ গল্পে তিনি নূর জাহানকে ভাসান দিলেন। লখিন্দরবিহীন একা বেহুলা ভেসে যায়। কোন সাপে নূর জাহানকে কেটেছে। সামাজিক সাপে । তার নাম জালু মিয়া। কার দোহাইয়ে কেটেছে? ধর্মের দোহাইয়ে (অস্পষ্ট ছায়া ছায়া)। তবে মসজিদ তৈরির ইচ্ছে ছিল নূরজাহানের। মনে রাখার জন্য বলে রাখা, এই বিত্তান্তের মূলঃ সামন্তদের পতনের পর, জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ বা পট পরিবর্তনে তখন রঙমহলার রূপজীবীরা পালাতে বাধ্য হয়েছিল। তাদের সঞ্চিত অর্থে অনেক জায়গায় মন্দির মসজিদ হওয়ার ব্যার্থতার কাহিনী এখনো পাঠকের আকাক্সক্ষার ঘূর্ণী মাপে। নার্গিস খানকে ধন্যবাদ এমন একটি বিষয়কে বেছে নেয়ার জন্য।
গ্রন্থের শেষ গল্প- ‘জীবাত্মার বিনাশ’, বর্তমান সময়ের জ¦লন্ত সংকটের গল্প। গল্পে একজন আগুন্তুক বলেন, এ যে তাসানের লাশ। কে তাসান, কেন তাসান লাশ হলো, এ জাতীয় অনেক প্রশ্ন গল্পে হুড়মুড় করে পাঠকের মনে অঙ্কুরিত হয়। তাসানের মা তানিয়া। অল্প বয়সের বিয়ে। লেখক নিজে সমস্ত গল্পে অল্প বয়সে বিয়ের বিপক্ষে থেকেছেন, তাসানের মায়ের জ্ঞান না হওয়ার অনেক কারণের একটি। তাসানের বাবা বিত্তশালী। তাসান অন্য রকম হতে পারতো। কারন তাসান তার বন্ধু তমালের বাসায় বইয়ের বিশাল লাইব্রেরি দেখে একদিন অবাক হয়েছিল। তাসান বলেছিল বাসায় তার ভালো লাগে না। বাসাকে দোজকের কুণ্ডলী মনে হয়- তাহলে তাসান ছিল সম্ভাবনাময় ছেলে। কিন্তু তাসানের মগজ ধুলাই করে রাজাকার ধর্মান্ধরা। ফেসবুকের ভয়ংকর বন্ধুরা। তাসান এখন লাশ। এ গল্পে লেখক কোন প্রকার দম বন্ধকরা কাহিনী বলেননি। বলার সুযোগ ছিল। গল্পটি পাঠ সমাপনে লেখকের ইচ্ছাকে বুঝতে পারলে এর অন্তর্নিহিত প্রাণভোমরাকে ধরা যায়। মূল কথা এমন একজন তাসান এই শহরে বেঁচে থাকরই তো কথা। সে কেন অকালে ঝরে যাবে। ঝরে যাবার কারন পাঠক জানে। কিন্তু আরও নিতল কুণ্ঠার খোসা ছাড়িয়ে বীজের ভেতর অবলোকন করলে দেখা যায় সেখানে মাওলানা কবি রুমী বসে আছেন। রুমী কী বলছেন আমরা দেখতে পারি। এলিমার বর্ণনায় পাই, রুমী বলেন, ‘পৃথিবীর তাবৎ সভ্যতা সৃষ্টি হয় মানুষের মস্তিষ্ক থেকে,সভ্যতার সৌন্দির্য ফুলে-ফলে বিকশিত হয় শুদ্ধ চিত্তের বিশালতার মাধ্যমে। কৃতজ্ঞ মনের বিনয় প্রকাশের মধ্যে দিয়ে এর অনুপস্থিতে সভ্যতা ধ্বংশ হয় অনিবর্যভাবে।’
তাসান পরিবারে সব আছে কিন্তু জ্ঞানের চর্চা নেই। এ কথাই বলতে চেয়েছেন কথাশিল্পী নার্গিস খান।
‘চেতনারা কাঁদায়’ এ গল্পের প্রধান চরিত্র বর্ষা। বয়স পঁচিশ। ফাগুন মেপে বয়স নির্ধারণে লেখকের কাব্য শক্তি অনুমিত হয়। বর্ষা বইপ্রেমী। বর্ষার মনোজগতের খবরঃ সে নৈরাশ্যে বাস করে, অথবা নৈরাশ্য তাহাতে বাস করে। নিজকে সবসময় তুচ্ছ ভাবে। এক অচেনা আতঙ্কে সে নিমজ্জিত। তাহলে সে অরোরার সঙ্গে মিত হবে কী প্রকারে? লেখক নার্গিস খান বর্ষাকে বলেছেন-‘আত্ম প্রতারক’। আত্ম প্রতারকের মনোজগত বাস্তবের চেয়ে অবাস্তবে বেশি গতিশীল (আসলে মর্ষকামী)। এইসূত্রে ফ্রয়েডের জ্ঞান অজ্ঞান ( চেতন অবচেতন) জগতের কথা এসে যায়। জাঁকলাকা অজ্ঞান বলতে জ্ঞানহীনতা বুঝান না। তিনি বলেন ‘সহজ মানুষ’। ধরে নিলাম বর্ষা সহজ মানুষ। বইখোর এই বর্ষা- ফ্রয়েড মার্ক্স সার্ত্রে বুঁদ। তারপর লেখক নার্গিস খান বর্ষার অজ্ঞানে মায়াকোভস্কির- ‘এ লাউড এণ্ড স্ট্রেইট’ থেকে অনুবাদে প্রবেশ করেন, মায়াকোভস্কি বলেন, ‘তার অমরত্বে মোহ নেই। জীবন নির্মাণের জন্য পিটাসবার্গের নিপীড়িত মৃত্যুবরণকারী শ্রমিকদের মতো তার কবিতা ধ্বংশ হয়ে গেলেও তাতে তাঁর কোনো দুঃখ থাকবে না। যদি মানুষের কল্যাণে তা কোনো ভূমিকা না রাখতে পারে।’
এমন দর্শনগত বাক্যের উল্লম্ফন স্থাপন এই গল্পে কী কারণে হলো তা যে কোন পাঠক জিজ্ঞেস করতে পারেন।
তারপর লাওজের বাণী। লাউজের বাণী উল্টে দিয়ে বর্ষার ভাবনায় ধরা দেয় এভাবে- ‘সুন্দর মুখ দেখে জগতে সবাই মুগ্ধ হয়, ওটা দিয়ে স্রষ্টাকে ভুলানো যায় না। যদি দেখো কোন নারী তোমার দিকে আসছে পূর্ব দিক থেকে তুমি পশ্চিমে দৃষ্টি ফেরাও। যদি দেখো পশ্চিম থেকে আসছে, চোখ ফেরাও পূর্ব দিকে।’
বর্ষা এতোই অবসেসনে নিমজ্জিত। অথচ এমন বৈপারিত্বের মধ্যে ছোট্ট পরিসরে ( ছোট গল্পে) অরোরার সঙ্গে বর্ষার বিয়ে হয়। অরোরা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারপর২৪ ঘন্টার মধ্যে এক ঘন্টার জন্য অরোরাকে কাছে পাওয়ার চিন্তা। গল্পের মূল সঙ্কট ভেঙ্গে যায় অথবা অস্পষ্টতা তৈরি করে।
তবু বলতে হয় নার্গিস খান এর ‘চেতনারা কাঁদায়’ গল্প নিয়ে ভাবনার বিশাল পরিসর থেকে যায়। তিনি গল্পের শুরুতে এই গল্পের বর্ষার অসুখী হওয়ার কারণ বলে দিয়েছেন। ‘ জানালার পাশে নিষ্পাপ দাঁড়িয়ে স্বামীর অফিসে যাওয়া এবং ফেরা দেখে প্রতিদিন। এভাবেই করাত কলের মতো দিন রাত কেটে সামনে এগোচ্ছে তার সময়। না, ভালো লাগে না। এ আকুলতা বোঝার চেষ্টা নেই কারো।’
নার্গিস খান নিম্নবর্গের জীবনিকার। তিনি তার গল্পে দরিদ্র জীবনের সংক্ষিপ্ত রুপ দক্ষ শিল্পীর তুলির কয়েক টানে আঁকতে পারঙ্গম। তিনি উচ্চবিত্ত এবং মধ্য বিত্তের উচ্ছন্নে যাওয়া নবীন ছেলেটির পরিণতী ও বেদনার নিতল কারণটি পাঠকের কাছে তুলে ধরেন নিজ শিল্পসুষমায়। অনটনের সমাধানের কোন পথ বাতলে না দিয়ে প্রকৃত লেখকের দায়িত্বটি পালন করেন। নার্গিস খান গল্পের উল্লম্ফন ব্যবহারে নিজের ইমাজেনসন ব্যববহার না করে জগৎ বিখ্যাত ব্যক্তিদের মহান বাণী সংযোজন করেন কোন প্রকার রাখডাক ছাড়া। তিনি ধর্মান্ধগোষ্টির মগজ দোলাই কর্মের নীরব কর্মকাণ্ডের ইঙ্গিত দেন।
নার্গিস খানের একটি গল্পের শ্লেষ ব্যবহার এর লোভ সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই পাঠক হিসেবে।
গল্পের নাম ‘আমার মেঘমালা’। গল্পের তপু চরিত্র, বাসর রাতে তার স্ত্রী কালিকে বলছে, ‘এই কালি তুই আমাকে ছুঁবি না। তোকে আমি কোথাও নিয়ে যেতে পারবো না। আমার সাথে তুই বেড়াতে যেতে পারবি না। তুই আমার সাথে কোন কথা বলবি না। তুই আমার সামনে আসবি না।’ থামতে হলো, এমন বাক্য আরো আছে।
এখন লেখকের দায়িত্ব হলো তপুকে উদ্ধার করা। মানবতার এই অপমান নিজে মুছতে না পারেলে বুঝতে হবে লেখক জানেন না গল্প আসলে এক প্রকার নির্মীত সত্য, অথবা নির্মীত মিথ্যা যা জীবন চিনতে সাহায্য করে।
গল্পের শেষ অংশে নার্গিস খান কী করেছেন লক্ষ্য করুন।
‘কালি বলে নিঃশব্দ ডাক হৃদয়ে ধ্বনিত হলো। কালি প্রশ্নে তার আনুগত্য নিঃশর্ত কেন? চোখের কোণে কিঞ্চিৎ জমাট বাঁধা জল অনুসরণ করছে শান্ত নিঃস্বার্থ কালির জন্য আলোময় ভোরের। আপন মনে নিরবে কথোপকথন চলছে, নাহ্ তাকে আর কালি বলবো না। তার নতুন নাম হবে মেঘমালা। ‘মেঘমালা’ বলে চিৎকার করে ডাকছে তপু।’
নার্গিস খানকে ধন্যবাদ। তিনি গল্পে আরো নিবিষ্ট হবেন।
প্রত্যাশা এবং প্রত্যাশা।
আগুনের ঝড় এবং অন্যান্য কবিতায় রুদ্র

আরিফুল হাসান ।।
ছফার
প্রশ্রয়ে যে ক’জন উচ্ছনে গিয়েছিলো (আহমদ শরীফ গংদের বাইরে এবং
প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডামেন্টালিজমের বিরুদ্ধে), রুদ্র তাদের অন্যতম। ঢাকসু
নির্বাচনে অংশ নিয়ে জিগরি দোস্ত কামাল চৌধুরিকে বুঝিয়ে দিয়েছে, না বাবু,
যতই এক বিছানায় ঘুমাই, স্বপ্ন কিন্তু আমাদের আলাদা। এই স্বতন্ত্র স্বপ্নের
ঘোর বয়ে, বাকি জীবনের সংগ্রামী সময় কাটিয়ে দিয়েছেন রুদ্র মুহম্মদ
শহিদুল্লাহ। আমৃত্যু প্রত্যাখ্যান এক তাঁর ভেতরে বাহিরে ঝড় তুলে গেছে, ফলে
বন্ধু আড্ডায় থেকেও রুদ্র মূলত নির্বন্ধু এবং কোলাহলে থেকেও রুদ্র মূলত
ভেতরে ভেতরে নির্জন। তাই একীভূত আগুনের সত্তা যখন উছলে পড়েছে তখন তাঁর রোধ
জানতে পারেনি সমকালীন অন্য ভাষাবীররা এবং রুদ্র এদিক থেকে অনেকগুণ এগিয়ে
যান। ফলে তাঁর তাঁর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয় তাঁর সমকালীন অন্যান্য
কবিদের মাঝে।
রুদ্র আমাদের রুদ্রমঙ্গল। তাঁর কবিতা আমাদের ভেতরের
উদ্গীরণকে উষ্কে দেয় এবং আমাদেরকে করে তুলে দুর্বার। শোষিত মানুষের যাতনার
কথা তাঁর কবিতায় ভাস্বর হয়ে উঠে অবলীলায়। তিনি রাজনীতি সচেতন কবি আবার একই
সাথে গণচাহিদারও বাক্সময় মুখ। তাঁর কবিতায় স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের
রাজনৈতিক উত্তাপ ও অস্থিরতাকে ধারণ করা হয়েছে নিপুণ চিত্রিত গাঁথায়।
বাংলাভাষায় মুখে মুখে ফেরা অধিকাংশ কবিতার জনক রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লা।
কবিতাকে স্রোতৃপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অসামান্য। বোধয় তাঁর
কবিতাই সবচেয়ে বেশি পাঠে ও আবৃত্তিতে মুখর। যদিও অনেকেই তাঁর কবিতাকে
স্লোগানসর্বস্ব মুখরতা বলে অভিযোগ করেছেন, যদিও অনেকে বলেছেন তাঁর কবিতায়
কোনো চিরায়ত দর্শনের অভিপ্রকাশ নেই, তবুও রুদ্র তাঁর আপন আলোয় উজ্বল, তবু
রুদ্র তাঁর আপন বিভায় দেদ্বীপ্যমান।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ বোধয়
সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন জীবনের বোহেমিয়তাঁকে। সত্তরের অনেকের মতো ঘরছাড়া
ঘরের নাবিক হয়ে রুদ্রই শেষপর্যন্ত গৃহের সন্ন্যাসরূপে চিহ্নিত থাকতে
পেরেছেন। যদিও কামাল চৌধুরি, জাফর ওয়াজেদ, আলী রিয়াজ, ইসহাক খানসহ একঝাঁক
স্বপ্নবানরা ছিলো তাঁর সহপাঠী, তবু রুদ্রের মরণপণ বোহেমিয়তাই তাঁকে এগিয়ে
দিয়েছে অন্য সবার থেকে। নীলক্ষেতে, বাকুশাহ মার্কেটের ফটোস্ট্যাট,
কাগজপত্রের দোকানের পেছনে, সারি সারি বন্ধ সাঁটারের একটিতে পাওয়া যেতো
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে। কেরোসিনের বোতলভরা স্বদেশী পানীয়, আকণ্ঠ ঢকঢক
গিলে চিত্তের আগুন নেভাতেন। সামনেই একটা কুকুর লোম উঠা বিবর্ণ দেহ নিয়ে
কুণ্ডুলি পাকিয়ে ঝিমুতো, যেনো মদ খাওয়ার সব মাতলামি ভর করেছে কুকুরটির উপর।
রুদ্র টেবিলের উপর রাখা ছোলা সেদ্ধ মুখে দিতেন, আর বোতলের পর বোতল খালি
হয়ে যেতো নিমিষেই।
এতসব করার পর, এতকিছু করার পর রুদ্র যে কবিতায় রাজত্ব
করে গেছেন, তা একবাক্যে সকলেই স্বীকার করে। স্বীকার না করেও উপায় নেই,
তাঁর কবিতা এমনি শিকার করেছিলো নারী-বৃদ্ধা-ভবঘুরে, দরিদ্র-নিরন্ন আর
নিঃস্ব মানুষদের হৃদয়। জাত থেকে অভিজাত, মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত-করুণ কেরানি
সবাই তাঁর স্লোগানের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছিলো। তাই স্বৈরাচার বিরোধী
আন্দোলনের মূলস্বরটি দখল করে আছেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। তাঁর বাতাসে
লাশের গন্ধ কবিতাটি সে সময় সাড়া ফেলে দিয়েছিলো। মূলত শোষণের মূলে কুঠারাঘাত
করে এমন অজস্র কবিতা রুদ্র লিখে গেছেন। তাঁর বাতাসে লাশের গন্ধ থেকে
কয়েকটি ছত্র পড়া যাকÑ
এই রক্তমাখা মাটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিল।
জীর্ণ জীবনের পুঁজে তাঁরা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আঁধার,
আজ তাঁরা আলোহীন খাঁচা ভালোবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায়।
এ যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আড়ষ্ট কুমারী জননী,
স্বাধীনতাÑএ কি হবে নষ্ট জন্ম?
এ কি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল?
এরকম
আগুন ভাষায় লেখা রুদ্রের সহজজাত। আগুনের হরফে হরফে তিনি ভেঙে ফেলতে চান
সকল নিয়ম-কানুন শৃঙ্খল। তাই তাঁর কবিতায় নজরুলের উত্তরবিদ্রোহ দেখতে পাওয়া
যায়। মূলত, নজরুলের পরে আরেকটি নজরুল হয়ে উঠার সাহস ছিলো রুদ্রের। কখনো পথ
পিছলে গেছে জীবনানন্দীয় আবহ আবার কখনো বা মহাকাব্যিক বর্ণনাভঙ্গি তাঁর
কবিতাকে করেছে ভিন্নচল। তবে যে কথাই বলি, তাঁর যে শুরু থেকে পণ, যে দৃঢ়
প্রতিজ্ঞা মানবজন্মের সাথে, তাতে তাঁকে অবিচল পাওয়া যায় মৃত্যুর আগ
পর্যন্ত। আবার আগুনের ভাষার আড়ালে গভীর এক রবীন্দ্রময়তা দেখতে পাওয়া যায়
তাঁর মাঝে। ফলে তাঁর উন্মেষকালের কবিতাগুলো আত্মবিকিরণ আর আত্মমর্মীতায়
প্রযুক্ত এবং যতই দিন যাচ্ছিলো রুদ্র কেবল ক্রমাগত কবিতা হয়ে উঠছিলেন। শেষ
জীবনে, যখন তসলিমার সাথে বিয়েভঙ্গের দায়ে কবির মন খারাপ, তখন একমাত্র
উপাচার হিসেবে কবিতাকেই তিনি গ্রহণ করেছিলেন সর্বাংশে। তাঁর সে সময়কার
কবিতা যদি একটি দুটি পড়া যায় তাহলে বিষয়টি অনুধাবনের আরো সহজবোধ্য পথ তৈরি
হবে। ‘মানুষের মানচিত্র’ এক শিরোনামে বত্রিশটি কবিতা লেখেছেন যখন তখন তিনি
থাকতেন মিঠেখালি মংলায়। ক্রমাগত কবিতার ভেতর তিনি অনর্গল বলে গেছেন যেনো।
১৯৮৮-১৯৯৯ সালের মধ্যে বত্রিশটি মগ্নকাব্যের এক বিশাল সমাহার তিনি
পাঠকদেরকে উপহার দিয়েছিলেন। মানুষের মানচিত্রের সতেরো নাম্বার কবিতাটি থেকে
একটু পড়া যাকÑ
দিনের আহার শেষে ধবল পাখিটি আর ফিরলো না নীড়ে।
সব বাঁশি বাজলো না, পেলো না হাতের ছোঁয়া সবকটি তার,
ফসল বোনার আগে ভেঙে প’ড়ে গেল জলে গাঙের কিনার।
বুকের শিখাটি জ্ব’লে উঠলো না বেদনার অন্ধকার ছিঁড়ে-
গাঁয়ের হালোট বেয়ে গরুগুলো ঘোরে ফেরে।হাটবারে আসে।
জাংলা থেকে শিম পাড়ে ঘরের নোতুন বউ, মন উচাটন।
খেয়াঘাটে লোক জমে। ওপাড়ায় চুরি হয়। থামে না জীবন-
গাঙের উজান স্রোত চিরকাল যেন এক কালো নৌকো ভাসে।
প্রেমের
কবি বলেও রুদ্রের বেশ নামডাক আছে। বিশেষ করে ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ গানটি
লেখার পর তুমুল জনপ্রিয়তায় তাঁর নাম প্রেমিকের খাতায় চলে আসে। যদিও রুদ্র
ছিলেন স্বয়ংই প্রেমিক। এবং এ প্রেম ধারাস্বাভাবিকতাঁর বাইরে। ফলে তুমুল
মনপ্রিয় ডাক্তার তসলিমা নাসরিনের সাথে ঘর বেঁধেও ঘরে রাখতে পারেননি মনের
মানুষকে। মূলত, তসলিমার প্রগতিবাদিতার ভেতরেও রুদ্র প্রত্যক্ষ করেন এক
নিপাট রমনীয়তা এবং এসব থেকে মুক্তি পেতে তাঁর প্রাণপিঞ্জর ছটফট করে। তসলিমা
প্রেমে, পরিণয়ে রুদ্রকে বাঁধতে চাইলেও দুপুরের রবির মতো অগ্নিতাপ প্রেমের
মালাকে ছিড়ে দিয়েছে কিন্তু অপরাপর দম্পতির মতো রুদ্র তসলিমার ছাড়াছাড়ি হয়ে
গেলেও রুদ্র তসলিমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেননি। উল্টো তসলিমার
পুরুষবিদ্বেষী লেখালেখির সমালোচনা করে বলেছেন, ‘এসব না করে মৌলিক লেখায়
মনোনিবেশ করলে সে হয়তো আরও ভালো করতো।’ যাক সে পুরনো প্রসঙ্গ।
রুদ্র-তসলিমার ছাড়াছাড়ি রুদ্রকে একদমই ঘায়েল করতে পারেনি, বরং রুদ্র আরও
বেশি একা হয়েছে কবিতার জন্য। তখন অসীম সাহার ‘ইত্যাদি’ প্রেসের আড্ডায় সকাল
থেকে সন্ধ্যা অবধি চেয়ারটেবিল বনে বসে থাকতো রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।
নীলক্ষেতের বাবুপুরায় ইত্যাদিতে তখন আড্ডা দিতে আসতেন কবি মহাদেব সাহা,
নির্মলেন্দু গুণ, সাহিত্যিক আহমদ ছফা, চিত্রকর সমর মজুমদার, সঙ্গীতশিল্পী
কিরণচন্দ্র রায়, কবি কাজলেন্দু দে প্রমুখ।
রুদ্রের কবিতা কখনো তাঁকে
ছেড়ে যায়নি। ছোট্ট জীবনে এইটুকুই তাঁর প্রাপ্তি। যদিও জীবন পঁয়ত্রিশের
সীমাবদ্ধতায় আকীর্ণ, তবু জীবন-সীমার বাঁধন টুটে তিনি দশদিকে ছড়িয়ে পড়েন।
তাঁর লেখা কবিতাই শুধু জনপ্রিয় হয়নি। চিঠি, সাহিত্য সমালোচনা, কাব্যনাট্য,
গল্প এবং গানের জগতেও তিনি ছিলেন বিখ্যাত। তাঁর রচিত কবিতাগুলোর মধ্যে
অধিকাংশ যদিও দ্রোহের, তবে প্রেমের কবিতার তাঁর কম নয়। জীবন ও নারীকে তিনি
পাঠ করেছিলেন নিবিড় নিষ্ঠায়। ইতিহাস চেতনায়ও তিনি ছিলেন বেশ সজাগ এবং
কবিতার উৎকর্ষতাঁর ব্যাপারে ছিলেন সতর্ক। তাঁর একটি কৃষ্টিনিষ্ঠ কবিতার পাঠ
নেয়া যেতে পারে।
‘শাড়িতে তোমাকে মানায় সবচে’বেশি
এবং তা যদি স্বদেশের তাঁত হয়।
অস্ট্রিক–ভাষী ভেড্ডিড জনধারা
বয়ে এনেছিল যে-পোশাক দেহে কোরে,
আজকে তা শাড়ি নাম নিয়ে আছে বেঁচে।
পুরুষের ধুতি লুপ্ত হয়েছে প্রায়।
মাটি ও জলের মাতৃভাষার সাথে
মিশে আছে স্বাদ, দিনযাপনের ভাষা।
শ্রমের স্বভাবে গাঁথা মানুষের দিন,
তাঁর সাথে গাঁথা প্রাণের স্বভাবগুলো।
শাড়িতে তোমাকে মানায় সবচে’ বেশি
এবং তা যদি স্বদেশের তাঁত হয়।
নগ্ন দেহের শ্যামল প্রকৃতি ঘিরে
নদীর মতোন জড়িয়ে থাকবে শাড়ি।
আগুনের
ঝড় হয়ে এসেছিলেন রুদ্র। পুড়িয়ে দিয়েছেন রাজপথের সন্ত্রাস। স্বৈরাচারী
এরশাদের আশকারা পেয়ে সুবিধাভোগী কবিরা যখন এশীয়া কবিতা উৎসব করে তখন রুদ্র
তাঁর প্রতিবাদে দাঁড় করান জাতীয় কবিতা পরিষদ। যদিও এখন শুধু তাঁর কাঠামোটাই
আছে আর প্রাণ ও মেরুদণ্ডটা ভেসে গেছে কোনো বেনুজলে। তাঁর আদর্শ,
সাংস্কৃতিক উদ্দেশ্য কিছুই এখন রক্ষিত হচ্ছে না যদিও তবু কবিতা পরিষদ
স্বৈরাচারি এরশাদের পতনে জোড়ালো ভুমিকা রেখেছিলো এ কথা অনস্বীকার্য।
মাত্র
সাতটি কবিতার বই লিখেছেন ছোট্ট জীবনে। ‘উপদ্রুত উপকূল’ থেকে শুরু করে
‘মৌলিক মুখোশ’ এর নাতিদীর্ঘ চিত্রে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলার ইতিহাসের
দীর্ঘ প্রেক্ষাপট। বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের অসম লড়াই, ৪৭-উত্তর পূর্ব
বাংলায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের পুনর্জন্ম, বাংলাদেশের অভ্যুদয়,
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অপঘাতÑ কোনোটিই বাদ
পড়েনি তাঁর আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে। জীবনের বেদনা ও মাধুরীকেও প্রশ্রয় দিয়ে
এঁকেছেন। বলা বাহুল্য, প্রেম তাঁর মাধুরী, বেদনা তাঁর নিষ্প্রেম
নৈঃসঙ্গ্য; সব কিছুর মর্মমূলে ঘা দেয় আর্থসামাজিক বাস্তবতা। আর এ জন্যই
রুদ্র হয়ে উঠেন মিছিলের অগ্রভাগে জ্বলন্ত মশাল।