ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
উৎসবের আনন্দে উৎকণ্ঠার যাত্রাপথ
Published : Saturday, 30 April, 2022 at 12:00 AM
উৎসবের আনন্দে উৎকণ্ঠার যাত্রাপথমোফাজ্জল করিম ||
আনন্দের ঈদ, কষ্টের যাত্রা- ঈদের আগে ঘরমুখো মানুষের নানামুখী বিড়ম্বনার কারণে এমন শিরোনাম হয় সংবাদমাধ্যমে। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। প্রায় প্রতিবারই সরকারের তরফে বলা হয়, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সব রকম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই যাত্রা কতটা নির্বিঘ্ন হয়, তা ভুক্তভোগীরা জানেন। এ যেন পথে পথে পাথর ছড়ানো। বলা দরকার, যে উপলক্ষে সাধারণ মানুষ নাড়ির টানে ঘরমুখো হয়; এই উপলক্ষগুলো চিরন্তন। আবহমানকালের। অর্থাৎ উৎসব-পার্বণে বিশেষ করে ঈদের মতো উৎসবে যারা নগরে-মহানগরে ও গ্রামে থাকেন, এই দু'পক্ষের একত্র হওয়া কিংবা একসঙ্গে মিলেমিশে উৎসব উদযাপন বা পালন করা আগে থেকেই চলে আসছে।
আগে অর্থাৎ নির্দিষ্ট করেই বলি, ব্রিটিশ আমলে যখন আমাদের এই ভূখণ্ডের হিন্দু জমিদার কিংবা যারা বিত্তশালী ছিলেন তাদের প্রায় সবারই কলকাতায় ব্যবসা-বাণিজ্য অথবা চাকরিসূত্রে বসবাস ছিল। কিন্তু শারদীয় উৎসবের ছুটির আগেই তাদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হতো। মিলিত হওয়ার এই তোড়জোড় দু'দিকেই অর্থাৎ গ্রামে ও দূরবর্তীদের মাঝে শুরু হয়ে যেত।
এমনটি শুধু যে বিত্তশালী হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা নয়। তখন হয়তো সংখ্যায় কম হলেও কলকাতা নিবাসী মুসলমানরাও ঈদে এভাবেই শিকড়ে ফেরার তাগিদ অনুভব করতেন। সেই ধারাবাহিকতা আজও চলমান। আমরা স্বাধীনতার আগের সময়ে অর্থাৎ পাকিস্তান আমলেও এ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছি। স্বাধীনতার পর থেকে দেখা গেল, নগরে-মহানগরে বসবাসকারী প্রায় সবার মধ্যেই গ্রামমুখী হওয়ার প্রবণতা খুব বেড়ে গেল। ঈদে বাড়ি যেতেই হবে। পরিবার-পরিজন নিয়ে বিশেষ উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকল।
এর ফলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে অর্থাৎ ঈদের আগে-পরে প্রায় সর্বত্র চাপ বেড়ে গেল। বিশেষ করে ঈদুল ফিতর অর্থাৎ রমজানের ঈদে; যে ঈদকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন দুটো ঈদের মধ্যে এটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এই সময়ে বাড়ি যাওয়ার চাপ তুলনামূলক বেশি দৃশ্যমান। সেই পাকিস্তান কিংবা ব্রিটিশ আমলে এই ভূখণ্ডের জনসংখ্যা যা ছিল, তার চেয়ে এখন জনসংখ্যা ৩-৪ গুণ। ফলে এই বাড়তি জনচাপ রাস্তাঘাট, যানবাহন ইত্যাদি ক্ষেত্রে পড়ল এবং ক্রমাগত তা বাড়ার কারণে সামাল দিতে সংশ্নিষ্ট মহলগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই সমস্যার সমাধানকল্পে রাতারাতি যে নতুন বা বিকল্প রাস্তা নির্মাণ করা যাবে, তা তো নয়। তাহলে বিকল্প কী? বিকল্প ভাবতে হবে। বিশেষ করে মানুষের চিন্তাধারায় একটু পরিবর্তন আনতে হবে। এই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে শুধু প্রশ্ন তোলাই সমাধান নয়।
নিজের বা পরিবারে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, সুযোগ-সুবিধা বিশেষ করে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ভাবনায় এসব বিষয় নিজের মধ্যেও প্রাধান্য দিতে হবে। একই সঙ্গে দেখতে হবে কোথায় কোথায় মানুষ বেশি বিড়ম্বনায় পড়ছে। সারাদেশে তো একই চিত্র দৃশ্যমান হয়ে ওঠে না। কয়েকটি সড়ক-মহাসড়কে বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। কেন হচ্ছে? যেমন ঢাকা থেকে আরিচা এই পথে স্বাধীনতার আগেও জনচাপ ছিল; স্বাধীনতার পরে তা আরও বেড়েছে। পার্থক্য আরও আছে। তখনকার চেয়ে অবকাঠামোগত অবস্থা এখন অনেক ভালো। কিন্তু জনসংখ্যার আনুপাতিক হার পর্যালোচনা করলে তখনকার চেয়ে এই হার এখন অনেক বেশি এবং এরই বহুমুখী প্রভাব দেখা যাচ্ছে। স্বাধীনতার আগে শুধু রাস্তাঘাটের অবস্থাই অনেকটা করুণ ছিল না; যাতায়াতের মাধ্যমেরও এত প্রসার ঘটেনি। সড়ক-মহাসড়কের এতটা বিস্তৃতিও ছিল না। নদীর ওপর এত সেতুও ছিল না। নদী পারাপার হতে হতো ফেরি দিয়ে।
দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত ছাড়া চাপ আছে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কপথে। এদিকে যাতায়াতকারীদের ফেরি বা নদীপথ অতিক্রম করতে হয় না। কিন্তু এই পথে বিসদৃশ মনে হওয়ার মতো কারণ সারা বছরই কমবেশি দেখা যায়। যেখানে ফেরি কিংবা নদীপথের ঝামেলা নেই, সেখানেও যানজটের এত বিড়ম্বনা কেন? ঝট করে এর একটা উত্তর দেওয়া যায়। এই মহাসড়কে বছরের প্রায় সব সময়ই কোনো না কোনো অংশে সংস্কার বা মেরামত কাজ চলে এবং এরই বিরূপ প্রভাব পড়ে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে। অভিযোগ আছে, কাজের গুণগত মান খারাপ হওয়াই এ অবস্থার সৃষ্টি। সংবাদমাধ্যমে দেখেছি, বিশেষ করে ঈদের সময় এই মহাসড়কে কয়েক কিলোমিটার যানজট লেগেই থাকে। ঢাকা-দক্ষিণবঙ্গ কিংবা ঢাকা-ময়মনসিংহের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এত অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরও জনদুর্ভোগ কমেনি।
সমস্যাগুলো নতুন নয়। কিন্তু মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা কোনো সমাধান নয়। মানুষ তার স্বজন ও পরিবার কিংবা এলাকাবাসীর সঙ্গে মিলিত হতে চায় তার অন্তর্গত টানেই। কিন্তু মানুষের সম্মিলনের এই পথটা কীভাবে সহজ করা যায়, তা ভাবতে হবে। সরকার ও দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর দায় অনেক বেশি বটে, কিন্তু আমাদেরও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আরও সচেতন হওয়া দরকার। জীবনের জন্য যা কিছু ঝুঁকির মাত্রা বাড়ায়, সে সবেরই নিরসন ঘটাতে হবে যূথবদ্ধ প্রয়াসে। নৌপথে চলাচলকারী ছোট-বড় নৌযানের সংখ্যা কম নয়, বরং বলা যায় যথেষ্ট।
নৌপথে যানজটের বিষয়টিও নেই। কিন্তু সে ক্ষেত্রে বড় চিন্তার বিষয় নিরাপত্তা। যাতায়াতের সব মাধ্যমে বিশৃঙ্খলার নিরসন করে কীভাবে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যায়, এর বহুমুখী কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। নৌপথে বিগত দুই দশকে অত্যন্ত মর্মান্তিক কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোর বেশিরভাগই এখনও রয়ে গেছে প্রতিকারহীন। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নতকরণ দরকার। জবাবদিহি ও আইনের বিধিবিধান নিশ্চিত করতে সংশ্নিষ্ট ঊর্ধ্বতনদের নির্মোহ অবস্থান নিতে হবে।
সেই কবে এই ভূখণ্ডে রেলের যাত্রা শুরু হয়েছে; রেলওয়ের উন্নতি আজও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হলো না।
যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে তুলনামূলক নিরাপদ রেলপথে যাত্রী বাড়লেও এর ব্যবস্থাপনাগত নানা ত্রুটি দৃশ্যমান। এই ত্রুটিগুলো রেলের টিকিট বিক্রি থেকে শুরু করে একেবারে কামরা পর্যন্ত বিদ্যমান। সংবাদমাধ্যমেই দেখছি, ঈদের আগাম টিকিট বিক্রির শুরু থেকেই টিকিটপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঘরমুখো মানুষদের কী দুঃসহ বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে! আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, ঈদের সময় লঞ্চ, ট্রেন, বাসের টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে অসাধুদের কালো হাত প্রসারিত হয়। আমরা ইতোমধ্যে স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রম করলেও রেলের সেবার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে এগোতে পারিনি জনপ্রত্যাশা অনুসারে। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তখন রেলের এত চাকচিক্য না থাকলেও অনেকটা নির্বিঘ্নে যাতায়াত করা যেত। অবশ্য এখন সেই তুলনায় যাত্রীসংখ্যা অনেক বেড়েছে, কিন্তু এর সঙ্গে সেবার মানোন্নয়ন ঘটেনি। পরিসর বেড়েছে বটে, কিন্তু যাত্রীদের স্বস্তির যাত্রা নিশ্চিত হয়নি।
যাতায়াতের সব মাধ্যমেই যেটুকু দৃশ্যত উন্নতি হয়েছে, ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়ন সে অনুপাতে অনেক ক্ষেত্রেই করা সম্ভব হয়নি। পদ্মা সেতু হয়তো আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করে দেবে। অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, কিন্তু এর কোনো কিছুর সুফলই সর্বজনের কাছে সমানভাবে ধরা দেবে না, যদি ব্যবস্থাপনার অসংগতি দূর করা না যায়।
প্রায় প্রতি বছর ঈদযাত্রায় যাতায়াতের সব মাধ্যমেই জনবিড়ম্বনার যে চিত্র দেখা যায়, এর কারণ চিহ্নিত করে তা নিরসনে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠন করা যেতে পারে। এই কমিশনের সুপারিশক্রমে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে হয়তো মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরতে পারে। মনে রাখা দরকার, সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হলে অপচ্ছায়া দূর হবে। মানুষের কল্যাণের পথ সুগম হবে। জনবিড়ম্বনা লাঘব হবে।

মোফাজ্জল করিম: সাবেক সচিব ও কবি