
আবু আহমেদ ||
অর্থমন্ত্রী
আ হ ম মুস্তফা কামাল ৯ জুন জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট পেশ
করেছেন। আমরা জানি, প্রস্তাবিত বাজেটের যে খসড়া উত্থাপিত হলো, এর ওপর দীর্ঘ
আলোচনা শেষে চলতি অর্থবছরের বাজেট পাস হবে। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের
আকার ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। এই বাজেটের ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪১
হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। আর অনুদান ছাড়া ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি
টাকা। বাজেটে যে ঘাটতি দেখানো হয়েছে, তা যে বিপুল- এ বিষয়টি তর্কাতীত।
যেসব উৎস থেকে এই ঘাটতি মেটানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা এত সহজসাধ্য হবে
বলে মনে হয় না।বাজেটে যে ঘাটতি রয়েছে, তাতে মুদ্রাস্ম্ফীতি আরও বাড়বে।
অভ্যন্তরীণ উৎস কিংবা বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে সরকার ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়াবে।
রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে, তা কতটা সম্ভব হবে এ-ও বলবে
ভবিষ্যতে। আসলে দেশের রাজস্ব আদায় নির্ভর করে বিনিয়োগের ওপর। দেশের অধিকাংশ
রাজস্ব আসে করপোরেট ট্যাক্স খাত থেকে। এটা সরাসরি বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত।
বিনিয়োগ না বাড়লে রাজস্ব আদায় বাড়বে না। আয়কর, ভ্যাট কিংবা আমদানি-রপ্তানি
যা-ই বলেন, সবকিছুই বিনিয়োগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটা কথা আমলে রাখা
দরকার, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এমনিতেই মূল্যস্ম্ফীতি বাড়ছে। এ অবস্থায়
বিপুল ঘাটতি এ ক্ষেত্রে বাড়তি উপসর্গ বললে অত্যুক্তি হবে না।
আমরা
দেখছি, ক্রমাগত ঘাটতির পরিমাণ বাজেটে বাড়ছে। এভাবে বাজেটের ঘাটতি বাড়তে
থাকা ঠিক নয়। অভ্যন্তরীণ ঋণের বিপরীতে যে সুদ দিতে হচ্ছে, এর হারও অনেক।
সার্বিকভাবে প্রস্তাবিত এই বাজেট কীভাবে দেখছি, এর উত্তর যদি দিতে হয় তাহলে
বলব- কথায় চমক আছে, গাণিতিক হিসাবে অনেক কিছু আছে; কিন্তু বাস্তবতা কত
ভিন্ন, তা তো দৃশ্যমানই। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, মূল্যস্ম্ফীতি ৫ দশমিক ৬
শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্যই মূল চ্যালেঞ্জ। আমি স্পষ্টতই মনে করি, এই
লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখা কঠিন। এমনিতেই তো মূল্যস্ম্ফীতি অনেক বেশি। ৫ দশমিক ৬
শতাংশের হিসাবটা কীভাবে করা হলো, তা আমার বোধগম্য নয়। বিদ্যমান পরিস্থিতি
সাক্ষ্য দিচ্ছে, মূল্যস্ম্ফীতি অনেক বেশি হবে। একদিকে মূল্যস্ম্ফীতি বাড়ছে,
অন্যদিকে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাব ক্রমেই প্রকট
হচ্ছে।
মূল্যস্ম্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে রাখতে পারলে তো খুবই ভালো।
কিন্তু এমন হিসাব কষা হয় কী করে, যার বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন? এই ভুল
হিসাবের ফলে আরও বেশি নেতিবাচকতা সৃষ্টি হয়। মূল্যস্ম্ফীতি যদি ৫ দশমিক
৬-এর ঘরে রাখতে পারা যায়, তাহলে অর্থমন্ত্রীকে আমরা বাহবা দেব নিশ্চয়।
ডলারের দাম টাকার বিপরীতে বেড়েই চলেছে। এর কারণটা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা
অধিক নয় কি? আমাদের অভ্যন্তরীণ কারণগুলো যদি অনালোচিত থাকে, তাহলে মানুষ
সুফল পাবে কী করে? বাজেটে গাণিতিক হিসাবে এলোমেলো করে অনেক কিছু তুলে ধরা
সম্ভব; কিন্তু এর বাস্তবায়ন যে বড় চ্যালেঞ্জ, তা দায়িত্বশীলরা ভুলে গেলে
চলবে কী করে?
ব্যাংকে পাঁচ কোটি টাকার বেশি থাকলে বাড়তি কর আদায়ের কথা
বলা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত সঠিক বলে মনে করি না। ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রেখে
বাড়তি আয় করলে না হয় কর দেওয়া গেল। কিন্তু যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই তা হবে
না, তখন তা কীভাবে করা হবে? যেমন চলতি হিসাবে একজন গ্রাহক টাকা রাখলেন।
সেখান থেকে তার আয় কী? এমতাবস্থায় তিনি কর দেবেন কী করে? এই সিদ্ধান্তের
ফলে অনেকেই যা করবেন, তা হলো ব্যাংকে টাকা না রেখে ঘরে তা সঞ্চয় করবেন।
তাতে অর্থনীতির ক্ষতি হবে। ব্যাংকে ৫-১০ লাখ টাকা রাখলেও এখন আবগারি
শুল্ক্ক বা বিভিন্ন সার্কুলারের অজুহাত দিয়ে টাকা কাটা হচ্ছে। এর ফলে যে
পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, সার্বিকভাবে তা অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনছে না।
টাকা
নিয়ে মানুষ যদি ব্যাংকমুখী না হয়ে ঘরমুখী হয়, তাহলে কার্যত এর ফল তো ভালো
হওয়ার কথা নয়। অন্য দেশে এসব ব্যাপারে কোন পন্থা অবলম্বন করা হয়, তা-ও
পর্যালোচনা দরকার। আশা করা হয়েছে, প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। খুব
ভালো। ৭ দশমিক ৫ করতে পারলে তো তা হবে অনেক আশাব্যঞ্জক। তবে বিষয়টি
সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আমাদের রপ্তানির ওপর। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি গত এক বছর যা
দেখা গেছে, তা বজায় রাখতে পারলে (গত এক মাসের হিসাব বাদ দিয়ে) আশার ঘরে
বাসা হতে পারে। প্রবাসী আয় আমাদের অর্থনীতির অন্যতম বড় জোগানদার। কিন্তু তা
এখন নিম্নমুখী। অর্থাৎ প্রতিকূলতা সামনে অনেক।
পাচার করা টাকা ফিরিয়ে
আনার ক্ষেত্রে বৈধতাদানের কথা বলা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- তা কীভাবে করা হবে।
যিনি টাকা পাচার করলেন, তিনি এই ঘোষণার পর ওই অর্থ রেমিট্যান্স হিসেবে
দেশে পাঠাবেন। কিন্তু আমাদের রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে ট্যাক্স ফ্রির
ব্যবস্থা রয়েছে। এ অবস্থায় কি পাচারকারীকে উৎসাহিত করা কিংবা পুরস্কৃত করা
হলো না? পাচার করা অর্থ অন্যভাবে ফিরিয়ে এনে যদি কর আদায় করা হয়, তাহলে ঠিক
আছে। কিন্তু সিদ্ধান্তটা কীভাবে নেওয়া হবে, এর ওপর নির্ভর করছে এর
সুফল-কুফল। এ ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা খুব প্রয়োজন ছিল। অর্থ পাচার
আমাদের একটি ভয়াবহ ব্যাধি। অর্থ পাচার ঠেকানোর জন্য যেসব ব্যবস্থা নিশ্চিত
করা জরুরি, সেসব ক্ষেত্রে কতটা কী করা হলো- জানার বিষয় সেটি।
পাচারকারীর
অর্থ ফিরিয়ে এনে সেই অর্থের বৈধতা দেওয়া হবে, অথচ কোনো প্রশ্ন করা যাবে
না- এ কেমন কথা! এর ফলে যা হবে তা হলো এখান থেকে টাকা পাচার করে আবার
পাচারকারী বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে নিয়ে এলেন। তাতে লাভ হলো কার? অর্থ নিয়ে
এখানে কত রকম কেলেঙ্কারিই তো হয়েছে! কত মানুষের ই-টিআইএন আছে; কিন্তু এর
মধ্যে কর দেন কতজন? বড় করদাতা অনেকেই তো ঠিকমতো কর দেন না। এটাও তো রাজস্ব
ঘাটতির অন্যতম কারণ। পরিস্থিতি উত্তরণে কর-ফাঁকিবাজদের আইনের আওতায় আনা
উচিত। তা ছাড়া সরকারি ব্যয় যদি দক্ষতার সঙ্গে করা না হয়; নির্দিষ্ট সময়সীমা
মানা না হয়; দুর্নীতি-অনিয়ম বন্ধ ও অপচয় হ্রাস করা না যায়, তাহলে বাজেটের
আকার বাড়িয়ে লাভ কী? বাজেট বড় হলেই আমরা খুশি হতে পারি না।
রপ্তানি,
বিনিয়োগ, প্রবাসী আয় ইত্যাদি যদি নিম্নগামী হতে থাকে, তাহলে সব প্রত্যাশাই
মাঠে মারা যাবে। বিদেশি বিনিয়োগের ব্যাপারে কাজের কাজ কতটা কী করা গেল,
তা-ও দেখতে হবে। শুল্ক্কমুক্ত বাণিজ্য চুক্তি যদি বাংলাদেশ করতে না পারে,
তাহলে কীভাবে অর্থনীতির স্ম্ফীতি আশা করা যায়? এসব ক্ষেত্রে কি আমাদের
উল্লেখযোগ্য সাফল্য আছে? বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শুল্ক্কমুক্ত বাণিজ্য চুক্তি
না করে সমৃদ্ধ অর্থনীতি কিংবা বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে এত কথার যৌক্তিকতাই বা
কী?
বাজেটে এডিপির আকার বড় হলে অনেকে খুশি হন। ব্যক্তিগতভাবে আমি খুশি
হতে পারি না। কারণ, এডিপির আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতিও বড় হতে থাকে।
ঋণ করে অর্থ এনে এর সঠিক ব্যবহার হয় না। আমাদের রাজস্ব বাজেট বেড়ে যাচ্ছে।
এর প্রধান কারণ সরকারের কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় জনবল অনেক
বেশি। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কাজ না থাকলেও জনবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এক সময়
রাজস্ব বাজেটের চেয়ে উন্নয়ন বাজেট বেশি হতো। এর পর তা প্রায় সমান সমান হয়।
পরে দেখা গেল, রাজস্ব বাজেট উন্নয়ন বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে। জনগণকে
করভার থেকে মুক্ত করতে সরকারের আকার ছোট করার বিকল্প নেই।
প্রস্তাবিত
বাজেট নিয়ে যে আলোচনা-সমালোচনা হবে, সেসব আমলে নিয়ে যেসব ক্ষেত্রে সংশোধন
প্রয়োজন, তা করাই শ্রেয়। গঠনমূলক সমালোচনায় ক্ষুব্ধ না হয়ে গভীরভাবে তা
আমলে নিলে কল্যাণের পথ চওড়া হবে। বাজেটের আকারের চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে
সম্পদের জোগান। আমাদের মতো দেশে যত বেশি অর্থের জোগান হয়, সরকার তত বেশি
অর্থ ব্যয় করে। এই ব্যয়ের ক্ষেত্রে আবার অস্বচ্ছতাও বৃদ্ধি পায়। সুতরাং
বাজেটের আকারের চেয়ে কার্যকারিতা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আবু আহমেদ: অর্থনীতিবিদ; অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়