
মাছি

কাজী মোহাম্মদ আলমগীর ||
মাধবিকে একবার বলেছিলাম, মাছি হতে আমার খুব ইচ্ছে করে। শুনে তো মাধবি অবাক। কেন মাছি হতে ইচ্ছে করে। আমাদের বাসার সামনে মহিবের দোকানের নাম ‘ক্ষুদ্র টেইলার’। দর্জি দোকান। ক্ষুদ্র মানে ছোট। কাজ কাম খুব একটা নেই। মহিব প্রায় মন খারাপ করে বসে থাকে। তার সংসার কিভাবে চলে ভাবতে গেলে মাথা ঘুরে। প্রতিলিটার তেলার দাম ০০০ টাকা। মাধবির অনেক ক্ষমতা, তাতে আমার কী! মাধবিকে আবার বলি, আমার মাছি হতে ইচ্ছা করে। মাধবি আমাকে এক চোট নেয়। ‘ময়লা আবর্জনা ভালো লাগে!মনের ভেতর কুৎসিত চিন্তা আছে তাই মাছি হতে চাও?’
না, মাধবির চিন্তার সঙ্গে আমার চিন্তা মিলে না। কথায় কথায় মাধবি চেতন থেকে অবচেতনে চলে যায়। আমি আবার বলি, মাছি হতে ইচ্ছে করছে এবং এ কথা বলে মাছি হওয়ার চেষ্টা করে সফল হই। প্রথমে উড়াল দিয়ে পাশের বাড়ির গোলাপ গাছটায় গিয়ে ফুলের উপর বসি এবং কোন প্রকার আনন্দ ছাড়াই সেখান থেকে পালিয়ে আসি। মাছি, গোলাপে আনন্দ পাবে কেন!তারপর মাধবির নাকের উপর । মাধবি খুব বিরক্ত। মাধবিকে আমি দেখছি নতুন করে আমার অক্ষি মঞ্জুরী দিয়ে। আমার চোখে হাজার লেন্স। আমি ১৬০ ডিগ্রি কোনেও দেখতে পারি। বাহ! একটা নাক কতোভাবে কতো তলে বিস্তার করে শ^াস গ্রহণ করে এবং ছাড়ে। বেঁচে থাকার জন্য এই অঙ্গটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার উপস্থিতিতে মাধবির নাকে সুরসুরি ওঠে। এভাবে কোন নারীকে দেখা কঠিন। তার নাকের উপর বসে তাকে দেখা। মাধবি ঠাস করে একটা থাপ্পর লাগায়। মাছি মারা কঠিন কাজ। এটা শুধু কেরানিরা ভালো পারে। কেরানিরা এপর্যন্ত কতো মাছি মেরেছে জানা অসম্ভব ।

তবে তারা প্রচুর ‘সময়’ নাক দিয়ে টেনে বাতাসে মিশিয়ে দিয়ে পৃথিবীর বয়স বাড়িয়েছে এ কথা বলা যায়। ইংরেজরা এদেশে কেরানি তৈরি করে সার্থক হয়েছে। মাধবির থাপ্পর মিস হয়। আমার আনন্দ লাগে। ঠিক আছে মাধবির উপর প্রতিশোধ নেয়ার অনেক সময় আছে। আমি একটু ঘুরে আসি। বেশি দূর যেতে পারবো না। মাছি তো আর আন্ত মহাদেশীয় পাখি না, উড়াল দিয়ে দনবাস-মারিওপুল থেকে, কিয়েভ থেকে, যুদ্ধের ধোঁয়া থেকে বাঁচতে অসময়ে জাহাঙ্গীর নগরের লেকে এসে ভেসে ভেসে দুশ্চিন্তা করবে। আমি পাশেমনোয়ার মিয়ার চা দোকানের ভুনা ছোলা বুটের গোলাকার থালার কিনারে গিয়ে বসি। কী চমৎকার ঘ্রাণ ভুনা ছোলার। জিরা বাটা দিয়েছে উপযুক্তভাবে। কাটা কাটা সুন্দরপেঁয়াজভাজাকে কী বিচ্ছিরি ভাবে বলা হয় বেরেস্তা, তাও আছে। লম্বা লম্বা কাঁচা মরিচ। ঝাল ছোলা মাধবির খুব পছন্দ। প্রতিদিন ইফতারির সময় মাধবির ভুনা ছোলা ছাড়া মন ওঠে না। তখন একটা ট্রাক, মাটি ভর্তি ট্রাক সাঁই করে চলে গেলে বিশাল এক ধুলির চাদর মনোয়ার মিয়ার চা দোকানে ঢুকে পড়ে। ধুলির চাদর আস্তরণ হয়ে ছোলা বুটের উপর পড়লে আমি উড়াল দিয়ে পাশের কাঁচের সুকেইসের ভেতর বসি। একজন কাষ্টমার ছোলা খেতে খেতে বলে,‘মাদলাসাল পাশেলআমিল দিঘীল মাটি কাটা হচ্ছে। ৪ কোটি টাকাল মাটি কাটা শেষ হলে মাটি নেয়া বন্ধ হবে। দিঘীটাল দিকে তাকালে মনে হয় এই বুঝি চালপাল ভেঙ্গে পলবে। কোন ইঞ্জিনিয়াল দিয়ে পলখ না কলে এ মাটি কাটা হচ্ছে। পূল্ব পালটা ভাঙ্গলে বিশাল আবাস হুমকীল মুখে পলবে।’ লোকটা সকল ‘র’ শব্দকে ‘ল’ উচ্চারণে কথা শেষ করলো, মনে হলো লোকটা র’ শব্দে- তোতলা। এসব কথা আমার অক্ষি মঞ্জুরীর উপর বিভিন্ন দৃশ্য তৈরি করলে আমার মাথা ঘুরে উঠে। এবার আমি কোথায় যাই। ভয় হচ্ছে। মাছির ক্ষুদ্র জীবনে দেখার সুযোগ কম। একেই জায়গায় ঘুরপাক খাওয়া জীবন।মনোয়ার মিয়ার হাতে মাছি তাড়ানোর একটি যন্ত্র, চিকন চিকন কাগজ দিয়ে তৈরি ঝাড়ু। ঝপ্ করে আঘাত করলে আমার অক্ষি মঞ্জুরী শেষ, আমিও শেষ। এখান থেকে বের হতে হবে। আমার অনেক দিনের ইচ্ছে একজন ক্ষমতাবান লোকের নাকের উপর বসে তাকে দেখা। কিভাবে তিনি চোখ রাঙান। কিভাবে তিনি হাতের আঙুল দিয়ে গোম্ফ ঘষেণ, দাড়ি ঘষেণ, অথবা সেভ করা হালকা নিলাভ থুতনিতে তর্জনী হেলানে চিন্তিত হন। তখন তার মেজাজ কেমন হয়। তখন কী তার নাক বা কপাল ঘামতে থাকে। সেই অবস্থায় কী তার নাকের উপর কোন মাছি বসে!
আমি সামান্য নকল মাছি। আসল মাছিরা যদি আমাকে চিনে ফেলে তবে তাড়া করবে। আমার দরকার ক্ষমতাবানের নাক। কিন্তু মানুষ মুখ ঢেকে চলতে শুরু করেছে। আসমানি রঙের কাপড় দিয়ে মানুষ মুখ ঢেকে রাখে। সেই সঙ্গে নাকও ঢেকে রাখে। আমি সামনের হাত দুটিকে কোনভাবে থামাতে পারছি না। ক্ষমা চাওয়ার মতো করে দু হাত বার বার ঘষছি। মহা বিরক্তিকর। কোন অপরাধ না করে এতো ক্ষমা চওয়া।
একজন সব্জি বিক্রেতার ঝুড়িতে বসে চললাম। ঝুড়ির রশিতে বসে চলছি। সব্জিতে বসতে পারছি না। তাজা সব্জি। কিন্তু বিভিন্ন রকম ওষুধের ঘ্রাণ পাচ্ছি। সম্ভবত কীটনাশক। কোনটাতে কীটনাশক নেই বলতে পারবো না। কিছুদূর যেতে লোকজনের কোলাহলে দিশাহারিয়ে সব্জির ঝুড়ি থেকে উড়াল দিয়ে কোলাহলের ভেতরে ঢুকে গেলাম। তেল নিয়ে তেলেসমতি চলছে। আমি তেলের মালিকের নাকের উপর গিয়ে বসলাম। মালিক লোকটা ভেতরে ভেতরেউৎফুল্ল। তার ছবি টেলিভিসনে দেখানো হবে। তেল মজুদের কোন অপরাধবোধ তার মধ্যে নেই। সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে জরিমানার টাকা দিলো। লোকটাকে যদি বলা হতো একটু নাচেন , মনে হয় থামতে না বলা পর্যন্ত নেচে চলতো। আমি তার নাকের উপর বসে আছি। তার কোন খেয়াল নেই। তার কোন সুরসুরী লাগে না। নির্বোধ লোক। গণ্ডায় গণ্ডায় নির্বোধ, তাদের হাতে তেল, তাও লুকানো চুকানো।তাদের চেয়ে মাছির জীবন অনেক ভালো। মাছি ক্ষমা চায়। সামনের হাত সে ঘষতে থাকে। ক্ষমা করে দাও, ক্ষমা করে দাও। আমি জীবানু বহনকারী পতঙ্গ। কতো রোগ ব্যাধি ছড়াই। তবে তোমাদের মতো তেল মজুদ করি না।
এবার কোথায় যাই! যাবো আর কোথায়। মাধবিকে দেখি কী করছে সে একা একা । উড়াল দিয়ে বাসায় আসি। ওমা মাধবি কথা বলছে মোবাইলে। মাধবির কাছে গিয়ে বসতে হবে। তার ডান হাতে মোবাইল। ডান কাঁধের কাপড়ের উপর বসতেই আমি দু পক্ষের কথা শুনতে শুরু করি।
মেবাইলের ভেতরে কে একজন বলে‘জী, তোমার লোকটাকে কথা বলার সুযোগ দিবে না। সে মাছি হতে চায় নাকি হাতি হতে চায় এ কথা তার মনের ভেতর গোপন রাখতে হবে। সংসারের অশান্তি হয় এমন কোন কথা বলা দণ্ডনীয় অপরাধ। তুমি বলবে এসব আর বললে তাকে দেখিয়ে দিব। তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে তার কী!সংসার চালাও তুমি। লোকটা আর কী করেবল তো।’
মাধবি বলে, ‘ও করে কিনা জানি না। তখন থেকে একটা মাছি আমার নাকের উপর ঘুরে ঘুরে বসছে। আমি অনেক চেষ্টা করেমাছিটাকে মারতে পারছি না। কয়েকটা মাছি ইতোমধ্যে মেরেছি কিন্তু নাকের উপর কোন্ মাছিটা বার বার বসছে বলতে পারছি না।’
‘তুমি কি তোমার নাকে ঝাটার বাড়ি দিতেছো?’ মোবাইলের ভেতর থেকে জানতে চাইছে।
মাধবি চুপ করে কী যেন ভাবে। আমি কিন্তু বুঝতে পারলাম না মাধবির সঙ্গে কে কথা বলছে। শালা ধমক দিচ্ছে আমাকে। তারে কাছে পাইলে আমি তার নাকের উপর বসে আমার ক্ষমতা দেখিয়ে দিতাম।
‘মাধবি চুপ করে আছো কেন?আমি তোমার জন্য কী করতে পারি বলো।’ মোবাইলের ভেতরের লোকটা বলে।
মাধবি অভিমানী কণ্ঠে বলে, ‘তুমি আমার জন্য কিছু করতে পারো না। তুমি যদি কিছু করতে চাও তাহলে বলছি, পৃথিবীর সব মাছি মেরে দেখাতে পারো।’
আমার কী আনন্দ লাগছে। সাব্বাস, এই না বলে চাকরি। কেরানির চাকরি। সারা পৃথিবীর মাছি মারার চাকরি। শালার বেটা এবার ভাগবে। প্রেম! মাছি মারার পরীক্ষায় পড়েছে। এই না সাহসী নারী, আমার মাধবি।
এবার আমি মাধবির নাকের উপর আরাম করে বসি। মাধবি টের পায় আমি তার নাকের উপর বসেছি। সে ধীরে ধীরে ড্রেসিং টেবিলের দিকে মুখ ঘুরে দাঁড়ায়। আমার দিকে স্পষ্ট দৃষ্টিতে তাকায় কিন্তু আমাকে চিনতে পারে না। পৃথিবীর সকল ঘরো মাছি এক রকম। সকল নীল মাছি এক রকম। আমি হলাম ঘরো মাছি। মাধবির দুই হাত প্রথমে দুই দিকে প্রসারিত হয়। আমি বুঝতে পারি মাধবি এখন আমকে নাকের উপর ঝাপ্টা দিয়ে ধরবে। মাধবির ক্ষমতাও অনেক। আমি এখন ধরা দিব । উড়াল দিব না। আমি বুঝতে পারছি ক্ষমতাবানরা সহজে মাছি মেরে ফেলে। ক্ষমতাবানের নাকের উপর সহজে বসা যায় না। সত্যি তাই হলো। মাধবি তারহাতে থাকা শলার ঝাড়ু দিয়ে আমাকে তাড়া করলো। আমাকে পালাতে হবে। উড়াল দিয়ে মহিবের ক্ষুদ্র টেইলারে ঢুকে পড়লাম। মহিব আমাকে বলে , বেয়াদবি মাপ করবেন, একটু আগে এক কাপ চা এনেছি। এখনো ঠাণ্ডা হয়নি আপনি খেলে খুশি হবো। আমি কোন কথা না বলে চায়ের কাপ মুখের কাছে নিয়ে দেখি একটি মাছি চায়ের ভেতর মরে আছে।
সুন্দরী কাকীদের অহংকার

আরিফুল হাসান ||
আমাদের জয়নাল কাকার স্ত্রী সুন্দরী। শুধু সুন্দরীই না, অপরূপ সুন্দরী। একবার দেখলে আর চোখ ফেরানো যায় না। আমরা সবাই জয়নাল কাকার বাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করি। কাকী আমাদেরকে দেখেন। আঁড়চোখে জানলার ফাঁকদিয়ে একপলক দেখেই হেসে মুখ লুকিয়ে ফেলেন। হাসলে কাকীকে আরও সুন্দর লাগে। মনে হয় আসমান থেকে হুরপরি নেমে এসেছে। ফলে আমাদের রাতদিন এক হয়ে যেতে থাকে জয়নাল কাকার বাড়িতে।
কাকা কি আমাদের মতলব বুঝে না? বুঝে। তবে বুঝলেও চ্যাংড়া পোলাপানদের সাথে কে লাগতে যায়। কাকা তেমন কিছু বলে না আমাদেরকে। একবার কাকার সেলুতে গোসল করার সময় ভুল করে বকেছিলো, আর রক্ষা হয়নি তার। রাতে সেলু ঘরের মেসিন খুলে সাতআটজন পোলাপান মিলে মেশিনটি কাধে নিয়ে খিলের ধারের দিঘিতে ফেলে দিয়ে এসেছি। বছর শেষ হলে দিঘী যখন সেচবে তখন তার অতল থেকে বেরিয়ে আসবে কাকার লালরঙের ষোলোঘোড়া মেসিন। সেবার মেসিন চুরি হওয়ায় কাকার একার ক্ষতি হয়নি। গ্রামবাসী কৃষকদেরও ক্ষতি হয়েছে ইরিতে ঠিক সময়ে পানি না পাওয়ার কারনে। তারপর থেকে কাকা আর আমাদের সাথে দোছরা কথাবার্তা কয় না।
একদিন কাকার বাড়িতে গেলাম কাকীকে দেখার জন্য। গিয়ে দেখি কাকী রান্নাবাড়া করে। আহারে, এমন চান্দের মতো কাকী আমাদের আগুনের তাপে পুড়তাছে! কাকীকে বললাম, একটা কাজের মাইয়া রাখতে কন জয়নাল কাকারে। এতো ট্যাকাপইসা দিয়া কী করবো? যুদি জীবনডারেই আরাম দিতে না পারে? তারপর কইলাম, আপনেরে এই আগুনের মইধ্যে না দেইখা যদি নিজের গায়েও আগুন লাগতে দেখতাম বোধয় এত পুড়তাম না। কাকী ফিক করে হেসে ফেলে। বলে, ঘরে যাও। আমার এক সুন্দরী বইন এসেছে। দেখো ওর সাথে বাউটাউ করতে পারো কিনা। ঘরে গিয়ে আমার তো চক্ষুতে চড়কগাছ। ওমা, ও আল্লাহ, আমি এটি কী দেখছি। স্বয়ং একটি চাঁদের পুতুল বসে আছে সোফার উপর। মিস্টি হেসে তাকে বিয়াইন বলে সম্বোধন করি। সে আসলে জানে না আমি তার সম্পর্কে কে হই। তাই বিয়াইন ডেকে আরেকটু নিকটে যাওয়ার চেষ্টা। কাকীর বোন মিষ্টি হেসে আমাদের সাথে কথা বলে। সে যখন হাসে, তখন স্ফটিকের মতো দাঁতগুলো থেকে মুক্তোর ঝিলিক ঝরে পড়ে।
কাকীদের বাড়িতে আর বেশিদিন যাইনি কারন কাকীর বোন আমাকে তার মুঠোফোন নাম্বার দিয়েছে। এখন দিনরাত শুধু কাকীর বোনের সাথে টাংকি মারি। দিনরাত রাতের ভেতর, রাতদিন দিনের ভেতর মিশে যেতে থাকে। কাকীর বোন সুলতানা আমার স্বাভাবিক জীবনে একটি অন্যরকম পরিবর্তন নিয়ে আসে। ফলে স্বভাবতই আমি আমার নৈমিত্তিক ছন্দ হারাই এবং ছন্দহারা এই জীবনে আস্তে আস্তে বন্ধু বান্ধব কমতে থাকে। এদিকে আমার বিষয়টি আঁচ করতে পেরে আমাদের বন্ধু সোলাইমান গিয়ে জয়নাল কাকার কাছে বিচার দেয়, আপনের হালি তো সুজনের লগে প্রেম করে। জয়নাল কাকা মুখের উপর এমন কথা হয়তো আশা করেনি তাই তিনি চুপ করে থাকে। সোলায়মাল রসিয়ে কসিয়ে আরও বড় করে ঘটনা কল্পনা মিলিয়ে বলে কাকার কান ভাড়ি করে। শেষে কাকা নিঃশব্দে সোলায়মানের কাছ থেকে চলে যায়। চলে গেলে সোলায়মান এসে অন্য বন্ধুদেরও বিষয়টা বলে তখন বন্ধুদের চাপের মুখে আমাকে স্বীকার করতে বাধ্য করা হয় এবং আমি স্বীকার করি যে আজ তিনমাস ধরে আমি সুলতানার সাথে কথা বলি। তখন তখন কথাটা এক-দু কান করে রাষ্ট্র হয়ে যায় এবং আমার পরিবার আমার মোবাইল কেড়ে নেয়। যোগাযোগহীন অবস্থায় দুতিনমাস গেলে হঠাৎ শুনতে পাই যে কাকার শালীর বিয়ে হয়ে গেছে, বিরাট এক ধনকুবের তাকে পাজেরোতে করে নিয়ে গেছে পাঁজরের বন্ধনে বন্দি করতে। আমি সুলতানার জন্য কাঁদি, সুলতানাও আমার জন্য হয়তো কাঁদে। জয়নাল কাকাদের বাড়িতে গিয়ে ঘাটের কাছে শূণ্য টুলটাতে বসে থাকি। বাড়ির ভিতর প্রবেশ করি না। কাকিও নতুন বউ বলে তেমন একটা বাহিরঘাটে আসে না। আমার উদ্দেশ্য, একবার বাগে পেলে জিজ্ঞেস করবো কাকিকে, কেনো এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিলো সুলতানাকে।
আমি কাকির দেখা পাই না। বোধয় কাকিও গেছে বাপের বাড়িতে। একদিন দুইদিন তিনদিন, সময় ঘনায়, সময় যায়। আমিও এসএসি পাশ করে শহরের কলেজে ভর্তি হবো। বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার আগের দিন হঠাৎ জয়নাল কাকার বৌয়ের সাথে দেখা। আরে সুজন! কাকিই আগে থেকে কথা বলে, কতোদিন ধরে তোমাকে দেখি না। আর কি আসোটাসো না নাকি এদিকে। আমি মুখ ভার করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকি। কাকি কাছে এসে শরীরের উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়ে বলে, কী, কথা বলবে না আমার সাথে? আমি কী কথা বলবো? চুপ করে থাকি। কাকি বলে, তোমারে কইছিলাম মশকরা কইরা। তুমি যে সত্যি সত্যিই আমার বোনের সাথে লাইন লাগাই দিবা তা তো ভাবিনি। এরপর দেখো, তুমি এবং অন্য কেউ আর আসো না আমাকে দেখতে। অন্যদের কথা বাদ দিলাম, তোমার নেশাতুর চোখ আমি দারুণভাবে উপভোগ করতাম। বলতে পারো, নিজের প্রেম ঠিক রাখার জন্যই আমি ছোটবোনের প্রেম ভাইঙ্গা দিছি। সুলতানার বিয়ে হয়েছে তো কী হয়েছে? আমি তো আছি।
আমি তো আছি, এই একটি মাত্র শব্দ সেদিন আমার মন ভালো করে দেয়। বিপন্ন বর্ষার মতো অবিরল ঝরতে থাকা হৃদয়ক্ষরণ পলকে কমে আসে। কাকি আরেকটু ঝুঁকে সন্ধ্যার অন্ধকারে আমার গালে চুমু খেয়ে অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে যায়। আমি তারপর অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি সেখানে। রাত যে হয়েছে, অন্ধকার যে বেড়ে যাচ্ছে, আমি যে বিষণ্ন আঁধারের ভেতর জয়নাল কাকার ঘাটের কাছে দাঁড়িয়ে আছি সব ভুলে যাই। দাঁড়িয়ে থাকি তো দাঁড়িয়েই থাকি। প্রহর বাড়তে থাকে। দূরে শেয়ালেরা হুক্কাহুয়া করে ডেকে উঠে। আকাশের মেঘের ফাঁকে একটুকরো চাঁদের ম্লান আলো অন্ধকারকে আরও রহস্যময় করে তোলে। কোথাও একটা সরিসৃপ সরসর করে পাতার উপর দিয়ে চলে যায়। আমি জয়নাল কাকার বাড়ি থেকে ধীরে ধীরে পা বাড়াই। যেতে যেতে শুনি, আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে, রাতের কাহনে কাহনে বেজে চলছেÑ আমি তো আছি, আমি তো আছি...।
৭ মে ২০২২, কুমিল্লা, বাংলাদেশ। ০১৭৬৩৭১৩৫৪৮
জেইমস জয়েসঃ আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের নক্ষত্র

আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা জেইমস জয়েসের জন্ম ১৮৮২ সালে। ডাবলিনে। মৃত্যু ১৯৪১ সালে। তাঁর বাবা জন স্ট্যানিস্লাস জয়েস ছিলেন একজন ব্যর্থ ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ। ট্যাক্স সংগ্রহেও তিনি ছিলেন একজন ব্যর্থ ব্যক্তি। মোটাদাগে, তিনি একজন ব্যর্থ মানুষ ছিলেন। তাঁর বড় ছেলে হলেন আমাদের জেইমস জয়েস। জেইমসের মা একজন দক্ষ পিয়ানো বাজিয়ে ছিলেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে তিনি ছিলেন একজন পাড় ক্যাথলিক। সীমাহীন অভাবের মাঝেও জেইমসের বাবা প্রাণপণে চেষ্টা করতেন তাঁদের মধ্যবিত্ততা রক্ষা করে চলতে।
জয়েস জেসুত স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। তাঁরপর ইউনিভার্সিটি কলেজ, ডাবলিনে। তাঁর প্রথম লেখা ছিল ইবসেনের উপর একটা প্রবন্ধ। ফোর্থনাইটলি রিভিউ নামে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল এটি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দিনগুলোতে জয়েস গানও লিখতেন।
১৯০২ সালে স্নাতক পাস করে তিনি প্যারিসে পাড়ি জমান। তখন বয়স মাত্র বিশ বছর। কঠিন আর্থিক চাপের মধ্যে থেকে তিনি সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা ও অন্যান্য চাকুরী করেছিলেন সেখানে। প্যারিসে এক বছর থেকে তিনি আয়ারল্যান্ডে ফিরে যান অসুস্থ মাকে দেখতে। মায়ের মৃত্যুর অল্প কিছুদিন পর তিনি আবারো ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। ১৯০৪ সালে নোরা বার্নাকলকে নিয়ে দেশ ছাড়েন। নোরা ছিলেন। নোরা ছিলেন একজন পরিচারিকা। তাঁকে ১৯৩১ সালে বিয়ে করেন। জুরিখ, প্যারিস, ক্রোশিয়া,ও রোম প্রভৃতি জায়গা ভ্রমণ করেছিলেন তিনি। অবশ্যই ভ্রমণের ফাঁকে নিয়মিত ডাবলিনে যাওয়া আসা করতেন। বলাবাহুল্য, তিনি অবশ্যই ডাবলিনকে খুব একটা পছন্দ করতেন না। একজন শিল্পীর জন্য প্রয়োজনীয় বিচ্ছিন্নতাবোধ তিনি গড়ে নিতে পেরেছিলেন ঘুরাঘুরির এই বছরগুলোতে।
জেইমসের কাজের তালিকা বেশ সমৃদ্ধ। ১৯০৭ সালে তাঁর কবিতা সংগ্রহ " চ্যাম্বার মিউজিক" প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের মধ্যে ডাবলিনার্স ১৯১৪, আ পোট্টেইট অভ দি আর্টিস্ট এজ আ ইয়াঙ্ম্যান ১৯১৬, নাটক নির্বাসন ১৯১৮, বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ইউলিসিস ১৯২২, এবং ফিনেগানস ওয়েক প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ সালে। ফিনেগান্স ওয়েক পাঠকের মাঝে কাঙ্ক্ষিত সাড়া তুলতে পারেনি।
নোরা ও জয়েস সাতাশ বছর প্রেম করার পর ১৯৩১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করেন। নোরাকে লেখা জয়েসের চিঠিগুলো খুললে বুঝা যায় কতটুকু অন্তরঙ্গ এবং সাহসী যুগল ছিলেন তাঁরা। জয়েসের ইউলিসি বিশ শতকের অন্যতম প্রধান উপন্যাস। আ পোর্টেইট অব দি আর্টিস্ট এজ আ ইয়াঙ্ম্যান অনেকটা আত্মজৈবনিক। পোর্টেইটের মূল চরিত্র স্টেফেন ডেডেলাসের সাথে রবীন্দ্রনাথ নষ্টনীড় গল্পের অমলের মিল পাওয়া যায়। দুইজনই ব্যক্তিগত উন্নতির স্বার্থে যাবতীয় পিছুটানকে মাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যান। স্টেফেনের সাথে ছুটি গল্পের চরিত্র ফটিকেরও মিল আছে এক জায়গায়। ফটিকের জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করে বলে, ' মা,
, এখন আমার ছুটি হয়েছে মা, এখন আমি বাড়ি যাচ্ছি। ” স্টেফেন অসুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে মাকে লিখেন, " মা, আমি অসুস্থ। আমি বাড়ি যেতে চাই। আমি এখন হাসপাতালে।
আলমগীর মোহাম্মদ, শিক্ষক, বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, কুমিল্লা।