
চট্টগ্রাম
মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থান নেই। আগুনে পোড়া
রোগী নেওয়া হচ্ছে অন্য ওয়ার্ডে। সেখানেও ঠাঁই হয় না। রোগী রাখা হচ্ছে
বারান্দায়।
কারো সারা শরীর, কারো হাত-পা, কারো চোখ-মুখ পুড়ে গেছে। কারো
কেটে গেছে, কারো বা হাত-পা ভেঙেছে। আহত ও পোড়া রোগীদের চিৎকারে আকাশ-বাতাস
ভারী হয়ে উঠেছে। সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে শনিবার রাতের ভয়ংকর
অগ্নিকাণ্ডের পর মুহূর্তে এমনই অবস্থা ছিল চমেক হাসপাতালসহ চট্টগ্রামের
সরকারি-বেসরকারি আরো কয়েকটি হাসপাতালে। অন্যদিকে মানুষ যে মানুষের জন্য,
মানুষের মানবিকতা যে হারিয়ে যায়নি, তা বোঝা গিয়েছিল সেই রাতেই। স্বাভাবিক
সময়ের মতো সেই রাতেও অনেক চিকিৎসক-নার্স হাসপাতালের ডিউটি সেরে বাড়ি চলে
গিয়েছিলেন। তাঁদের কাউকে খবর দিতে হয়নি। কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড
এবং বহু মানুষের হতাহত হওয়ার খবর শুনেই তাঁরা ছুটে এসেছিলেন নিজ নিজ
হাসপাতালে। হাসপাতালের বার্ন ইউনিট, অর্থোপেডিক, চক্ষু, সার্জারিসহ
বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীদের ভর্তি করা হয়ে থাকে। সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েন আহত
রোগীদের চিকিৎসা কিংবা সেবায়। ছুটে এসেছিল অনেক সাধারণ মানুষও। আহত রোগীদের
অনেকেরই রক্ত প্রয়োজন। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তারা এগিয়ে গেছে। রক্ত দিয়েছে।
অনেকের জরুরিভাবে ওষুধ প্রয়োজন, অর্থ নেই। অনেক ওষুধের দোকান থেকে বিনা
মূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। সেই রাত থেকে তিন দিন ধরে মানুষ এভাবেই
মানবিকতার সর্বোৎকৃষ্ট নজির স্থাপন করে এসেছে।
বাড়িঘর, বিপণিবিতান,
গার্মেন্ট কারখানা বা অফিস-আদালতে আগে বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও কোনো
কনটেইনার ডিপোতে এত বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বাংলাদেশে এর আগে আর ঘটেনি।
ডিপোতে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ থাকায় বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে। সেখানে
অগ্নিনির্বাপণ ও হতাহতদের উদ্ধারে গিয়েছিলেন দমকল বাহিনীর অনেক সদস্য।
ছিলেন পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্য। স্থানীয় লোকজনও গিয়েছিল উদ্ধার
অভিযানে অংশ নিতে। কনটেইনার বিস্ফোরণে তাঁদের অনেকেই হতাহত হয়েছেন। তার পরও
কেউ পিছিয়ে যাননি। হতাহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। যাঁর
যতটুকু ক্ষমতা আছে তিনি সেভাবেই আহতদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সারা
রাতই রোগী আনা হয়েছে হাসপাতালে। চিকিৎসক-নার্সদের এক মুহূর্ত দাঁড়ানোর উপায়
নেই। এখান থেকে সেখানে, একজনের পাশ থেকে আরেকজনের পাশে ছুটে বেড়িয়েছেন।
স্বজনহীন, আত্মীয়-পরিজনহীন অবস্থায় অনেক রোগী বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন।
স্থানীয় মানুষ তাঁদের পাশে বসে আপনজনের মতোই সান্ত্বনা দিয়েছে। প্রয়োজনীয়
জিনিস সংগ্রহ করে দিয়েছে। এমন মানবিকতার উদাহরণ বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথায়
পাওয়া যাবে! এর আগেও আমরা দেখেছি রানা প্লাজাধস, তাজরীন ফ্যাশনস লি., কিংবা
নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পর হাজার হাজার মানুষ কিভাবে ছুটে এসেছিল
আর্তমানবতার সেবায়।
মানুষের সংকটে মানুষ পাশে দাঁড়াবে, এটাই স্বাভাবিক।
আর সেই স্বাভাবিক ও সেরা মানবিকতার যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন চট্টগ্রামের
চিকিৎসক, নার্স, বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য এবং সাধারণ মানুষ—এককথায় তা
অবিস্মরণীয়। তাঁদের প্রতি আমাদের অগাধ শ্রদ্ধা। আমরা আশা করি, এভাবেই এগিয়ে
যাবে এক মানবিক বাংলাদেশ।